চাঁদ, প্রজাপতি ও জংলি ফুলের সম্প্রীতি-৫


মাসুদ খান


(পূর্বপ্রকাশিত-র পর)

এলিয়েনের ধরিত্রীলীলা সাঙ্গ…

প্রাণীটা খুবসম্ভব উভচর, কারণ, মাঝে-মধ্যে গভীর রাতে মনে হয় উঠে আসত সে অথইদহ থেকে। ডাঙায় রেখে যেত পদচিহ্ন। ধরিত্রীর বুকে ভিনগ্রহের ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট। এলিয়েনটাকে দেখার পর স্থানীয়রা বলাবলি শুরু করে দিলো, “তাই তো কই, বছর-বছর আমাগো খ্যাতের ফসল, গাছপালা, জঙ্গলমঙ্গল সব ডামেশ কইরা ফালায় কেডা! তাই তো কই, এত্তো বড়-বড় পায়ের দাগের মতন দাগ, ওগুলা কিয়ের? ও, কালপ্রিট তাইলে এইটা?” এমনিতে পৃথিবীটা এলিয়েনের জন্য গ্রহান্তর, তার ওপর এতসব অচেনা প্রাণীর ভিড়ের ভেতর তাকে তুলে আনা হয়েছে এক ভয়ানক বৈমাত্রেয় পরিবেশে, তারপরও প্রাণীটা প্রথম প্রথম বেশ সপ্রতিভ, হাসিখুশি। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, ততই মুশকিল হয়ে পড়ছে তার জৈবরাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখা। শ্বসন, প্রস্বেদন, তাপমাত্রা, চাপমাত্রা, পেশিবিক্ষেপ… সবকিছু হয়ে পড়ছে বেসামাল। শুরু হয়ে গেছে রিভার্স অসমোসিস। প্রাণীটির শরীর থেকে প্রচুর জলীয় কণা বের হয়ে আসছে বাষ্প আকারে। চৈত্রের খর্খরে আবহাওয়া। বাতাসে আর্দ্রতা আজ ভয়াবহরকম কম, মাত্র ২০%। এরকম বিশুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যেও সেই বাষ্পবিকিরণের কারণে প্রাণীটির চারপাশে অনেকখানি জায়গাজুড়ে কুয়াশার বাতাবরণ। চারদিকে চরাচরে প্রখর রোদ, শুধু ওই জায়গাটুকু কুয়াশায় ঘেরা। যদিও এই বাষ্পকুয়াশা কেটে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যেই, কিন্তু ওই আধো-অলৌকিক ঘটনাটি ঘিরে যে কুয়াশার আবরণ, তা আর সহজে কাটে না। কত হবে প্রাণীটার বয়স? গ্রহাণুর মতো বিপুলাকার উল্কাটি যখন করতোয়ায় এসে পড়ে, কয়েকশো বছর আগে, তার সাথেই কি সেও এসেছিল!? এত বয়স? তা ছাড়া, কীভাবে সম্ভব? উল্কাপিণ্ড যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর সবেগে ঢুকে পড়ে তখন তো বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায়। তাহলে বাঁচল কেমন করে? গবেষণা বলছে, অতিকায় উল্কাটির আবরণের নিচেই ছিল একটি সাব-টেরেনিয়ান জলাশয়। মূল গ্রহ থেকে যখন ছিঁড়ে যায় গ্রহাণুটা, তখন প্রাণীটা ছিল ওই জলাশয়ের ভেতর। জলাশয়ের ওপরকার আবরণটা ছিল খুব কঠিন এবং পুরু। হয়তো তাই সুরক্ষিত ছিল সে।

এলিয়েনটার অবস্থা ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে। প্রাণিবিশেষজ্ঞ ও ডাক্তারের দল অযথাই স্টেথোস্কোপ, বিপি-মিটার, থার্মোমিটার, ইনজেকশন সিরিঞ্জ নিয়ে প্রাণীটার চারপাশে ঘোরাঘুরি-দৌড়াদৌড়ি করছে, ওগুলো এতই ক্ষুদ্র ও অপ্রাসঙ্গিক যে তা নিয়ে তারা নিজেরাই যারপরনাই বিব্রত। কী আর করা! ওগুলোই নিয়ে লাগাচ্ছে প্রাণীটার দেহে। মর জ্বালা! প্রাণীর গায়ে সুড়সুড়িও লাগছে না ঠিকমতো। এক পশুবিশেষজ্ঞ, এমনিতে শ্বেতীতে সারা মুখ শাদা, তার ওপর বিলাতে থাকে বহু বছর ধরে, বেড়াতে এসেছে দেশের বাড়ি। খুব দেমাগ, দেমাগের চোটে মাটিতে পা পড়তে চায় না, কথায় কথায় খালি বিলাতের গল্প, আর নিজে কী কী করেছে তার গল্প। আর সবাইকে খালি জ্ঞান দিতে থাকে। আর পয়সার গরম। কিন্তু গরিব-গুর্বারা একটু সাহায্য-টাহায্য চায়, তা দেয় না। হাটে গিয়ে বড়-বড় মাছ, মাংস, খাসির গুর্দা, গরুর কল্লা… ভালো-ভালো যা পায় সব কিনে নিয়ে চলে আসে। দরদাম করে না, যা দাম চায় সেই দামেই কিনে ফেলে। বাজারে জিনিশপত্রের দাম সেই যে চড়িয়ে দিয়েছে লোকটা, আর নামে না। মাসখানেকের মধ্যেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে গ্রামের লোকজন। বেতমিজ পোলাপান প্রাণিবিশারদের নাম দিয়েছে ‘বিলাতি বান্দর’। তো, সেই প্রাণিবিশেষজ্ঞ এসেই শুরু করে দিলেন হুলুস্থুল লম্ফঝম্ফ। ভেরি এক্সাইটেড! নানারকম অত্যাধুনিক তত্ত্বকথা শোনালেন প্রাণিবিদ্যার, ইংরাজি-বাংলা মিশিয়ে। বললেন, “পৃথিবী নামের এই প্ল্যানেটে যত ক্রিয়েচার আছে, অল আর কার্বন-বেইজড, কিন্তু এই যে ক্রিয়েচারটি দেখছেন, এইটা যে প্ল্যানেটের সেখানকার সব প্রাণীই সিলিকন-বেইজড, এটাও তা-ই। ইউ নো, সিলিকন ক্যান নট হোল্ড ওয়াটার ফর লং, দ্যাখেন না, সিলিকন-ডাই-অক্সাইড, মানে বালু… বালুর মধ্যে তো পানি থাকে না বেশিক্ষণ। সো, এই প্রাণীটাও, আই মিন, এই ক্রিয়েচারটাও ইভাপরেটস ওয়াটার ভেরি কুইকলি। দিস প্রাণী বিলংস টু দ্য স্পিসিস নেইম্ড হিপ্পোফ্যালাইটিস স্যাপোলিপিথেকাস প্রকান্ডাম।” শুনে লোকজন বলে, “আরে! প্রকাণ্ড যে, তা তো দেখতেই পাইতেছি, তো এইসব অংবং প্রকান্ডাম/বোম্বাস্টিক ঘোড়ান্ডাম…এগুলা কী-কয়-না-কয় ব্যাটা!” সেই থেকে তারা পশুবিশেষজ্ঞটির খেতাব দিয়েছে ‘অংবং প্রকান্ডাম/বোম্বাস্টিক ঘোড়ান্ডাম’। মানুষের মধ্যে কি-জানি-কী একটা ব্যাপার ঘটে…যাকে দেখতে পারে না তো পারেই না… ভালো ভালো কথা বললেও না।

প্রাণীটাকে কীভাবে বাঁচানো যাবে সে-ব্যাপারে প্রেসক্রিপশনও দিলেন বিলাতি পশুবিশারদ। কিন্তু কাজ হলো না কোনো। সব উদ্যম, উত্তেজনা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রাণীটি অচেনা ভাষায় চিৎকার করতে করতে কয়েকঘন্টার মধ্যেই ধরিত্রীলীলা সাঙ্গ করল। প্রাণিবিশেষজ্ঞ তো কেটে পড়ল সুরসুর করে। এরপর এলো এলিয়েনের সৎকারের পালা। কী করা হবে বুঝতে পারছে না কেউ। এই প্রথমবারের মতো ডাক পড়ল সেই বিখ্যাত হকসেদের, এলিয়েনটার শেষকৃত্যের ব্যাপারে ফতোয়া দেবার জন্য। আসমান-জমিনের অনেক খবরই তো থাকে ওর কাছে। ও, ভালো কথা, এই হকসেদটা কে, সে কথা তো বলাই হয়নি। পরে বলছি। আর বলবেন না, বুড়া হয়ে গেছি, মনেও থাকে না ঠিকমতো, আগের গল্প পরে বলি, পরের গল্প আগে…। তো যাই হোক, হকসেদ বলে, “প্রাণীটা ভিনগ্রহের এক্কেবারে এক নম্বর উন্নত প্রজাতির না হইলে কী হইবো, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের প্রাণী তো বটেই। এদেরও তো একটা রিলিজিয়ন আছে, নাকি? শোনেন নাই, মরার আগ দিয়া প্রাণীটা , “কক্কারাতাফুকুনটামারিয়ামটালানটালামালাগফিরিস…”  মানে, সে কইতে চাইতেছিল—  কক্কারাতা, মানে কক্কারাতা হইল-গিয়া তাদের ঈশ্বরের নাম, আর এই প্ল্যানেট হইছে তাদের দশটা দোজখের একটা। দীর্ঘ নরকবাস তার শ্যাষ হইলো আইজ। এলিয়েনের আত্মারাম তো অলরেডি উইড়া গ্যাছে-গা অন্য আরেক গ্রহে যেইটা কিনা হইলো-গিয়া তাদের বেহেশত। এলিয়েনের আত্মাডা তো মনে করেন এরই মধ্যে নতুন শরীর ধারণ কইরাই ফালাইছে। আত্মা তো আর ভোগ করতে পারে না কোনো কিছু, না সুখ, না কষ্ট, ভোগ করার জন্য তো বডি লাগে একটা, তাই না? দেহধারণ করা লাগে, ঠিক কিনা? কিন্তুক এলিয়েনের তো এইটা দুই নম্বর মরণ, এর আগেও তো একবার মরছিল ব্যাটা, তখন হইছিল তার আসল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। এইবার আপনারাই কন, ভদেশটার এই ভুয়া বকেয়া বডি সৎকার কইরা আর কী লাভ? দ্যাখেন, যেটা ভালো হয় করেন। তবে কই-কি, এক কাম করা যায়, কাইটা দেখা যায় কী আছে এইডার মধ্যে।”

ডালাখোলা কনটেইনারের ওপরই শুরু হলো এলিয়েনের পোস্টমর্টেম। শরীরের কোন জায়গা থেকে অস্ত্রোপচার শুরু করা যায় তা দেখতে বিশাল এক লৌহশলাকা-হাতে স্থানীয় শল্যচিকিৎসক ডাঃ আরিফ প্রয়াস নিলো এলিয়েনের শরীরে আরোহণের। কিন্তু পাহাড়ের মতো শরীরের কিছুটা উঠেই পিছলে পড়ে ব্যথা পেল ডাক্তার। এল লাশকাটা ঘরের ডোমেরা। ছুরি-কাঁচির বদলে নিয়ে এসেছে গাছকাটা বিশাল করাত এক জোড়া। হাতে-টানা করাতের দুই প্রান্তে দুইদল ডোম বসে ঘসঘস করে কাটতে লাগল সর্বশক্তি প্রয়োগ ক’রে। করাতের দাঁতে দাঁতে প্রাণীটার চামড়ার নিচ থেকে উঠে এল প্রচুর ভেজা বালি ও কাঁকর। এলিয়েনটা হঠাৎ নড়ে উঠে আশপাশের বায়ুস্তর কাঁপিয়ে, দিলো এক অট্টহাসি- মরণোত্তর অট্টহাসি। ডোম-সম্প্রদায় ছিটকে পড়ল দূরে দূরে। এখন ডোম, ডাক্তার কেউ আর আসে না কাছে। এল পেশাদার করাতিরা। ঘচাঘচ কেটে আলাদা করে ফেলল ধড়। তরল গড়িয়ে পড়ল পীতবর্ণ, প্রচুর। পরে বোঝা গেল, আসলে এ তো প্রাণী নয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক ইকো-সিস্টেম- চলিষ্ণু, জীবন্ত, জঙ্গম। বিস্ময়কর এক ইকোসিস্টেম। সারা শরীরে ওই যে ঘন জঙ্গল দেখছেন ওগুলো লোমও নয়, আঁশও নয়, ওগুলি আসলে এক জাতের তৃণ ও শৈবাল-জাতীয় উদ্ভিদ। আর প্রাণীটার চামড়ার নিচে রক্তমাংসচর্বির বদলে বিচিত্র খনিজ ও জৈব উপাদান মেশানো জল-কাদা-বালু-কাঁকরের জমাটবাঁধা এক মশলামিশ্র। বিলাতি বিশেষজ্ঞ তো ঠিকই বলেছিল- সিলিকন-বেইজ্ড প্রাণী। ওই জীবন্ত মশলামণ্ডের ভেতর, বালু-কাঁকরের মাংসরাশির ভেতর সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম জালিকাবিন্যাসে ছড়িয়ে আছে অজস্র রগরেশা, শিরা-উপশিরা। আর সেসবের ভেতর দিয়ে শিকড় চারিয়ে দিয়ে খাদ্যরস শুষে নেয় শরীর জুড়ে গজিয়ে ওঠা ওই তৃণ ও শৈবালের জঙ্গল। ধীরে ধীরে ফুল ফোটে তৃণে ও শৈবালে, ফল হয় চিনা-কাউন বা পোস্তদানার মতো গুড়িগুড়ি, হয়তো আকারে কিছুটা বড়-বড়। কিছু তার খুঁটে খুঁটে খেয়ে ফেলে ছোট-ছোট জলজ ও স্থলজ প্রাণীতে, আর বাকিটুকু ঝরে পড়ে ওই মরে যাওয়া তৃণ বা শৈবালের নাড়ার ভেতর। তারপর নতুন মৌসুম শুরু হলে প্রাণীটার সারা গা ভ’রে ফের গজিয়ে ওঠে নতুন তৃণ ও শৈবাল। এই শস্যচক্র চলতেই থাকে যতদিন বেঁচে থাকে এলিয়েনটা। এলিয়েনটা আসলে একটি প্রাণীই যার সারা-গা-ভর্তি ফুলফলময় উদ্ভিদ। একাধারে সে প্রাণী, উদ্ভিদ এবং এক জ্যান্ত, চলিষ্ণু ভূমিখ– স্বয়ংক্রিয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক প্রতিবেশচক্র। এলিয়েনটার, মানে সিস্টেমটার অভ্যন্তরে তিন স্তরে বিশাল-বিশাল আধার। একটি আধার জলাশয়; আরেকটি জীবন্ত রসায়নাগার, যা অটুট রাখে ইকো-চক্রটিকে। তৃতীয়টি প্রত্ন-সংগ্রহশালা। অদ্ভুত গ্রহের অদ্ভুত সব সামগ্রী তাতে। বিচিত্র সব রত্নরাজি, আদিম ও আধুনিক কিছু হাতিয়ার, তৈজস, কৃৎকৌশলের নানান নমুনা… এইসব। আপনি যদি কখনো মহাস্থানগড় আসেন, তবে দেখবেন, ওগুলো এখনো সংরক্ষিত আছে বরেন্দ্র জাদুঘরে। যা হোক, শেষটায় অচেনা গ্রহের সেই একখণ্ড জিন্দা ইকোসিস্টেমকে ফালাফালা করে কেটে ছিঁড়ে ফাটিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হলো  ধরিত্রীর ধুলার সঙ্গে।

(চলবে…)

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *