অব্যয় অনিন্দ্য’র পাঁচটি কবিতা


images (1)লাসভেগাসের প্লেন

জ্যান্ত ক্যাসিনো বুকে লাসভেগাসের যুবতী রাত
মাত্র কয়েক পলক দূরে –
পাইলটের কাঁধে স্মার্ট ঝাঁকুনিতে কথাটা ইউনিফর্ম পরে হাসছিল।

অথচ মেঘের মনিটরে দেখি –
পাঁচ বছরের ছোট্ট আমি কাগজের প্লেনে
পায়রার সাথে পাল্লা দিচ্ছি রায়পুর গ্রামের চাতালে;
পাশে দাদু আমার শৈশব নিয়ে খেলছে দুহাতে,
খেলতে খেলতে সমস্ত শৈশব চলে গেল তার চোখে,
কিছু বোঝার আগেই সেই চোখ বুজে গেল জন্মের মত।

প্লেনটা আর একটু ঝাঁকুনি দিতেই দেখি –
জীয়ন পুকুরের উত্তরমাঠে রাবার ঢিলা হাফ-প্যান্টটাকে
শরমদণ্ডের পোয়াইঞ্চি উপরে টেনে টেনে তুলছি বার বছরের আমি।
একটা পোয়াতি টুনটুনির ডানায় উড়ে যাচ্ছে
আমার কৈশোরের ঘুমহীন দুপুর।
পাশের কুট্টি খালে উদোম নাইতে নেমেছে আমার ছোট্ট প্রেমিকা,
জলে ধুয়ে যাচ্ছে প্রেমিকার শৈশব;
যৌবনে সে কোথায় ডলারের আলোয় চুল শুকাচ্ছে সেটা খুঁজতেই–
মেরিলিন মনরোর মৃত্যুদৃশ্য ভেসে উঠল।

হঠাৎ শুনছি, পাইলট তন্বী বিমানবালাকে বলছে–
ওকে নামিয়েই দাও,
ওর প্লেন কখনও লাসভেগাসে যাবে না।

গন্ধ

পৃথিবীর হামাগুঁড়ি চুঁইয়ে পড়া দোলঘড়ি চেটে চেটে
স্থূল হচ্ছি আমি, স্লিম হচ্ছে আমার শৈশব
সাথে পাল্লা দিয়েই তন্বী হচ্ছে শৈশব কাঁখে হেঁটে চলা তিস্তা —
আহা, ফিগার বিলাসী মডেল–ডায়েট করেই চলছে
নদীর ডায়েটিংও বুঝি মিলন-সংক্রামক
যারা ছুঁয়েছিল, সবারই ঝরছে মেদ –
মাছের দুধ আর ধানের যৌবন ভরা জাহাজ ছেড়েছিল
ফিরে এসেছে মন-মাঝির শীর্ণ বৈঠা

আর একটু তন্বী হলেই তিস্তা ফ্যাশন-টিভিতে যাবে—
কূটনীতির টাইয়ের নট ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে হাঁটবে তিস্তাচুক্তি বরাবর
চুক্তির পাতায় আমার শৈশবের ঘ্রাণে ভাসতে থাকবে ডায়েটিং

ডায়েটিং বুঝি নদী আর ফুলে ভিন্ন
ফুলেদের মধ্যে রজনীগন্ধার ডায়েটই সবচেয়ে কার্যকর
ওর চিকন কোমর অনেকক্ষণ সইতে পারে–গন্ধের ভার

আমি তিস্তা নই, আমি রজনীগন্ধাও নই –
এই স্থূল আমিকে আর বেশীদিন বইতে পারবেনা পৃথিবী
তবে পৃথিবী কথা দিয়েছে —
আমার সূক্ষ্ম গন্ধটাকে বয়ে চলবে সূর্য্য নিভে যাওয়া পর্যন্ত
তাই প্রতিটি রজনীগন্ধার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেখ—
একটা অব্যয় অব্যয় গন্ধ

মাকড়শা

আমার মৎস্যজীবী বাবার ডুলা
প্রতি প্রভাতে মাছের পেছনে ছুটত,
বাবাও ছুটেছেন – ভেল, চাই, বর্শি আরো কী কী নিয়ে
আজীবন – আমার পিছনে।
কিন্তু খাল-বিল-নদী থেকে এক প্রজন্ম দূরত্বকে ছুঁতেই পারেননি।
না পারাটা কষ্ট নয় – অহংকারই হয়েছিল তাঁর।
অহংকারটা বেয়ে বেয়ে
মাছ না ধরে শিখলাম জাল বানাতে।

কিমাশ্চর্য জাল – ছেঁকে, শুকে সব ধরল
শুধু উড়ে গেছে সুখ –
সুখ নাকি প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই একটা পাখি,
পাখিটা জাতিস্মর – ডিএনএতে জাল হ্যাকিং-এর সূত্র নিয়ে ওড়ে
জীবনের খাতায় ‘ইশ’ জাতীয় শব্দ ছুড়ে ছুড়ে।
ও বাবার সাথেই গেছে কিনা –
জগদীশ বোস বা সলিম আলী কেউই টুইট করেনি সে কথা।

পাখিটার ফেরার শর্ত পূরণে
এখন জালটা ছিঁড়তে প্রাণপণ চেষ্টা।
এক প্রজন্ম পেছন থেকে ভেসে আসছে একটা স্বর –
মানুষের মাকড়শা-গুণ নেই,
মাকড়শা নিজের জালে ধরা পড়ে না।

সুখ-দুঃখের দুরত্ব

ঝিকমিক করলেও নিয়ন বাতি দুঃখ-রাতের তারা হয় না—
দূরত্বের যতি ঠোঁটে নিয়েই তারারা সমব্যথী হয়—
ছুঁতে না পারার বেদনা কান্নার পড়শি হয়ে যায়।
দূরত্বের সাথে দুঃখের এই সমানুপাতিক সম্পর্ক নিবু মানেনি।
কাছে আসাতেই নাকি আরো চাওয়ার ফাঁদে
উঠানো-আমি আটপৌরে বেদনা হয়ে গেছি –
নিজেকে অচেনার দূরত্ব বেয়ে নিজেই দুঃখ হয়ে গেছি …

কিন্তু দুঃখ যাদের শিথানে-পৈথানেই আজীবন
তাঁরা দুঃখের সাথে দূরত্বের দূরত্বকে মাপতে পারেনি;
মাপার স্কেলটা চুরি করে কিছু সেমিনারজীবি
তাঁদের নাম দিয়েছে প্রান্তিকজন—
ছোঁয়ার নাগালে থেকেও তাঁরা আকাশের তারাদেরও দূরতম প্রান্তে।
তাঁদের দুঃখ নিয়ে কা-কা করতে করতে
দুঃখ-বিলাসীরা মানবতার ভাগাড়ে পৌঁছলে
কবি নাম পায়।

দুঃখের গল্পে সুখকে না আনলে
সুখ পাণ্ডিত্যকে আড়াল করে ঝুলে থাকে
আহা, সুখ –
আমার ভাদ্দরবউ – তোমার পরস্ত্রী – আর ঈশ্বরের আপেক্ষিকতা।

যুগল অশ্রু

আমার জন্ম খরখরা আঘন মাসে,
জন্ম মুহূর্তে আকাশ, বাতাস কেউ কাঁদেনি–
একাই কেঁদেছি মায়ের মিঠা দুধে শব্দ ঢেলে ঢেলে।
এখন আমার প্রতিটা কান্নার ঘ্রাণ ছুঁয়ে
তারারা ফুঁপিয়ে ওঠে মিটমিট শব্দে;
ওই মুহূর্তে মেঘ দুগ্ধবতী হলে
আকাশও নামতে থাকে দুঃখের প্যারাসুট বেয়ে।

কান্নারও প্রাণ আছে –
কথাটায় এক জোড়া নারী চোখ হাঁটে আমাদের জানালায়,
লাভাকে জল করে বহমান শিল্প হতে – কেবল নারীই পারে
পুরুষের কান্নায় দুঃখ শুধু শব্দ হয়ে পাড় ভাঙ্গে –
অশ্রু পায় না নদীর বহতা মাধুরী

তবে নারী কোকিলটা কথা দিয়েছে –
আমার মৃত্যুর দিনে–পুরুষ সঙ্গীকে নিয়েই কাঁদবে,
যুগল অশ্রুই সুন্দরতম – কথাটা অনুসিদ্ধান্ত হয়ে
ছাইগুলি হাসতে থাকবে ইতিহাসের চিতায় চিতায়।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *