শিবলি সাদিক-এর কবিতাগুচ্ছ


ssA

ঘাট

চারুলতাদের ঘাটে মাঝে মাঝে বসি, যদিও দেখি নি তাকে
বাড়ির জানালা দিয়ে তার গয়নার মৃদু গন্ধ ভেসে আসে, তার
গান জলে ভাসে, চারুকে না দেখে ভালবাসি তার জলে-ভাসা হাঁস
ভালবাসি রৌদ্রে তার সম্প্রচার, কচুরিপানার ফুলে রক্তসম্প্রপাত তার

কখনো দেখি নি তাকে, তবু রংকাহিনী ফুটছে জলে কলমির নীল ফুলে
জলে ঢেউ, স্বর্ণকুম্ভ সূর্য, তারাদের তাঁত, বাতাসে মৌতাত সব রূপ তার
আমি জানি, চারু জানে, বেঁধেছে আমাকে সবখানে, বাষ্প হচ্ছি গানে
আরো আগে ডালিম কুমার নাকি ঘাটে বসে ক্ষয় হয়ে গেছে কামনার টানে

চারু নাকি দেহ ধুয়ে যায় জলে, ওগো ঢেউ, আমাকে দেখাও তার শিখা
সে জলে নামলে দীপ্র তারার কলস খুলে কি অমর্ত ঝরনাধারা নামে?
সে বচসা করে কি জলের সাথে, যদি দেহ খুলে তুলে নেয় অমল কমল?
আমি জানি চারু হাঁস, ঝর্নার সপক্ষে তার রূপে ডুবে করি সর্বনাশ
তার পর দেখি চারপাশে চারুলতা, জাহাজে আগুন, দমবন্ধ শ্বাসবন্ধ হাঁসফাঁস

আমাকে বসিয়ে ঘাটে, চারু করে খেলা, চারিদিকে মেঘে রূপ তার হেলাফেলা
জল ক্ষুদ্ধ, মাছ দগ্ধ, ফুল অতিরিক্ত গন্ধে আমাকে সতর্ক করে রৌদ্রে সারাবেলা
চারু তুমি অদৃশ্য দরজা খুলে মর্তের সোনার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এস আজ ত্বরা
বাড়ির অন্দরে হাসি রাত্রিকে পাগল করে, অদিতি তোমাকে করবে না ক্ষমা

দ্রষ্টব্য:
ঘাট দেখলেই আমার যাদু ও কবিতাগানের কথা মনে পড়ে।
একদিকে হাজার দুয়ারী মর্ত্যপৃথিবী আর অন্যদিকে জলের জগতে
একটু সামান্য নড়া-চড়ায়, ঢেউয়ের ঘাতে যে কোনো মুহূর্তেই এক
জলকুমারী তার অলীক সৌন্দর্য নিয়ে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে আসবে এমন
এক অতিবাস্তবতার যাদুকরী মাঝখানে ঘাট, দোদুল্যমান সর্বদাই
বাস্তবতার কঠিন পাথর আর জলের মায়ালোকের মধ্যিখানে, তার ফলে
ঘাট নিয়ে কবিতা বা গান লেখা অসম্ভব, চারুলতার প্রেমের সহায়তা ছাড়া।
আর চারুলতাকে নিয়ে কিছু না বলাই ভালো, জল ও স্থলের মাঝখানে
দীর্ঘশ্বাস জমে একদিন পাথর হলে কি চারুলতা সেই পাথরে দাঁড়িয়ে
ভাবত ডালিমকুমারের কথা, যে ঘাটে বসে ক্ষয় হয়ে যায় সুন্দরের গানে?

শ্বাস-প্রশ্বাস

প্রতি নিশ্বাসেই আমি গাছের শ্যামল গন্ধ, মাছের স্বপ্ন টের পাই
আমার নিশ্বাসে আজ গ্রহদের গান, অক্সিজেন, পাতায় পাতায় গান
কি মধুর যে অক্সিজেনের, হাওয়ার স্বাদ, ফুসফুস সূর্যের এনার্জি নিয়ে
আমাকে বানায় ছোট সূর্য, আমি তাই সহজেই আজ গাছ আর মাছ হয়ে
যাই, অনায়াসে আলো দেই, সব পাত্রে ঢুকে যাই পাখা নিয়ে আলো নিয়ে

এনার্জি ম্যাটার ম্যাটার – এরা আমাকে বানিয়েছ, কার মত করে?
আগে মনে হতো নিজেকে জিরাফ, যার গ্রীবা উর্ধ্ব আসমানে আর
পা মাটিতে শিলায় প্রোথিত, ঢুকে যেত দেহে মেঘ, মরালের স্রোত
এফোঁড় ওফোঁড় করে বের হয়ে গেলে কষ্ট হত, ফাঁপা বোধ হতো
আজ সব ধারণ করতে পারি, দুর্গার মতন দশবাহু দিয়ে সব যত্নে
ধরে রাখি, কিছুই ফেলি না, গ্রহদের গান, মেঘঋতু, হাসি, প্রজাপতি, রংধনু

তাই আজ টের পাই, আগে পেতাম না, কি করে এই বিশ্ব এক সাথে
শ্বাস নেয়, পাতায় পাতায় অক্সিজেন, মাছে মাছে অক্সিজেন আর গান
একটা গাছের মধ্যে মাছের নিশ্বাস তাই ফল হয়ে, রাঙা স্বপ্ন হয়ে ঝুলে
থাকে, আর মাছ তো গাছের বিভেদ মাত্র, বুদবুদে সবুজ স্বপ্নকে পাঠায়
আর রাতে সব পাতা জ্বলজ্বল করে তারার আলোতে, গাছ সাঁতরায়

আজ জানি আমিই রাধা, আমিই কৃষ্ণ, যুগ্মসূর্য, চাঁদসূর্য একদেহে শ্বাস নেই
আহা নিশ্বাসে সৌরভ এত, বিশ্বের সৌরভ, সবুজ সবুজ অক্সিজেন, এত গান

**

এই মাত্র যে নদীর পাড় হতে ঘুরে এলাম, যা দেখলাম তাকে উন্মাদ ভিশন
বলা যায়, দেখলাম চিত্রা নদীজলে এক তীর ছোঁড়া হলো, কী ভীষণ রূপময়
এই তীর, আর কি ভীষণ তেজ, আসমানের সবটা তেজ, রেতশক্তি
হানল আঘাত, আর জল সব তেজ শুষে নিয়ে দান করল মাছকে
উঠে এল সে লোভ ও বিষ্ময় নিয়ে খটখটে ডাংগায়, তাই সে দ্রুতই তার
স্বপ্ন পেতে দিল, আর নিল ঘন ঘন শ্বাস, আর সেই স্বপ্ন একদিন গাছ হয়ে গেল
আর মাছ দিব্য লীলাময় বিবর্তনে মানুষের জন্ম দিল, তাই আমি দেহে মাছ
স্বপ্নে গাছ

শহরে কবিরা যুদ্ধে নেমেছে

আবহমান যুদ্ধ
খণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। কেউ একটা ল্যাম্পপোষ্টকে অস্ত্র হিসাবে
ব্যবহার করছে। কবিদের যুদ্ধ। কেউ একজন একটা গাড়িকে
ব্যবহার করছে বাঙ্কার হিসেবে, যার মধ্য হতে সহস্র গোলাপ
বের হয়ে অস্ত্রকে নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে। একটা বাজারে আগুন লাগল
কিছু আগে, বিলবোর্ড বিজ্ঞাপন পুড়ে যাচ্ছে আর পণ্যের প্যাকেট
হতে মানবিক প্রতিশ্রুতি দাউ দাউ করে জ্বলে শহরকে আলোকিত
করছে, একটা কর্পোরেট মোড়ল কবিতা পড়ছে ষ্টকের দাম ভুলে।
আসলে যুদ্ধটা চলছে কিছুটা চুপচাপ আর আকারে ইংগিতে –
বেবিলনের প্রখ্যাত নটী আমাকে বলল কিছু আগে, সম্রাটকে
ঘোড়া বানিয়ে চড়ত, আর এক ছদ্মবেশী এনার্কিষ্ট প্লেটোর বিরুদ্ধে
তর্ক করেছিল রিপাবলিকের পাতায় রাষ্ট্রের সমস্যা নিয়ে।
আর এ-পাড়া ও-পাড়ায় যে মাঝে মাঝে দাঙ্গা হয় ঘুড়ি নিয়ে
আর শহরে রঙের বন্যা ছোটে, শিশুরা ঘুড়ির পিছে ছুটে যায়,
তার মানে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার মৃত্যু নাই, পতাকা উড়ছে।

শেষ যুদ্ধ
শহরকে নিয়ে কবিতা লেখা যায় না। ভিড় ধোঁয়া ধূলাবালি চিৎকার
গাড়ির হর্ণের আওয়াজে মানুষেরা খোঁজে সুবর্ণ হরিণকে, অলৌকিক
ময়ূরকে তারা চায় কাজে, বাসে, ট্রেনে। দোকানের ট্রায়াল রুম হতে
পোষাক পরে বের হয়ে আসে তন্বী, তাকে দেখে মনে হবে সাবানের
বিজ্ঞাপনে কাল সমুদ্রপাড়ের সুখ খোঁজ করবে, বিকিনি খুলে উঠে-আসা এই
আফ্রোদিতি। এমন কি সামান্য একজন কেরানি স্বপ্নে নয়, জানালায় ঝুলতে
দেখে রৌদ্রে অজস্র সোনালি চিল। অর্থাৎ শহর ও সভ্যতা মেকি, টিকবে না।
গুহাচিত্র হতে বের হয়ে তাই মানুষেরা লড়াইয়ের মধ্যেই আছে। সারাক্ষণ
নিজের স্বভাব আর নিসর্গের বিরুদ্ধে লড়ছে। একটা আয়নার মধ্যে আমি
বাইসনের পিছনে ছুটে যাই দেখি, অথচ আমার সাক্ষ্য দেয়ার একান্ত ইচ্ছা।
ছুটন্ত লরীর পিছে যায় ছোটে এখনও এক আদিম শিকারি, কিন্তু এবার করবে
বধ যাকে, সে নিজের ইতিহাস – তালপত্রে, ভূর্জপত্রে, ইলেকট্রনিক ডিজিটে
লেখা, যন্ত্রের সাথে ইন্দ্রিয়ের, ভাবনার সাথের দেহের লড়াইতে নেমেছে
এক সবুজ মানবী, একদিন ঝর্নাজলে স্নান করবে মানব, শুদ্ধতম শুভ নগ্ন।

ল্যুডিটের উচ্চারণ
আকাশ আমার দেহ – এক চোখ সূর্য আর অন্য চোখ চাঁদ
যদিও শহরে থাকি, প্রায়শই মেঘ হয়ে উড়ি, ঘুড়ি হয়ে উড়ি
প্রায়শই চোরাগুপ্তা হামলা করি, লুট করে যন্ত্র ভেঙ্গে ফেলি
আমি নিউ ল্যুডিট, জাপাতিস্তা, আমাজন অরণ্যের মন্ত্র পড়ি
নর্তক শিবের জটাজাল, আমি বয়ে যাই নদী হয়ে আর
পাড়ার মেয়েরা সে নদীতে নেমে পড়ে, তারা সব বুঝে খুব
ঢেউ লেগে তাদের দেহের গুপ্তচিত্র খুলে যায়, দেহ খুলে আরো
কত কত রত্নঢেউ বের হয়ে আসে, সেই আদিম লাবণ্যে স্নান
সারি, এর ফলে বোঝা দায় কে আধার আর কে আধেয়, কে কার
মধ্যে রং আর রঙ্গ খুঁজে আর রতি করে কোন কৃষ্ণ কোন রাধা
তাই আমি উভলিঙ্গ আদিযোনি, পাহাড় ও ঝরনা, চিতা ও হরিণ
শহরের সঙ্গে সারাক্ষণ যুদ্ধে যাই, সব টাওয়ার হতে ঘড়ি খুলে
সেখানে ঝুলাই চাঁদ ও সূর্যকে, যারা আমার দুচোখ, আমি মহাকাল

বৃক্ষসমাজের গান
গুহাচিত্র হতে বের হয়ে সম্রাটের অহম-উপনিবেশে মানুষ ঢুকে পড়ে
জন্ম-দোষ তার কাটল না, ফলে সভ্যতার গতি মানুষ ও নদীর বিরুদ্ধে
স্তম্ভিত অয়দিপাউস, দাস, মিশরের বেশ্যা, মেঘ ও বাতাস, অরণ্যের জীব
যুদ্ধ চারপাশে দেখি, সূর্যস্তম্ভ বানাতে দারুন অপচয়, ফারাওদের ইগো কাকে
চায়, পিরামিড-সিঁড়ি বেয়ে কোন স্বর্গে অমরতা খোঁজে প্যারানয়েড সম্রাট
স্কাই-স্ক্রেপার কি মেঘ ফুঁড়ে-ওঠা লিঙ্গ নয় দাঁতাল পশুর, অসুস্থ, অসুখের?
তবু এই শহরেও প্রেম আসে, তখন একটা নির্বোধ গাড়ির দুই পাশে ডানা
গজায়, সে শহরে ছেড়ে উড়ে যায় ইকারুসের আকাশের দিকে গনগনে
দীপ্তি নিয়ে, একটা বিকল দমকল আগুন ছড়াতে ছুটে যায় কৃষ্ণচূড়ার লালে
হরপ্পার সব কান্তি লোহা যুদ্ধ অস্ত্রে আর অপচয়ে শেষ হয়ে গেল, কোনো কাজে
লাগল না, আর আমি প্রেম নয়, সেই নারীকে খুঁজছি, যার নাভি পুঁতে দিলে আজ
একটা বৃক্ষসমাজের জন্ম হতে পারে, ট্রাইবকে পাব ফিরে, যারা শুধুই নাচবে –
রংধনুর মতন উত্তাল ও বাঁকা দেহে, দু’পায়ে আগুনের মাতাল নুপুর, সৌরনাচে
সর্বভূতে পূর্বাপর সবাই নাচছে

বাসনাকে দোষ দেই নাই
মানুষের বাসনাকে দোষ দেই নাই কোনো দিন মহান বুদ্ধের মত
যদি তাই হবে, তাহলে শিশুর হাতে প্রজাপতি দিতই না বারবার ধরা
অন্ধকারে লিঙ্গ-কর্তনের ভয়ে সারা রাত বুনে যে তারার তাঁত,
তাতো বাসনাই, তাকে চৈত্রের মহান ডানঅলা ঘোড়া ভেবে আমি চড়ি
শহরের দেয়ালে দেয়ালে আমিই আঁকছি মাছের রঙিন চিত্রকল্পগুলি
তাতে দেখ একটা গাছের সাথে সূর্যমানবীর প্রেম জ্যোতি হয়ে জ্বলে
ফ্রয়েড, লাকান আর সব পুরোহিতরাও জেনো বাসনাকে দোষ দিয়ে
করে গেছে বহু ক্ষতি, দেখ এক খেলনা ঘোড়ার পিঠে চড়ে শিশু কত দিকে
যায়, সব সূর্য পাখি কলরব করে তাকে ডাকে, ধুলার ভিতরে নেমে বন্ধু
খোঁজে তার হাত কত, তাকে আমি প্রেম বলি, অজ্ঞান অপরাহত মনোবীজ
তাকে ব্যাপ্ত করি চারিদিকে, বুনে দিতে চাই জলেস্থলে সর্বদেহে সর্বসাজে
সেই প্রেম সব বাঁধ খুলে না দেয়, সে ভয়ে অর্থশাস্ত্র লিখে কৌটিল্যের সংযম
মিথুনের এত বড় দেবতাকে বাদ দিয়ে মন্দিরে ও মসজিদে প্রোপাগাণ্ডা হয়
আমি জানি পুঁজিচক্রে বাসনাই ঘোরে, তব তা শিং-পরা এক দানবের, নয়
তা মানবশিশুর, শহরের দেয়াল দেয়ালে প্লাস চিহ্ন এঁকে আমি দুই পাশে
আঁকি সূর্য আর চাঁদ, যেন দেহ আর মন ফের ফিরে পায় সিংহের রতি

তামাশার জবাব
কে কার সাথে তামাশা করে, আমাকে বলল উড়ে যাও, শুধু উড়ে যাও
কিন্তু হায়, আমার দুহাত কেড়ে নিয়ে তারা যন্ত্র ও বন্দুক বানিয়ে দিল
আমার দু’খানি পা-ই পাহাড়ের দিক হতে সরে গেল, নর্তকের শিবছন্দ নাই
আমি চাই নাই সেই রাজহাঁস আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি যা পণ্যের শুধু ছলকলা মাত্র
বস্তুকে চেয়েছি এক সমগ্রতার ভিতরে, দেহের অন্তিম স্বাদ বর্ণময়তায়
বিষণ্ন দাসের মত চাইনি ক্রুশের কাঠ হোক নৈতিক জয়ের চিহ্ন আর
ডানাঅলা ঘোড়াগুলি নিয়ে যাবে কেউ কেউ তাদের প্রাসাদে রংমহলে ও
খুলে নিয়ে ডানা বলে যাবে উড়ে যাও কারখানা হতে কারখানার চিমনিতে
তবু জেনো একটা ঘোড়াকে আমি লুকিয়ে রেখেচি আমার ত্বকের নিচে
সে-ই অদিতি বরাহদেবতা নচিকেতা বল্লমবাহিতা গুহাচিত্রের ধানুকী
বার বার তার পাখা সর্বব্যাপী এক রসায়নে সমাজের সব ফাটলে দেয়ালে
জ্বলে ওঠে সূর্যনাচে সূর্যস্নানে, তার মৃত্যু নাই, তার পিঠে আমি প্রতিরাতে
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যাই, সূর্যের অসীম গর্ভে জাত আমি অপরাহত জানি

বাস্তবতা

(বাস্তবতার চেয়ে রহস্যময় হরিণ-চিতার যুগ্মরূপ ও ব্যাখাবিহীন
অন্য কিছু নয়, স্বপ্ন তার শিশু, যে হাঁটিহাঁটি-পা করে চলছে
শিশুকন্যার মুখের দিকে তাকালেই আমি স্বপ্ন নয়, পরম সত্যকে
দেখে স্তব্ধ স্মিত বাকহারা হয়ে দেখি জগতের সব ঘটনা ও স্থান
সংকুচিত হয়ে পরমার আনন্দিত আননে, কি পরম সুন্দর তার মুখশ্রী
কিন্তু একে সামান্য আয়ত্ত করা বোধ বুদ্ধি চেতনা ইন্দ্রিয়ের সাধ্য নয়)

কল্পনা নামের সেই শ্রীমতীর কাছে কত কবি গেছে আরো আগে
লাইনে অনেক পিছে আমি ভিক্ষাপাত্র হাতে অপেক্ষায় আছি, কবে
ডাক পড়ে, তাই অবসরে আমি একটা পাথর হতে ঝর্ণা মুক্ত করে দেই

সে আমাকে বয়ে নিক ত্বরা পৃথিবীর গন্ধ-ঝরা সব বীথির ছায়ার নিচ দিয়ে
কাশ আর শষ্পে ঝরে-পড়া এক শাদা মৃত্যুর মোমবাতির দহনে দহনে
রামধনু-রং জানালায় স্তব্ধ-হয়ে-থাকা নক্ষত্রের চোখের ভিতরে দিয়ে
একটা বৃক্ষের মধ্যে জন্ম-মৃত্যুর নৌকায় হাসি-খুশি দোল দিয়ে
শিশুদের হাতে ক্রিষ্টমাসের রং-পেন্সিল চকলেটের প্যাকেট রেখে
অন্ধকার পাবে এক নর্তকীর নাচের বিশুদ্ধ বিবসন সারাৎসারে
সেবাদাসীর নাচের শব্দে জেগে-ওঠা দেবতার ক্ষুদ্ধ কামের ভিতরে
চঞ্চল ফ্রকের ছায়ায়, বালকের অভিমান-ক্ষুদ্ধ নির্জনতার বেদনায়
ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের খাঁ খাঁ পোড়োবাড়ির ঘুঘুর ডাকের প্রাচীন অলসতায়
চলেছে কলস-কাঁখে বধু, অস্তরাগ ঢুকেছে মনসার সাপ হয়ে সেই জলে
স্কুল-পালানো ছাত্রের ছুটে-চলায়, সুতাকাটা ঘুড়ির পিছনে ছোটা উল্লাসে

নিয়ে যাক সেই স্তব্ধতায় যেখানে সমুদ্র ও পাহাড় নিভেছে নিমেষে
বেহালার সুরে অকস্মাৎ সাতরঙের সাত পাখির জ্বলে-পুড়ে যাওয়ায়
সুন্দরী কাঠের টুকরায় আগুনের চিত্রকল্পে, নিহিতার্থে, সম্ভাবনাছন্দে
মৃত্যুর নৌকায় জ্যোৎস্নায় ভাবুকের মুগ্ধতায় স্তব্ধতায় অলৌকিক শ্বাসে
অনন্ত বৃষ্টির নিচে দুই হাতে বৃক্ষেরা গান করে – এমন আবিষ্কারে স্বাদে
পাখির গানে গাছে গাছে জ্বলে-ওঠা বাতি আর রৌদ্রে জ্বলে-ওঠা অন্ধকারে
জেলখানার দেওয়াল ভেদ করে হরিণের আসা-যাওয়া দেখে হাহাকারে
হাওয়ার ধাক্কায় একটা বাড়ির গায়ে ক্রমে ক্রমে জ্বলে-ওঠা ডানার আগুনে
উন্মাদশালার দরজা-জানালা দিয়ে সব ইচ্ছামৃত্যুর রমণীয় উড়ে-যাওয়ায়

জলরং
(জল সবচেয়ে রহস্যময়, সুন্দর, সব রংই তো শেষে জলে মেশে
রাতে সমস্ত নৌকার ছই হতে কত তারার গুঞ্জন জলে ঝরে পড়ে
আর সব যাত্রী – গাছ, শস্য, সব ঋতু দাহ হয়, জলে মিশে, শেষ চিতা)

জল হতে সব সময় পরীরা উড়ে যায়, আলো উড়ে যায়
দিনে রাতে কলমীফুলের নীল রং ডানা উড়ে যায়
এত দিন ভাবতাম এ যে আয়না কেবল, যার মধ্যে কবি আর দ্রষ্টা
নিজ মুখ দেখে রূপে দগ্ধ হয়ে, স্তব্ধ হয়ে মরে যায়
আজ জানি জলের নিজস্ব ভাষা আছে, ভোমরারা তার গান শোনে
দুঃখবাদীরা অবশ্য দেখে জলে অর্ফিয়ূসের কর্তিত মাথা, তার দুঃখগান
আমি দেখি জলে ভাসে তার নিজস্ব কমলা লাল নীল গান আর পাখা

মরমিয়া যারা, তারা বলেন, জলের চোখ আছে, সবাইকে দেখে
একটা নদীর কিনারে প্রায়ই আমি বেড়াতে যেতাম বিকালের দিকে
তখন জলের মধ্যে পাখিদের নম্র আলো, আর দু’ধারে গাছের শাখা হতে
সব আলো লাল নীল ঘুড়ি হয়ে উড়ে যাচ্ছে, শিশুদের জগতের ভাষা সবখানে
মাঠে চাষি রক্ত ধান সব সূর্যের রক্ত হয়ে আছে যেন জন্মনদীর কিনারে

নদীর কিনার তাই আশ্চর্য প্রপঞ্চ, তীরে ইতিহাস, নীচে পরমা প্রকৃতি
মাঝে আমি ভাষাজীবি সব ভাষা হারিয়ে অবাক স্তব্ধতায় মুগ্ধ চোখে,
আমি দেখতাম ধীরে ধীরে আলো নিভে ছায়া আসছে নেমে আর এক
নৌকা ভেসে আসে কোন খান হতে, যার গায়ে মা দুর্গার চোখ আঁকা
মনে হতো এই নদী জল মা দুর্গার অপরূপ নয়নের সুখ হয়ে বয়ে যাচ্ছে

আর সকালেই ফের আলোর পরীর খেলা দেখতাম পুকুরের ঘাটে বসে
আম জাম ইত্যাদি গাছেরা পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখত আমার মতই, আর শেষে
না থাকতে পেরে আমি যোগ দিয়ে ফেলতাম এ খেলায়, কারণ আমার
হাজার পাখির গান জানা আছে, গাছের পাতার সম্পন্ন ধ্বনির রং জানা আছে
শিমুল ফুলের রং হয়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে সারা দিন চুপচাপ ভাসতাম
আর শোনতাম জলের নিজস্ব ভাষা- গানে রঙে নিরবতায়, চুপচাপ সারা দিন

**

লুপ্তকথা, গুপ্তকথা, ট্যাংরা মাছে কানাকানি, বিল দেখেছি, ফুল দেখেছি
দেখেও যে সব কিছুই দেখি নি, ঢেউয়ের উপর-নিচে কার ছবিটি, দেখেও
যেন চোখ খুলি নি, ছিল বুঝি নিচেতে পান-সুপারির বাটাখানি বৃদ্ধ মাসির
নাতবৌ যে পদ্মবধূ, ঠোঁটে তাহার রঙ ধরেছ, অধিক হতো পেলে মধুর
পানের বাটাখানি, দুঃখ ছিল দুঃখ আছে, কিছু নিল বাটা মাছে,
কিছু এখন ডুবছে বিলে

জল দেখি নি, ফুল দেখি নি, তিন রমণীর টানাটানি, এক কানেতে হুসহাস
ডাহুক ডাকে, অন্য কানে দিব্য আলো বাতি জ্বালে, শব্দ আর আলো মুছে
অন্য নারী পদ্ম মাঝে মুখ ঢাকে, তিন ভাতারি, রংমাতারি, করছে রে
খুব টানাটানি

শিশুদের সাথে

চল হে শিশুরা, বালকের দল, তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ি শীঘ্র
শিকার করব খুব আমরা রংধনুর দিকে মেঘে মেঘে তীর ছুঁড়ে দিয়ে
আমরা তো যাই না আর স্কুলে, কারো চোখ রাঙানির ধার ধারি না তো
বনে বনে হরিণের সাথে ছুটে বেড়াই, ফুলের স্কুলে আড্ডা জমাই
গাছের তলায় সুর্যফুল কুড়িয়ে বেড়াই, রোদের ডানায় উড়ে বেড়াই
আমাদের টাকা লাগে না কিনতে জমিদারের ভিটেমাটি আনন্দকুসুম
সকাল হতেই নেমে পড়ি কত্ত কাজের বোঝা মাটে-ঘাটে চড়ুইবাতি
গাছ হতে লাফিয়ে পড়ি ঘোড়ার পিঠে, সূর্যের পিঠে ইচ্ছা-খুশির হাওয়ায়
মেতে উঠি, গাছের নৌকায় সাত-মুলুকে ঘুরে এসে পাতার নিচে দুর্গ গড়ি

চল মন বেরিয়ে পড়ি সংসারের কাজের গাড়ি যাক চলে যাক
আমারা যাবই যাব ফুলের চাকায় রঙের নেশায় সাতশ গাছের দিকে
আমাদের দেহেই তো আছে কত বাগান বাড়ি, নেশার মত মস্ত গাড়ি
দেহ খুলে আপেল গড়ি, গড়িয়ে দিলে যায় যে সুদূর মামার বাড়ি
দিন চলে যায় দেহ হতে দেহে ঘোরে মত্ত নেশায় করে কাড়াকাড়ি
দিন শেষে তো আলোর পক্ষী হতে লাফিয়ে নামি আমরা চাঁদের ঘড়ি

সমগ্রের রং সবই আছে, দেহেই আছে, খুঁজছি না তো দূর সুদূরে তালপুকুরে
জলের মাঝে ডুবছি না তো, সাঁতাড় দিলাম সব রোদে আর কারুকাজে
নিজের মাঝে জেগে দেখি সাতশ ভুবন জেগে আছে সাতটা পাখির নাচে

নদী

নদী দিয়ে কি বয়ে যায় – এর উত্তরে মডার্ন পোয়েটরা
বলবেন চিতাবাঘ আর হরিণের রক্তমাখা চিত্র, কোট করবেন
জীবানান্দ দাসকে, মাল্যবান পাহাড়ের নদী চিত্রকল্প হতে পারে,
দুঃখগানের সমস্ত সুর তাদের নখদর্পণে (যদি ও গান লেখে না)।
জয়ন্তী নদীর ধারে নাকি একটা পাগল ফল হাতে নিয়ে বলেছিল
‘উঠেছ প্রকাশি’। অর্থাৎ এ নিয়ে আমরা অনেক দিন ধরে ভেবে
কোনো কূল কিনারা পাচ্ছি না। কারণ ভাষায় উপযুক্ত শব্দ নাই,
আর চিত্রকল্পগুলো অভিধানে ঢুকে গেছে বিনীত নদীর মত।
পাড়ার নতুন মেয়ে মন্দাকিনী, তাকে বলতেই সে বলল, এক কাজ
কর, আমাকে একটা সোনার কলস দাও, আমি গোধূলির আগে
জলে স্নান করব, তারপর কলস ভরে আনব জল। সে রাতেই আমি
মন্দাকিনীর কিনারে শুয়ে শুনেছিলাম অনেক কলতান। কিন্তু অর্থ
বুঝি নাই। এর পর অবশ্য প্রশ্নটা সোজা হয়ে গেছে। নদী নিয়ে খুব
ভাবনা মতিভ্রমের আগে হয়, তখন নৌকায় চড়ে শব যায় উত্তর কালে –
আধুনিক কাব্য পড়ে এই মতামত। এ ব্যাপারে নদীর উত্তরের
অপেক্ষায় আছি। ঠিকানা – কাকতাড়ুয়া, যে কোনো নদীর কিনারে।

**

নদী নিয়ে লেখা খুব অসম্ভব, বলে মাছরাঙ্গা – প্রিয় পাখি
নদী দিয়ে বয়ে যায় কত কী, হরিণের মুখশ্রী, দূরের বনের ফুল
আরো দূর দেশ হতে ভেসে-আসা নারীর দেহের রূপ, হৃদয়ের লিপি
কিন্তু এসবই তো আমার ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা, দেহের অনুবাদ, স্বাদ
‘জলের নিহিত গান’ – এতো অধিবিদ্যা, লিখে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে ভাবি
তাহলে কি কোনো কালে ছিল দেহ দিয়ে জানার উপায়? তাই অভিধানে
নদী, নারী জল, নৌ-অভিজ্ঞতা, দেহ-নৌকায় অনন্ত ভাবসমাধি – এসব
লেখা হত, কবিতার অভিধান ভরে গেছে কত চিত্রকল্পে, খোদ নদী নেই
চিত্রা নদীর জলে তাই ডুবে যাই, অজ্ঞাতের স্রোতে কিছু দূর ভেসে যাই
দেহ দিয়ে বুঝে নিতে চাই, স্রোতের আনন্দে কত দেহ কুলকুল রবে বয়

প্রিয় কবি জয় গোস্বামীর ছুরি-চিকিৎসা

আমারও একবার মৃত্যু হয়েছিল, তখন জয়গোস্বামীর কবিতা পড়ছে ঢাকার কবিরা
কেউ কেউ আরো আগে পরীদের খুব লাশ দেখে সরোবরে গিয়ে, মোমসমুদ্রের
চিত্রকল্পে তারা লেজ নিয়ে ঢুকে পড়ে, শামুকের খোলে ঢুকে রূপান্তরিত তারা, তার
কিছু পরে আমি মরে গেলাম প্রেমের ঘাটে, আহা সেই ঘাটে কত শব আর মরা নিয়ে
তারপর কত রাত কাটিয়েছি আলেয়ার হ্রদে, তখন তো ভূতেরাই জলজ্যান্ত মানুষকে
ধরে খায়, আমি কোন ছাড়! তখন প্রেমের দেবী ঘন ঘন তার আঙ্গুল আমার চোখে
বিদ্ধ করে কি যে অন্ধকার দেখাতেন, তাকে বোদলেয়ারীয় বা জীবনান্দীয় যাবে না
বলা, কারণ সুন্দরী কাঠের চিতার রূপ বাইরে নিরীক্ষা করা নয়, কবি চেলাকাঠ হয়ে
আগুনের খাদ্য হয়ে মগজ-ঘিলুর মধ্যে টগবগ করে ফুটতে-থাকার ছন্দ গন্ধ স্বাদ নেন
আমিও লিখেছি বাইসন শিকারকাহিনী, আর শিকারের শেষে ঘুমিয়েছি নিজেই শিকার
হয়ে, নিজ গুহায় গুটিয়ে শুয়ে দেখেছি আকাশ-প্রাচীরে বাইসনটি উঠছে জ্বলে, যাকে
শিকার করেছি নিজ মৃত্যু দিয়ে, আহা এইসব বাইসনে অনেক চড়েছি আমি সেই কালে

এক দশকের পর বাইসন রৌদ্রে এসে মরে যায়, আর আমার কবিতা মরে যায়
বাংলা কবিতার ভালমন্দ খাবার দাবার দরকার, না হলে জয়ের পর আর কবিতা
হচ্ছে না খুব লেখা, তবু অনুকরণের আলো নিয়ে যারা অমরত্বের স্বপ্ন দেখে
তারা সেরে উঠে আর লিখছেন না, যৌবন তাদের মৃত ঘোষনা করছে, চিকিৎসা
করে লাভ নেই, এমন কি ছুরিচিকিৎসায় হচ্ছে না কোনো কাজ, বাংলা কবিতার
সম্পাদনা ভাল, মাছের খাবার ভাল, সামুদ্রিক মফস্বলে গিয়ে থাকা ভাল, আহা
কবিতার স্বাস্থ্য ভাল হোক, তাকে রৌদ্রে রাখ, ঘন ঘন জল তেষ্টা হোক তার
নির্মলা নামের সব মেয়েকে সে ভালবাসুক, রাতে কখনো বাঘ-মানুষ হয়ে
চলে যাক বনে, তার চিকিৎসা হচ্ছে, হোক, চিতার দেখিয়ো না ভয় তাকে

তবু চিকিৎসা হচ্ছে, তাবৎ নোংরা জল গরম হচ্ছে, তাপে তাপে ফুটছে খুব
চিকিৎসা হোক, চিকিৎসা হোক, হচ্ছে তো, গরম হচ্ছে খুব গঙ্গাজল
আর দ্যাখ দ্যাখ বের হয়ে আসছে তাপে তাপে, ধড় নাই, ঠ্যাং নাই, এক হৃৎপিণ্ড
রক্তমেঘ, রক্তডানা, জন্মেই লিখছে, শুরু কর – ছুরিচিকিৎসা ফের শুরু হোক

পাখি

গান এক অলৌকিক মায়াজাল, এর মধ্যে ঢুকে গেলে আর নাকি
বেরোবার পথ খুঁজে পাওয়া যায় না, গাছে গাছে জানালায় কত পাখি
বসে থাকে, তারা এক সুর হতে অন্য সুরে যাবে নিয়ে, কত দিন-রাতে তুমি
কানা হয়ে ঘুরবে বস্তুর রূপে, ঝম ঝম করে কত বৃষ্টি হবে বোধে অন্ধকারে
আয়নার মধ্যে সুরে তুমি ঘুরে বেড়াবে, বেহালা বেজে যাবে, আগে কোথা ছিল
এত রূপ শচী মাতা, বালিঘরে, রাঙা পাতাদের নিচে মেঘ-নম্র কারকাজ সব
দেখে যাবে কত কত রং-যাদুঘরে যেখানে অমর হয়ে গান করে এক পাখি
সেই পাখি তোমাকে সহজে ছেড়ে দিবে না, গানের এক সুর হতে অন্য সুরে
সে উড়বে আর তুমি তার পিছে ছুটতে ছুটতে পার হয়ে যাবে আনন্দ-দুপুর
মধ্যরাত্রি, ঝমঝম কত ট্রেন গাড়ি, নিশ্চিন্তপুরের অপু দুর্গা, পুরনো ছবিতে
ফুটতে-থাকা কানন বালা, কমলাবাগানে সুখ-দুঃখ, জানালায় বসা রৌদ্রচিল
একটা গাছের রৌদ্র-ছায়ায় জীবনের সমস্ত দুপুর, তবু তুমি সুর হতে সুরে ঘুরে
এর পর ঠিক যাবে নাচতে নাচতে প্রজাপতির পিছনে, হাত-ফসকে ছুটবে যেই
এবার নামছ তুমি হামাগুড়ি দিয়ে অন্ধকারে, একটা পাতাল ছায়ায় নামছ তুমি
কোথায় লুকাল গান, কাঁদছ এবার তুমি, হায় পাখি, হতচ্ছাড়া কোথায় পালালে!

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *