গল্প: ঘোর


দারা মাহমুদ

 

আমার বাবার একটা প্রিয় কুকুর ছিলো, নাম কালু। বাবা যখন কোর্টে যেতেন, কুকুরটা পেছন পেছন যেতো। বাবা আর মহুরি চাচা রিকশায় উঠলে, কালু ফিরে আসতো। লেজ নাড়াতে নাড়াতে। এই ভাবে প্রতিদিন কালু বাবাকে সি অফ করতো। একদিন কুকুরটা মারা গেলো। কুকুরটার মৃত্যুতে বাবা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। একদিন না খেয়ে ছিলেন। এসব আমার শোনা কথা। কারণ তখন আমার জন্মই হয়নি। কালুর মৃত্যুর পনের দিন পর আমার জন্ম হয়। মায়ের চতুর্থ এবং শেষ সন্তান, আর বাবার অষ্টম এবং শেষ সন্তান হিসাবে। আমার বাবার ছিলো দু’টি পরিবার। আমার জন্ম দ্বিতীয় পক্ষে। আমার যখন জন্ম হয় তখন আমাদের বাড়ির লোকজন সন্তান দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমার জন্মটা আকাঙ্খিত ছিল না। বাবা তার কুকুরের নামে আমার নাম রাখলেন “কালু”।

কুকুরের নামে আপনার নাম রাখলো?

এতোক্ষণে কথা বললো মেয়েটা। সেই সন্ধে থেকে মুখোমুখি বসে আছে, অনেকটা নীরব শ্রোতার মতো। মুশফিকুর রহমান, ওরফে কালু ওরফে মুশফিক সন্ধ্যায় সংসদ ভবন এলাকা থেকে মেয়েটাকে এনেছে তিনশত টাকা রাত চুক্তিতে। মেয়েটা অবশ্য পাঁচশ হেঁকেছিলো, দরদাম শেষ পর্যন্ত তিনশতে ঠেকে। বাসায় আনার পর থেকে মুশফিক কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। পুরো দু’হাজার টাকা মেয়েটার হাতে ধরিয়ে বললো, এই সোফাটায় বসো, তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে।

মেয়েটার নাম শিউলি। এই নামটাই সে মুশফিককে বলছে। শিউলি অবশ্য মুশফিকের এই অস্বাভাবিক আচরণে মোটেও অবাক হচ্ছেনা। ও পেশাগত জীবনে এরকম অনেক চিড়িয়া দেখেছে। অনেকে উদ্ভট ধরনের যৌন আচরণ করে, আবার অনেকে নানা ধরনের পাগলামি করে। আস্ত এক লিটারের বোতল নিয়ে বসেছে মুশফিক।

গ্লাসের শেষ সিপটা মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে, আর একটা পেগ ঢালতে ঢালতে মুশফিক বললো, হ্যাঁ সেই গল্পটাই তো তোমাকে বলছি। আমার কালু নামটা শেষ পর্যন্ত টেকে নি। আমি যখন বিশাল ঠিকাদার হয়ে গেলাম। কোটি টাকা নাড়াচাড়া করি, তখন আমার শরীর থেকে কালু নামটা খসে গেলো। আমি হয়ে গেলাম মুশফিক সাহেব। এবং এটা কার জন্য হলো জানো?

শিউলি বললো, না।

এটা সম্ভব হয়েছিলো বনির জন্য। বনি দেখতে ছিলো ঠিক তোমার মতো। আমি তো লাইটের আলোয় তোমাকে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে চোখ আর ঠোঁট। একদম এক রকম। তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে রাস্তায় দাড়ালো কেন, সে গল্প শোনার আগ্রহ ঠিক এই মুহূর্তে নেই। কারণ তোমাদের সমস্ত দুঃখের কাহিনী একই রকম। আমার কাহিনী শোনো। আমার গল্পটা অন্যরকম।

মুশফিকের চোখ এবং কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। শিউলিও শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে সোফার ওপরে। মাঝে মাঝে হাই তুলছে শিউলি। কিন্তু ঘুম ঠেকিয়ে রেখেছে, কারণ ভদ্রলোক অনেকগুলো টাকা দিয়েছেন ওকে। এছাড়া অন্য একটা ভয়ও ওর মনে কাজ করছে। একবার এক ভদ্রলোক এরকম নানা প্যাঁচাল পাড়তে পাড়তে হঠাৎ জলন্ত সিগারেট চেপে ধরেছিলো ওর স্তনের ওপর। তারপর রীতিমতো ধর্ষণ করেছিলো। এখনো ডান স্তনে কালো পোড়া দাগটা আছে।

মুশফিক পান করতে করতে কিছুটা জড়ানো গলায় গল্প বলতে লাগলো। -বুঝলে, আমার বাবা ছিলেন মোক্তার। পরে সব মোক্তাররা যখন উকিল হয় বাবাও একটা পরীক্ষা দিয়ে উকিল হয়ে গেলেন। তখন জেলা শহরে আমাদের বাড়িটা ছিলো দেখার মতো। বিশাল দু’তলা। বৃটিশ আমলে এটা ছিলো সেনদের বাড়ি। সাতচল্লিশে সেনরা কলকাতা চলে গেলে আমার দাদা বাড়িটি দখল করেন। তো আমাদের বাড়ির ঠিক সামনেই ছিলো বনিদের বাড়ি। ওর বাবা আগে থেকেই পাশ করা উকিল ছিলেন। একটু নাকউঁচু ভাব ছিলো। বনি ওই বাড়ির ছোট মেয়ে। বনির কথায় পরে আসছি। আগে নিজের কথা বলে নিই। আমাদের বাড়ির সব ছেলেমেয়ে পড়েছে কনভেন্টে। আমাকে ভর্তি করে দেয়া হলো ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে। কারণ কালু বাবার প্রিয় হলেও কুকুর ছিলো তো। বাবা হয়তো চেয়েছিলেন এই অনাকাঙ্খিত ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাক। তিনি টের পেয়েছিলেন সামনের দিন আসছে মাস্তানদের। তার নানা উপায়ে করা বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রক্ষা করতে হলে বাড়িতে একটা মাস্তান দরকার হবে। তুমি আমার কথা শুনছো তো? কি যেন নাম বললে?

জ্বে, শিউলি।

শিউলি নিশ্চয় তোমার আসল নাম না। থাক তোমার আসল নাম জানার কোন দরকার নেই। শোনো, আমাকে যে হাইস্কুলে ভর্তি করা হলো সেটা ছিল শহরের সবচে ওয়াস্ট স্কুল। একশ জন প্রবেশিকা দিলে পাশ করতো চার পাঁচ জন। শিক্ষকগুলো ছিলো হতদরিদ্র, চির অসুখী। জীবনের সমস্ত ব্যর্থতার উশুল নিতো ছাত্র পিটিয়ে। আর আমি ছিলাম প্রধান টার্গেট। কারণ আমার ভেতর নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবণতাগুলো তখন চারিয়ে উঠেছে। তোমার মনে হয় লেখাপড়ার কথা ভালো লাগছে না। খুবই স্বাভাবিক। তুমি তো নিশ্চয় লেখাপড়া করোনি।

জ্বে, না।

আচ্ছা লেখাপড়ার প্রসঙ্গ বাদ দিলাম। বনির কথা বলি। তখন আমি শহরের নাম করা মাস্তান হয়ে গেছি। আমার নামে একটা মাস্তান বাহিনী চলে। চাঁদাবাজি করি, বেশ্যা পাড়ায় যাই। লোকজন ভয় পায়। বাবার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। একদিন বাবা আমাকে ডেকে বললেন, কালু সাদেক সাহেব একটা অনুরোধ করেছেন।

আমি বলি কি অনুরোধ বাবা?

উনার মেয়েকে কয়েকদিন তোর মটরসাইকেলে করে কলেজ থেকে আনা নেওয়া করতে হবে।

কেন? এরকম অনুরোধ কেন?

উনার মেয়ের পিছনে অন্য পাড়ার মাস্তান লেগেছে, উনার ধারণা তোর সাথে কয়েকদিন দেখলে মাস্তানরা বনিকে আর উত্যক্ত করবে না।

বাবার কণ্ঠে এক ধরনের অহংকার ঝরে পড়ে। মাস্তান ছেলের জন্যে অহংকার। ভাবটা এমন পাশ করা উকিল, নাকউঁচু, শেষ পর্যন্ত মোক্তার উকিলের কাছ আসতে হলো তো !

বনির পেছনে অন্য পাড়ার মাস্তান লাগার একটি অন্যতম প্রধান কারণ ছিলো, বনি দেখার মতো সুন্দরী হয়ে উঠেছিলো। সেকেন্ডারী পরীক্ষায় বনি বোর্ডে মেয়েদের মধ্যে থার্ড প্লেস পেয়েছিল। তো ঘটনা হলো কি জানো? একদম হিন্দি সিনেমার মতো। বনির সাথে আমার প্রেম হয়ে গেলো। এইচ এস সি পর্যায়ের ছেলে মেয়েরা নানান উদ্ভট কাজ করে। আমার প্রতি বনির ঝুঁকে পড়াটাও সে রকম একটা উদ্ভট ব্যাপার ছিলো। বনির বাবা সাদেক উকিল সাহেব তীব্রভাবে রিএ্যাক্ট করলেন। কিন্তু আমার ভয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে পারলেন না। আমার জীবনের গতিপথ ঘুরে গেলো। বনির জন্য আমি মাস্তানি ছেড়ে ঠিকাদারী শুরু করলাম। প্রথমে ছোট ছোট রিপেয়ারিং ওয়ার্ক। আস্তে আস্তে বড় কাজে হাত দিলাম। পানি উন্নয়ন বোর্ড একটা বাঁধ বানাতে পারছিলো না এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোকের জন্য। ঠিকাদার ইঞ্জিনিয়াররা সবাই মিলো নেগোসিয়েশান করে কাজটা আমাকে দিলো। কাজটা বেশ বড় ছিলো। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কাজটা আমি তুলে ফেললাম। আমাকে ঘাটাতে কেউই সাহস পায়নি। ব্যস, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি আমার। এই যে এই বাড়িটা দেখছো না, ঢাকায় এই তিনতলা বাড়িটা আমার সে সময় করা। তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?

শিউলি বললো, না, পিপাসা লেগেছে।

পানি খাও, ঐ তো ডাইনিং-এ গ্লাস-জগ সব আছে। একটু হুইস্কি নেবে? অবশ্য কেরুর হুইস্কি। স্কচ ডিলাক্স থেকে নামতে নামতে কেরুতে ঠেকেছে, আর উঁচুতলার প্রসটিটিউট থেকে নামতে নামতে রাস্তায়, এই তোমাদের কাছে এসে ঠেকেছে। অবশ্য তুমি আর বেশিদিন রাস্তায় ঘুরবে না। সুন্দরী মেয়েরা বেশিদিন রাস্তায় থাকে না। নাও একটু হুইস্কি নাও।

জ্বে না, আমি খাই না।

শিউলি উঠে গেলো ডাইনিং-এর দিকে। মেয়েটা বেশ লম্বা। বনিও লম্বা ছিলো। কিন্তু সম্পূর্ণ চোখ তুলে তাকাতে পারছে না মুশফিক। চোখ ঝুলে আসছে। আর বোধ হয় পান করা ঠিক হবে না। গল্পে গল্পে অনেক টেনেছে ও । তবুও গ্লাসে ঢাললো মুশফিক। মেয়েটা এসে আবার ওর সামনে বসলো। চোখে ঘুম। চেহারা আর চলাফেরায় বেশ আভিজাত্য আছে মেয়েটার। তবে প্রসাধনে আর কথাবার্তায় একেবারে অনভিজাত। মুশফিক আবার বসলো, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?

জ্বে না।

আমার গল্প মনে হয় তোমার ভাল লাগছে না।

জ্বে, ভালো লাগছে, খুব ভালো লাগছে।

শিউলি দু’হাত কাঁধের কাছে তুলে ধরে সোফায় এলিয়ে পড়লো। গল্প যে ওর ভালো লাগছে না তা ওর চেহারা, ইঙ্গিত করছে। কিন্তু ও যে টাকাগুলো পেয়েছে তার জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে চায়। সেরকম বডি ল্যাঙ্গুয়েজ প্রকাশ করার চেষ্টা করলো ও। কিন্তু মুশফিক সে দিকে গেলো না। মুশফিক বললো, আমার গল্প প্রায় শেষ, তোমাকে আর বেশিক্ষণ কষ্ট দেবো না।

শিউলি বললো, আপনি গল্প বলেন, আমার কষ্ট লাগছে না।

শোনো তখন বাবা আর বেঁচে নেই। আমার ভাইরা সব চাকরী করে, আমি জেলার দুতিন ঠিকাদারের একজন। ডিসি এসপির সাথে মিটিঙে বসি। মহল্লার ক্লাবের অনুষ্ঠানে আমি বিশেষ অতিথি হই। বনি তখন এম এ ফাইনাল দিয়েছে। বার বার আমাকে বিয়ের কথা বলছে। রোডস এন্ড হাইওয়েজের একটা ব্রিজ তৈরি নিয়ে আমি ব্যস্ত। ভাবছি ব্রীজের কাজটা উঠে গেলেই বিয়েটা করে ফেলবো। সাদেক সাহেব না করতে পারবেন না। কারণ, তখন আমি নিজে মাস্তানি না করলেও মাস্তান পুষি। টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, ঢাকায় বাড়ি আছে। আমাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা তখন আর নাকউঁচু সাদেক উকিলের নেই। কিন্তু ব্যাপারটা কি হলো জানো?

শিউলি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মাথা ঝাঁকি দিয়ে উঠে বললো, না।

ব্যাপারটা হলো কি সাদেক মিয়া গোপনে বনিকে নিয়ে এলো ঢাকায়, ভায়ের বাসায়। কিছুটা জোর করে ইঞ্জিনিয়ার ডেভেলপার ছেলের সাথে বনির বিয়ে দিয়ে দিলো। আর বনি কি করলো জানো?

এবার শিউলি বললো, জানি।

কি জানো, বলতো।

মেয়েটা সোয়ামীর ঘরে যেয়ে আপনাকে ভুলে গেলো। তাই আপনি মনের দুঃখে…

না তোমার ধারণা ঠিক নয়। বিয়ের এক সপ্তাহ পরে বনি আত্মহত্যা করেছিলো। আমার মতো আপদমস্তক পচনশীল মানুষের জন্য শহুরে শিক্ষিতা বনি আত্মহত্যা করে বসে। আমি বিষয়টি যখন জানলাম, বুঝলে, তখন আর করার কিছুই নেই। একবার ভাবলাম সাদেক উকিলকে খুন করে ফেলি। কিন্তু সাদেক নিজেই হার্টফেল করে মারা গেলেন। ব্যবসা বাণিজ্য গুটিয়ে সব টাকা পয়সা নিয়ে ঢাকা চলে এলাম। সমস্ত টাকা দিয়ে সিদ্ধেশ্বরীতে জমি কিনলাম। বড় ডেভেলপার হবো এরকম ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু আলী হোসেন গং জমির আসল মালিক হিসাবে মামলা করলো। অনেকদিন হলো, এখনো মামলা ঝুলছে। বাজারে যা দেনা হয়েছে, এই বাড়িটা বেঁচলে তা শোধ হবে না। তবুও টিকে আছি। বাড়ি ভাড়ার টাকায় মামলা চালাই, কোনরকমে নিজে চলি। শস্তা মদ খাই, শস্তা মেয়েলোকের কাছে যাই। আসলে আমার এই অবস্থা কেন হলো জানো ?

শিউলি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললো না।

মুশফিকের কথা জড়িয়ে গেছে। কিছুটা থেমে থেমে বললো, আসলে আমার জীবন থেকে বনি হারিয়ে গেছে বলেই, আমার এই বিপন্ন দশা।

শিউলি চুপ করে থাকলো।

মুশফিক বললো, তোমাকে এতো বড় গল্প যে জন্য বললাম এবার সেই আসল কথাটাই বলি:

কিন্তু কথা বলতে পারলো না মুশফিক। উঠে আস্তে আস্তে টলতে টলতে টয়লেটের দিকে গেলো ও।

শিউলি যেভাবে সোফার উপর শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বসে ছিলো ঠিক সেইভাবে বসে থাকলো। শিউলি শুনতে পেলো, বমি করার শব্দ। ভদ্রলোকের জন্যে কি কিছু করা উচিত? না, এসব কাজ শিউলিদের পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। শিউলি ঠায় বসে থাকলো। বসে বসে চোখ চালালো ঘরের চারদিকে।

কিছুক্ষণ পর মুশফিক টলতে টলতে এসে বসলো আগের জায়গাটায়। ঈষৎ বেঁকে গেছে ওর মাথাটা। একটা চোখ বন্ধ, একটা চোখ আধখোলা। ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক হয়ে আছে। মুখ দিয়ে এক ধরনের চাপা গোঙানির শব্দ বেরুচ্ছে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অল্প অল্প করে লালা বেরিয়ে জামার বুক পকেটের মধ্যে পড়ছে।

কিছুক্ষণ আগেও কিছু করার ছিল শিউলির। অন্তত, ভদ্রলোকের গল্প শোনার ভঙ্গি করার ছিলো। কিন্তু এখন কিছুই করার নেই। ভদ্রলোক ঘুমিয়ে পড়েছে না জেগে আছে ঠাওর করতে পারছেনা শিউলি। ওর বয়স এখন আঠার উনিশ হবে। ওর বয়সের দ্বিগুণ বয়সী একজন লোক একটা চোখ হালকা ফাঁক করে জড়পিণ্ডের মতো পড়ে আছে। পুরুষ শিকার ওর জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় হলেও পুরুষ দর্শন হয়ে উঠে না। কারণ ক্রেতারা পণ্য পছন্দ করে, কিন্তু ক্রেতা পছন্দের অধিকার পণ্যের নেই। অনেক অনেক দিন পর শিউলি সম্পূর্ণ চোখ খুলে একজন পুরুষ দেখছে। মাঝ বয়সী মাথায় হালকা চুল, স্ট্রাইপের সার্ট আর গাঢ় নীল রঙের প্যান্ট পরা। বুকের কাছে কয়েকটা বোতাম খোলা। সার্ট গলিয়ে রোমশ বুক দেখা যাচ্ছে। একজন সম্পূর্ণ পুরুষ।

আস্তে আস্তে উঠলে শিউলি। পানি খাওয়ার সময় ডাইনিং থেকে একটা ঝুল বারান্দা দেখেছিলো। ধীর পায়ে ওই দিকেই গেলো। দু’তলার ঝুল বারান্দা থেকে শিউলি দেখলো মহল্লার রাস্তাটা একদম ফাঁকা। লোকজন নয় যেনো ঘর বাড়িগুলোই ঘুমুচ্ছে। শিউলি ইচ্ছে করলে এখন চলে যেতে পারে, কারণ বাইরের গেটের কমন চাবিটা ভদ্রলোক ওর সামনেই ড্রইং রুমের একটা পাশ টেবিলে রেখেছিলো। চাবিটা এখনো ওখানেই আছে। এখন মধ্যরাত এ সময় বাইরে বেরুনো ঠিক হবে না। শিউলি আবার ড্রয়িং রুমে এলো। ভদ্রলোক একই ভঙ্গিতে সোফার উপর আধশোয়া হয়ে আছে। একটা চোখ আগের মতোই আধখোলা। মুখ দিয়ে যে শব্দটা বেরুচ্ছিলো তা এখন কানে এসেছে।

শিউলি আস্তে আস্তে ভদ্রলোকের খুব কাছাকাছি এলো। আধখোলা চোখের খুব কাছাকাছি চোখ এগিয়ে নিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো লোকটা ঘুমে না জেগে। বসলো শিউলি। আবার সম্পূর্ণ চোখ তুলে তাকালো মুশফিকের দিকে। শিউলির মনে হলো একটা নৌকা পানির ভিতর আধা ডোবা হয়ে আছে।

“দুই”

মুল ভবনটি লকেট, আর পাশের বিল্ডিংগুলো হচ্ছে হার। একদিন চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় কি একটা সমস্যা হয়েছিলো, প্লেন নামতে পারছিলো না। অনেকক্ষণ ধরে ঢাকার আকাশে চক্কর খাচ্ছিলো প্লেনটা। লোকজন নানারকম দোয়া-দুরুদ পড়ছিলো। মুশফিক কিন্তু কিছুটা ওপর থেকে ঢাকা শহরটাকে দেখছিলো একমনে। প্লেনটা যখন সংসদ ভবনের উপরে আসছিলো মুশফিক খেয়াল করেছিলো হার এবং লকেটের ব্যাপারটি । জাতীয় সংসদ ভবনের বিশ্বখ্যাত নকশাবিদ একজন মহিলার গলার হার দেখে সংসদ ভবনের আর্কিটেকচারাল আইডিয়া গ্রহণ করেছিলেন। অনেকদিন এই বিশাল স্থাপনা প্রায় অকেজো পড়ে ছিলো। এখন কাজে লাগছে। অসংখ্য লোক প্রতিদিন আসে নানা ধরনের কাজে। বিকেলে নগরক্লান্ত মানুষ আসে একটু খোলামেলা হওয়ার জন্যে। সন্ধ্যা গভীর হলে বেশ্যা, দালাল, পুলিশের তৎপরতা চোখে পড়ে ক্রিসেন্ট লেক এলাকায়। এ ছাড়া কিছু ভিক্ষুক, দাম্পত্যক্লান্ত মানুষ, মাঝে মধ্যে সাধু-সন্নাসীও চোখে পড়ে। মুশফিক প্রতিদিন আসে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওর তৎপরতা কিছুটা গোয়েন্দার মতো। ওর কাজটা কিছুটা সাক্ষাৎকার ধাঁচের। যেমন:
তোমার নাম কি ?
খায়ের।
ঙ্ কতোদিন এ লাইনে আছো ?
তা দিয়ে আপনার কাম কি স্যার ? কি চান বলেন।
আমি শিউলি নামে একটি মেয়েকে খুজছি, লম্বা, ফর্সা, চোখ দুটো আর নিচের ঠোঁটটা একটু বড়।
জানি না স্যার। আমার কাছে লম্বা, ফর্সা পাবেন। কিন্তু চোখ ঠোঁট অত মিলিয়ে দিতে পারবো না।
না না আমি যে কোনো মেয়েকে নয়, শিউলিকে চাই। খোঁজ দিতে পারলে ৫ হাজার পাবে।
আচ্ছা।
মুশফিকের এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের টার্গেট পীপল হচ্ছে দু’ধরনের মানুষ। এক দালাল, দুই বেশ্যা:
এই মেয়ে একটু শুনবে?
শিউলি নামের কাউকে চেনো?
জ্বে না। ফোটেন।

এ অঞ্চলে মুশফিক ইতোমধ্যে পরিচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। পোশাকে আশাকে ভদ্রলোক। চেহারা স্বাস্থ্য ভালো। কিন্তু ওর মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা নিয়ে এখানকার লোকজনের সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অনেকে এখন কথা বলতে চায় না। কিন্তু মুশফিক দুর্বিনীত। যেভাবে হোক খুঁজে পেতে চায় শিউলিকে। সেই রাত্রে কোনো এক সময় অথবা ভোরে শিউলি পালিয়েছিলো। ঘরের বহন উপযোগী সমস্ত মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে পালিয়েছিলো মেয়েটি। সেই সব মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধারের আশায় যে মুশফিক শিউলিকে  খুঁজছে, তা নয়। সেই রাত্রে গুরুত্বপূর্ণ কথা শিউলিকে বলা হয় নি। সেই কথাগুলো ওকে বলা খুবই জরুরী। খুব দরকার, মুশফিকের জীবনের জন্যে।

হঠাৎই যেন মুশফিক দেখা পেয়ে যায় শিউলির।
ভাঙ্গা আধখানা চাঁদের সামান্য আলো গাছ পালা গলিয়ে নেমে আসছে। খপ করে মেয়েটার হাত ধরে ফেলে মুশফিক। না শিউলি নয়।

তোমার নাম কি?
আমার নাম ঝর্না।
তুমি কি শিউলি নামের কাউকে চেনো?
হ্যা, আমার বোনের নাম ছিলো শিউলি।
ছিলো মানে! এখন নেই ?
না, বিষ খেয়ে মরেছে।
কতদিন হবে?
ছয় মাস।

ঝর্নার কথা বিশ্বাস হলো না মুশফিকের। সম্ভবত এরা আর কথা বলতে চায় না মুশফিকের সাথে তাই মিথ্যা বলে ওকে এই খোঁজাখুঁজির প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে বলছে। মুশফিকের ভাবনাটা এরকম হলো বলেই ও আবার পা বাড়ালো উদ্যানের আরও ভেতরের দিকে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *