তাপস গায়েনের কবিতা


মম

 

 

সময়বূহ্যে অভিমন্যু [১৩]   

চলে তো যেতেই হবে । সময় সে তো সন্ত্রাস ! কেন যে এসেছিলাম এই পৃথিবীতে তার কোনো কারণ খুঁজে পাই নি ;  এবং চলে যাবার পক্ষেও দেখি নি তেমন কোনো চিন্তা, কিন্তু  অনুভবে জেনেছি চলে যাবার পক্ষের ব্যাপ্তি । গভীর কুয়াশার মাঝে মাতা এবং পিতাশ্রীর মুখাবয়ব জেগে ওঠে, যেভাবে মনের গভীরে উৎকীর্ণ হয়ে থাকে বিষণ্ণ শালিকের ঠোঁট । চলে যে যেতে চাই, তাই মাঝে মাঝে কান্না উঠে আসে, যেন মধ্য সমুদ্রে উত্তাল জলরাশির মধ্যে জাহাজের উম্মাতাল পাটাতন আমি, যেন ঘুমের গভীরে বীভৎস প্রাণির অবয়বে ইবলিশের অস্থিরতায় বিদ্ধ । জানি নি আমার উৎস, শিখি নি যাত্রাপথ, আজও বুঝি নি আমার অভিমুখ ।             

গুঞ্জরিত হয়ে উঠব বলে পানশালায় জড়ো হই, কিন্তু বিয়ারের গ্লাসে উর্ধ্মুখী বুদ্বুদের মতো আমি নই উদ্বাহু;  থেকে গেছি এক নির্জন নানুকঃ স্মৃতির মধ্যে শায়িত রেখেছি তুষার ঝড়, হিমবাহ, আর স্লেজে দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তি । বিচিত্র আকৃতির পাত্রে,  বিভিন্ন বর্ণের পানীয় সজ্জিত হয়ে আছে আমারই সম্মুখে, যেমন পানশালায় মানুষেরা হয়ে থাকে বিবিধ ভূগোলের, বিভিন্ন বর্ণের, আর হরেক রকম গোত্রের ! পৃথিবীতে যে আরও কিছুদিন থেকে যেতে হবে, তার জন্য যথেষ্ট কারণ আমি খুঁজে পাই নি কাতিয়ুশা কিংবা শ্যামা, খাদিজা কিংবা সারাহ-এইসব রূপসীদের কাছে, কিন্তু তাদের শরীর ও হৃদয়ের কাছে আমি আমার আত্মার সমর্পণ জেনেছি ।  এখনও তাদের নামের প্রতি রয়ে গেছে আমার পক্ষপাত !  

আমাকে তো যেতেই হবে ! তাই খুঁজে ফিরছি নির্জন শালিকের ঠোঁটের চেয়েও নির্জন ভূমি ।  অভূতপূর্ব জ্যোৎস্নায় যেদিন  নবগঙ্গার উতরোলের ধ্বনি এসে আছড়ে পড়বে হাডসন নদীর তটরেখায়, সেদিনের উৎসবের রাত হবে এই অমাময়ী নগরী ।  কিন্তু উৎসবের প্রতি আমার তেমন কোনো পক্ষপাত নেই ।  ইউনিয়ন স্কয়ারে দুই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থেকে গান্ধী এবং ওয়াশিংটন বলে যাবেন  বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের কথা ; ব্রাজিলিয়ান সাম্বার তালে নাচ হবে, নেচে যাবে আরব যুবকের সাথে পোলিশ রূপসী, আর মদের প্রবাহে ভেসে যাবে এই নগরী !  ভাসমান শবের মতো সময়ও কী চলমান !

ইঁদুরের পথরেখা ধরে হয়তো পেয়ে যাব নগরীর সবচে নির্জন সড়ক ; জানি, মনে পড়বে না কারও নাম, তবু হয়তো বা ভেসে উঠবে বাংলার শীতের রাত, খেজুরের রসে ভরে উঠবে মাটির হাড়ি ; কিন্তু, জানি আমার সময় হয়নি জড়ো যেভাবে সারারাতব্যাপী মাটির হাড়িতে হয়েছে জড়ো খেজুরের রস আর রসের আবেগ । আর কখনও হবে কী ! 

গলায় ফাঁস নিয়ে কবি যখন শূন্যে ঝুলে থাকে, তখন কী প্রশ্ন এসে হাজির হবে, ‘সময় কি তীরের মতো তীর্যক না কি সর্পের মতো কুন্ডলীকৃত হয়ে থাকা এক অশান্ত রজ্জু ?’

তাপস গায়েন…নিউইয়র্ক…সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৪  

 

সময়বূহ্যে অভিমন্যু [১৭]  

হেমন্তে জন্মগ্রহণ করে আমরা যারা অনুভবে জেনেছি আসন্ন শীতের কাল এবং গ্রাম্য শুড়িখানায় দাঁড়িয়ে দেখেছি নির্জন শশ্মান, বিশীর্ণ নদী, আর পরিত্যক্ত ফসলের মাঠ, বুঝেছি যে আমরা উদ্‌গত সময়ের রশি ধরে অতিক্রম করে যাব এশিয়ার মতো অতিকায় মহাদেশ আর ব্রহ্মপুত্রের মতো অতিদীর্ঘ নদী ; সঙ্গিন অস্ত্রের মতো কর্ম্মোদনার সাথে প্রসূতি মায়ের বিষন্নতা ফেরী করে ফিরব ভিন্ন কোনো মহাদেশে, শুধু রেখে যাব শারদীয় দুর্গা বন্দনা আর বর্ষার জলে নৌকা ভাসানোর স্মৃতি । অনতিক্রম্য থেকে যাবে কান্না আর শিশুর বিভ্রম নিয়ে জেগে ওঠা মায়ার পৃথিবী ।

ভলগা, গঙ্গা, আর তাইগ্রীসে বয়ে যায় জলস্রোত আর উর্ধ্ব-আকাশে উড্ডীন আছে যে ঈগল সে তার লেজার-দৃষ্টি নিয়ে মেপে যায় পৃথিবীর বুকে সকল-প্রবাহ, যেন সময়ের কাছে বিদ্ধ হয়ে আছি আমরা সবাই ।  কান্না অনতিক্রম্য জেনে আমরা গেয়ে যাই গান । দূরসমুদ্র থেকে ভেসে আসা বাতাস পাঠায় চিহ্ন, পাঠায় প্রেমের সংবেদ ।  রাতের গভীরে জেগে ওঠে দরোজায় কড়া নাড়াবার শব্দ ; জানি, আমি তো ফেরারি আসামী নই, তবু নড়ে উঠে প্রত্যয়, জীবনযাপনের স্মৃতি । আজ যে আছে আমার সন্নিকটে, ঘুমঘোরে, সে ই কী বিভিন্ন শরীর নিয়ে ব্যাপ্ত ছিল শিশুতোষকালে ? প্রথম যৌবনে ? শরীরের বন্দনা শিখি নি, তাই শব্দ ছেড়ে যায়, কবিতা সেও তো থেকে যায় অর্ধসমাপ্ত, অপূর্ণ, শেষাবধি, অসমাপ্ত । এই অপূর্ণ শরীর নিয়ে মানবতীর্থে তাই আজো জেগে আছি । উপরে আকাশ, তার নীচে এই পৃথিবী । এই গ্রহে মৃত্যু সে তো জীবনের মতোই ব্যাপ্ত ।

তবু ভাবি, একে অপরের কাছে আমাদের কী বা প্রত্যাশা আছে ? পানশালায় গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের মতো এখন আমাদের  সম্পর্ক অতি ক্ষীয়মাণ কাল ।  তাই দেখে যাই দীর্ঘ নদীপথ আর তার কুলে গড়ে ওঠা সব তীর্থের প্রত্যয় ।  কী ভাবে যে হয়ে উঠি আরও আয়ুষ্মান । নারী, প্রবাসে হেমন্তের উজ্জ্বল রঙ্গিন পাতার মতো যে দীপ্ত সাবলীল, সেও এক তীর্থ, যেখানে ভীড়েছে শিশু, বৃদ্ধ, ও যুবক ।  তাকে কেন যে আমি এড়িয়ে চলেছি বহু দীর্ঘকাল ।

আমি কী শিশু  না  বৃদ্ধ না যুবক । প্রকৃতির সকল প্রবাহের সাথে আমি হয়ে আছি লম্বমান, আমি আমার কাছেই হয়ে উঠি ফু্ল আর দীর্ঘ বল্লমের মতো অনির্দ্দিষ্ট সময় !

তাপস গায়েন…নিউইয়র্ক…সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৪

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *