মর্শিয়া বানুর আরেক সকাল


নাহার মনিকা

এমন সকালে, এমন সকাল বেলায় মর্শিয়া বানুর মনে হয়- জীবনে বিলাসিতা না থাকা ঠিক না। একতলা বাড়ির বারান্দায় বসে থাকার সকাল দশটা, নাশতা, চা শেষ। আধপড়া খবরের কাগজ আলস্য করে তার ইজি চেয়ারের হাতলে। আঙ্গুলের ডগা চুলে মই দেয়, অন্য হাত মনে মনে রোদের আভিজাত্য গায়ে মেখে পরিচ্ছন্ন উঠানে তার পোষা বেড়াল যেভাবে ইতস্তত ফড়িং এর পিছে লাফিয়ে বেড়ায়, তেমন বেড়ায়। এক কোনায় স্বাস্থবতী ডালিম গাছ, অপূর্ব সব ফুলের কোরক নিয়ে এমন সকালে রোদের কাছে নুয়ে থাকে। মর্শিয়া বানু বাৎসল্য স্নেহে তাঁকিয়ে দেখে আর জীবনের সম্ভব- অসম্ভব দুই পক্ষ-টেবিল চেয়ার সাজিয়ে বিতর্ক জুড়ে দিলে তার চোখ লেগে আসে।

নিজের কাছেই নিজের গল্পটা শাদামাটা ঠেকে মর্শিয়া বানুর। অবেলা দুপুরের ছায়াতে হঠাৎ লেগে আসা ঝিমুনি কেটে গেলে শুকিয়ে যাওয়া জলপাইয়ের মত কনুই দিয়ে চোখ ডলতে হয়। পাশের বাসার ছাদে কেউ, বাচ্চা কাচ্চা ঘুড়ি ওড়ায়। তিন কোনা, গাঢ় নিবিড় তিন রঙ্গের ছাট এসে লাগে মর্শিয়া বানুর চোখমুখে।  ঘুড়ি ওড়াতে ইচ্ছে করছে। কি হয় এক লাফে ঐ ছাদে চলে গেলে? এক দুই তিন করে মর্শিয়া সিঁড়ি ভাঙ্গতে থাকে, পিড়িং পিড়িং  ঘাস ফড়িংয়ের মত লাফ এক একটা- ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা!

মর্শিয়া এখনো শরীরের সাথে মনের দূরত্ব রাখতে পারে। সে কারণে এখনো প্রজাপতি উড়ে যাওয়ার মত সিঁড়ি ভাঙ্গতে পারে। স্কুলের দোতলা থেকে সন্ধ্যার দিকে, কেউ না থাকলে হালকা পায়েই নেমে আসে এ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস মর্শিয়া বানু।

আহহা, ঘুড়িটা মুখ থুবড়ে পড়লো, বাতাস ধরে গেল কি? নভেম্বেরের বাতাস কি ধীর লয়ে বিষণ্ণ হচ্ছে! মর্শিয়া বানুর মাথার মধ্যে- “ডালিম ফুলের রংটি লাল, ডালিম ফুলের রংটি লাল”- লাগাতার কাঁথা বুনে যায়। কান্নাকাটির ধাত নাই তার। হাই ব্লাড প্রেশারের সাথে, মৃদুমন্দ মেদের সাথে, ফর্সা বরং জেদ আছে, শিরা দপ দপ করা রাগ আছে। বলতে কি অন্য কোন বিষন্নতা, মন খারাপ করা কথা ভাবার সুযোগ হয়না তার। আজকে কি সব ছাই অবিমৃষ্য ওজর এসে মিন মিন করে, চোখ পুকুরের কিনারা উপচে বানভাসি ঘটার মত দু’একটা কারণ পায়চারী করে।

আগামীকাল থেকে তার ‘অবসরপ্রাপ্ত’র তকমা জুটবে। একরকম তৈরী তো মনে প্রাণে – গত কয়েকমাস থেকে, মাটির তলার পুরুষ্ট আলুর মত, ভূমির ওপর পাতা শুকিয়ে তবেই না শেকড়ে পরিপক্ক ভাব আসবে। তবু তার মনভর্তি আজকে বেতস লতার ভাব, নুইয়ে পড়া অবসাদ, দীর্ঘ দুপুর কেটে রাখা, খুলে রাখা ঘেমে ওঠা খাদ্যদ্রব্যের মত। এইসময়, পেট ভর ভরন্ত খাওয়ার পরে তার বসা থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না, অথচ মিশু এসে জিজ্ঞেস করতে পারে- “ফুপুমনি হাড়িমোছা বিরানীটুক তানি খালাদের ভুলুরে দিয়ে দেই? হাড্ডিগুড্ডি শুদ্ধা?”

ভুলু, কুকুর- আলজিভ বের করে ঘেউ ঘেউ করে। আজো করবে। মর্শিয়া বানু তখন বলতে পারে-‘কুকুররে দিবি? বুয়ারে দিলে হইতো না! বাসায় নিয়া ছেলেমেয়েগুলিরে দিতো’।

মনে মনে পশুপ্রেমের পক্ষে যুক্তি সাজিয়েও মিশু হয়তো বিনাবাক্যব্যয়ে তার কথাই শুনবে। সে ঘাড় বাঁকা করে চোখা কথা ভাবার মেয়েই না, মর্শিয়া জানে। কাঁখে পিঠে মানুষ করলে অন্তত এটুক জানা যায়।

তারপরও পাশের বাড়ির ভুলুর জন্য তার দরদ আর বুয়ার জন্য ফুপুর দয়ার শরীর- এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তাকে ভাবাবে। জোড়া ভ্রু’র কপালটা কুচকিয়ে সে ধীর পায়ে ফিরে যাবে। ভুলুর মালকিন তাকে জিজ্ঞেস করার অবকাশ পাবে না- ‘ও মিশু কত বিরানী রানছিলো তোমার ফুপু’? প্রকারান্তরে- ‘ও মিশু তোমার ফুপু তো তোমাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করলো, আহহারে বিয়াশাদিও করলো না’।  আর তখন প্রসঙ্গান্তর খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটে যাবে- ‘ক্যান করলো না, বিয়া কইরাও তো ভাইঝি মানুষ করা যাইতো, তখন তো দুইজন থাকতো, আহহারে নিজের কথা এক্টুও ভাবলো না’। মিশু তখন অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকবে। ফুপুর নিজের মুখে কখনোই উল্লেখিত না অথচ বহুল আলোচিত গসিপের কাছে স্মিত হাসবে।

মর্শিয়া বানু আরেকটু জুবুথুবু, সবুজ পশ্মিনা আরেকটু ঘনিষ্ঠ, আরেকটু আষ্টপৃষ্ঠে বেঁধেও তার মন খারাপ ভাব যায় না। চরাচর জুড়ে শীত নামার আগে পাখিদের যেমন বিষন্নতা ভর করে, অনেকটা তেমন। যেন কত শীতের পাখি দেখেছে মর্শিয়া! জীবনে শুধু একবার, জাহাঙ্গীর নগরে- মিশুকে ভর্তি পরীক্ষা দেয়াতে নিয়ে গিয়ে। তা মেয়ে চান্স পেলো কই। পই পই করে কিন্তু বলা ছিল- ‘এইসব কম্পিটিটিভ পরীক্ষা, এক চান্সে পাশ করতে হয়’। মিশু মনে হয় প্রতিজ্ঞা করেছে- ফুপু তাদের জন্য সংসারের স্বাদ নিলো না, তাকে সে হতাশ করবে না।  সুতরাং তার বিয়ের সম্মন্ধ এলে বিয়ে হলো। ভালো ছেলে, পয়সা আছে। মিশু তাই প্রায়ই ছেলে কোলে ফুপুর আধকপালী মাথা ব্যথায় ভিক্স লাগিয়ে মালিশ করে যায়।

সবুজ পশ্মিনা গায়ে জড়িয়ে আরেকটু জুবুথুবু হয়ে বসে মর্শিয়া বানু। অবসরে যাওয়ার মত কারণে তার কান্না পাওয়া যত অস্বাভাবিক, আবার তার রান্না মিশু, রিন্টুদের চেটেপুটে খাওয়াতে আনন্দাশ্রু মোটেই বিরলপ্রজ না, নিজেকে এইমত আবেগপ্রবণ ভাবতে তার প্রবল অনীহা। তবু আজকে এ দুটোর কোনটাই না- এ আন্দাজি অনুমান তাকে ভেতর বারান্দার কাঠের রং ক্ষয়ে যাওয়া ইজি চেয়ারটাতে বসিয়ে রাখে, বসিয়েই রাখে। বারান্দার ছায়ার বাইরে কামরাঙ্গা গাছের নুয়ে আসা ডাল- রোদের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে নট আউট। রোদ প্রায় শায়িত। পরাভূত কি? না এখনো- মর্শিয়া বানুর মত। নাহ, মনের ওপর ঝাঁপিয়ে আসা নিম্নচাপ যথাসম্ভব দ্রুততায় হটিয়ে দিতে হবে।

একটা কাক আলজিভ বের করে ডাকতে নিলে আবারো কান্নাটা দরকচা পাকিয়ে কন্ঠনালীতে উপনিবেশ বানায়। হাতের কড় গুনে হিসাব মেলায় মর্শিয়া। সোমবার সকাল এগারোটা বাজতে আরো কুড়ি ঘন্টা দুলকি চালে নড়বে চড়বে। এই পাক্কা কুড়ি ঘণ্টা তার ইটের দেয়ালের একতলায় টালির ছাদ, সেখানে ভব্য শব্দ তুললেও তুলতে পারে। যদিও তার ছাদে সময় ত্রস্তে এসে নামে না।

অন্যান্য দিন বিকেলোপক্রম সময়ে মর্শিয়া বানু স্কুলে বসে এককাপ চা খায়।  তাদের পিওন বড় কেটলি করে বড় রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে আনে, তারপর কড়া পড়ে যাওয়া কেটলির চা হাতল সমেত হিটারে বসে আরো উত্তপ্ত হয়ে কাপে ঢেলে পরিবেশিত হয়। কিছুটা ঘরোয়া কিছুটা বৈঠকি ঢংয়ের হয়ে ওঠে সে চা। আগামীকাল যদি এতক্ষণেও তার বিদায়সভা না ফুরোয়, এককাপ চা অবশ্যই চাওয়া চলবে। সহকারী প্রধান শিক্ষক অবসরে গেলে এই অভ্যাসের বশটুকু একদিনেই বিলুপ্ত হবেনা। অন্তত প্রথম দিনে।

মর্শিয়া জানে- মিশু অলরেডী তার জন্য কালকে পরার মেরুন পাড়ের ঘি রং তসর সিলেক্ট করে ফেলেছে। মিশুর বিয়েতে তাকে দেয়া, ওর শ্বশুরপক্ষের। সবচে ভালোটা। তার জন্য। দুধ দেয়ার গরুর জন্য যেমন সজীব ঘাস। আহ, এমন তার মনে হয় এখন? আগে হয়নিতো! হয়নি? হয়েছে, মর্শিয়া বানু সেসব ভাবনা, ভাবনার কোমর কেটে ধরা ইলাষ্টিক বোধ স্তুপীকৃত করেছে। খাটের নিচে, গোবর ঘুটে দেয়া পাটখড়ির আবডালে, ইত্যকার ভাবনা বাড়তে দেয়ার আগেই গিলোটিনে চাপান ভালো। তা সবসময় করা হয়নি।  কিন্তু এখনো তো মর্শিয়া বানু দুধ দেয় গরু, এখনো মিশু রিন্টুর জন্য তাজা ঘাস। তবু তার “কেন কাঁদে পরাণ কি বেদনায় কারে কহি”।
আগামীকাল, মর্শিয়া বানু জানে- একটা মিহি বুনটের ভোর হবে। মাথার কাছে জানলা খুলে দিয়ে কামরাঙ্গা গাছের ফাঁকে বিচ্ছুরিত আলো তার পিছু নেবে- খালি পায়ে  লালরঙ্গা মেঝে, বোতাম লাগানো সুতী ম্যাক্সির প্রিন্ট তার গা রগরে চনমনে করে ধুয়ে দিতে চাইবে সকালের কুসুম গরম পানি। শাড়ি, ব্লাউজ ড্রেসিং টেবিলের টুলের পাশে রাখা থাকবে। নাস্তা খাওয়ার মেজাজ না থাকতে পারে, বুয়ার দেয়া রুটি আর সব্জি আধ খাওয়া রেখে চায়ে চুমুক দিতে পারে মর্শিয়া। তখন নিশ্চিত এটা খেয়াল করার জন্য আশপাশে কেউ থাকবে না। তার প্রতিনিয়ত প্রাতঃরাশ শেষ করার নিয়মে সামান্য ব্যত্যয় হলে কিছু যাবে আসবে না।

গলির মুখে তার জন্য রিক্সা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, ব্যতিক্রমমুখী। অন্যদিন রিক্সা খোঁজাখুজির পেছনে শক্তিক্ষয় হলেও আগামীকাল সে জানে, তা হবে না। বরং বাতাসের বেগ ফিন ফিনে ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতাগুলো নুইয়ে গেলে জলিলদ্দি সেদিকে তাঁকিয়ে চিমশে যাওয়া রিক্সার সীট মমতা নিয়ে মুছে দেবে। তারপর মর্শিয়া শাড়ির কুচি ভাঁজভাঙ্গা এড়িয়ে উঠে বসবে। তার রোদচশমা, তার ম্রিয়মাণ পার্স-পেটফাঁপা কাগজপত্র নিয়ে পাশে থাকবে ওজরবিহীন।
এই ব্যস্ত রাস্তা দিন দিন অচেনা হচ্ছে, বিদেশ নাকি পরদেশ! অন্তত মর্শিয়ার কাছে -বিলবোর্ড, জমাট থিকথিকে পশরা সাজানো দোকান, রাজনৈতিক দল, আর ওরশ শরীফের হোর্ডিং, মাথার ওপরে ঝুলন্ত ব্যানার রাস্তার দুপাশ মাড়িয়ে ছাড়িয়ে যেতে যেতে তার এক ফালি সবুজ ভূমির জন্য তার মন আকুল হতে চাইতে পারে, অন্তত আগামীকাল।

এগারোটা বাজার পাঁচ-দশ মিনিট আগে সে পৌঁছে যাবে স্কুলে। কোন জ্যামে না আটকালে তেইশ মিনিট লাগে গলির মোড় থেকে তার স্কুলে পৌঁছাতে। রিক্সায় কত কি মাথায় আসবে যাবে মর্শিয়া বানুর।  কতদিনের মেয়াদে নিজের চালশে ভাবনাগুলোর অবসান ঘটে? সাতান্নতে অবসরে যাওয়ার সু-ফল কুফল নিয়ে বহু কিছু জাবর কাটার থাকে, মর্শিয়া জানে। কিন্তু তারো আগে, এতকাল তার চাওয়া পাওয়া সেগুলো ঠিক ছিল কিনা সেসব নিয়েও বোধকরি ভাবা দরকার।

টুং টাং বেল বাজিয়ে রিক্সা একটু সামনে গেলে মিষ্টি দোকানের পাইকারী পরিচ্ছন্নতা দেখতে ভালো লাগবে, পরিস্কার কাঁচের দেয়াল, পানি ছিটানো আঙ্গিনা, দরজা খুললে- বন্ধ হলে পিরিক করে এক ঝলকা ঠান্ডা হাওয়া। একবার ইচ্ছে করবে মিষ্টির দোকানে রিক্সা থামিয়ে একগাদা মিষ্টি কিনে নিয়ে যায়। স্কুলের মেয়েদের নধর বিস্ময় শেষবারের মত দেখা হলো। তবে, নাহ, নিয়ম ভাঙ্গবে না মর্শিয়া।  মিষ্টির দোকানের সামনে রিক্সাটা স্লো হয়ে যাওয়া ভালো লাগবে। মাথা উঁচিয়ে তাঁকালে কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখা যাবে- শীতল রসমালাই দুঃখী জলহস্তির মত দুধে ডুবে আছে।

আসল জলহস্তী দর্শনের একটা শিশু বাসনা ঘোরাফেরা করবে মর্শিয়া বানুর মাথায়। চিটচিটে গরমের তেজ বাড়তে থাকলে নাক ভাসানো, গা ডোবানো জলহস্তীদের ভাবনা তাকে আমোদ দেয়। একটা বাচ্চা জলহস্তীর গা জড়িয়ে ভেসে গড়িয়ে অলস  দিন কাটানোর কথা তাকে মুহুর্তের স্ফুর্তি দিলেও দিতে পারে।
রিক্সা তারপর আরো এগিয়ে গেলে মর্শিয়া বানু তখনো নিজের সুখ দুঃখ নিয়ে ভাববে। আলীবাবার কাসেমের মত – চিচিং ফাঁক ভুলে গিয়ে আলু ফাঁক, বেগুন ফাঁক দিয়ে সঠিক দরজাটা সে খুলতে পারেনি- এমনও মনে হতে পারে। মনে হতে পারে তার জীবনের পাসওয়ার্ড কোনকালে সঠিক ছিল না! বারে বারে ভুলে গিয়ে নবায়িত গুপ্তশব্দটি সে আর মনে করতে পারেনি!

আগামীকালের সঙ্গে হঠাৎ করে তার গতকালও জুতে যায় ইজি চেয়ারের হাতলে। শুরুটা তেমন জৌলুসে ভরা ছিল না। মর্শিয়া লেখাপড়ায় মাঝারী, দেখতে শুনতে  মাঝারীর চেয়ে ভালো, শুধু চাকরীর পাল্লাটাই কেমন পলকা হয়ে শুরু হলো। সরকারী টরকারী কিছু না, মুদি দোকান দিয়ে শুরু করে এখন বিশাল সুপার মার্কেটের মালিক হারিসুল ইসলামের অনুদানে চলা প্রাইভেট গার্লস স্কুলের ষ্টেনো কাম সেক্রেটারী। একদম দরকারী পোষ্ট না, চাচাতো বোন শাহিন আপা হেডমিষ্ট্রেস না হলে এই পোষ্টে তার কথা কেউ চিন্তাও করতো কিনা কে জানে। শাহিন আপা টাইপ জানা লোক খুঁজছিল, আর মর্শিয়া টাইপ শিখে কি করবে স্থির করতে পারছিলো না। বি এ পাশের পাশে বি এড না থাকলে তো আর টিচার হওয়া যায় না। অতএব সেক্রেটারীই সই। কাজ বেশীর ভাগই খুচরা, চিঠিপত্র টাইপ কদাচিৎ। তদ্বিরের কাজ বেশী। স্কুলের বার্ষিকীতে বিজ্ঞাপন দরকার, টেলিফোন নষ্ট- মর্শিয়াকে দৌড়াতে হয়। স্কুলের বেল বাজানো থেকে লগবুক হ্যান্ডেল করে মর্শিয়া দপ্তরী-কাম-সেক্রেটারী-কাম একাউন্ট্যান্ট হয়ে স্কুলের টোটাল এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ ডিপার্টমেন্ট হয়ে উঠলো।

নিরাভরণ এক শীতের দিনে যখন কচিমুখ মেয়েরা টিফিন পিরিয়ডে শাদা শালোয়ারে ধুলো মেখে হাসি গড়ানো কমিয়ে ফেললো- শাহীন আপা তাকে ডেকে ক্লাস সেভেনের বাংলার  ক্লাসে ঢুকিয়ে দিলেন- ‘মর্শিয়া তুমি যাও তো, ক্লাস সেভেনের মেয়েগুলিকে চুপ করাও’।

মর্শিয়া সেদিন শাড়ির আঁচল পাট পাট করে খাতা নিয়ে ক্লাসে ঢুকে অন্যরকম বোধ করলো, বীজ ফেটে চারা গজানোর তির তির উত্তেজনা আর আশংকার মাথা চাড়া দেয়া কৌতুহলে নিজেকে ক্ষমতাবান মনে হলো। মনে হলো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পোডিয়ামে তৃতীয় স্থানের কাছাকাছি, শিক্ষক না হয়েও প্রায় শিক্ষক। অনুভূতিটা সারারাত চোখের পাতায় লেপ্টে থাকলো, ফলে ঘুম হলো না, কিন্তু ক্লান্তিও নাই। বোনের বিকল কিডনী, ভাইয়ের সংসারের বাড়তি কাজ সবকিছুর মধ্যেও মর্শিয়ার তখন উড়তে ইচ্ছা করে। মনে মনে চায়- একেকদিন একেকজন টিচারের অসুখ হলে হয়, না হলে এক ঘণ্টার জন্য ব্যস্ত হয়ে যাক তারা, ক্লাস নিতে না পারুক।

তারপর ঝড়বৃষ্টির দিন শেষ হয়, কতগুলো শরৎকাল ফিন ফিন করে উড়ে যায়। মর্শিয়ার বিকল কিডনী বড়বোন যখন সবল একটা কিডনীর অভাবে মরে যায়, মিশু আর রিন্টু তখন তিন আর দুই বছরের শিশু। আর মিশুর বাবা পরের বছর কি নির্বিবাদে গাড়ির চাকার নিচে। ঢাকা-আরিচা হাইওয়েতে সন্ধ্যার পরে কে কাকে আটক করে!

এইসব মন্দ সময়ে মুদি দোকানদার বড় সুপার মার্কেট বানিয়ে, বাস ট্রাক কিনে মালিক সমিতির নির্বাচনে জিতে এম পি ইলেকশন করবে বলে স্থির করেছে। কতদিন হয়ে গেল তবু মনে হয়- সেদিন সকাল। মর্শিয়া দেখে এম পি ক্যান্ডিডেট হারিসুল ইসলাম শিক্ষামন্ত্রীকে নিজের নির্বাচনী প্রচারনায় স্কুলে এনে স্থানীয় জনগণের বিশাল সভা করে একটা কম্পিউটার উপহার দিলেন। যন্ত্রটা টাইপ রাইটার এর পাশে কানখাড়া খরগোশের মত সেলোফিনে গা ঢেকে নিঃশ্চুপে বসে আছে। মনিটর, কী বোর্ড, মাউস এমন কি প্রিন্টার পর্যন্ত এসেম্বলীতে দাঁড়ানো ছাত্রীদের মত ডিসিপ্লিন্ড। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে শাহীন আপা কম্পিউটার নিলেন তো বটেই কিন্ত সেটা চালাতে তো হবে মর্শিয়াকেই। স্কুলের আর কেউ এই বিদ্যায় ধনন্তরী না। শাহীন আপার যন্ত্রপাতি দেখলে হৃদকম্পন বেড়ে যায়।

মর্শিয়াকে সাবষ্টিটিউট টিচার হওয়ার স্বপ্ন গুটিয়ে আবারো কম্পিউটার বিদ্যা ঝালাই করতে সান্ধ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়া আসা শুরু করে। আর নিজেকে অবাক করে দিয়ে স্কুলের কম্পিউটারটাকে তার ভালো লেগে যায়। নীল আলোয় ভরা চৌকোনা বাক্স তাকে আভাময় করে তোলে। চিঠিপত্র টাইপ ছাড়াও স্কুলের ছাত্রী তালিকা, লগবুক, পে স্লিপের রেকর্ড ঢুকে যায় এক্সেল ফাইলে। তারপরও মর্শিয়ার দু একটা পড়ন্ত দুপুর থাকে ফ্রি সেল খেলার। সবগুলো ক্লাস গুনগুন শব্দে মুখর হয়ে গেলে মর্শিয়া ‘প্যারানয়েড’ খেলতে বসে। একটা বারের ওপর বল, পিং পং করে পড়লে তাকে ধরে রাখার কায়দা দ্রুত শিখে ফেলেন। দিনের পর দিন খেলতে খেলতে নিজেকে সার্কাসের ঝানু খেলোয়াড় মনে হয়। এক দুই করে তিরিশ লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে মর্শিয়ার মনে হয় পৌঁছাবার মত আর জায়গা তার জন্য অপেক্ষা করে নাই। বাসায় ফিরে তার মাথায় লাফানো পিং পং বলগুলো বিভ্রমের মত ঘোরে।

স্কুলের চেয়ারম্যান এম পি হয়ে গেলে সরকারী অনুদান আসে। সরকারীকরণের তালিকাভুক্ত স্কুল, শাহীন আপা মর্শিয়াকে বি এড কোর্সে ভর্তি হয়ে যেতে পরামর্শ দেন। চাকরীতে টিকতে হলে দরকার। আর তাছাড়া কম্পিউটার জানা শিক্ষক একজনও নাই। বি এড করতে কষ্টই হয়েছে মর্শিয়ার। সারাদিন স্কুল, তারপর সন্ধ্যাবেলা ক্লাস। জীবনভর সান্ধ্যকালীন ক্লাসের কথাই মনে আছে তার।  সেই কবে দিনের বেলায় স্কুলছাত্রী ছিলো!

কষ্টের আরেকটা কারণ মিশু-রিন্টু। ওরা তখন তার নিজস্ব, আর নিজস্ব হলে হেলাফেলার সুযোগ কই? মিশু রিন্টুর বাপ মা দুজনের দায় নিয়ে একটা বিয়ারিং লাগানো চাকা হয়ে ছুটে বেড়ায় মর্শিয়া। ছুটতে ছুটতে বিএড পাশ হয়। একদিন মিশু রিন্টু যখন কলেজে যায়, তাদের একতলার ওপরে দোতলার ছাদ জোড়া হলো। নিচতলা ভাড়া হলো। রিন্টু স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশ গেলো।

সব হতে হতে মাঝখান থেকে কেমন কেমন করে যেন বয়সটা মর্শিয়াকে ছেড়ে চলে গেল। চল্লিশ পার হলে ‘বেঁচে থাকায় কি ফল, তোমার আছে ডাঙ্গা আমার আছে জল’ ধরনের মিড লাইফ ক্রাইসিসেও ভুগলো মর্শিয়া।

শাহীন আপা স্বামীর সুবাদে ইউরোপ আমেরিকা করে বেড়ায়। কেরালায়  দু’সপ্তার কম্পিউটার প্রশিক্ষণের কোর্সে যাওয়ার কোন সাধ তার নাই, মর্শিয়ার জীবনে একটু ‘পৌষ মাস’ ঘটলো। শাহীন আপা নিজের জায়গায় তার নাম ঢুকিয়ে দিলে তার নিরামিষ অবসন্নতা কাটলো। স্কুল ততদিনে সরকারীকরণের পাকা তালিকায় নথিভুক্ত হয়ে গেছে, আর মর্শিয়া হবে এসিষ্ট্যান্ট হেডমিষ্ট্রেস।

কেরালায় থিরুভানান্থাপুরাম শহরের স্থাপত্য সৌন্দর্য দেখে, দু চারটা শাড়ি কিনে, সব খাবারে নারকেল তেলের সুবাস পেয়ে বিরক্ত মর্শিয়া দু’সপ্তায় ই-মেইল, ইন্টারনেট, গুগল সার্চ ইত্যাদি শিখে বাড়ি ফিরে দেখলো তার মিডলাইফ ক্রাইসিসের সিম্পটমগুলি উধাও হয়ে গেছে! ঐ বছর তাদের স্কুল ভিজিট করতে আসা ওয়াই এম সি’এর আর্জেন্টিনিয়ান বুড়া রিনিয়েরি কি সুন্দর বলে গেল- লাইফ বিগিন্স এট ফোর্টি! মর্শিয়া তারপর ‘লাইফ বিগিনস এট ফোর্টি’ লিখে গুগল সার্চ দিয়ে বিচিত্ররকম মানে খুঁজে পায়। মর্শিয়া ঠিক করে ফেলে যে গল্প উপন্যাসে যতই লেখা থাকুক না,“ মহিলাটি প্রৌঢ়া, বয়স তিরিশের কোঠায়”! মর্শিয়া সেসব ঠেলে ভাড়ার ঘরে ডাই করে রাখবে। হবে, তারও হয়তো কেঠো বাত হবে, কিন্তু তাতে কি?

তা  এসিষ্ট্যান্ট হেডমিষ্ট্রেস হিসেবে প্রমোশন পেয়ে আর রিটায়ার করা হলো না মর্শিয়ার। শাহীন আপা চাকরী ছেড়ে ছেলের কাছে আমেরিকায় চলে গেলে সে বুঝতে পারে  সরকারী স্কুলে পদোন্নতিতে ডিগ্রীর সঙ্গে সময়ও লাগে। ইতিহাসে এম এ, এম এড ফারজানা আলম শাহীন আপার জায়গায় এলে এ বিষয়ে তার আরো বোধোদয় হয়।

আগামীকাল তার জান্নাত আরা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শেষ দিন। কতদিন ধরে চেনা স্কুলের বারান্দা, পরিচিত সিলিং, গোল লোহার ঘন্টা কালকের পরে তার চৌহদ্দির বাইরে। খুব বেশী মিস করার কিছু নাই, ঘানি টানতে কাঁহাতক ভালো লাগে! নাহ, মর্শিয়ার রিটায়ার করতে কোন অসুবিধা নাই। শুধু কম্পিউটারটাকে মিস করবে। ফারজানা আলম আসার আগ পর্যন্ত সে একচ্ছত্র ব্যবহার করেছে। প্রতি সকালে চনমনে অনুভূতি নিয়ে স্কুলে যেতে ইচ্ছে করেছে কেবল এই একটা বিশেষ কারণে।
ইজি চেয়ারে চাদরের নিচে জুবুথুবু হয়ে থাকার আবেশ ভেঙ্গে সোজা হয়ে বসে সে। পাশের বাড়ির ছাদের ঘুড়িটা মুখ থুবড়ে তার পায়ের কাছে।  ছেলেগুলি হই চই করছে। কেউ একজন হ্যাঁচকা টান দিলো। ঘুড়ি হাল্কা চালে লাফ দিয়ে সূতোর পিছে পিছে উড়ে আবার ছেলেগুলোর কাছে। মর্শিয়া উঠে দাঁড়ায়। প্রাইভেট স্কুলে পেনশন স্কিম অত পোক্ত না, তাই এককালীন কিছু টাকা তার ব্যাংকে। রিন্টু আর দেশে ফিরবে বলে মনে হয় না। মিশুরও কোন কিছুর কমতি নাই। কি এমন হয় যদি মর্শিয়া আজকে নিজের জন্য কিছু করে?  সে একটা কম্পিউটার নিজের জন্য কিনতেই পারে। তারপর বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ। এইটুক নিশ্চয়ই তার অপ্রাপ্য হবে না। হিসাব কিতাবটা এখনই তো করে ফেলা যায়। মর্শিয়া আলমারী থেকে ব্যাংকের বই বের করে।

একটা ক্লিকে সারা দুনিয়া হাতের কাছে পাওয়ার দূর্মর আনন্দ তার ভাবনাকে স্পর্শ করে গেলে মর্শিয়ার ভালো লাগে। মনে হয়- হ্যা কালকেই কাজটা করতে হবে। তার বিদায় সম্বর্ধনা হয়ে গেলে মর্শিয়া রিক্সা নেবে, ফুল আর উপহার সমেতই সে ঐ দোকানটার সামনে রিক্সা থামাবে। অনেকদিন তৃষ্ণার্ত চেয়ে দেখেছে ভেতরে স্যুট টাই পরা সুবেশ তরুণ প্রাণ আর সাজিয়ে রাখা ল্যাপ্টপ, ডেস্কটপ। কাঁচের দরজা ঠেলে প্রবেশে বরাবরকার দ্বিধা আগামীকাল সে কাটিয়ে উঠবে, তার একটা ল্যাপটপ দরকার। আগামীকাল থেকে পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকার আগ্রহকে মেরে ফেলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নিজের ভেতর না দেখতে পেয়ে ভালো লাগে মর্শিয়ার।

তারপর কি আরো কিছু হতে পারে? একটা অনতিক্রম আশংকা ভর করে মর্শিয়া বানুকে। তার মনযোগ হাতব্যাগ ছাড়িয়ে কোলের কাছে চারকোনা বাক্সের দিকে বেশী ছড়িয়ে থাকবে। পছন্দের বাহন রিক্সার বদলে ট্যাক্সি অধিক বিবেচনাপ্রসূত মনে হবে। রিক্সা টু কালো কিংবা হলুদ ট্যাক্সির দরদামের ট্র্যানজিশনে মর্শিয়ার কপালের দু’পাশের শিরা উত্তেজনার চাপে ঘাম ঝরালেও ঝরাতে পারে। আর তা মেরুদন্ডে স্থায়ী আসন গাড়তে পারে যখন, যদি দুটো মোটর সাইকেলে চার আরোহী তাকে ঘিরে ধরে। মর্শিয়া নিশ্চিত তারা তার হাতব্যাগটা আর ছিনিয়ে নিতে চাইবে না। তাদের বাজপাখি চোখ তার ল্যাপটপের দিকে। কি করবে তখন সে?

আরাধ্য কত কিছু হাত ফসকে চলে যেতে দিয়েছে মর্শিয়া, আর আঁকড়ে ধরেছে অনাহুত। আগামীকাল এই পূনরাবৃত্তি হতে দেয়া যাবে না। প্রাণপণে ঝলসে উঠবে সে। দরকারে, প্রবল উড়ে গিয়ে শার্টের হাতা খাঁমচে ধরবে, এলোপাতাড়ি চড় চাপড় চালাবে।

পাঁচমিশালি যানবাহনের মিলিত গর্জন যখন রাস্তাকে একটা হা করে ডাইনোসর বানিয়ে তুলছে- আগামীকালের আবছা সন্ধ্যায় মর্শিয়া নিজেকে উড়ন্ত দেখতে পায়, দু’হাত দিয়ে দৃঢ় মমতায় আঁকড়ে থাকা ল্যাপটপ সে কিছুতেই ছিনতাই হতে দেবে না।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *