পাবলো নেরুদার ১০০ টি প্রেমের সনেট থেকে


untitledঅনুবাদ: আনন্দময়ী মজুমদার

(৮)

তোমার চোখে যদি চাঁদের রঙ থাকত না লেগে,
কাদা-মাখা দিন, শ্রমের ঝলক, লালচে আগুন,
এই সব আঁচ, আভা থাকত না যদি, যদি এতটা জড়ানো থেকেও
না হতে তুমি বাতাসের মত ফুরফুরে, শিল্পময়,

যদি না হতে হলুদাভ বাদামী পাথর, হরিত লহমার মতন
যে লহমায় হেমন্ত আঙুরের লতা বেয়ে ওঠে
না হতে যদি সুগন্ধী চাঁদের আঙুলে ময়ান দেওয়া সেই অখন্ড রুটি
তোমার সাদা সুরভিত গুঁড়ো না ছড়াতে আকাশের গায়

তাহলে হয়ত, প্রিয়তমা, তোমাকে ভালবাসতাম না
ততটা, যতটা বাসা যায় । কিন্তু যে মুহুর্তে তোমাকে ছুঁয়ে থাকি, ধরে থাকি তোমায়,
সে মুহুর্তে যা কিছু আছে, সময়ের করতলে, তাই যেন পাই:

বালুকণা, মুহুর্ত-স্পন্দন, বৃষ্টি-ঝরানো বৃক্ষরাজি,
সব কিছু জীবন্ত, আমিও জীবিত তাই : এসব অনুভব করি, নিষ্কম্প থেকে,
তোমার জীবন আমাকে জীবন শেখায় ।

(`If your eyes were not the color of the moon’, VIII from ‘100 Love
Sonnets of Pablo Neruda)

 

(৩৫)

তোমার আঙুল আমার চোখের ওপর
তোমার আঙুল আমার চোখের ওপর দিয়ে উড়ে যায়, দিনের দিকে।
আলো এসে থরে থরে গোলাপের সম্ভার খুলে দেয়।
বালি আর আকাশ একাকার হয়ে ফিরোজা মৌচাকের মত ধুক্পুকিয়ে ওঠে ।

তোমার আঙুল যে বর্ণমালা ছোঁয়, তারা রিনরিনে বেজে ওঠে ঘণ্টার মত
সেই এক হাত পর পর ছুঁয়ে যায় পেয়ালা, সোনালী তেল ভরা পিপে,
ফুলের পাঁপড়ি, ঝর্ণা, প্রধানত, প্রেম।
ভালবাসা: তোমার হাত প্রেমের ভাণ্ড পাহারা দেয়।

দুপুর …আশ্চর্য নিথরতায় জেগে থাকে। রাত পিছলে চলে যায়
একটি ঘুমন্ত পুরুষের চোখের ওপর দিয়ে, একটি ছোটো স্বর্গীয় আধারের মত।
মধুমালতী তার আদিম বিষণ্ণ ঝাঁঝ বাতাসে ছড়ায়।

তখনই তোমার হাত পাখির মত কেঁপে উড়ে আসে আবার,
যে পালক হারিয়ে গেছে, কল্পণায় ভেবেছি আমি,
সেই ডানা দুটি গুটিয়ে রাখে আমার চোখের ওপর, যে চোখ দুটিকে আঁধার গ্রাস করেছিল ।

`Your hand flew from my eyes into the day.’ 35, from ‘100 Love
Sonnets’ by Pablo Neruda.

 

(৩০)

দ্বীপমালার চিরসবুজ বনজ তন্তুর মত তোমার চুল;
তোমার ত্বকে শত বছরের অনাদি ইতিহাস;
সাগরের আরণ্যক শোঁ শোঁ শঙ্খধবনি তোমার শিরায়;
সবুজ, ভেষজ রক্ত আকাশ থেকে ঝরে, স্মৃতিতে তোমার।

এইসব শেকড়বাকড় থেকে, জলের ওপর সূর্য-কণার
এই বহুল বিচ্ছুরণ − এর টাটকা, কড়া, জৌলুস থেকে
আমার হারানো হৃদয়, কেউ ফেরাতে পারবে না ।
যে ছায়াময় অতীত আমার সঙ্গে বাস করেনা, সেখানে বসত করে আমার অনুভব।

আর তাই যেন তুমি দক্ষিণ থেকে জেগে ওঠো দ্বীপের মতন
তোমার মধ্যে ভীড় করে পালক আর বৃক্ষময় গুঁড়ি, তোমাকে মুকুট পরায়:
আমি সেই স্রোতগ বন্য আঘ্রাণ খুঁজে পাই তোমার ভেতর ।

অরণ্যের মজ্জায় যে গাঢ় মধু আমাকে টানে− তাই,
আর তোমার কোমর ছুঁয়ে অনুভব করা বুনো অনচ্ছ ফুল,
এই সমস্ত উপাদান, আমার সংগে পৃথিবীতে আসে, আমার সত্তার মতন ।

(`You have the thick hair of a larch’, 30 from `100 Sonnets of Love’,
by Pablo Neruda)

 

(৭৬)

এক ঋক্ষের ধৈর্য নিয়ে দিয়েগো রিভেরা
এক ঋক্ষের ধৈর্য নিয়ে দিয়েগো রিভেরা
তাঁর তুলির ডগায় খুঁজে নেন বনের পান্না-গলানো রঙ,
হৃদ-গোলাপের সিঁদুর-উদ্ভাসন,
তোমার ছবিতে তিনি পৃথিবীর তাবদ আলো ভরে দেন ।

তোমার অভিজাত নাক
তোমার চোখের চকিত বিদ্যুত
তোমার চাঁদের কলাকে ঈর্ষা-জাগানো নখ,
আর তোমার গ্রীষ্ম-ময় ত্বকে তরমুজের মত সুশীতল, সুস্বাদু মুখ ।

তোমার আগুন, ভালবাসা, আরাউকো-উত্তরাধিকার গেঁথে
তিনি তোমাকে দুটি মাথা দেন, আগ্নেয়গিরির সোনালী লাভার মত,
আর উজ্জ্বল কাদাময় তোমার দুই অবয়বের ওপরে

তিনি তোমায় বিস্ময়কর আগুনের শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেন:
ওখানেই আমার চোখ গোপনে অঢেল ছুটি নেয়,
তোমার সেই স্তম্ভের মত উন্নত চুলের রহস্যময়তায় ।

 

২০১৪/০৪/০১

(‘With the patience of a bear, Diego Rivera’, 76 from 100 Sonnets of
Love, by Pablo Neruda)

 

 

(৫)

তোমার রাত্রি, বাতাস অথবা সূর্যোদয় আলিঙ্গন করিনি আমি,
শুধু ধরেছি তোমার মৃত্তিকা, থোকাথোকা ফলের পরম অস্তিত্ব,
জলের মিষ্টতা পান করে টুসটুসে হওয়া বৃতিবান আপেল
তোমার সুরভিত গ্রামের কাদা আর বৃক্ষের আঠালো রজন।

তোমার চোখ যেখানে থেকে হেঁটে আসে, সেই আদি গ্রাম
কুইন্চামালি থেকে ফ্রন্তেরায়, যেখানে তোমার যুগল পা আমার হৃদয় নাড়ায়
তুমি সেই পরিচিত কালো কাদা আমার:
তোমার কোমর দু’হাতে ধরে ফের অনুভব করি ক্ষেতময় যবের ফসল।

আরাউকো থেকে জেগে ওঠা নারী, তুমি জানো কি
তোমাকে ভালবাসার আগে কী ভাবে তোমার চুম্বন বিস্মৃত থাকি
অথচ না জেনেই আমার হৃদয় হেঁটে যায়, তোমার মুখ মনে করে

শুধু হেঁটে যায়, একজন ক্ষতবিক্ষত মানুষের মত,
যতক্ষণ না উপলব্ধি করি, ভালবাসা।
যতক্ষণ না আমি সেই আশ্চর্য মাটিতে এসে পৌঁছই, যে ভুঁই চুম্বন আর আগ্নেয়গিরি সমৃদ্ধ।

 

(`I did not hold your night, or your air, or the dawn’, 5 from `100
Sonnets of Love’ by Pablo Neruda)

 

Facebook Comments

One Comment:

  1. opurbo! Etto valo onubad!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *