একদিন প্রতিদিন


মিতুল দত্ত

 

২/৪/১৩
৯:২৯, সকাল

জানলার সামনে বসে আছি। আমার চায়ের কাপে রোদ্দুর। ভিটামিন ডি। আমি অনেকটা
রোদ্দুর একসঙ্গে খেতে চাইছি। আমার গলা দিয়ে নামছে না। আমার গলায় কান্না,
রোদ্দুরকে আমার ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না।

৯:৫০, সকাল

আমার আত্মাকে আমি বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখছি। ওর অসুখ করেছে। অবিশ্বাসের
অসুখ। গরুর মতো চোখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। জানলার বাইরে ক্রমশঃ গরম হয়ে
ওঠা পৃথিবী। কোনও পাখি কেন আজ আমার বাগানে এল না? ইঁটের পাহাড়ের ওপর
দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে। এইটুকু একটা মশা, আমার বুড়ো আঙুলের ওপর
এসে বসল। আমার আত্মাহীন চামড়ার ওপর।

১০:১২, সকাল

অথচ এসব আমি বলতে চাই না। আমি যে কী বলতে চাইছি, তাও খুব স্পষ্ট নয় আমার
কাছে। চারদিকে কুকুরের খেয়োখেয়ি। তার মধ্যেই ঘাসগুলো দিব্যি বেড়ে উঠছে।
কী যে পাচ্ছে আমার, পেচ্ছাব না খিদে, আমি বুঝেই উঠতে পারছি না। চারদিকে
এত রাস্তা, কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সব? না, আমি ঈশ্বরের কথা বলছি না। আমি
শুধু গন্তব্যের কথা বলছি। একটা গন্তব্য।

১০:৩৫, সকাল

নির্জনতার রঙের কি কোনও নাম আছে? মাধুকরীর নাম কে রেখেছিল? কাল একটা
কুমোরে পোকা আমার চুলের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। আমার মাথার ভেতরে তাঁত বোনার
শব্দ। পুরীর সমুদ্রে স্নান করে আমি উঠে আসছি। আমার গা থেকে ঝরে পড়ছে
বালি। আমার গা থেকে ঝরে পড়ছে ষোড়শ শতাব্দী। ও বলছে, আমাকে বাঁচাও। মৃতের
প্রার্থনা জীবিত কি গ্রহণ করতে পারে? (ওহ্ সন্দীপন!)

১০:৫০, সকাল

খুব খিদে পাচ্ছে এবার। আমের গুটিগুলোকেই চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে। আগুনের
জন্মের আগে কীরকম ছিল মানুষের জিভ? কাঁচা মাংসের স্বাদ, কী নাম তার? ওঃ,
আজ  এত নাম নিয়ে পড়লাম কেন! পাগলরা কি নিজের হাত-পা চিবিয়ে খায়? গৌর লাহা
স্ট্রিটের সেই পাগলটা, সারাক্ষণ নর্দমার ধারে বসে কী খুঁজত?

যাদের চোখের মধ্যে কোনও সন্ধান থাকে না, তাদেরও কি অন্ধ বলা যায়?

১২:২৪, দুপুর

চায়ের মধ্যেও মাংসের গন্ধ! কী যে একটা দিন! গিটার নিয়ে বসব বলে নখ
কাটলাম। নখ বেড়ে গেল। আমার গিটার কি আর কোনওদিন বেজে উঠবে? শরীরের সমস্ত
কাটাছেঁড়া আর পোড়াদাগের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব বলে সকাল থেকে বোরোলিন
খুঁজছি। বাগানের পাঁচিলে আর্টপেপারের সাইজের রোদ্দুর পড়েছে। তার নীচে
ঝরাপাতার স্তূপ। লোকঠকানো শ্যাম্পু আর সানস্ক্রীন আমার বসন্তকে শুষে
নিচ্ছে রোজ। ছোটমাসি জিরাট থেকে ঘোল এনেছিল কাল। আমি খাইনি।

১২:৫৩, দুপুর

এইসব মুহূর্তযাপনের কথা, কতটুকুই বা আর বলা যায়? জীবনের আঠা, গায়ে লেগে
যাচ্ছে। কত ছোট ছোট পোকামাকড়ের মতো সম্পর্ক, আটকে যাচ্ছে গায়ে। কাল
সারাদিন চুল আঁচড়াইনি। জটিবুড়ি হয়ে বসে আছি সকাল থেকে। জীবন আর কত
ব্যান্ডেজ খুলে খুলে যে দেখাবে, ভেতরের সাদা হয়ে যাওয়া, পোকা হয়ে যাওয়া,
থকথকে পরাবৃত্ত! সমুদ্রের ধারে, সেই মুকুটপরা বাড়িটাকে মনে পড়ছে।
ভালোবাসার দিন, ভালোবাসার মতোই হারিয়ে যায়! কোথায়?

১:৪৫, দুপুর

নিজের ভেতরে শান্তি না থাকলে কাউকে কি তা দেওয়া যায়? এইসব জ্বালাপোড়া বুক
থেকে একটা একটা করে ইঁট খুলে দেখাতে ইচ্ছে করে। কোথাও যেন ছায়া নেই আর ।
ভাস্করদাকে মনে পড়ছে খুব। একা হয়ে যেতে যেতে মানুষ কীভাবে যে শেষ হয়ে
যায়। বাগানে নামিয়ে দেওয়া লক্ষীপ্রতিমাটি রোদে-জলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে রোজ
রোজ। বড় কষ্ট হয় মাঝে মাঝে ওর জন্য। একবছর আগেও তো, ও আমাদের বিশ্বাস
ছিল। কত অযত্নে, কত অবহেলায় যে ক্ষয়ে যায়, মরে যায়, গলে গলে মাটিতে মিশে
যায় আমাদের বিশ্বাস।
“);

Facebook Comments

2 Comments:

  1. শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

    দারুণ লাগলো, চমৎকার।

  2. ‘গিটার নিয়ে বসব বলে নখ
    কাটলাম। নখ বেড়ে গেল।’

    boro beshi valo lekho tumi!
    ador nio, Mitul.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *