চারটি কবিতা


দারা মাহমুদ


স্মৃতিঘর

 

খোলস ছাড়তে ছাড়তে সে ছুটে যায়
দিন আর রাত্রির টানেল বরাবর
তার পিছনে ধাওয়া করে
তারই ছেড়ে আসা মুখোশগুলো
একদিন যাদেরকে নায়িকা ভেবে
প্রবল বিভোর ছিল
আজ তারা প্রেত হয়ে
মেলে ধরে দাঁতের করাত
পৃথিবীর এসব বীভৎস ইমেজ থেকে
দূরে— কোনো অচিনপুরে
যেখানে মধু ও মদের নদীতে স্নান হয়
সেখানে যাবে বলে তার এই গতি দৌড়
এটা কোনো খেলা নয়, প্রতিযোগী নেই,
তবু সে জীবনমরণ দৌড়ে যায়
মাঝে মাঝে ছেড়ে আসা
খোলসের জন্য মায়া হয়
স্মৃতিঘর বড়ই নির্মম

 

উন্মাদের ডায়েরি

আয়নার সামনে দাঁড়ালেই
বিকেলের এক উদাসী বালক
আড় চোখে তাকায়
মফস্বলের জীর্ণ ঘরদোর
আর ইট বোনা রাস্তা ধরে
বড়লোকের ছেলেদের বাড়িয়ে দেয়া
সিগারেটের পশ্চাৎদেশ টেনে
অনেক না পাওয়ায় বাড়ি ফেরা
সেই উদাসী বালক
এসে আয়নার ভেতর ঢুকেছে
আবার আয়না বরাবর সাঁটা আছে
তোমার সেই শাদাকালো ছবিটা
শাদাকালো চোখের দীপ্তি
আলো ফেলে কলেজ পাড়ার রাস্তায়
আমি রাতে তোমার শরীরে ঢুকে
সেই শীর্ণ বিষণ্ন বালিকাকে খুঁজি
সমস্যা আমার নয়
সমসা ডাক্তারের
মনো ডাক্তাররা একটু পাগল
পাগল হয়, এটা তাঁর রোগীরা
যতটা জানে, অন্যরা জানে না

 

নগর গৌতম

মহানগরের পথে পথে
একজন বুদ্ধ হেঁটে যায়
মানুষের মধ্যে একা একাকী গৌতম
তার চলাচলে খেলা করে গোয়েন্দা স্বভাব
বিয়ানিবাজার থেকে মধ্য বাড্ডায়
অথবা গুলশানের সাজানো পাড়ায়
পরিত্রাণহীন মানুষের মধ্যে সেই
বুদ্ধ হাঁটাহাঁটি করে

বস্তিতে ভূতের শিশু আঁস্তাকুড় শিশু
ৰুধা আর বেদনার গান গায়
পল্টনের মোড়ে, গ্রীনরোড়ে হাত-পাহীন সত্তা
অলৌকিক মূর্ছনা ছড়ায়
তাদের দুঃখের খুব কাছ দিয়ে
বুদ্ধ হেঁটে যায়—
রথের সারথি নেই, সুজাতার হাসি নেই
জেতবন গয়া আর সারনাথ নেই
শুধুই বৈষম্য আছে, এখানে প্রচুর আছে
সম্পদ ও দারিদ্র্যের অন্ধ বসবাস

দ্যাখা হলো দালান প্রাকার, কলোর জীবন …
লোভে পাপে এই নগরের আত্মা পুড়ে গেছে
অভিশপ্ত দানবকে পিছে রেখে
হলুদ গ্রামের পথে যেতে মন চায়
নগরের অদৃশ্য দেয়াল বাধা দেয়
অদৃশ্য পুলিশ তেড়ে আসে
এ নগর থেকে যাওয়া নেই, তাই
পথে পথে আলোকিত শার্ট
চশমা ও প্যান্ট আর এক জোড়া জুতো
সবকিছু দুঃখময় বলে হাঁটাহাঁটি করে

 

একাকীত্ব

যখনই কিছু ভাববো বলে চোখ বন্ধ করি
মাথার মধ্যে মৃত রাজবাড়ি
কোলাহল করে ওঠে
সেখানে রাজা মন্ত্রী সান্ত্রী রানীমাতা
এবং নীল চোখওয়ালা রাজকুমারী আছে …

এরপর চোখ খুললেও ঘোর যায় না
কারণ ওই যে মন্ত্রীর ভিলেন পুত্র আছে
রাজবাড়ির অন্ধ কুঠরি আছে
ষড়যন্ত্রের ঘুলঘুলি আছে
সবাই চারপাশে ভিড় করে

ভিড়ের ভেতর থেকে রাজবাড়ির মধ্য থেকে
ভাড়াবাড়িতে নেমে আসি,
দেখি একটি তেলাপোকা আমাকে দেখছে
আর বলছে— ‘হে ভাগ্যাহত, পরমাণু যুদ্ধে
তোমার মৃত্যু হবে, আমার হবে না’

আবার চোখ বন্ধ করি, আর ভাবি
রাজকুমারীর উলঙ্গ পিঠের কথা
যেখানে নায়াগ্রার প্রপাতের মতো
কালো চুলের ঝরনা নেমে আসছে অবিরাম
তার মধ্যে গোছলে মেতে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি
একটি তেলাপোকা ঠিক চোখের সামনে বসে আছে
দেয়ালে টিকটিকি আছে— পুরনো ঝুল মাকড়সা
এবং শত্রুর মতে স্থবির ঘড়ি।

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *