মঈন চৌধুরীর কবিতা


যতিচিহ্নের সুখ

সত্য ও মিথ্যাকে খুঁজে একদিন চিহ্নকে পাওয়া গেল,
যতিচিহ্ন, সমস্ত সমস্যার সমাধান।
তারপর নৈশব্দের আলোড়নে জেগে ওঠে দ্বীপ,
জল গড়িয়ে মিশে যায় সমুদ্রমহলে।
ওখানে শব্দহীন মাছ,
লাল রঙের সবুজ শ্যাওলা,
বেগুনি রঙের হলুদাভ নীল
আর তারপর আলোও নেই অন্ধকারও নেই।
দেশকালহীন এই ক্লীব চুম্বক মাত্রাকে আনন্দ বলা যায়,
এবং আমি তাকে আনন্দই বলি।

কতকিছু অনর্থ শব্দের পর ভাগ্যিস যতিচিহ্নকে পাওয়া গেল
নয়তো আবারো বিস্ফোরণে কেঁপে উঠত হৃৎপিণ্ড ঈশ্বরের,
আবারো লিখতে হতো রক্তের কবিতা।

পদ্মফুল

যদি বলি শব্দ এক, যদি বলি ফুলের নাম
যদি বলি পদ্মফুল, তবে কি তা বিব্রতকর ?
অর্ঘ জলের সাগর আছে সেখানে যে উতাল ঝড়
ডোবায় যদি প্রবাল দ্বীপ, ওড়ে যদি পঙ্খিরাজ
তবে কি তা আতসবাজি কিংবা শুধুই কষ্টকর ?

অন্তঘরে মানতে হবে ইতিহাসের নীরব চোখ,
শব্দ যদি সত্য হয়, হৃদয় যদি টুকরো হয়
তা হলেতো তাই কবিতা, তীব্র আলোর অন্ধকার,
ইজেল জুড়ে রঙ জোনাকি, অন্তরালে চিত্রময়।

শব্দ যদি শব্দ হয়, শব্দ যদি অর্থময়
প্রাণে বাজে রুমঝুমাঝুম, ফুল হয়ে যায় পদ্মফুল,
বিব্রতকর সময় ছুঁয়ে ভগ্ন আকাশ একক হয়ে
প্রবাল দ্বীপের বৃক্ষ আবার নতুন করে জীবন পায়,
সত্যগুলো গোপন রাখা ঠিক তখনই কষ্টকর।

শুনতে পারো শব্দ কথা, বুঝতে পারো পদ্মফুল ?
শব্দ মানে প্রাণের নিয়ম, শব্দ হল ফুলের নাম।

 

দুঃখ/কষ্ট

কী করছো তুমি, এখন কি রাত, কটা বাজে ?
একা একা অন্তরে আছো জানি,
অথচ দেখ এই আশ্চর্য ঘড়ির সময়ে অনিবার্য রেখায়
আঁকা হচ্ছে দুঃখ আর কষ্টের কারুকাজ।

দুঃখ আর কষ্টের মাঝে পার্থক্য বোঝ ?
দুঃখ হলো চুম্বক চুম্বনের সর্বশেষ ব্যর্থতা
আর কষ্টের কথা যদি বলি, তা হলো
প্রাণ সমুদ্রে সমস্ত ভাষা বর্ণমালার হঠাৎ ডুবে যাওয়া
আর তারপর চারদিকে বিন্দু বিন্দু জোনাকিহীন
অনন্ত অন্ধকার !

শোনো, আশ্চর্য, তুমি কি জান না কিছুই !
এখনতো তোমার রাত্রিকাল,
কালো চকমকে আলো হঠাৎ করে
আলোর অন্ধকারে ভেসে গেলে কি যে হয়
তা কি চিন্তা করতে পারো ?
যদি পারো তবে দুঃখ আর কষ্টের অর্থ পাবে
পেয়ে যাবে সমুদ্রস্থিত সমস্ত ব্যর্থতার ইতিহাস।

 

বৃষ্টিতে বর্ষায়

ভেসে যাচ্ছেতো সব, ভাসছে পৃথিবী বৃষ্টি হয়েছে খুব
খড়কুটো, পথ, বৃক্ষের শাখা বিড়ালের পচা লাশ,
দুধের কৌটা, তরিতরকারি বিষ্ঠা মেশানো পানি—
ভেসে যাচ্ছেতো সব, ভাসতেই হবে বৃষ্টি হয়েছে খুব।

হঠাৎ করেই খুঁজে পাচ্ছি না পাইনি যাহাকে খুঁজে
তবে কি তাহাও ভেসেই গেল বৃষ্টিকে ভালবেসে ?
হতে তো পারেই, ভেসেই গেছে আমারই অবিশ্বাস
পাইনি খুঁজে যে বায়ু তরাসে ভেসেছে তাহারই লাশ।

ভেসে গেল সব, ভাসতেই হবে ভাবছি বিলাপে হায়,
আমিও কি তবে ভেসেই গেলাম বৃষ্টিতে বর্ষায়?

 

জ্যোৎস্নার অনুপাত

বর্ণমালার শেষ বর্ণটি তার বিন্দুকে বাদ দিয়ে
এখন আমার উপর চুপচাপ বসে আছে,
চারদিকে জ্যোৎস্নার রাত
ছবি আঁকছে বিন্দু বিন্দু রঙে,
আর জাগতিক সব সম্ভাবনা এই চমৎকার আলোতে এসে
রূপ নিয়েছে আমার চাওয়া ও পাওয়ার,
আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে আপন করছি
নিজের অস্তিত্ব ও তার বৈপরীত্যকে।

আমি দেখতে পাচ্ছি কবিতা ও গণিতের সহবাস
আমি বুঝতে পারছি জীবন ও শূন্যতার মাঝে
কোনো মৌলিক তফাৎই নেই,
যা আছে তা কেবল জ্যোৎস্নার অনুপাত।

 

তিল

ঈশ্বর শুধু তোমাকেই সৃষ্টি করেছেন
তার সঙ্গীত দিয়ে, কবিতা হিসেবে, রংধনু রঙে।
এই যে পৃথিবী দেখ তা হল অনুষঙ্গ এক,
অসীমের ক্যানভাসে আঁকা তোমার প্রেক্ষাপট শুধু।

আজ তুমি তাকিয়ে দেখ ঐ সমুদ্র নদী
চেয়ে দেখ ঝরা পাতা, মেঘ, বৃষ্টি, জল
পাখি দেখ, বনলতা, আরো দেখ রাত
আলোর আলোক দেখ পঙ্খিরাজ ঘোড়া
সবই হল প্রেক্ষাপট, সম্মুখে তুমি।

ইচ্ছার জোয়ার এলে আমাকেও পাবে
লক্ষ কোটি অনুষঙ্গে আমিও আছি,
আমি এক অবাক বিস্ময়ে, ঈশ্বরের ভুলে,
তোমার ঐ গালে এক সর্বগ্রাসী তিল।

 

আরশি

আকাশের পর আকাশ দেখেছি,
তারপরও আছে পর;
প্রশ্ন এসেছে, কি আছে ওখানে ?
পাইনিতো উত্তর।

তুমি কি দেখেছ তোমার ঐ চোখে
অচেনার ঠিকানাকে ?
বলো কি তুমি ! ঐ অচেনাকে
অন্তর বলে ডাকে ?

তাহলে ভালই, চিনলাম আমি
আকাশ পেরিয়ে কী,
তোমাকেও বুঝি, তুমিতো বোঝালে
কাকে বলে আরশি ।

 

মেটামরফোসিস

আমি একজন মানুষ ছিলাম, মানুষের মতো,
অনেকে আমাকে বৃক্ষ বলে ডাকতো।
আমার ডালপালার প্রেমে থাকতো কাঠবিড়ালি,
পাখি, ফুল, ঘাস ফড়িং, আরো কতোকিছু।
একদিন এক মেয়েপাখি আমাকে উড়াল দিতে বললো,
উড়তে গিয়ে আমি হয়ে গেলাম পাখি!

পাখি হয়ে উড়েছি অনেক
চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, তারা, সব দেখেছি উড়াল চোখে,
নীল পৃথিবীর রঙে সাজিয়েছিলাম ডানা,
নীল রঙ আমি খুব ভালোবাসি।

একদিন হঠাৎ আবার ঐ মেয়েপাখিটি বললো—
আর কতো দেখবে হে তুমি? বিশ্বতো আর নেই!
তারচেয়ে ভালো শব্দকে নিয়ে তুমি সৃষ্টিতে চলে যাও।
আমি বদলে গেলাম আবারও, চলে গেলাম সৃষ্টিতে।

এখন যদি কখনো শব্দের কলরব তুমি শোন, তবে ভেবো—
এই হলাম মেটামরফিক সেই আমি, সৃষ্টিতে আছি,
অন্তরে আজো আমি সেই বৃক্ষ বা মানুষের মতো,
যদিও এখন সবাই আমাকে কবি বলে ডাকে।

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *