রবার্ট ফ্রস্ট, হাইনরিশ হাইনে, পাবলো নেরুদা ও আদুনিসের কবিতা


অনুবাদ: জুয়েল মাজহার

untitledরবার্ট ফ্রস্ট

(২৬ মার্চ ১৮৭৪-২৯ জানুয়ারি, ১৯৬৩)

 তুষার-সন্ধ্যায় বনের কিনারে থেমে

কার এই বনভূমি, মনে হয়, আমি চিনি তারে।
বুঝিবা বাড়িটি তার কাছেপিঠে গাঁয়ের ভেতরে;
পড়বে না চোখে তার আমি যে এখানে থামলাম
দেখতে তার বনভূমি ঢেকে যেতে তুষারে তুষারে।

ছোট্ট আমার ঘোড়া হয়তো বা অবাক হয়েছে
কী হেতু এখানে থামা যেহেতু খামার নেই কাছে
দুই পাশে বন আর হ্রদ শুধু বরফ-জমাট
বছরের গাঢ়তম গোধুলি এখানে ঘনায়েছে।

গলতি হয়েছে কোনো এই ভেবে টাট্টু আমার
গলার ঘুন্টিটা সে নাড়লো একবার।
আরো যে শব্দ এক কানে বাজে সেটা
ঝিরিঝিরি হাওয়া আর মিহি তুষারের।

গহনগভীর মধুর কালো এ-বন,
তবু যে আমার রয়েছে একটি পণ,
ঘুমাবার আগে দিতে হবে পাড়ি অনেক যোজন
ঘুমাবার আগে দিতে হবে পাড়ি অনেক যোজন।

[ Stopping by Woods on a Snowy Evening]

হাইনরিশ হাইনে
(১৩ ডিসেম্বর ১৭৯৭-১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬)

বসেছিলাম দু’জ আমরা

আমরা দুজন বসেছিলাম, প্রিয়,
আমাদের এই ভঙ্গুর তরণীতে;
বিশাল সাগরে প্রশান্ত ছিল রাত
আমরা দু’জন ভেসে বেড়ালাম তাতে।

ভৌতিক সেই আবছায়া, প্রিয় দ্বীপ,
চাঁদের কোমল চাহনিতে ছিল শুয়ে;
শোনা গেল গান সেখানে মধুরতম,
ছায়া-নৃত্যের ঢেউ ছিল সেইখানে।

যতো শোনা য়ায় ততই মধুর লাগে,
এখানে-ওখানে ঢেউ খেলে যায় তার;
আমরা কিন্তু পাশ কাটালাম একে
সাগরস্রোতের ওপরে নি:সহায়।

(My Darling, We Sat Together
Heinrich Heine)

আমার সুখের দিনগুলি

আমার দিবস ছিল সুখময়, রাত্রি আমার পয়মন্ত ছিল।
আমার লোকেরা, আমায় কতো যে ভালো তারা বেসেছিল!
বাজাতাম আমি যখন কাব্যবীণা;
অনুরাগই ছিল আমার আগুন, গান,
কতো না মধুর আলো সে জ্বালিয়েছিল।
আমার গ্রীষ্ম এখনো জ্বলছে; তবু, আমি গোলাঘরে
নিয়ে গেছি সেই শস্য, যা আমি ফলিয়েছিলাম নিজেরই হাতে—
পৃথিবী যা-কিছু করেছে আমার প্রিয়,
দিয়েছে যেসবে ভালোবাসা অকাতরে;
–এখন আমায় যেতে হবে সব ছেড়ে!
আমার আয়ুধ খসে পড়ে হাত থেকে।
মনের হরষে, অতি বিশ্বাসে, যে-পেয়ালা আমি ঠোঁটে
ঠেকিয়েছিলাম, সেটি ভেঙে খান্‌খান!

হায় ঈশ্বর, মরণ সে কতো তিক্ত বিষাদে ভরা!
কতো মধুময়, কতো না নিবিড় মানবজীবন
এই সুখময়, এই সুনিবিড়, পার্থিব নীড়ে।

(Mein Tag War Heiter by Heinrich Heine)

গোলাপ কেন এমন ফ্যাকাশে

ওগো প্রিয়তম, গোলাপেরা কেন এমন ফ্যাকাশে
আমায় কি দেবে বলে?
আর কেন নীল, বেগুনি হারায়
উপত্যকার তলে?

কেনবা চাতক মেঘের মর্মে
গানে গানে কেঁদে মরে?

গন্ধতরুর মধুর কুঁড়িটি থেকে
মরণের ঘ্রাণ ছড়িয়ে কেন যে পড়ে?

আর সূর্যটা কেন তৃণভূমে
এ-রকম ভ্যাংচায়?
আর পৃথিবী কেন ঝুর্‌ঝুর্‌
ধূসর কবর, হায়?

আর জরদ্গব কেন আমি হবো
সে কোন্ ভাগ্যবলে?
আর কেন তুমি, পরাণসখা হে,
মোরে ফেলে যাও চলে?

(Why The Roses Are So Pale – Poem by Heinrich Heine)

স্থবির রাত্রি

রাত্রি কতো স্থবির আর পথগুলো সুনসান,
এই বাড়িটিতে থাকতো আমার প্রিয়,
এই শহর সে ছেড়ে গেছে কতো আগে,
তবু সেই বাড়ি আজো সেখানেই আছে।
সেখানে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে একটি লোক
তীব্র ব্যথায় বাহু তার মোচড়ায়:

চাহনিতে তার আমি ভয়ে জড়োসড়ো—-
জ্যোৎস্না দেখায় আমার মুখটি ফের।
তুমি প্রতিরূপ অবিকল আমারই!
ধ্বস্ত-মলিন চেহারার তুমি প্রাণি!
কেন য়ে রয়েছো এমন তীব্র ক্লেশে,
প্রেম, তুমি কেন পীড়ন আমায় করো,
কতো যে বছর, রাত চলে গেছে জানি।

(Still Ist Die Nacht by Heinrich Heine)

দেবদারু আর পাম

রয়েছে দাঁড়িয়ে একা এক দেবদারু;
ওই উত্তরে ঊষর উচ্চতায়
রয়েছে ঘুমিয়ে। বরফ, তুষারঝড়
মুড়িয়েছে তাকে সফেদ আস্তরণে।

স্বপ্নে সে দ্যাখে একটি ধ্বজদ্রুম
পুবে বহুদূরে অস্ফুট বেদনায়
তাতল বালিতে কেঁদে মরে একা একা।

(The Pine and the Palm
By Heinrich Heine)

পাবলো নেরুদা

জলপরি ও মাতালদের কাহিনি

ঘরটিতে মরদেরা জুটেছে সবাই, তখুনি ভেতরে এসে
ঢুকলো সে পুরো বিবসনা।
মদ খেতে খেতে ওরা ছিটাতে লাগলো থু-থু ওর সারা গায়।
নদী থেকে সবে উঠে আসা, ও ছিল সরল আলাভোলা।
ও তো এক জলপরী পথ ভুলে এসেছে এখানে।
ঝলোমলো অঙ্গে ওর বিদ্রূপের তুবড়ি গেল বয়ে।
খিস্তিতে-খিস্তিতে ওর হেমস্তন নোংরা-আবিল।
কান্না কাকে বলে ওর জানা নেই, চোখে তাই অশ্রু গড়ালো না ।
পরিধেয় কাকে বলে জানতো না, তাই ছিল পুরো বিবসনা।
সিগারেটে-ছ্যাঁকা দিয়ে, বোতলের পোড়া ছিপি দিয়ে ওকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে
সরাইয়ের মেঝেজুড়ে গড়াগড়ি খেলো ওরা ইতর হাসিতে।
সুদূর প্রেমের রঙে সেজেছিল ওর দু’নয়ন;
ওর জোড়া বাহু যেন দুধশাদা পোখরাজে গড়া।
শব্দহীন জোড়া ঠোঁট কেঁপে উঠলো প্রবালের গোলাপি আভায়;
আর সেই দরজাপথে হঠাৎই সে বাইরে হারাল।

নামলো নদীতে যেই, জলে ধুয়ে গেল সব আবিলতা চোখের পলকে।
দেহখানি তুললো ঝিলিক ফের; বৃষ্টিঘোরে যেন কোনো শ্বেত মর্মর।
তাকালো না একবারও পিছু ফিরে; –দিলো সে সাঁতার
ভেসে গেল শূন্যতার পানে শুধু, ভেসে গেল আপন মৃত্যুতে।

[Fable of the Mermaid and the Drunks
Pablo Neruda

আদুনিস
(আলি আহমাদ আল সাইদ আসবার)
(জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৩০…)

নয়া নূহ্ 
১.
আমরা ভ্রমণ করি কিস্তি চেপে, কাদায়-বৃষ্টিতে,
আমাদের দাঁড়গুলি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতিজাত।
কেবল আমরা রই বেঁচে –আর, বাকি সকলেই যায় মরে ।
আমরা চলি ঢেউয়ে ঢেউয়ে, আকাশ ছাপিয়ে ওঠা
লাশের দড়ির সঙ্গে আমাদের জীবনকে বেঁধে।
স্বর্গ আর আমাদের মাঝখানে তবুও রয়েছে এক স্থান অবারিত।
”প্রভু, তুমি আর-আর প্রাণিদের, লোকেদের মধ্য থেকে
কী কারণে আমাদেরই বাঁচালে কেবল?
আর, তুমি কোন্‌খানে এইবার আমাদের করবে স্থাপন ?
তোমার আরেক দেশে, আমাদের আদি ঠিকানায়?
মরণের পাতার ভেতরে, নাকি জীবনের হাওয়ার নিগড়ে?
আমাদের প্রতি প্রাণে, আমাদের ধমনীতে সূর্যের ত্রাস বহমান।
‘প্রথম’ আলোকে আমরা হয়েছি হতাশ,
আমরা হতাশ, প্রভু; সে-আগামীকালের বিষয়ে
আমরা করবো শুরু তাতে এক নতুন জীবন।
সৃষ্টির আদিতম চারা আমরা না যদি হতাম,
এ-জাহান আর এরই প্রজন্মের পরম্পরায়, –স্রেফ
কাদা কিংবা উনুনের ছাই হয়ে যদি থাকতাম,
কিংবা, এতদুভয়ের মাঝামাঝি কিছু একটা যদিবা হতাম,
তাহলে তো আমাদের আর
দু’দুবার দেখতে হতো না এই পৃথিবীকে, আর এর প্রভুকে ও এর জাহান্নাম।”

২.
কালের সূচনা যদি হতো পুনর্বার,
আর যদি জীবনের মুখখানি ডুবে যেতো অগাধ সলিলে,
আর যদি পৃথিবীর উঠতো খিঁচুনি, আর এ-আমারই কাছে
ঈশ্বর, সানুনয়, আসতেন ছুটে,: ” নূহ, তুমি রক্ষা করো জীবিত রয়ছে যতো প্রাণ!’
আমি তার অনুরোধে দিতাম না সাড়া।
আমার কিস্তিতে আমি ভ্রমণ করতাম, মৃতদের
চোখ থেকে কাদা আর সমুদয় নুড়িকে সরিয়ে।
আর, মহাপ্লাবনের কাছে আমি তাদের সত্তার তল মেলে ধরতাম,
তাদের ধমনী-শিরায় আমি ফিস্‌ফিস স্বরে বলতাম
আমরা এসেছি ফিরে প্রাণহীন অন্তহীন ধু-ধু জলরাশি পাড়ি দিয়ে।
গুহা থেকে বের হয়ে আমরা এসেছি,
বদলে দিয়েছি আমরা অন্তহীন কালের অম্বর,
ভয়তরাসের কাছে মাথা-না-নুইয়ে আমরা উড়িয়েছি পাল —
সেই ঈশ্বরের কোনো কথা আমরা তো করিনি পালন।
মরণের সঙ্গে শুধু আমাদের সব বোঝাপড়া।
আমাদের তটভূমি সেতো এক চিরচেনা সুখদায়ী হতাশার নাম,
অবিরাম বৈঠা ঠেলে, আমরা দিয়েছি পাড়ি
লৌহ-উদকময় অগভীর সেই পারাবার— অবশেষে;
সেই ঈশ্বরের প্রতি আমরা দিইনি আমল, তার শুনিনি বচন।
অভীপ্সা করেছি শুধু, কোনো এক, নতুন প্রভুর।

(The New Noah by Ali Esber Adunis; English translation by Kamal Abu-Deeb)

না-ফেরার দেশে

যদিবা ফিরেও আসো ওহে, ওদিসিউস;
এমনকি মহাশূন্য, সে তোমাকে ঘিরে যদি নিজেকে গোটায়,
আর যদি পুড়ে হয় ছাই সেই পথপ্রদর্শক
তোমার শোকার্ত মুখে
কিংবা তোমার বন্ধুসুলভ ত্রাসে, তথাপিও
অন্তহীন ভ্রমণের হয়ে রবে ইতিহাস তুমি;
পড়ে রইবে প্রতিশ্রুতিহীন কোনো দেশের গোলকধাঁধায় চিরদিন,
পড়ে রইবে কোনো এক না-ফেরার দেশে চিরদিন,
যদিবা ফিরেও আসো,
ওহে, ওদিসিউস

(A Land Of No Return by Ali Esber Adunis
Translated by: Kamal Abu-Deeb)

সম্মোহন

আঘাতে আঘাতে দফারফা বইপত্রের দঙ্গলে
হলদ ওই গম্বুজের নিচে
চুপসে যাওয়া একটি শহরকে আমি উড়ে যেতে দেখি।
দেখি, রেশমি চাদরে বানানো দেয়াল আর
একটি নিহত নক্ষত্র
চলেছে সাঁতার কেটে একটি সবুজ জলাশয়ে
দেখি, অশ্রু আর দেহের কাদায় তৈরি
একটি মূর্তি; আর, দেখি এক
রাজার পায়ের তলে আভূমি প্রণতি।

(Spell by Adonis)

আদম

নিখিল নৈ:শব্দে আর গোঙানির স্বরে
ফিসফিসে দীর্ঘশ্বাসে, শুষ্ক কণ্ঠে আদম আমাকে বললেন:
”আমি নই পৃথিবীর পিতা।
দেখিনি স্বর্গ আমি,
আমাকে প্রভুর কাছে নিয়ে চলো, বাছা ।”

(Adam by Ali Esber Adonis; English Translation by Kamal Abu-Deeb)

অশ্রুরা 

তারাটি ফুঁপিয়ে কাঁদে-
রাত্রি তারাটিরই চোখের জল।
(Tears by Adonis; Eng Translation by Hassan Hilmy)

অলস হাঁটাহাঁটি 

লম্বা আলখাল্লা গায়ে একটি তারা
পামগাছগুলোর ভেতরর দিয়ে পায়চারি করে।
(Promenade by Adonis; Eng Translation by Hassan Hilmy)

একটি গোলাপ

একটি গোলাপ। এর নিজের ঘ্রাণই এর বাড়ি
আর হাওয়া এর বিছানা।
(A Rose by Adonis; Eng Translation by Hassan Hilmy)

পিপাসা 

কোথাও কি এমন জল আছে যা করতে পারে
জলের পিপাসা নিবারণ।
(Thirst by Adonis; Eng Translation by Hassan Hilmy)

এক মহিলার মুখ

করি অধিবাস এক মহিলার মুখে
তার অধিবাস ঢেউয়ের গর্ভে থাকে
ঢেউকে জোয়ার আছ্‌ড়ে ফেলছে তীরে
শঙ্খগুলোর ভেতরে সে-তটরেখা
হারিয়ে ফেলল আপন পোতাশ্রয়।
এক মহিলার মুখে আমি বাস করি
সে-মহিলা আমায় হত্যা করে,
তার আকাঙ্ক্ষা
আমার রুধিরে সে
হবে বাতিঘর
পাগলামির ষোলকলা শেষ করে।
(The Face Of A Woman by Adonis; Eng. trans. by Kamal Abu-Deeb)

শোকগাথা

(আমার পিতার জন্য)

১.
আমার বাবা হচ্ছে একটি আগামীকাল
যা আমাদের কাছে ভেসে আসে,
একটি সূর্য,
আর আমাদের বাড়ির ওপরে মেঘদল জাগে।
তাকে ভালেঅবাসি আমি, মাটিতে প্রোথিত গোপনতা,
ময়লা-ঢাকা একটি কপাল।
আমি ভালোবাসি তাকে, তার ক্ষয়িষ্ণু হাড় আর কাদা।

২.
আমাদের বাড়ির ওপরে নীরবতার স্তূপ জমে আছে,
আর নেমে এসেছে এক কান্নার ফোঁপানি—
আর যখনই আমার পিতা মৃত্যুতে লুটিয়ে পড়লেন
গিয়েছে শুকিয়ে একটি মাঠ, পালিয়ে গিয়েছে চড়ুই।

(Elegies by Adonis; English Translation by Khaled Mattawa)

আমার পিতার কোট

আমাদের বাড়িতে আছে একটা কোট
তাতে ক্লান্তি ও অবসাদের সুতো দিয়ে সেলাই করা
আমার পিতার জীবন।
এটি আমাকে বলে—এর উপরে বোসো তুমি
কেটে ফেলা ডালের মতোন
আর তার মনের ভেতরে তুমি ছিলে
আগামীকালেরও আগামীকাল।
আমাদের বাড়িতে এক কোট রাখা আছে
রাখা আছে হেলায় ফেলায়, কেউ যত্ন নেয় না এটির,
এটি আমায় সিলিংয়ের সাথে,
এই মর্টারের সাথে আর পাথরের সাথে বেঁধে রাখে।
এর ছিদ্রগুলোর ভেতর দিয়ে আমি
দেখতে পাই আমার পিতার আলিঙ্গনকাতর হাত,
এরই গভীর ভেতরে তার
হৃদয় আর হৃদয়ের আকৃতি রাখা আছে।
এটি আমায় প্রহরা দেয়, আগলে রাখে, আমায় মুড়ে রাখে আলিঙ্গনে,
আমার চলার পথে প্রার্থনার দাগ টেনে রাখে,
আমাকে বিশ্বাস করে উপহার দ্যায় তার খাগড়ার বাঁশি,
দ্যায় এক বনভূমি আর এক গান।

(A Coat by Adonis; English Translation by KHALED MATTAWA)

শৈশব-বন্দনা

এমনকি বাতাসও চায় হতে
প্রজাপতি-টানা
একটি এক্কা গাড়ি।

মনে পড়ে যায়, পাগলামি
দিয়েছিল প্রথম হেলান মনের বালিশে।
তখন আমি কথা বলছিলাম আমার দেহের সাথে
আর, আমার দেহটা ছিল একটি ধারণা কেবল
যা আমি লিখে রেখেছিলাম লাল কালিতে।
লাল হচ্ছে সূর্যের সবচে সুন্দর সিংহাসন
আর বাকিসব রঙ
লাল জায়নামাজে প্রার্থনায় রত।

রাত্রি হচ্ছে আরেক প্রদীপ।
বাহু এক, প্রতিটি বৃক্ষশাখায়;
একটি বার্তা বয়ে নেওয়া হয় মহাশূন্যে, যাতে
বাতাসের শরীরের প্রতিধ্বনি জাগে ।

যখনই আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়
কুয়াশার পোশাক পরবে বলে বায়না ধরে নাছোড় সূর্যটা:
আমাকে কি বকে দিচ্ছে আলো?

ওহে, আমার ফেলে আসা দিন—
হাঁটাহাঁটি করতো তারা নিজেদের ঘুমের ভেতরে
আর আমি কতোকিছু তাদের বিষয়ে শিখতাম।

প্রেম আর স্বপ্ন এরা দুটো লঘু বন্ধনী।
এ-দুয়ের মাঝখানে দেহ রেখে আমি
দুনিয়াকে আবিষ্কার করি।

কতোবার আমি
ঘাসের যুগল পায়ে হাওয়াকে দেখেছি উড়ে যেতে
আর, হাওয়া দিয়ে তৈরি পায়ে রাস্তাটি চলে নেচে নেচে।

আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি ফুল
আমার দিনগুলোকে রঙিন করে তোলে।

অকালে ক্ষতের শিকার হই আমি,
আর অকালে শিখেছি
ক্ষতরাই আমার কারিগর।

আজো আমি চলি সেই শিশুর পেছনে
যে এখনো আমার ভেতরে চলে হেঁটে।

সে এখন আলো দিয়ে তৈরি এক সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
বিশ্রামের জন্য আর রাত্রির মুখখানি ফের
পাঠের জন্য এক উপযুক্ত কোণ খুঁজে ফেরে।

রাত্রি যদি হতো একটা বাড়ি,
আমার গা-দুটো তবে এর দোরগোড়ায় ঘুনাক্ষরে যেতেই চাইতো না।

তাদের গ্রহণ করে ধুলো,
মৌসুমী হাওয়ার কাছে আমাকে যা বয়ে নিয়ে যায়।

বাতাসে একটি হাত
রেখে আমি হাঁটি,
অন্য হাতটি, যা-আমি-কল্পনা করি,
তার গায়ে আদর বোলায়।

মহাশূন্যের মাঠে
একটি নক্ষত্র, সে-ও এক চিলতে নুড়ি।

দিগন্তরেখায় যাকে
যুক্ত করা হলো, সেও পারে
বহু-বহু আনকোরা রাস্তা বানাতে।

একটি চাঁদ, বুড়ো এক,
রাত্রি হলো তারই আসন;
আর, আলো তারই হাঁটবার লাঠি।

যে ঘরে জন্মেছিলাম তারই ধ্বংসস্তূপে
এলাম যে দেহটাকে ফেলে
সে দেহকে কী বলবো আমি?

যেসব তারারা জ্বলে সে-বাড়ির মাথার উপরে
আর যারা রেখে আসে গোধূলির পথে পদচ্ছাপ
তারা ছাড়া আর কেউই আমার
শিশুকালের বর্ণনা দিতে পারবে না।

এখনো আমার শৈশব
জন্ম নিচ্ছে একটি আলোর করতলে
আমি তো জানি না তার নাম
আর, সে আমাকে নাম দ্যায় উপহার।

ওই নদী থেকে একটি আয়না সে আমায় দিয়েছে বানিয়ে
আর, এরই কাছে জানতে চেয়েছে তার দু:খ বিষয়ে।
আপন দু:খ থেকে বৃষ্টিকে সে করেছে নির্মাণ, আর
মেঘেদের করেছে নকল।

তোমার শৈশব এক গ্রাম।
যতো দূরে যাও তুমি
কখনোই পারবে না সে-গ্রামের সীমানা পেরোতে।

তার দিনগুলো সবই হ্রদ
স্মৃতি তার ভেসে চলা দেহ।
.
যে তুমি আসছো নেমে
অতীতের পর্বত থেকে,
বেয়ে উঠবে ফের তুমি কী করে সেসবে,
আর, কেনই বা সেটা করতে যাবে ?

সময় দরোজা এক
সেটি আমি খুলতে অপারগ।
আমার জাদুটি আজ লাগছে না কাজে,
ঘুমিয়ে পড়েছে আমার সকল স্তব-গান।

ছোট্ট ও গোপন এক জরায়ুর মতো এক গাঁয়ে
আমি জন্মেছিলাম।
কখনো যাইনি একে ছেড়ে।

তীর নয়, আমি বিপুল সাগর ভালোবাসি।

(Celebrating Childhood by Adonis)
Translated By khaled Mattawa)

[ ”বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি বইমেলা ২০১৬ বইমেলায় ‘চৈতন্য’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিতব্য  অনুবাদগ্রন্থ ‘দূরের হাওয়া’ থেকে”]
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *