চাঁদ, প্রজাপতি ও জংলি ফুলের সম্প্রীতি-৩


মাসুদ খান


(পূর্বপ্রকাশিত-র পর)

শ্রুতি ছুঁয়ে যাচ্ছে শ্রুতি, হৃদিতে মিশছে হৃদি, শ্রবণে শ্রবণ…

কবি ফখরুল আহসানের সঙ্গে রিকশায় চলেছি। রিকশা চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস। দুপুরের রোদের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ঠনঠনিয়া, কানছগাড়ি, মালতিনগর, জলেশ্বরীতলা…। রাস্তার ধারে এক ছোকরা নাপিত টুল ও চেয়ার পেতে, আয়না খাটিয়ে বসে পড়েছে দিব্যি। টেকোমাথা এক খদ্দের। মাথায় অল্প কিছু চুল অবশিষ্ট। টাক থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে আলো। চকচকে করছে তাই। নাপিত ছোকরা খুব কায়দা করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চুল ছেঁটে দিচ্ছে। খালি গায়ে নেয়াপাতি ভুড়ি ভাসিয়ে আয়েশে চোখ বুজে চেয়ারে বসে আছেন টেকোমাথা। কী মজা! কী আমোদ আজ আকাশে বাতাসে ও রোদে! কী আনন্দ আলোর বিদ্যুচ্চুম্বক ঢেউয়ে, ফড়িঙের পাখার কাঁপনে, লাউডগার লিকলিকে জিহ্বায়, আকর্ষিকায়, বাতাসের গুলতানিতে! শ্রুতি ছুঁয়ে যাচ্ছে শ্রুতি, হৃদিতে মিশছে হৃদি, শ্রবণে শ্রবণ…। এইতো হচ্ছে যোগাযোগ, একদম সরাসরি, সোজা ও সহজ। নাপিতের পাশে রাখা রেডিওতে গান বাজছে। গানের ঝলক বেতার থেকে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে তারে। ইলেকট্রিকের তার। তারে প্রতিহত হয়ে কানে এসে লাগছে গানের সুর, ফুটে উঠছে কলি “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখি…”।

রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস।

মফিজ পাগলার মোড়। সাঁৎ করে একটি রিকশা আড়াআড়ি পার হয়ে গেল। আরোহী দুজন তরুণী। চালকের চোখেমুখে স্ফূর্তি, অনির্বচনীয়। গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যাচ্ছে, ওই সেই একই গান “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পাখি তো নয় নাচে কালো আঁখি…”

জলেশ্বরীতলা। পথের পাশে ছোট্ট একটি মুদিদোকান। দোকানিটা খুব সরল-সোজা। অনেক কজন খরিদ্দার এসেছে দোকানে। দোকানি একটু হিমশিম খাচ্ছে হয়তো-বা। বিরক্ত-বিরক্ত ভাব। একপর্যায়ে সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে, যেন এক তুড়িতে বিশ্বের তাবৎ বাণিজ্যনীতির গালে চটকনা মেরে বলে উঠল, “আর কারো দোকান দ্যাখো-না, খালি আমার দোকানে আইসা ভিড় করো!” রিকশায় এক চক্কর দিয়ে যখন আবার যাচ্ছিলাম সেই দোকানের সামনে দিয়ে, দেখলাম এক আশ্চর্য ব্যাপার, বিরসবদন ওই লোকটিই কিনা দোকানদারি ছেড়ে বাইরে এসে কাঁধে একটি শিশুকে তুলে নেচে নেচে গাইছে, অবাক, সেই একই গান “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পাখি তো নয় নাচে কালো আঁখি…”।

রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস। বর্ষাশেষের উদাস-উদাস দুপুর। পাশে শীর্ণকায়া করতোয়া। নিচু ভল্যুমে মাইক বাজিয়ে উজান বেয়ে চলেছে পালতোলা একটি নৌকা, বনভোজে যাচ্ছে বোধহয়। কিন্তু বন কই? আর মাইক তো কখনো এত নিচু স্বরে বাজে না! যা হোক তবুও পাল উড়ছে, নৌকা চলছে, মাইক বাজছে… ভেসে আসছে সেই একই গান, একই কলি “নদীর নাম সই অঞ্জনা…।” কিন্তু নদীর নাম তো করতোয়া, তীরে খঞ্জনা পাখির জোড়া হয়তো এখনো নাচে কিন্তু জল নিতে আসা কাউকে দেখলাম না, যে কিনা সইদের বলবে, “পাখি তো আর কিছু রাখিবে না বাকি…”।

একজন বৃদ্ধমতো মানুষ। অবসরে-যাওয়া শিক্ষক হয়তো-বা। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। নাতিকে নিয়ে এসেছেন মাছ ধরতে। বড়শি ফেলে বসে আছেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে। স্মিতমুখ নাতি দাদুকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। দাদু কিছু তার জবাব দিচ্ছেন, কিছু দিচ্ছেন না। বড়শিতে মাছ ধরছেন– চেলা, নলা, পুঁটি, টেংরা, বউমাছ…। মাছ ধরে ধরে পেছনে রাখছেন বিছিয়ে রাখা গামছায়। ফাৎনার দিকে নিরঙ্কুশ মনোযোগ দাদু ও নাতির। এদিকে তিনটি টিট্টিভ পাখি পেছন থেকে এসে একটি একটি করে মাছ মুখে পুরে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। গিলে ফেলছে টপাটপ। কিন্তু টেংরাকে বাগে আনতে পারেছে না কিছুতেই।

মাছ তো সব খেয়ে গেল টিট্টিভে। নাতির চোখ ছলোছলো। পায়জামার ধুলা ঝেড়ে দাদু ও নাতি উঠে এবার হেঁটে যাচ্ছে নদীর কিনার ধরে। হাত নেড়ে নেড়ে দাদু নাতিকে কী কী যেন বলছেন, বোঝাচ্ছেন। হয়তো ধৈর্যধারণের কথা, হয়তো আগামী স্বপ্নের কথা… আগামীকালে, আরো-আরো আগামীকালে তারা আবারও বসবে ছিপ ফেলে, অসীম ধীবরধৈর্যে, আর অনেক অনেক মাছ পাবে তারা, বড়শিতে।

সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, কবি ফারুক সিদ্দিকী। পাকাচুল, কিন্তু নিরলস। টানা চল্লিশ বছর ধরে ‘বিপ্রতীক’ বের করছেন। নবীন কবিরা মজা করে বলে ‘বীরপ্রতীক’। তাঁর বাড়ির নাম “কে-লজ”। সূত্রাপুর, বগুড়া। বিশাল জায়গা জুড়ে অদ্ভুত এক বাড়ি। স্পিলবার্গের ছবির শুটিং লোকেশনের যেন এক অতীত সংস্করণ।

আগে সূত্রাপুর, মালতিনগর, জলেশ্বরীতলা, মফিজ পাগলার মোড়- পুরো এলাকাটা ছিল জঙ্গলে ভরা। প্রাণবৈচিত্র্যে উপচানো। বাহার ভাই যে বলেন সাতমাথার দিকে বাঘ আসত, বাঘডাস আসত, নীলগাই নামত, তা তো আসত এই ফারুক ভাইয়ের পরগণা থেকে। হঠাৎ-হঠাৎ ফারুক ভাই বাঘ আর বাঘডাস পাঠাতেন আর বাহার ভাই কেবলই বিস্মিত হতেন আর জীবজানোয়ারদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতো ট্রাফিক পুলিশ।

ফারুক ভাইয়ের পরগণায় এখন আর বাঘ নাই, বাঘডাসও নাই। অরণ্যও নাই। পরিষ্কার। কালে কালে গজিয়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, জেগে উঠেছে পাকা রাস্তা। তবে তাঁর হাবেলি যেখানটায়, শুধু ওই জায়গাটুকুতে কিছুটা অরণ্য এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। ইটকাঠলোহাপাথরের বিশাল মরুভূমির মধ্যে ছোট্ট একটি মরূদ্যান। কালের চাবুকে পাতা ঝরে, প্রাণ-প্রাণী-প্রকৃতিতে ধস নামে, অতঃপর বৃক্ষের বীজ থেকে, প্রাণী ও মানুষের বীজ থেকে ফের গজিয়ে ওঠে নতুন অঙ্কুর, নতুন পাতা, নতুন পাখি, নতুন প্রাণ, নতুন মানুষ। যে বৃদ্ধা বাঘিনী জরা ও অনশনে জীর্ণা হতে হতে অরণ্যের ওই যে ওখানে নেতিয়ে পড়ে মরে গিয়েছিল, ঠিক ওখানটাতেই পড়ে আছে সে। লোম-লাবণ্য সব উবে গেছে হাওয়ায়, চামড়া-মাংস সব পচে ধুয়ে ফুরিয়ে গেছে একেবারে, এখন মাটির ওপর জেগে আছে শুধু হাড়ের কাঠামো। অবিকৃতপ্রায়। ময়লা জমেছে, শ্যাওলা ধরেছে মাত্র।

ফারুক ভাইয়ের বনে বিচিত্র গাছগাছালি। হঠাৎ একটি খেজুর গাছ। কেমন যেন বেমানান, হংসমধ্যে বক যথা। গুনা দিয়ে মাটির কলসি বেঁধে লাগানো হয়েছিল গাছে। পরে গাছিয়াল লোকটির কি জানি কি মনে হয়েছিল, কোনোদিন আর কলসি নামাতে যায়নি সে। কলসিতে রস জমেছে, উপচে পড়েছে, শুকিয়ে গেছে, পিঁপড়ায় বোলতায় খেয়েছে। তারপর মাটির মৌচাকের মতো ছোট ছোট টিবি গড়েছে বোলতারা ঝুলন্ত ওই কলসির ওপরেই।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়েছে বোলতাদের। ঢিবি ঝরে গিয়ে গজিয়েছে নতুন ঢিবি, ওই কলসিরই গায়ে। যেদিন গাছটি কলসি বেঁধে নিয়েছিল গলায়, সেদিন সে ছিল তরুণ। পরে কলসিকে অনেকদূর পেছনে ফেলে বেড়ে উঠেছিল তরতরিয়ে। আরো পরে বাজ পড়েছিল মাথায় একদিন। বজ্রাঘাতে মরণ হয়েছিল গাছটির। মরেও দাঁড়িয়ে আছে সটান। সারা গায়ে কাঠঠোকরার খোঁড়ল। আর তরুণ বয়সের গলায়-বাঁধা কলসি এখন কোমরে। লোহার সরু গুনাটি পর্যন্ত শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে গেছে।

আমরা- মানে ফারুক ভাই, বাহার ভাই, মঈন ভাই, জিন্না ভাই, আশরাফ ভাই, সাজ্জাদ, রাজু, ব্রাত্য, আদিত্য, রিয়াজ, পথিক, রোহন, বিদ্যুৎ, ইকবাল, ফিরোজ, জয়ন্ত, ফখরুল, পিন্টু, মাহবুব, শামীম, বায়েজিদ, শিবলী, আশিক, স্বপন, মাইনুক, আরজু, আমি- সে-এক বিশাল অভিযাত্রিবাহিনী, ঢুকে পড়লাম সেই অরণ্যের ভিতর। মনে হলো অন্তত আশি বছর কোনো জনমানুষের পা পড়েনি এখানে। আশি বছরের অগেকার সময় তার গন্ধ হাওয়া স্মৃতি আমেজ উষ্ণতা নিয়ে জড়িয়ে ধরল আমাদের। এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। সময় যেন থমকে রয়েছে, আবার ঠিক থমকেও নেই। আসলে এখানে, অন্তত এই জায়গাটুকুতে, সময় বইছে এক ভিন্ন চালে। নির্বিঘ্নে, আপনমনে। একটুও ডিসটার্ব করেনি কেউ কখনো এখানকার কোনোপ্রকার স্থিতি, গতি বা প্রবাহকে। এই তো কিছুক্ষণ আগে কারা যেন এসে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাদের টাইম মেশিনে, অল্প কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে নামিয়ে দিয়ে গেছে এখানে। আর তাতেই পার হয়ে গেছে আশিটি বছর…

(চলবে…)

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *