আঁরি মিশোর কবিতা


বাংলা রূপান্তর: নান্নু মাহবুব

[কবি, লেখক, চিত্রকর আঁরি মিশোর জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে
বেলজিয়ামের নামিউর শহরে। ১৯ অক্টোবর, ১৯৮৪ সালে প্যারিসে
তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে আ  বারবারিয়ান
ইন এশিয়া; ডার্কনেস মূভস; মিজরেবল মিরাকল; আ ডিসটান্স;
বাই সারপ্রাইজ

প্লুম আঁরি মিশোর প্লুম-সিরিজের কবিতাগুলির কেন্দ্রীয় চরিত্র।]

 

রানীমহলে

পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে প্লুম প্রাসাদে ঢুকতেই রানী বললেন,
“এই শোনো, রাজা তো এখন ভীষণ ব্যস্ত! তাঁর সঙ্গে পরে দেখা কোরো।
তুমি চাওতো পাঁচটার দিকে আমরা দু’জনাই তাঁর সাথে দেখা করতে পারি।
ডেইনদেরকে রাজার ভীষণ পছন্দ! তোমাকে পেলে রাজা খুশিই হবেন।
ততক্ষণ তুমি আমার সাথে একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারো।
প্রাসাদটা এত বড়, সারাক্ষণই আমার ভয়ভয় করে কখন জানি এর মধ্যে
পথ হারিয়ে ফেলবো, তারপর দেখবো আমি একদম রান্নাঘরের ভেতরে।
একটা রানীর জন্যে সেটা যে কত হাস্যকর হবে তুমি তো বুঝতেই পারছো!
আমরা এইদিকে যাব। এই রাস্তাটা আমি ভালোই চিনি। এই যে আমার
বেডরুম।”

এবং তারা ঢুকলো শয়নকক্ষে।

“আমাদের হাতে যেহেতু দু’ঘণ্টার বেশি সময় রয়েছে, তুমি আমাকে কিছু
একটা পড়ে শোনাতে পারো। পড়ার মতো খুব মজার কিছু অবশ্য এইখানে
নাই। তাস খেলা যায়। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে সবসময়ই আমি
খেলতে-না-খেলতেই হেরে ভুত।
তুমি ওইভাবে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকো না তো, সেটা খুবই ক্লান্তিকর; বসে
থাকলেও দেখ বোর লাগে, আচ্ছা আমরা তো এই ডিভানটার উপর শুয়ে
থাকতে পারি।”

এবং তারা ডিভানটার উপর শুয়ে পড়লো।

কিন্তু শিগগিরই রানী আবার উঠে বসলেন।

“এই ঘরটায় সবসময়ই অসহ্য গরম! তুমি যদি আমার কাপড়চোপড়
খোলায় একটু সাহায্য করতে আমি ভীষণ খুশি হতাম। তখন আমরা ঠিকমতো
গল্পসল্প করতে পারতাম। ডেনমার্ক নিয়ে কিছু শুনতে আমার কী যে ভাল্লাগবে!
তাছাড়া এই ফ্রকটা খোলা কোন ব্যাপারই না।  সারাদিন যে আমি কীভাবে
এইসব পরে থাকি! কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফ্রকটা পিছলে বার হয়ে
আসবে। এই যে দেখ, আমি হাত উঁচু করছি। এখন একটা বাচ্চাও তার হাতের
মধ্যে ফ্রকটা টেনে নিতে পারবে। কিন্তু সেটা নিশ্চয় আমি তাকে করতে দিব না!
বাচ্চাদের আমার খুবই পছন্দ, কিন্তু একটা প্রাসাদে কত যে কানাকানি, আর
তাছাড়া বাচ্চারা যাতেই হাত দেয় সেটাই নষ্ট করে ফ্যালে।”

প্লুম তাকে নগ্ন করলো।

“এই, তুমি ওইভাবে থেকো না তো! বেডরুমে কেউ সমস্ত কাপড়চোপড় পরে
থাকলে কী যে বাজে লাগে, আর আমি তোমাকে ওইভাবে সহ্যও করতে
পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আমাকে এই বিশাল প্রাসাদটায় একা ফেলে তুমি
কোথাও চলে যাচ্ছো।”

প্লুম নগ্ন হলো। তারপর তার শার্টের উপরেই শুয়ে পড়লো।

“এখন বাজে কেবল সোয়া তিনটা,” রানী বললেন, “ডেনমার্ক নিয়ে পৌনে
দু’ঘণ্টা চালাবার মতো অতকিছু কি তুমি আসলে জানো? আমারও অত দরকার
নেই বাপু। সেটা যে কত কঠিন হবে আমি বুঝি। এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করার
জন্যে তোমাকে একটু সময় দিচ্ছি। আর শোনো, ততক্ষণে, তুমি আছোই যখন
তোমাকে কিছু জিনিস দেখাই, জিনিসগুলো আমার কাছে খুবই রহস্যময় লাগে।
একজন ডেইন এটা নিয়ে কী বলে আমার খুব জানার ইচ্ছে!
আমার ডান স্তনের নিচে দেখ, ঠিক এইখানে, তিনটা ছোট ছোট দাগ,
না তিনটা না: দুইটা ছোট, একটা বড়। বড় দাগটা দেখ, এটা দেখতে ঠিক…
সত্যিই খুব আজব, না? আর বাম স্তনটা দেখ, কিচ্ছু না! একদম সাদা!
শোনো, কিছু-একটা বলো আমাকে, কিন্তু তার আগে এইটা ভালোভাবে পরীক্ষা
করো, সময় নিয়ে দেখ…”

তো প্লুম তাঁর স্তন পরীক্ষা করলো। দ্বিধাজড়িত আঙুলে সে সেগুলো স্পর্শ করলো,
হাতড়ালো, এবং কাজটা করতে গিয়ে তার কাঁপুনি শুরু হলো, এবং তার আঙুলগুলো
সেগুলোর বঙ্কিম পথে চলতেই থাকলো।

প্লুম খানিকক্ষণ চিন্তা করলো।

“তুমি দেখি চিন্তা করছো,” কিছুক্ষণ পর রানী বললেন, “(এখন তো দেখছি তুমি
ভালই ওস্তাদ।) তুমি জানতে চাও আমার আর কোনো পরপুরুষ আছে কি না।
না, নাই,” এই কথা বলেই রানী লজ্জা পেয়ে ভীষণরকম লাল হয়ে গেলেন।

“এখন আমাকে ডেনমার্ক বিষয়ে বলো, কিন্তু আমার উপর চেপে আসো যাতে
তোমার কথা আরো ভালোভাবে শুনতে পাই।”

প্লুম এগুলো; শুয়ে পড়লো তাঁর পাশে এবং নিজের অবস্থাটা আর লুকোতে পারলো না।

এবং সত্যিসত্যিই…

“শোনো,” তিনি বললেন, “আমার মনে হয় রানীর উপর তোমার যথেষ্টই শ্রদ্ধা আছে,
কিন্তু তোমার যা অবস্থা, ডেনমার্ক নিয়ে আমাদের আলাপসালাপ পরে হলেও
অসুবিধা নেই।”

রানী তাকে কাছে টেনে নিলেন।

“আমার পায়ে আদর দিতে থাকো,” তিনি বললেন, “নইলে আমার মনটা এক্ষুণি
বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। কেন যে এখানে শুয়েছি সেটাই আর মনে করতে পারবো না।”

ঠিক ওই সময় রাজা এসে ঘরে ঢুকলেন!

. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .
ঘটনাটি ভয়ঙ্কর, ঘটনাটির প্লট বা শুরুটা যেমনই হউক না কেন, ঘটনাটি গভীর
বেদনাদায়ক, এক ক্ষমাহীন প্রতিপক্ষের দ্বারা পরিচালিত।

 

প্লুমের আঙুল ব্যথা

প্লুমের আঙুল একটু ব্যথাব্যথা করছিল।

“তুমি বরং একটা ডাক্তার দেখাও,” তার বউ বললো, “একটু
লোশন লাগালেই এইসব সেরে যায়।”

তার কথা শুনে প্লুম ডাক্তারের কাছে গেল। “একটা আঙুল কেটে
ফেললেই সব ঠিক হয়ে যাবে,” সার্জন বললেন, “এ্যানাস্থীজিয়া
দিলে এটা খুব বেশি হলে ছয় মিনিটের ব্যাপার। আর তাছাড়া
আপনি তো ভাই বড়লোক, অনেক আঙুলের আপনার কোনো
প্রয়োজন নাই। শুনুন, এই অপারেশনটা করতে পারলে আমি খুশিই
হবো, তারপর আপনাকে কয়েক ধরনের আর্টিফিশিয়াল আঙুল
দেখাবো। কয়েকটা আঙুল আছে একেবারে নিখুঁত। ওহ্, সেগুলোর দাম
অবশ্য একটু বেশি। কিন্তু দামটা তো এখানে কোনো ব্যাপারই না
কারণ সবচে’ ভালো আঙুলটাই আমরা আপনাকে দেবখন।”

বিষণ্ন দৃষ্টিতে আঙুলটার দিকে তাকিয়ে প্লুম মৃদু গাঁইগুঁই করলো:
“ডক্টর, এটা তো তর্জনী, তাই না? খুবই জরুরী আঙুল। আসলে যেই
মাকে লিখতে শুরু করেছি…লেখার সময় আমি সবসময় তর্জনীই
ব্যবহার করি। মাকে যদি আর কখনো না লিখি মা আমার খুব
দুশ্চিন্তায় পড়বেন। ক’দিন পরেই আমি আবার আসবোখন। মা
আমার খুব সেনসিটিভ মানুষ। খুব অল্পতেই মা অস্থির হয়ে যান।”

“কোনো ব্যাপারই না,” সার্জন বললেন, “এই যে এখানে কাগজ
আছে, স্রেফ সাদা কাগজ, এতে কোনো হেডিংও নাই। তাঁকে কিছু
ভালো ভালো কথা লিখে দিন, ব্যাস হয়ে গেল। ততক্ষণে আমি
ক্লিনিকে খবর দিয়ে দিচ্ছি সবকিছু ঠিকঠাক করতে: শুধু কিছু
যন্ত্রপাতি স্ট্যারিলাইজ করে বের করা। আমি এই যাব আর
আসবো।”

সার্জন গিয়েই আবার তক্ষুনি ফিরে এলেন, বললেন, “সবকিছু রেডি,
তারা আমাদের অপেক্ষায়।”

“এক্সকিউজ মি, ডক্টর,” প্লুম বললো, “হাতটা কীরকম কাঁপতেছে
দেখুন। আমি সহ্য করতে পারছি না…”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” সার্জন জবাব দিলেন, “ঠিকই তো, মাকে কিছু লেখারই
দরকার নাই। মহিলারা খুব স্পর্শকাতর হয়, বিশেষ করে মায়েরা।
তাঁদের ছেলেদের ব্যাপারস্যাপার নিয়ে তাঁদের সারাক্ষণই খুঁতখুঁতানি।
তাঁদের কাজই হলো তিলকে তাল করা। আপনি-আমি তাঁদের কাছে
তাঁদের ছোট্ট সোনামণি ছাড়া আর কিছুই নই।
এই যে আপনার ছড়ি আর এই যে আপনার হ্যাট। চলুন চলুন,
গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে…”

শিগগিরই তাদের দেখা গেল অপারেশন কক্ষে।

“শুনুন শুনুন, ডক্টর! আমি আসলে, সত্যিই…”

“ঘাবড়াবেন না!” ডাক্তার চিৎকার করে উঠলেন। “আপনি
অতি বিবেকবান হইছেন। চান তো আমরা দুজনে মিলেই চিঠিটা
লিখবোখন। অপারেশনটা করতে করতেই আমি সেটা নিয়ে
ভাববো।” নিজের মুখে মাস্ক লাগাতে লাগাতে তিনি প্লুমকে ঘুম
পাড়িয়ে দিলেন।

“তুমি তো আমার একটুখানি মতামতও নিতে পারতে,” প্লুমের বউ
বললো তার স্বামীকে। “হারানো আঙুল ফিরে পাওয়া খুব সহজ
ভাবছো? মুড়া আঙুলের একটা লোক! না না আমি ভাবতেই পারি
না। আঙুলটা যখন বাদই দিছো, আমার উপর আর নির্ভর
করবা না। পঙ্গুগুলা জঘন্য, ধর্ষকামী, কোনো ধর্ষকামীর সাথে জীবন
কাটানোর জন্যে আমি বড় হই নাই, বুচ্ছো? তুমি বোধহয় ভাবছো
সেবাদাসি হয়ে আমি ওইসমস্ত কামে তোমারে সঙ্গত করে যাবো।
ভুল, ভুল, তোমার আগেই সবকিছু ভাবা উচিৎ ছিলো।”

“শোনো শোনো,” প্লুম বললো, “ভবিষ্যতের কথা ভেবে অত
চিল্লাচিল্লি কোরো না তো! এখনো আমার নয়টা আঙুল আছে আর
তোমার স্বভাবটাও হয়তো শেষমেশ পাল্টে যাবে।”

 

একজন শান্তিকামী মানুষ

বিছানায় হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙতে গিয়ে হাতে দেয়াল না
ঠেকায় প্লুম আশ্চর্য হয়ে গেল। “হুম, নিশ্চয় পিঁপড়া খেয়ে
ফেলেছে…” সে ভাবলো, এবং আবার ঘুমিয়ে পড়লো।

একটু পরেই তার বউ এসে তার হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগলো:
“দেখ, দেখ, অপদার্থ!” বউ বললো, “মড়ার মতো ঘুমুচ্ছিলে যখন
তারা আমাদের বাড়িটাই চুরি করে নিয়ে গেছে।”
এবং সত্যিসত্যিই চারদিকে ছড়িয়ে আছে নিঃসীম আকাশ।
“ওহ্ আচ্ছা, এইটা তাহলে শেষ!” সে ভাবলো।

একটু পরেই তারা একটা শব্দ শুনতে পেলো। একটা ট্রেন সশব্দে
সোজা তাদের দিকে ছুটে আসছিলো।
“যেভাবে ছুটে আসছে, আমাদের আগেই ওটা চলে আসবে,”
এবং আবার সে ঘুমিয়ে পড়লো।

তারপর তার ঘুম ভাঙলো ঠাণ্ডায়। তার সমস্ত শরীর রক্তে
জবজবে। তার পাশেই তার বউয়ের কয়েকটা টুকরো পড়ে ছিলো।
“যেখানেই রক্ত সেখানেই এতো যন্ত্রণা!” সে ভাবলো, “শুধু ওই
ট্রেনটা যদি না যেত কী ভালোই না হতো! কিন্তু গেছেই যখন…”
এবং আবার সে ঘুমিয়ে পড়লো।

“দেখ হে,” মহামান্য বিচারক বলছিলেন, “তোমার বউটা এমন
মারাত্মকভাবে জখম হয়ে আট টুকরা হয়ে গেলো, আর তুমি তো
শুয়ে ছিলে তার পাশেই, একটু নড়লে না পর্যন্ত, এমনকি ব্যাপারটা
বুঝতেও পারলে না, এই ঘটনায় তোমার ব্যাখ্যাটা কী? সেটাই
হলো রহস্য। সেটাই হলো প্রশ্ন।”

“এই তদন্তে আমি তাঁকে কোনো সাহায্যই করতে পারি না।” প্লুম
ভাবলো, এবং আবার সে ঘুমিয়ে পড়লো।

“আগামীকাল ফাঁসি কার্যকর হবে। আসামীর কোনো বক্তব্য আছে?”

“আমি দুঃখিত,” সে বললো, “আমি কিছুই খেয়াল করি নাই।”
এবং আবার সে ঘুমিয়ে পড়লো।

 

সরলতা

এতকাল যাবৎ আমার জীবনে যে জিনিসটার অভাব ছিলো
সেটা হলো সরলতা। এখন আমি একটু একটু করে পাল্টাতে শুরু করেছি।

যেমন ধরুন, এখন আমি সর্বদাই বাইরে বেরুই আমার বিছানাপাতি
সঙ্গে নিয়ে, আর কোনো নারীকে পছন্দ হলেই তাকে বিছানায় নিয়ে নিই।

তার নাক বা কানগুলো যদি কুৎসিত বা বড় বড় হয়, সেগুলো আমি তার
কাপড়চোপড়ের সাথে খুলে নিয়ে বিছানার নিচে রেখে দিই, যাতে করে
যাবার সময় সে সেগুলো ফেরৎ নিয়ে যেতে পারে। আমার যা পছন্দ আমি
শুধু সেটাই রাখি।

যদি তার অন্তর্বাস পাল্টানো লাগে তক্ষুনি আমি সেগুলি পাল্টে দিই।
এইগুলিই হলো আমার উপহার। কিন্তু যদি দেখি আরো সুন্দরী একটা নারী
যাচ্ছে, তক্ষুনি আমি প্রথমটার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে হাওয়া করে দিই।

লোকজন যারা আমাকে চেনে তাদের ধারণা, এতক্ষণ যা বলেছি সেটা
আমি পারবোই না, সেটা আমার স্বভাবই নয়। নিজের সম্পর্কে আমারও
একসময় তাই ধারণা ছিলো, তবে তার কারণ হলো তখন আমি
যা-পছন্দ-তাই করতাম না।

এখন আমার বিকেলগুলো অসাধারণ। (সকালের দিকে আমি কাজকর্ম করি।)

……..

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *