বঙ্গীয় আর্দ্রতা উদ্‌যাপন


vযশোধরা রায়চৌধুরী

নিতাইবাবু কাঁদিয়া ফেলিলেন।

অথচ সেইদিন অশ্রুসংবরণ করিয়াছিলেন। কন্যাবিদায়ের মুহূর্তে তাঁহার চক্ষুদুইটি শুষ্ক ছিল। চার-পাঁচদিন পূর্বে কন্যা চলিয়া গিয়াছে , কন্যা-জামাতার চাঁদমুখ পর্যবেক্ষণ করিয়া গিন্নি সুলতাদেবী ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিয়াছিলেন, কন্যার অনিষ্টকামনা করিবেন না বলিয়া সরিয়া গিয়াছলেন কিচেনের এক কোণে। কন্যা টিনাও , যথাবিহিত অশ্রুছলছল নয়নে প্রথমে প্রণামাদি সারিয়াছিল, তৎপরে বান্ধবী , পিশি, বৌদি এবং অন্যান্য নারীকুলের দিকে চাহিয়া বিগলিত নয়নে কাঁদিতে কাঁদিতে বিশালাকৃতি মার্সিডিস বেনজ্‌-টিতে উঠিয়া গিয়াছিল। জামাতার মুখ থমথমে শান্ত। বেচারা সে কী করিবে ভাবিয়া পাইতেছিল না। এই রূপ টিনার দেখে নাই কখনো। আহা! আই টি সেক্টরের ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ার টিনা! মারাত্মক ফ্যাশনদুরস্ত টিনা। নুডল স্প্যাগেটি স্ট্র্যাপ সহকারে জিন্স পরিধানে অতি সুদৃশ্যমানা টিনা! সে ত কর্মেও অতি তৎপর, প্রায় রোজ পেনসিল হিলের উপরে দৌড়াইতে দৌড়াইতে অফিস যায়, এমনকি বসকে কটাক্ষ ও কাজ দুইয়ের দ্বারা বশে রাখিতে সুদক্ষা টিনা । তাহার এইরূপ ক্রন্দন দেখিয়া টিনার এক্স বয়ফ্রেন্ড ও আপাতত বর দেবপ্রতিম ঈষৎ বিচলিত ও হতবাক।

সেইদিন নিতাইবাবুর কান্না আসে নাই। কন্যাকে শ্বশুর গৃহে পাঠাইতে হইত, যায় যায় করিয়া ৩১ বৎসর কন্যা পিতৃগৃহে কাটাইয়াছে। নিতাইবাবু কনট্রাকটরি করিয়া সরকারি প্রজেক্ট এক্সটেন্ড করাইয়া শুধু টাকা করেন নাই, সেই টাকাকে রাখিতে জমির কেনা বেচা করিয়াছেন, পুরাতন বাড়ি কিনিয়া ডেভেলাপিং ইত্যাদিও করিয়াছিলেন। টাকা মানে কাগজ কয়টি নহে। উহার দাম অতীব ক্ষণস্থায়ী তাহা নিতাইবাবু বিলক্ষণ জানিতেন। টাকা যে টাকারূপে ছিল তাহা নয়, কাঁচা, অর্ধ কাঁচা, অর্ধ পাকা ও পাকা প্রপার্টিতে প্রচুর খাটাইয়া রাখিয়াছিলেন । তাহা সত্ত্বেও জিনিশপত্রের দাম যে হু হু বেগে বাড়িতেছিল তাহাতে টিনার হাইহিলের উপর দৌড় দেখিয়া, আর বয়ফ্রেন্ড পাল্টানোর হার দেখিয়া মনে মনে দমিয়া যাইতেছিলেন নিতাইবাবু। আজ হোক কাল হোক মেয়েকে সৎ পাত্রে দিতে হইবে, তখন ধুমধাম করিতেই হইবে। সুতরাং নিতাইবাবুর মনে হইতেছিল, তাড়াতাড়ি ঘাড় হইতে নামো মা, নহিলে যে বাজেটে কুলাইতে পারিনা!

মেয়ে শ্বশুরবাড়ি গেল, কিন্তু তাহাতেই বা অসুবিধা কি। রিমোট কনট্রোল মেকানিজম বাজারে আসিয়া গেছে না! এক নয়, একাধিক উপায়েই মেয়ের সুখ শান্তির উপর নজর রাখা যাইতেছিল।

মোবাইল ফোন। এই একটি জিনিস হইয়াছে বটে। ইহারই কৃপায়, ইহার পর হইতে কন্যার গতিবিধি সকলি নিতাইবাবুর গোচর ছিল। হাজরা আলিপুর খিদিরপুর রোড হইয়া মারবেল কোর্ট নামক জামাতার বেহালাস্থিত বহুতল আবাসনের বাসভূমিতে গাড়িটি ঢুকিবার খবর, শ্বশুরগৃহে প্রবেশ করামাত্র কন্যাকে উলু-ধ্বনি, কুলাভর্তি বিবিধ উপচারে বরণ করা ইশতক তিনি ট্যাবে দেখিয়া লইয়াছিলেন, কন্যাপ্রেরিত ভিডিও মারফত। জামদানি-বিরিয়ানি দিয়া ভাতকাপড় করিতে দেখিয়াছিলেন জামাতাকেও, জামদানির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ, সঙ্গে একটি নতুন স্মার্টফোন । টিনার শ্বশুর খুব জাঁদরেল সরকারি অফিসার, অধুনা অবসৃত। শাশুড়ি নাই। জামাতা দেবপ্রতিমের ভ্রাতাভগিনী নাই, অর্থাৎ টিনাকে ননদ ভাজের ঘরও করিতে হইবে না। শ্বশুরগৃহে তাহার রাজই রাজ। এমত সুন্দর সংসারে টিনা প্রবেশ করিল , ইহাতে আবেগ গদ্গদ হইলেও অশ্রুবিসর্জন করিবার কোন কারণ ছিল না নিতাইবাবুর।

একালে নিতাইবাবু প্রোমোটারি ও কনট্রাকটরি করিয়া কিঞ্চিত পয়সা করিয়াছলেন। লোকে বলে তাঁহার শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিগ্রিটি একেবারেই কাজে লাগে নাই। কাজে লাগিয়াছিল ধান্ধাবাজি ও ম্যানেজ করিবার মিঠা কথা বলিবার ক্ষমতা। দুর্জনে কতকিছুই না বলে। সম্পদাপন্নের সম্পদ দেখিলে এমন দুর্নাম কত হয়, উহাই পুরুষের পুরুষকারের ভূষণ।

না, ভিরু, কর্মোদ্যমহীন বাঙালির দুর্নাম নিতাইবাবুকে স্পর্শ করে নাই। তিনি সদা সতর্ক ও তৎপর, রীতিমত আঁটঘাঁট বাঁধিয়া কাজ করেন। এই দুনিয়ায়, এই বহুপ্রশাখাসম্পন্ন সংসার বৃক্ষের ঘাঁতঘোঁত তাঁহার জানা। এই সুবিপুল অর্থনীতি যন্ত্রের কোন কোন ফুটাতে তেল ঢালিলে মেশিন ভাল চলে , তাহা তাঁহার বিলক্ষণ খেয়াল থাকে। সরকারি প্রজেক্ট হাশিল করিতে যাহা যাহা অবলম্বন করা প্রয়োজন সকল ধরণের কুশলতাই তিনি প্রয়োগ করিয়া, শেষ মেশ ছয় সাতটি সরকারি প্রকল্প তিন চারবার করিয়া এক্সটেনশন নিয়া ও দুইচারবার করিয়া এস্কালেশন করাইয়া, সম্পূর্ণ করিয়াছেন। সরকারি দপ্তর হইতে তাঁহার কনট্রাক্টরির রানিং বিল হইতে শুরু করিয়া, কার্যান্তে বকেয়া টাকার পুরা বিল পাশও করাইয়াছেন, প্রচুর জলঢালা হইলেও। ইহাতে তাঁহার জুতার শুকতলা যায়নাই, চুলে কলপ করিতে হয় কিন্তু তবু, পুরা মাথা সাদা হয় নাই। ল্যান্সডাউন রোডে অ্যাপার্টমেন্ট হইয়াছে। পৈতৃক গৃহখানি আপাতত প্রোমোটিং এ আছে। পঞ্চান্ন বৎসর বয়সে এ কী কম কথা নাকি?

এহেন নিতাইবাবুর একমাত্র কন্যার বিবাহের সময়ের খরচাদির কিছুটা ভার যে তাঁহার সাপ্লায়ারগণ লইয়াছিল তাহা আর কেহ না জানিলেও, গিন্নি বিলক্ষণ জানিতেন। তবে মেয়ের জন্য যাহা যাহা মার্কেটিং হইয়াছিল তাহার অর্ধেকও হইতে পারিত না কর্তার বিষয়বুদ্ধি এত প্রখর না হইলে ইহা জানিয়া তিনি চুপ করিয়া ছিলেন। ইমপোর্টেড ফার্নিচার এবং প্ল্যাটিনামের গহনা হইত না, অসংখ্য নমস্কারি কাপড়চোপড়ে দক্ষিণী ভারি রেশমের পরিমাণে কিছু শতকরার সিন্থেটিক মিশেল স্বীকার যাইতে হইত।
আপাতত সকলেই খুশ। বাবা খুশ মা খুশ কন্যাও খুশ। এ হেন মুহূর্তে কর্তার চক্ষে জল আসিল কেন? এ কোন মন্ত্রবলে সকাল সকাল তাঁহার মন দ্রবীভূত, অঙ্গ শিথিল এবং চক্ষু দরবিগলিত হইল?

 

ধীর মন্থর একটি রবিবারের সকাল। সবেমাত্র সকালের মিউজিক চ্যানেলে ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান শেষ হইয়াছে, গোলাপি কাগজে শেয়ারের দর দেখিয়াছেন, সাদা গোলাপি মিলাইয়া তিনটি কাগজের এক কাঁড়ি রবিবারের সাপ্লিমেন্ট মেঝেতে লুটাইতেছে, পেজ থ্রির ফোটো দেখা হইয়া গিয়াছে, কেচ্ছাগুলিও আত্মস্থ, কফির কাপে দুইটি চুমুকের পর কফিটেবিলে বড় মাগটি রাখিয়াছেন ( এই মাগ তাঁহার শৈশবে দেখা সেই উন্মুক্তকেশ, চওড়াপাড় শাড়ি পরা মাসি নহে বাগবাজারের গঙ্গার ধারে যাহার বাড়িতে মাঝে মাঝে বাবার হাত ধরিয়া গিয়ে ক্ষিরের মোয়াটা, মাংসের সিঙাড়াটা খাইয়া ফিরিতেন, আদরে একটা উৎকট এসেন্সের গন্ধ ছিল, কিন্তু পানখাওয়া দাঁতের হাসিটি কেমন অন্যরকম, তাঁহার মায়ের মত নহে, তাই কি তাঁহার মাতৃদেবী ফিরিয়ে আসিলে বলিতেন বেহায়া মাগ , যত্তসব পেয়ারের মাগের বাড়ি ঘুরিয়ে আনা হল ছেলেকে!), এমন সময়ে তাঁহার টাচস্ক্রিন , স্মার্টফোনটি টুংটাং করিয়া উঠিল।

সোফাটিতে জুৎসই হইয়া বসিয়া , টিভির সকালের খবরের দিকে অর্ধমনস্ক নিতাইবাবু স্মার্টফোন তুলিয়া লইয়া দেখিলেন, মেসেজ আসিয়াছে, ইউ হ্যাভ বিন ট্যাগড ইন এ ফোটো। ফোটো হাতড়াইয়া দেখিলেন, কন্যা টিনা তাহার ফেসবুক পেজে একটি ছবি দিয়াছে, বাবাকে ট্যাগ করিয়াছে। লিখিয়াছে দু কলম, ড্যাড, ইউ আর সো কিউট!!

ছবিটি সাদাকালো । দেখিবামাত্র এ কী ভাবান্তর হইল নিতাইবাবুর! এ ছবি টিনা পাইল কোথা হইতে! এ যে আনবিলিভেবল!

মুহূর্তমধ্যে তাঁহার চক্ষে সেন্টিমেন্টের জল আসিল। তাঁহার অশ্রুসজল চক্ষু লইয়া গদ্গদ স্বরে তিনি ডাকিলেন, সুলতা দেখিয়া যাও। মেয়ে ট্যাগ দিএয়ছে।

কী বললে? এ কী অলুক্ষুণে কথা গো? না হয় শ্বশুরঘরেই গ্যছে, তা বলে ত্যাগ দেবে কি?

আহহা ত্যাগ নয় ত্যাগ নয়, ট্যাগ, ট্যাগ। ফেসবুকে। আরে রান্নাঘর থেকে একবার এইদিকে এসো না বাপু।

নিতাইবাবুর চক্ষে রবিবারের সকালটা পাল্টাইয়া গেল। এখনো কন্যার বিবাহের বড় বড় পেমেন্ট বাকি, কন্যা সবেমাত্র শ্বশ্রুগৃহে পদার্পণ করিয়াছে, প্রতিটি লাঞ্চ ও ডিনারে যাহা যাহা খাইতেছে সবের ছবি ফেসবুকে আপলোড করিতেছে, কিন্তু বিবাহের দুইদিনের মধ্যে নিতাইবাবুকে সে এত মিস করিতেছে, ভাবা যায়না।

যে ছবিতে নিতাইবাবুকে ট্যাগ দিয়াছে টিনা, তাহা নিতাইবাবু ও সুলতাদেবীর প্রথম যৌবনের অসামান্য এক স্ন্যাপ, আগফা ক্লিক থ্রি ক্যামেরায় নিতাইবাবুর ভাই মনাই তুলিয়াছিল, বোউভাতের সন্ধ্যায় ফুলসাজে সজ্জিতা ক্ষীণকটি তন্বী সহাস্যবদনা সুলতা আর চুলে গন্ধতেল দেওয়া টেরিকাটা চশমা পরা সদ্যইঞ্জিনিয়ারিং পাশ নিতাইবাবু।

কোথায় পেল বল তো টিনা এ ছবি?

ম্যাক্সি পরিহিতা, তাহার উপর গোলাপি কিচেন এপ্রন আবৃতা সুলতা আসিলেন। সর্বক্ষণ ঘামিতেছেন, কাজের চাপে চিঁড়াচ্যাপ্টা হইবার অভিযোগ করিতেছেন, কিন্তু চেহারাটি তো বাতাবি লেবুর মত নিটোল নধর।

ক্রমাগত ফুলিতেছেন নিতাইগৃহিণী। আপাতত রবিবার সকালের জলখাবার বিবাহের যাবতীয় লেফট ওভার খাদ্য দিয়া হইবে, সেই তদারক করিতেছিলেন । পঞ্চাশটি ফিশফ্রাই, প্রচুর রাধাবল্লভী, এবং রসগোল্লার কয়েক বালতি বাঁচিয়াছিল। চারদিন ধরিয়া খাইয়া-বিলাইয়াও শেষ হয়নাই। ইতিমধ্যে টিনার বৌভাতে গুরুপাক খাইয়া নিতাইবাবু হাত তুলিয়া দিয়াছিলেন। ফ্রুট সল্ট , অ্যান্টাসিড আদি গ্রহণ করিয়া এখন ঠিক আছেন। আবার পরশু অষ্টমঙ্গলায় আসিবে কন্যা-জামাতা, সেই প্রিপারেশন বরাবর চলিতেছে।

এপ্রনে হাত মুছিতে মুছিতে সুলতাদেবী সাগ্রহে বলিলেন, কই , দেখি দেখি? ছবি দেখিয়া মুখ আনন্দে আলোতে ছড়াইয়া পড়িল।

– হ্যাঁ গো, সেদিন বৌভাতে ওদের যে ছবি উঠেছে, সেই অ্যালবামটা ভাল করে দেখেছিলে?

– আমিই তো তোমাকে দেখালাম, বাহ্‌! তোমার কি ফেসবুক আসে? তুমি তো এই ব্যাপারে ক-অক্ষর গো-মাংস!

– আহা তুলি ফোন করে বলল না পরে! ওই অ্যালবাম দেখে তুলতুলি নাকি কমেন্ট লিখেছিল, তোকে হুবহু মাসির মত দেখতে লাগছে। উত্তরে টিনা লিখল, দাঁড়া, মা-বাবার বৌভাতের ছবি স্ক্যান করে পোস্ট করছি, আসার সময়ে মায়েদের কালো কাগজের অ্যালবাম, সেলোফিন পেপারের ডিভাইডার দেওয়া, ন্যাপথালিনের গন্ধেভরা, ঝেঁপে এনেছি।

আলমারি হাঁটকাচ্ছিল একদিন টিনা, বিয়ের কদিন আগে, তখনই বুঝেছি, কিছু খুঁজছে, স্ট্রলিতে গুছিয়ে নিচ্ছে, পুরণো স্মৃতি কিছু। ওইসব নিয়ে যাবে শ্বশুর বারি। আমি ভেবেছি ওর পুরনো বন্ধুদের চিঠি কার্ড এইসব বুঝি।

 

এই সবে শুরু। উহার পর হইতে নিত্য নিত্য আর্দ্র হইয়া উঠিতে লাগিল নিতাইবাবুর চক্ষু। এ এক নতুন জগতের সন্ধান পাইলেন নিতাইবাবু। ছবি এত পারে? একটি সাদা কালো ছবি এইরূপ অধিকার করিয়া লইতে পারে মানুশকে? উহুঁ, বলা ভাল, মধ্যবয়সী মানুষকে। হ্যাঁ, পারে। লাজ নষ্ট হইলে নাম হয় নস্টালজিয়া। জিয়া ধড়কায় , জিয়া নষ্টায়। পুরাকালে ইহাকেই বলিত স্মরণবেদনা, স্মৃতিসুখ।

ফেসবুকে ছবিটা দেখেছ? আহা বড় ভাল লাগল গো ফেসবুকে তোমার ছবিটা দেখে…

ইস্কুলজীবন, কালেজ জীবনের প্রাচীন বন্ধুকুল, যাঁহাদের নিতাইবাবু খুঁজিয়া পাইয়াছেন ফেসবুকের দয়া ও কৃপায়…সকলেই বলিল। ফোন করিয়া বলিল, এস এম এস করিয়া বলিল, এমনকি ফেসবুকেও বলিল, না বলিলেও সমস্বরে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া লাইক দিল। চ্যাংড়া ভ্রাতুষ্পুত্র ভাগিনেয়গণ দেওয়ালে হাতের ছাপ রাখিল, ওই জ্যেঠ্‌, কুল। আজিকালি ভ্রাতুষ্পুত্রগণ জ্যাঠাকে জ্যেঠ্‌ বলে। এই, ওহে, ওগো শুনছ-র বদলে এখন বন্ধু, অনুজ, প্রেমিকা বা স্ত্রীগণ সবাই সবাইকে “ওই!” বলিয়া সমাদর করে।
ভাগিনেয়গণও হুল্লোড় করিল। “যা হয়েছে না মামু, দারুণ, ফাটাফাটি, অসাম, অসা-“ ইত্যাদির বন্যা বহিল। মামু তো রাজভাষাতেও মামু । তাই তাহাই বহাল রহিয়াছে। কারণ ভাগিনেয়গণ বাংলায় ক অক্ষর গোমাংস। হিন্দি ইংরাজি ছাড়া কতা কয়না।

মামুর প্রতি সবিস্তারে হট-কুলাদি সম্ভাষণ প্রয়োগ করিতেও ভাগিনারা পিছাইয়া রহিল না। সকলেই বলিল, বিবাহকালে নিতাইবাবু যা হান্ডু ছিলেন, সেমত হান্ডু এই যুগের দেব বা জিৎও নহে। হান্ডু বলিতে ইহারা হ্যান্ডসাম বুঝাইল, হুঁ হুঁ বাপু তাহা হইবে না বা কেন, ইহারা তো আর সকালে উঠিয়া লেকের পাড়ে দৌড়াইবার বা ডাম্বেল ভাঁজিবার খবর রাখে না। নিতাই দিনেকালে বড়ই স্বাস্থ্যমনস্ক ছিলেন। এখন অবশ্যই কোলেস্টেরলের ভয়ে ওটস সেবন করিয়া দিন কাটে।

নিতাইবাবু কোমরের ব্যথা ভুলিলেন, এক্স এক্স এল সাইজ ভুলিলেন, মাথার ক্রমাপসৃয়মান হেয়ারলাইন ভুলিলেন… ছলাৎছল ক্রমশই তাঁহার প্রাচীন সত্ত্বায় ফিরিতে লাগিলেন। কন্যাকে বলিয়া বলিয়া একের পর এক প্রাচীন চিত্র পোস্ট করাইতে লাগিলেন তাঁহার অ্যাকাউন্টে।

কোথা হইতে কী, একদিন এক শিবপুর-সহপাঠী অরূপ ঝুলি ঝাড়িয়া শেষ মেশ তাক লাগাইয়া দিল। ইহা নিতাইয়ের কালো কাগজের পোকায়-প্রায়-কাটে -কাটে অ্যালবামে ছিল না। বান্ধব অরূপ করিল কি, শিবপুরের হোস্টেলে থাকাকালীন তাহার অতি আদিম ক্যামেরায় উঠানো, এক গ্রুপ ফোটো পোস্ট করিয়া বসিল।

প্রাক বিবাহ যুগের সেই তরুণ তুর্কি মূর্তিগুলিকে দেখিয়া নস্ট্যালজিয়ার ঢেউ আর এক কাঠি বাড়িল। প্রায় বিপদসীমা ছোঁয় ছোঁয় ভাববন্যা। ওই তো রমেন, শঙ্কর, রমেনের পাশে নিতাই, নিতাইয়ের পাশে অরূপ, অরূপের পাশে কে?

কে? কে? কে রে?

সবাই জিজ্ঞাসিয়া আকুল হইয়া উঠিল। সত্যি ওই একমাথা কোঁকড়া চুল, প্রচন্ড ফর্সা, অপরূপ দর্শন যুবাটি কে? খানিক যেন অভিনেতা অজিতেশ আর অভিনেতা অভিষেক বচ্চনের অ্যাভারেজ কষা চেহারা!

প্রশ্নের পালা থামিল আরো কিছু বন্ধুর ইতোমধ্যে ফ্রেন্ডলিস্টে আগমনে। সর্ব মোট দশবারোজন, কেহ বা হনোলুলুতে, কেহ কার্ডিফে, কেহ ক্যালিফোর্নিয়ায়। নিতাই কলিকাতায় , অরূপ ব্যাঙ্গালোরে। কিন্তু শঙ্কর, যাহার স্মৃতিশক্তিতে মরিচা ধরে নাই সেই শঙ্কর, যাহাকে ক্যালিফোর্নিয়া হইতে খুঁজিয়া পাওয়া গিয়াছে সেই শঙ্কর, সোৎসাহে লাফাইয়া আসিল, আমি বলিব, আমি বলিব। এটা তো চার্বাক!

 

চার্বাককে কে আর ভুলিবে? অথচ সকলে ভুলিয়া গিয়াছিল। নানা কারনে সে ছিল সবার সেরা। দারুণ অশ্লীল গল্প বলিত, অসাধারণ নাটক করিতে, লোককে নকল করিতে তাহার জুড়ি ছিল না। একটাই সমস্যা পরবর্তী জীবনে আসিয়াছিল। চার্বাককে সকলের ভুলিয়া যাইবার একটিই কারণ বলা যাইতে পারে।

চার্বাক জীবনে কিছুই হইতে পারিল না। সে না পাইল চাকরি, না করিল ব্যবসা , না গেল বিদেশ। অরূপ নিতাই শঙ্কররা যখন মনোযোগ দিয়া নিজ নিজ কর্মজীবনের ইঁট কাঠ বালি সুড়কি নিয়া ব্যস্ত হইয়া কেরিয়ারের অট্টালিকাটি বানাইতেছিল, সেই সময়েই ধীরে ধীরে স্মৃতির অতলে চলিয়া গেল চার্বাক।
উফ, উহার ঐ দাঁতভাঙা নামটিই বা কে রাখিয়াছিল রে বাবা! সকলেই ভাবিল, বাপ দাদার যারপরনাই অবিমৃশ্যকারিতার ফলেই, উদ্ভট ওই নামকরণের জন্যই, ছেলেটা ডুবিয়া গেল!

এইবার শুরু হইল খোঁজ খোঁজ। একবার মনে পড়িয়া যখন গিয়াছে, চার্বাককে আর ছাড়ান নাই। খুঁজিয়া বাহির করিতেই হইবে। পড়াশুনাতে সে মেধাবী তো ছিলই, স্বভাবটিও তো মধুর ছিল কিনা। না হয় জীবনে কিছু হইতে পারে নাই, গোবেচারার মত কোন কোণায় মুখ লুকাইয়া কাটাইতেছে।

-তোর মনে নেই সেই একবার আমি দিল্লি থেকে ফেরার সময় কালকা মেলে চার্বাককে দেখলাম, আমাকে চেনা দিল না?

-ওরে বাবা সে কদ্দিন আগের কথা রে! তখনো ট্রেনে যাতায়াত করা হত, ফ্লাইট ছাড়া দিল্লি ভাবতেই পারছি না!

– হ্যাঁ , ওটা সেই প্যালিওলিথিক যুগের কথা। তারপর অবশ্য, বছর পনেরো আগেও একবার ওর কথা শুনেছিলাম কার কাছে যেন।

– কী শুনেছিলি?

– দাদুর বাড়িতে আছে, বর্ধমানে। বেশ টাকাপয়সা ছিল তো ওর দাদুর।

– ও বাবা, লাটসাহেব করছেন কী? গ্রামে গ্রামে অ আ ক খ পড়াচ্ছেন নাকি?

– হে হে , থ্রি ইডিওটস দেখিস নি? সেই রনছোড়দাস চাঁচড়ের মত আবিষ্কার করছে নাকি গ্রামগঞ্জে বসে? ইনোভেশন?

– অত কিছু জানি না। তবে ব্যাটাকে খুঁজছি দাঁড়া। আমার শালার শ্বশুরবাড়ির দিকের একটা সোর্স আছে বর্ধমানের দিকে।

বর্ধমান হইতে অবশেষে চার্বাকের খবর পাওয়া গেল। সে বহাল তবিয়তেই আছে, কিন্তু না, কোন উদ্ভাবনী কর্ম করে নাই, এমনকী বিনা পয়সায় ছাত্রও পড়ায় না। মধ্যে কিছুদিন একটি বই লিখিবে ভাবিয়াছিল, কিন্তু না, লেখে নাই।

তাহলে সে করিতেছে টা কী? একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবদান সকলে। শংকর নিতাই প্রমুখরা অত্যন্ত উদবিগ্ন, গদগদ সেন্টি হইয়া পড়িলেন। নিশ্চয় তাহার মনে খুব দুঃখ, এবং পুরাতন বন্ধুদের পাইলে সে নিশ্চয় খুব খুব খুশি হইবে। বলা যায়না, এক পতিত পুরুষকে এই সুযোগে পরিত্রাণও করা যাইতে পারে!

এই ভাবিয়া পরিকল্পনা হইয়া গেল। শঙ্কর দেশে আসে প্রতি শীতকালে। নিজেদের পুরাতন বাড়ির কয়ঘর ভাড়াটেকে জপায় উঠিয়া যাইতে, যাহাতে নিতাইয়ের মত তুখোড় ডেভেলাপার কাম বান্ধবের সহিত জয়েন্ট ভেঞ্চার করিয়া বাড়িটা প্রোমোট করা যায়, কিন্তু পুরাতন ভাড়াটে নামক জীবটি বড় খতরনাক, কিছুতেই দরে পোষাইতেছে না।

এমতাবস্থায় শীতের দ্বিপ্রহরে সব বুকে আয় , বুকে আয়, ফেসবুকে আয় বান্ধবগণ একত্র হইয়া, বর্ধমানমুখী হইলেন।

 

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের উপর দিয়া শাঁ শাঁ করিয়া গাড়ি চলিতেছে, সত্তর দশকের হিন্দি গান আর কাঁচা খিস্তি, বোতলে মোদক পানীয় এবং চানাচুর চিপস সহযোগে, ছয়জন ইঞ্জিনিয়ার, প্রত্যেকের বয়স ৫৫ অতিক্রান্ত, সেন্টিমেন্টে চুর হইয়া আছে, এমত সময়ে নিতাইবাবুর ফোনে আর একটি এস এম এস আসিল।

ইহাও কন্যা টিনার মেসেজ।

বাবা, তোমাকে আউট অফ রিচ বলছে কেন? কোথায় তুমি? আজ কী কান্ড হয়েছে জানো, দেবপ্রতিমের মেজ পিশেমশাইয়ের নাকি একটা ছবি তোমার ফেবু পেজে আছে। ভদ্রলোকের নাম চার্বাক রায়। তোমাদের সঙ্গে বোধ হয় পড়তেন। চেনো? উনি আজ আমাদের বাড়িতে এসেছেন।

চক্ষু বর্তুল করিয়া নিতাই বলিলেন, ইউরেকা! তাহার পর গাড়ি থামানো হইল। টাওয়ার পাওয়া যাইতেছে কিনা দেখিতে সকলেই মোবাইল পকেট হইতে বাহির করিয়া পর্দার উপর ঝুঁকিয়া পড়িল।
তখন সবে সিঙ্গুর পার হইয়া গিয়াছে, একটা ছোট জনপদে মিষ্টির দোকানে থামানোর ফলে মিষ্টির দোকানে বেঞ্চির উপর বসিলেন প্রত্যেকে। হ্যাঁ, টাওয়ার আছে। কন্যাকে ফোন লাগাইলেন নিতাই। অসাম ব্যাপার, মিরাকল! দে দে, চার্বাককে ফোনটা দে।

সকলে ঝুঁকিয়া পড়িলেন নিতাইয়ের দিকে। যাহাতে সকলেই শুনিতে পায়, ফোনটা লাউড স্পিকারে দিলেন নিতাই।

চার্বাককে ফোন দান করা হইল ওই প্রান্তে। হেঁড়ে গলায় কেহ বলিল, হ্যালো।
নিতাই গলা ফাটাইয়া বলিলেন, শোরের বাচ্চা, বান…, হ্যালো বলা হচ্ছে? বলি এ্যাদ্দিন গা ঢাকা দিয়েছিলি কোথায়?

কে , নিতাই? হেঁড়ে গলায় হাসির আভাস শুনা গেল।

তাহার পর , শকার মকার সহকারে নিতাইয়ের উদবাহু ভ্রাতৃপ্রীতির নমুনা এই দিক হইতে বর্ষিত হইল। ওইদিকে চার্বাক বলিলেন, বুঝলাম। তোরা আমার বাড়ি যাচ্ছিলি। তা একটা পোস্ট কাট ছাড়বি তো আগে।

পোস্ট কার্ড! কোন যুগে বাস করিস রে। মোবাইল নম্বর বল।

মোবাইল তো আমার নেই।

ইন্টারনেট?

না, তাও নেই।

তুই কোথাকার ভূত রে! মেশোমশাই তোকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়েছিলেন কেন?

আমি এখন বাবা অমৃতানন্দের আখড়ায় বসি রে।

বাবাজির চেলা হয়েছিস। ছ্যা ছ্যা। বৈজ্ঞানিক চেতনা ফেতনা সব হাওয়া! মাথায় টিকি রেখেছিস নাকি? ও হো হো, তোর এখনকার চেহারাটা, দাঁড়া, টিনাকে দে, ওকে বলি ছবি তুলে আপলোড করে দিতে।
মনই সব, মনই অনেকখানি। তোদের মনে আমি যদি থাকি রে, সেই মনোপটই অনেক। কম্পিউটারের পটে আমাকে রাখতে হবে না, বুঝলি?

তুই একটা অমানুষই থেকে গেলি। একেবারে অকাজের গোঁসাই।

ঠিক রে, ঠিক। একেবারে ঠিক। তোরা সব কত কাজের লোক, কত দাম তোদের সময়ের। আমার ত কাজ টাজ নেই, আমি শুধু সময় কাটাই।

শোন, তোদের ঐ ফেসবুক আর কী কী সব বলিস তোরা, ওসব তো গৃহিণীর পুঁটলি রে, কত কিছু থাকে তাতে, সমুদ্রের ফেনা, শশার বিচি, লেবুর খোসা, চুলের ক্লিপ। আমরা তো ঠিক সংসারী নই রে, আমাদের অতসব রাখা বারণ।

উফফ। কী বোরিং বোরিং কথা বলে এই চার্বাকটা। বেজায় খচিয়া গেলেন সকল বন্ধুতে। ফোন কাটিয়া নিতাই খ্যাঁক খ্যাঁক হাসিলেন। কোথাকার বাবাজির চেলা। হে হে। যাঃ ও ব্যাটার জন্য শুধু শুধু একটা দিন নষ্ট করতে যাচ্ছিলাম। ছাড়।

শঙ্কর মিষ্টির দোকান পরিক্রমা করিয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, একটু গেলেই একটা ভাল পুকুর পাব , বলছে মিষ্টির দোকানের মালিক। চালু পিকনিক স্পট। চ’ ওখানটাতেই বসে পড়ি। হে হে, তোরা ভাবছিলি সমাজ সেবা করবি। উলটে এ ব্যাটাই তোদের জ্ঞান দিয়ে দিল।

বলিয়া চারিদিকে তাকাইয়া দেখিলেন, কেহ শুনিতেছে না।

ততক্ষণে উপস্থিত সকল কৃতী পুরুষই , বহুক্ষণ বাদে টাওয়ার পাইয়া, নিজ নিজ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। বহু কাজের কথা , বহু ব্যবসায়িক লেনদেন, বহু জরুরি বার্তা, বাকি পড়িয়া গিয়াছে। কেহ কাহারও দিকে আর চাহিতেছেন না, থমথম নীরবতায় প্রচুর কাজ হইয়া যাইতেছে। সমুদ্রের ফেনা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *