বিসর্গ তান-১


[ ‘বিসর্গ তান’ নাহার মনিকা’র প্রথম উপন্যাস।  এ বছর ঈদসংখ্যা সাপ্তাহিক ২০০০ এ ছাপা হয়েছিল। ‘সাহিত্য ক্যাফে’তে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হবে। – সম্পাদক]

 

নাহার মনিকা

১.
নিধির শৈশব স্মৃতিতে অগণন ঘুরপাক আছে, যেখানে একটা ঔষধি গাছের ছায়ার সঙ্গে কাটিয়ে দেয়া দিনও দেখা যায় পাকেচক্রে তার কাছে উজ্জল, প্রখর হয়ে বেগে ছুটে আসে। নিঃশ্বাস নেবার পরের মুহূর্ত স্বপ্ন, আর আগের পল নিমেষে অতীত, এভাবে দেখার ধাত তার তৈরী হলো না কেন, তা সে জানে না।

বাবা হাল ছেড়ে দিয়েছিল, মা হাল ধরার সুযোগ পায়নি। সচেতন বেখেয়ালে আশপাশের (সে সময়কার, প্রায় বাইশ-পঁচিশ বছর আগে) সবাই নিধিকে এককোনে রেখে দিতো। সেটাই মনে হয় তাকে অন্তর্গতভাবে সঞ্চরণশীল করেছে। ছোটবেলায় বেশী জুটেছে ছবির বই, রং করার খাতা আর ভীড়ের মধ্যেও কোনার ঘর, কোনায় ডেস্ক, এককোনে বিছানা করতে করতে নিজেকে কোনঠাসা দেখতে আর খারাপ লাগতো না। অথচ এখন, এই উনত্রিশে এসে কপালে (কপাল চাপড়ে?) জুটে যায় টিমওয়ার্ক (হোয়াটস গ’না ওয়ার্ক- ‘টিম ওয়ার্ক’ কোরাসে গান গাওয়া), রাস্তায় প্ল্যাকার্ড ধরে গাড়ি থামিয়ে ফান্ড রেইজ করা, টেলিমার্কেটিং (একেক সময় ফোনের ওপারে ক্লায়েণ্টের কড়া ধমকে লাল হয়ে ওঠা), বাচ্চাদের সুইমিং পুলে মনিটর, নয়তো ব্যাঙ্কোয়েট হলে বিয়েবাড়ির যোগালির কাজ সব অস্থায়ী কাজ। একটা শেষ হলে আরেকটা শুরুর মাঝখানের ফুরসত, নিজের একলাপনা ভালো লাগে নিধির।

মেয়ে হয়ে না জন্মে একটা সাপ, কিংবা হাতলে কাপড় লাগানো ইজি চেয়ার, নিদেন পক্ষে একবাক্স খুচরো পয়সা হয়ে পৃথিবীতে এলে কেমন হতো- এমন ভাবনা ভাবতে নিজেকে জমিয়ে রাখতে হয়। ভীড়ভাট্টায় খুব দ্রুত নিজেকে একা করে ফেলার নৈপুণ্য আছে নিধির। ছোটবেলায় যখন পড়তে লিখতে, দিকচক্রবালের হাওয়া বুঝতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী সময় লাগলো, তখন এ অভ্যাসটাও রপ্ত হলো। তার আগপর্যন্ত সে নিজের মধ্যে শুধু স্পর্শকাতরতা অনুভব করেছে।

২.
তুমুল বাজনার সঙ্গে র‍্যাম্প মডেলের মত একের পর এক আসে বর কনের বাবা মা, ব্রাইড মেইডস, অনার এটেন্ডেন্টস। হলভর্তি মানুষের করতালি। নিধির বাঁ’হাতের ট্রে’র ওপরে ডজন খানেক গ্লাস, ভারের চোটে কব্জি ফেটে যাবার উপক্রম হলেও হাসিমুখে টেবিলে টেবিলে রেখে যায়। বাইরে বার্চ গাছের শাদা ডালে তিরতির রোদ। ব্যাঙ্কোয়েট হলের বাইরের লনে সবুজ উপচে পড়ছে, এখনকার ভরভরন্ত গ্রীস্মে সন্ধ্যা দেরী করে নামে। দেশে যাওয়ার আগের সপ্তায় এমন খ্যাপের কাজই দরকার ছিল নিধির,  প্রতি সপ্তায় এক দু’বার ডাক পায়, কখনো কারো রিপ্লেসমেন্ট করতে ভোর ভোর ফোন বাজে। ‘ডাক দিয়েছ কোন সকালে কেউ তা জানে না’-গুনগুনিয়ে পাতাল রেলের সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামে সে।

নিধি’র ফোন খুব একটা বাজে না। যখন বেজে ওঠে, প্যান্টের পকেটে সেল ফোনের ভাইব্রেশনও আর এক প্রকারের হৃদস্পন্দন মনে হয়, বেঁচে থাকা টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিদেশ বিরানে, যেখানে নিধির আত্মীয় বন্ধু একেবারে কম, আর নিকোলাস ফোন করে কম। ও সামনে এসে, স্পর্শ করে দেখতে ভালোবাসে।

কিচেনে ফোন ধরা অসম্ভব। ওয়েটারদের ভীড়, হাতে হাতে ট্রে, সার্ভিং ডিশ, প্লেট। একটু পরে ডিনারের মেইন কোর্স সার্ভ করা হবে। ফুপু নিশ্চয়ই বলে বলে অয়নকে দিয়ে ফোন করায়? নিধি তো বহুবার ওর দিকে নিজের নীলচে ব্লিচে ধুয়ে শাদা করে ফেলা বিতৃষ্ণা ছুড়ে দিয়েছে!

-‘এত হট্টগোল কিসের? মিউজিক, কোথায় তুই নিধি?

কিচেন থেকে আবারো হলের মধ্য সেধিয়ে এক্সিটের দিকে এগোয় সে। দু’মিনিটে ফিরে আসতে পারলে ম্যানেজার আর খোঁজ করবে না।

ফুপুর কন্ঠস্বর যেমন একটা নিঝুম গাছের ছায়ার শান্তি দেয়, তারই পেটের ছেলে অয়ন, ওর সঙ্গে কথা বললে কেন ভেতরে বিরক্তি হিল হিল করবে- এর জবাব নিধি জানে কিছুটা, তারপরও খোঁজে (খুঁড়ে দ্যাখো অতল হৃদয়!)। স্কুলের ফার্ষ্ট বয় অয়নের জন্য নিধির অনুভূতি এখন রংচটা ভারী ফার্নিচারের মত, ভালোলাগে না, কিন্তু নড়ানোর উপায় নেই।

-আম্মা বলছে ফ্লাইট ডিটেইল দিতে- আটলাণ্টিকের অন্য পারে অয়ন, রেডিওর দিশাহারা ঘর্ঘরের মত ভেসে আসে তো আবার হারায়।

-‘মেইল করে দিবোনে’, যথাসম্ভব গলা তোলে নিধি। অয়নের নিথর ফোনালাপ শোনার সময় না এখন, সে ফোন কেটে দেয়। কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা দরকার, ফোনে এলার্ম দিয়ে ভোরে উঠে পেইন্টিং এর স্লাইডগুলী রেডি করে কম্পিটিশনে ই-মেইল করে যেতে হবে। আর যাচ্ছেই তো সে, অনেক বছর পরে হলেও দু’দিন বাদেই দেখা হচ্ছে অয়ন টয়ন সবার সাথে। এতদিনকার অস্থির অপেক্ষার এখন এক নাতিশীতোষ্ণ অনুভব, ভালো লাগে নিধির।

আবারও সুড়ুৎ করে বাজনায় ঢুকে যেতে হয়। এবারে বেহালার সুর, গভীর মমতায় সিম্ফোনি বাজাচ্ছে কোন ওস্তাদি হাত। কনের ছোটবেলাকার ভিডিও ক্লিপ চলছে। ছয় কি সাত, কী মিষ্টি দেখতে মেয়েটা, হলুদ ফ্রক পরে একটা সদ্য ফোটা ড্যান্ডেলিওনের ফুল, তার এখন বিয়ে হচ্ছে! (ভালোই, শুকিয়ে রোয়া ওড়ানো শুরু করার আগেই হচ্ছে)। ভিডিওর ফ্ল্যাশব্যাক- ব্যাকইয়ার্ডে বাবার সঙ্গে ফ্রিজবি খেলছে মেয়ে, রোলার স্কেটিং চড়ে রাস্তা দাবড়াচ্ছে মেয়ে, মায়ের গলা জড়িয়ে কনভোকেশনের ফটো, সকলি সুখস্মৃতি! নতুন জীবন শুরু করবে মেয়ে অথবা করেই ফেলেছে, এ কেবল আনুষ্ঠানিকতা। টেবিলে ওয়াইন সার্ভ করার সময় নিধি দেখে বাবার গাল বেয়ে অশ্রুধারা। কনের মা, বাবাটাকে জড়িয়ে ধরে – ওহ, বব! বব, শি ইজ আওয়ার বেবী’ ফিস ফিস করে বলছে। নিধির জায়গায় আর কেউ হলে নির্ঘাত লুকিয়ে চোখ মুছে নিতো। অতি সহজে আদ্র না হওয়া নিধির স্বভাবসঙ্গী সেই কবে থেকে!

ক্যানাডায় আসার পরে প্রথমবারের মত যাচ্ছে বলে নিধি ভাবতে পারেনি কত কিছু গুছিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে মিহিলতা(এতিম সিয়ামিজ বিড়াল, একজন ফ্রি’তে দিয়েছিলো, নিধির ছোটবেলার বিড়ালের নামে নাম), নিক এসে সপ্তায় দু’তিনদিন ক্যাটসিটিং করে যাবে। সে আরো কি কি করবে নিধি অনুমান করতে পারে। দু’একদিন পরপর এসে ঘন্টাখানেক বসে, হাট করে দরজার পাল্লা খুলে গান বাজিয়ে, কাবার্ড খুলে নিধির জামা কাপড়ে, বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে তোয়ালেতে মুখ গুজে, চাটনির বৈয়াম থেকে দু চামচ মুখে পুরে, ‘জগতে আনন্দ জজ্ঞে’ বার বার শুনে (পন্ডিচেরীতে বাঙ্গালী প্রতিবেশীর জানলা দিয়ে ভেসে আসা বাংলা গান নাকি জন্মের পর থেকেই শুনেছে নিকোলাস ব্রাগাঞ্জা!) ইংরেজী বই দু’এক পাতা পড়ে, বাংলাগুলো নেড়েচেড়ে- ‘আই মিস ইউ বেইব’ লিখে ফিরে যাবে নিজের ডেরায়। ফ্রিজের গায়ে ‘পোষ্ট ইট’ এর ট্যাগ জমতে থাকবে, হাসি মুখ-ব্যাজার মুখ। রং মিস্ত্রীর এইটুকুই আঁকার বিদ্যা। নিক বলে- ঘর রং করতে এসে ডুবুরীর মতো সে বহুমূল্য এ্যান্টিকের মত নিধিকে পেয়ে গেছে, কাছ ছাড়া করা যায় না, আবার নিরন্তর যত্ন করতে হয় (সেজন্যেই হয়তো একসঙ্গে থাকার প্রস্তাব নিয়ে লোফালুফি খেলছে)। নিকের চুলে মনে মনে আঙ্গুল চালিয়ে দেয় নিধি।

ওকে এখনো বলেনি, যাওয়ার আগে বলা ঠিক হবে কি না- এই নিয়ে নিজের সঙ্গে তর্ক বাঁধায় নিধি। কোন কিছুতে মাত্রা না ছাড়ানো নিক ওর মত করে নির্ঘাত হুলুস্থুল করবে। আর তাছাড়া সিদ্ধান্তের ব্যপারে সে নিজেও তো এখনো নিশ্চিত না। দেশে থাকছে মাত্র তিন সপ্তাহ। ফিরে এসে কিছু করার, সিদ্ধান্ত নেয়ার অনেক সময় হাতে আছে।

উনত্রিশ বছর বয়সে এসে নিধি বুঝেছে বৈরাগ্য আর গৃহস্থালী যে মানুষের ভেতরে একসঙ্গে বাস করে তার দোটানা শেষ হয় না। আরো বছর দশেক বাদে এই বোঝার রদবদল হবে কি না তা নিয়ে এখনি বেচাল হওয়ার কি দরকার? কাজেই, এই বেলা নিকোলাসকে খবরটা দেয়ার আগে কিছুদিন অপেক্ষা করলে ক্ষতি নেই,- নিজের এই গোয়ার্তুমিটাকে নিধি ময়দা দলার মত ছেনে মেখে দেখতে চায়।

(চলবে)

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *