হাইকু:কোবাইয়াশি ইসসার আরও এক গুচ্ছ


issa-303অনুবাদ: নান্নু মাহবুব

*
লণ্ঠনে আলোকিত

লণ্ঠনে আলোকিত
অপরূপ এক রাত…
ডাকে ব্যাঙ

*
যখন প্রজাপতি

যখন প্রজাপতি
ফিকে নীল,
ফিকে নীল চেরিফুলও

[চেরিফুল হলো ফিকে গোলাপি। ইসসা বলছেন, হালকা নীল
প্রজাপতির উপস্থিতিতে তার সেই রঙ পাল্টে গেছে।
এই অসাধারণ কবিতাটি পলকা পতঙ্গ আর ফুলের মধ্যেকার
সম্বন্ধকে ইঙ্গিত করে।]

*
বুনোফুল ফোটে

বুনোফুল ফোটে
নিখাদ শুভ্র…
গহন বৃক্ষছায়া

*
বৃষ্টি গেছে থেমে

বৃষ্টি গেছে থেমে─
খুঁটির উপরে এক
জমকালো মাশরুম

*
বসন্ত বৃষ্টি

বসন্ত বৃষ্টি─
কেতলির নিচে এক
আগুন মনোহর

*
প্রথম শীতের বরিষণ

প্রথম শীতের বরিষণ─
জগৎ ভরে গেছে
হাইকুতে

*
সবুজ দ্রাক্ষালতা

সবুজ দ্রাক্ষালতা
উঁকি দেয় জানালায়…
গ্রীষ্মের উষ্ণতা

*
খোলা জানালায়

খোলা জানালায়
উজ্জ্বল এক চাঁদ,
ডাকে ব্যাঙ

*
ডাকে বুনো রাজহাঁস

ডাকে বুনো রাজহাঁস,
রটে আমায় নিয়ে
রটনা

*
মর্নিং গ্লোরি

মর্নিং গ্লোরি
ফোটে ঘন হয়ে…
অন্য কারোর বাড়িতে

[মর্নিং গ্লোরি: নরম নীলাভবেগুনি ফুল। একরকম বাগানলতা।
ফুল অন্যান্য রঙেরও হয়। বহু প্রজাতির দেখা যায়। এই লতার
অপরূপ ফুল ফোটে সকালে আর দুপুরের আগেই বুজে আসে।
ছায়াকুঞ্জ তৈরিতে ঘনসবুজ পাতার মর্নিং গ্লোরি অনবদ্য।
জাপানে এই ফুল বহুল আদৃত।]

*
স্বচ্ছ নীলাকাশে লিখি

স্বচ্ছ নীলাকাশে লিখি
একটি আঙুল দিয়ে…
‘‘হেমন্ত গোধূলি’’

*
চোরকাঁটাঝোপ থেকে

চোরকাঁটাঝোপ থেকে,
জন্ম নিল কি
এমন এক প্রজাপতি?

*
পাইন বনের ছায়ায়

পাইন বনের ছায়ায়
পরম শান্তিতে খায়, ঘুমোয়
জনাষাট উপজাতি

*
এই যে! ছোট্ট কুঁড়েটি আমার

এই যে! ছোট্ট কুঁড়েটি আমার
নতুন করে ছাওয়া…
নীল মর্নিং গ্লোরি

*
নড়বড়ে কুটির আমার

নড়বড়ে কুটির আমার─
অবিকল আগের মতোই…
বসন্ত হলো শুরু

*
চড়ুইছানারা

চড়ুইছানারা
সরে যাও!
যায় ঘোড়া মহাশয়

*
শুধালে বয়স কত

শুধালে বয়স কত,
বালক নতুন কিমোনো পরা,
মেলে ধরে পাঁচ আঙুলের সবক’টি

*
হেমন্ত হাওয়া

হেমন্ত হাওয়া─
টলে ওঠে
পর্বতছায়া

*
সূর্যাস্ত

সূর্যাস্ত─
একটি ব্যাঙের চোখেও
চকচক করে অশ্রু

*
আমার বাড়িতে

আমার বাড়িতে
ইঁদুর আর জোনাকিরা
আছে মিলেমিশে

*
ভাবনা নেই, মাকড়সাগণ

ভাবনা নেই, মাকড়সাগণ,
ঘরবাড়ি রাখি আমি
অযতনে

[ইসসা মাকড়সাদের আশ্বস্ত করছেন যে তাঁর ঘরটি মাকড়সাদের জন্যে নিরাপদই আছে!]

*
ভেসে গেছে কুয়ো

ভেসে গেছে কুয়ো─
ঘাসের উপরে বসে
ডাকে এক ব্যাঙ

*
একটি মানুষ

একটি মানুষ,
একটি মাছি,
একটি বিশাল বৈঠকখানা

*
হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি

হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি─
আর নগ্ন আমি ছুটি
এক নগ্ন ঘোড়ার সওয়ার

[এটি ইসসার সবচে’ ইন্দ্রিয়ঘন ইমেজগুলোর মধ্যে একটি।]

*
নীল আকাশের মতো

নীল আকাশের মতো
গ্রীষ্মকিমোনো,
প’রে আছি আমি

*
আমার প্রয়াত মা

আমার প্রয়াত মা─
যখনই সমুদ্র দেখি
যখনই…

*
প্রিয় পুরাতন গ্রাম আমার

প্রিয় পুরাতন গ্রাম আমার,
গৃহের সমস্ত স্মৃতি
বিঁধছে যেন কাঁটা

*
কাছে আসি যত

কাছে আসি যত
আমার গ্রামের, ব্যথা বাড়ে…
বন্যগোলাপ

*
লাল সূর্যোদয়ে

লাল সূর্যোদয়ে,
শামুক,
তুমিও কি পুলকিত?

*
সরাইখানায়

সরাইখানায়,
হেমন্ত গোধূলি
হয়েছে বিস্মৃত

[কল্পনা করা যাক সরাইখানায় ইসসা এবং অন্য অতিথিরা বিপুল সাকে (ভাত থেকে প্রস্তুত একজাতীয় মদ্য) পান করেছেন, ‘বিস্মৃত হয়েছেন’ সবকিছু।]

*
নাইটিঙ্গেল

নাইটিঙ্গেল─
বৃষ্টিস্নাত তার
ভোরের কণ্ঠ

*
শুধু দুঃস্বপ্নই

শুধু দুঃস্বপ্নই
নিয়তি আমার…
ডাকে একটি কাক

[শিশুপুত্র ইশিতারোর মৃত্যুর পর ইসসা এই বিষণ্ণ হাইকুটি লেখেন।]

*
বসন্ত বৃষ্টি

বসন্ত বৃষ্টি─
পাশাপাশি বেড়ে ওঠে
ফিসফাসরত পাইনেরা

*
ভিজে হলো চুপচুপে

ভিজে হলো চুপচুপে
বছরের প্রথম বর্ষণে…
আমারই ছোট্ট কুঁড়ে

*
এই দুনিয়ায়

এই দুনিয়ায় মোরা
নরকের ছাদে ঘুরিফিরি,
অপলকে চাই ফুলে

*
নিস্তব্ধতা

নিস্তব্ধতা─
পাহাড়ের আতশবাজি
উড়ে গিয়ে পড়ে জলে

*
তার মৃত্যুকালীন কবিতা:
জন্মে এক স্নান

জন্মে এক স্নান,
মৃত্যুতে এক স্নান,
কী নির্বুদ্ধিতা!

*
পুরোনো পুতুল

পুরোনো পুতুল
ভাংরি দোকানের জানালায়
পোহায় রৌদ্র

*
বৃক্ষের জানালা দিয়ে

বৃক্ষের জানালা দিয়ে
দেখি নদী…
ঝরে বসন্ত বৃষ্টি

*
জোনাকির সাথে

জোনাকির সাথে
জ্বলজ্বলে কুকুরেরা,
গভীর ঘুমন্ত

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *