তুমি কেন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারোনি


মাহবুব আলী

যতটুকু নস্টালজিক পুলক কখনো মনের কোণায় জেগে উঠছিল, রিকশা থেকে নেমে সব স্তব্ধ। অফিস পাওয়া গেছে। লোকজনের ভিড়। জানা গেল, পাবনা আর বগুড়া চলছে। কতজন পেন্ডিং? প্রায় পঞ্চাশ-ষাট। অতপর কী আর করবেন? সব জায়গায় এই সিস্টেম। লোডশেডিং…ওভারলোড। অবশেষে সিদ্ধান্ত, এই ফাঁকে লাঞ্চ সেরে নেয়া যেতে পারে। দুপুর প্রায় বারোটা। সকাল থেকে মেয়েটি না খাওয়া। রাস্তায় বমি করেছে দু-বার। ফরসা মুখ বড্ড ফ্যাকাসে। ট্রেন যখন আবদুলপুর জংশনে ইঞ্জিনের মুখ ঘুরিয়ে নেয়, দশ পনেরো মিনিটের সুযোগ; মেয়েকে সাধেন। কিন্তু কিছু খাবে না। ঠিক তার মতো জেদি। না তো না। তিনিও মুখে কিছু দিতে পারলেন না। অবশ্য ভোরবেলা রুনার মা দুটো টোস্ট আর ডিম পোচ করে দেয়। একটি টোস্ট চায়ে ডুবিয়ে খেয়েছেন। ডিম খেতে পারলেন না। ভয় করে। অনেক দূরের রাস্তা। পেট গুড়গুড় করলে সমস্যার শেষ নেই। তখন সেই দিনের কথা মনে পড়ে যায়।

প্রিভিয়াস ভর্তি হতে যাত্রা। প্রথমবার ঘর হতে বের হয়েছেন। রাতে ঘুমোতে পারেননি। ভোরবেলার ট্রেন। শীতের নিজঝুম রাত। দুচোখে ঘুম চেপে বসে। আধোজাগরণে-আধোঘুমে তবু সময় কেটে যায়। মনে শঙ্কা। কোনো ফাঁকে ট্রেন চলে গেলে সব শেষ। তারপর আহসানগঞ্জ নাকি তিলকপুর এসে সমস্যা। তাই মেয়েকে কিছু খেতে জোর করেননি। রিকশায় স্টেশনে এলেন। কয়েকদিন আগে টিকিট কেটে রাখা হয়েছিল। সেই ঝামেলা নেই। কাজের সময় টিকিট পাওয়া যায় না। তারপর প্লাটফরমে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। দোলনচাপা ট্রেন যায় ঢাকা। তিনি পার্বতীপুর নেমে বরেন্দ্র ওঠেন। অবশেষে রাজশাহী। সময়ঘড়ি হিসাব করে রেখেছেন। এগারোটায় ভাইভা শুরু হলে রুনার সিরিয়াল আসতে আসতে দুপুর বারো বা একটা হতে পারে। ফেরার ট্রেন বিকেল তিনটায়। সন্ধেয় বা একটু রাতে ফুলবাড়ি নেমে বাস ধরবেন। লোকাল মেইল সব ধরনের বাস রাত নয়-দশটা পর্যন্ত চলাচল করে। সুতরাং বাড়ি পৌঁছতে খুব বেশি রাত হবে না। নিজের শহরে নিরাপদ মনে হলেও বাইরের জায়গায় মনে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক। দিনকাল ভালো নয়। এখন এ শহর অচেনা তার। একসময় সাহেব বাজার, মালোপাড়া, আলুপট্টি কত রাস্তায় হেঁটেছেন। বিনোদপুর, কাজলার মোড়, তালাইমারি, পদ্মার পাড়, বরেন্দ্র পার্ক কত পরিচিত নাম। কত স্মৃতি। কল্পনা, আলপনা, বর্ণালিতে ছবি দেখেছেন। কাটিয়েছেন আনন্দ সময়। ইউনিভার্সিটির বাসে শহরে এসেছেন। কাজ শেষে বাস বা রিকশায় ফিরে গেছেন। এসএমহল। অনেক হারানো দিন। হারানো স্মৃতি। অনেক কথা…অনেক স্বপ্ন।

তার স্বপ্ন পূরণ হলো না। বাবা প্রয়োজনে কাঁচাধান বিক্রি করেও টাকা পাঠাতেন। দুপুরে হলের করিডোরে পিওন আঙ্কেলের পদক্ষেপের প্রতি থাকত সতর্ক মনোযোগ। কষ্টও করেছেন। একদিন কোনো কষ্ট থাকবে না এই প্রত্যাশায়। মা-বাবা-ভাই-বোন সকলের কষ্ট। সেই তিন-সাড়ে তিন শত টাকার সংস্থান করতে দুপুর আর রাতের খাবারের মেন্যুতেও কাটছাট হয়েছে। বাবার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা। মঈন একটি ভালো চাকুরি পেলে আর কোনো কষ্ট থাকবে না।

তিনি সেই কষ্ট করতে পারেননি। চেষ্টা করেছেন। ডজন ডজন লিখিত পরীক্ষা আর ভাইভা। চাকুরি হয়নি। স্বপ্নের পেছনে ধাবমান বাবার সবুজ চোখ আশায় আশায় পাণ্ডুর হয়ে গেল। ক্যাটারেক্ট ফরম করে। যা কিছু দেখেন, চিনতে পারেন; পারেন না। আঠালো অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে সবকিছু পরিষ্কার দেখা যায় না। একদিন তার নীল আকাশ হারিয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন। অবশেষে মঈন কোন্ কাজ পেয়েছেন দেখে যেতে পারলেন না। এখন তার বুকের কোণায় লুকোন ভাবনায় দুচোখের দৃষ্টিতে ছানি। ক্যাটারেক্ট ফরম আর দৃষ্টি ঘোলা হতে শুরু করেছে। সেই ঘোলা চোখে তবু স্বপ্ন দেখেন, যে স্বপ্ন তার জন্য বাবা দেখতেন; রুনার একটি ভালো চাকুরি হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই স্বপ্নেরা হাত হতে অন্যহাতে ঘোরে। বদল হয়। অন্ধকার ছায়াপথে একটুকরো আশার প্রদীপ নিবিড় প্রত্যাশায় হস্তান্তর। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তার।

রুনা অনেক মেধাবী। প্রায় দেড় লক্ষ আবেদনের সঙ্গে লিখিত পরীক্ষা। ভালোভাবে পাস করেছে। চাকুরি তার হবে। সহকারী উপ-খাদ্য পরিদর্শক। অল্প-বেতন। সে যা হোক সরকারি চাকুরি। নিশ্চিত হওয়া যায়। তার নিজের জীবনে কিছু হলো না। লিখিত পরীক্ষা আর ভাইভা দিতে দিতে ক্লান্তির সূচনা হতে হতে আবেদনের বয়সও কোনফাঁকে টুপ করে সীমানা ডিঙ্গিয়ে গেছে। তারপর বিষন্ন দিনকাল চলতে চলতে শুধু টিকে থাকবার জন্য কার কাছেই না গিয়েছেন! তাদের দিকে কোনোদিন তেমন করে দৃষ্টি দেননি; সেখানে কত অনুনয়। অবশেষে কেউ দয়ার্দ্র হয়েছেন কিংবা ক্ষমতা দেখাতে কাজ দিয়েছেন। কোনোদিন আবার কেড়েও নিয়েছেন। তাই বহমান জীবনের ভাসমান মানুষ যখন আঠাশ বছর পর ট্রেনে ওঠেন, বুকের সুপ্ত আকাক্সক্ষা অপ্রতিরোধ্য জেগে ওঠে। সময় পেলে ইউনিভার্সিটির আমতলা চত্বর, জুবেরি মাঠ, কলা ভবন, বিশাল লাইব্রেরি অথবা আরও সুযোগ পেলে এসএমহলের সেই তিন শত একচল্লিশ নম্বর রুম ঘুরে আসবেন। রুনা সঙ্গে থাকবে। একসময়ের আনন্দ-স্বপ্নের গৌরবময় দিন যে তাকে কখনো ডাকে। এখন সেই রুমের দক্ষিণ দেয়াল নিশ্চয়ই আর শ্যাওলাসিক্ত স্যাঁতস্যাঁতে নেই। যে মানুষ বা মানুষগুলো রয়েছে, তাদের চোখ-মুখ তার সেই যুবাকালের মতো পরিচ্ছন্ন-উজ্জ্বল-স্বাপ্নিক নীলআকাশ দোলাময়। কখনো কখনো সেই আবেগ তাড়া করে। কখনো ভাবেন সেই হারানো দিনের মধ্যে কী খুঁজবেন তিনি? কিসের প্রত্যাশা? তারপরও সেই সুযোগ আর হবে না। এই বয়সে হারানো দিনের আবেগ আপ্লুত করলেও মন তো ফিরে যেতে সুযোগ পায় না। সেটি কি ঠিক হবে? এখন সামনে রুনার দিন। ওর জন্য অনেক কাজ তার।

একটি টিন-ছাপড়া দেয়া হোটেল ধারে-কাছে দেখতে পেয়ে মেয়েকে শুধোলেন, –

‘ভাত খাবি মা? সকাল থেকে তো কিছুই মুখে তুললি না।’

‘এখন বারোটার সময়? খেতে ইচ্ছে করছে না।’

‘তোর সিরিয়াল আসতে আসতে বিকাল চার-পাঁচটা হতে পারে মনে হয়। মানুষজনের ভিড় দেখেছিস? ততক্ষণ না খেয়ে থাকবি?’

রুনার টেনশন তার বুকে বাজে। বাবাদের বুকে কখনো কখনো সন্তানের পদক্ষেপ শব্দ নিশ্চুপ বেজে ওঠে। মেয়ে তার আত্মা। যেদিন রিনি তাকে কোলে তুলে দেয়, বুঝেছেন জীবনের কোন্ অমৃত-সুধা স্বাদ বুকে স্পর্শ করে গেল। রুনার উজ্জ্বল দৃষ্টি-রংধনু হাসি-আনন্দ ভূবন-মেঘলা আকাশ সব বুঝি তার হাজার বছরের চেনা। শত শত জনমের পরম আরাধ্য। তাই মেয়ের বিন্দু বিন্দু কষ্ট…সকল উপলব্ধি শুনতে পান। বুঝতে পারেন। সে-সবের অভিমান তীব্র বিষাদ তার বুকেও বেজে উঠে। তিনি আর কিছু বললেন না। রুনা বলে উঠল।

‘চলো বাবা তা হলে।’

স্কুলঘর ক্লাসের মতো হাই-লো বেঞ্চ। একটু দূরে তিন মাথার উনুন। তার পাশে বড় টেবিল। সেখানে ভাত-তরকারি-ডালের ডেকচি-কড়াই-ডিশ। ইলিশ কাতলা রুই ব্রয়লার গরুর-মাংস মাটন ডিম সবজি সব আছে। আলু ডাল মাছ ভর্তাও। তিনি ইলিশ মাছের কথা বলে হাত পরিষ্কার করে বসলেন। বাহুল্য খরচ। তারপরও রুনার পছন্দ। কত বছর ইলিশ খান না। প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেন। অল্প বেতন। ইলিশ কেনার সাধ জাগলেও সাধ্য নেই। পারেন না। আজ মেয়ের শুকনো মুখ খুব পীড়া দিচ্ছে। হোক কিছু বাড়তি খরচ। তার মায়ের জন্য কিছু নয়। কিন্তু রুনা খেতে পারল না। দীর্ঘ ট্রেন জার্নি। সিক ফিল, ভাইভার জন্য উদ্বেগ অথবা অসময়ে খেতে বসা কে জানে। তিনি খেলেন। রুনা খেতে না পেরে আধ-খাওয়া টুকরো তার পাতে তুলে দিলে সেটিও খেলেন। নিজেকে তখন অপরাধী মনে হতে থাকে। যদি তার একটি ভালো চাকুরি থাকত, অর্থ-সম্পদ-সাচ্ছন্দ; মেয়েকে ছোট একটি চাকুরির জন্য এত কষ্ট পেতে হতো না। দুঃসাধ্য সাধনের কষ্ট করতে দিতেন না। তার জীবন কেরানির, কলম ঘষে ঘষে আগুন করে ফেলেছেন; সেই আগুনে নিজে পুড়ে চলেন…ভস্ম হন। সেই তাপে প্রাণপ্রিয় সন্তানও রেহাই পায় না। ধিক্ এই জীবন! তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠল। দুর্বল মানুষ। মুখ ঘুরিয়ে গোপনে দুচোখ মুছে নিলেন। তারপর আবার জিজ্ঞাসা।

‘মা মিষ্টি খাবি? নাটোরের কাঁচাগোল্লা দেখছি।’

‘না বাবা তুমি খাও।’

তিনি আর কিছু না বলে বিল মিটিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালেন। মেয়ে পান নিচ্ছে। পান খায় না। নিশ্চয়ই আবার বিবমিষার উদ্রেগ করছে। কী করবেন ভেবে পেলেন না। ধীরে ধীরে হেঁটে অফিসে এসে দাঁড়ালেন। বিশাল কম্পাউন্ড। পশ্চিমে তিনতলা ভবন। সেটির দক্ষিণে গ্যারেজ। কয়েকটি পাজেরো আর টয়োটা স্টারলেট কার। ওপাশে স্টোর আর রিফ্রেসার্স। একধারে প্রার্থনাঘর। শিখরদেশে মার্বেল অথবা অন্যকোনো নীল-সবুজ-ধুসর পাথরের গম্বুজ। সেদিকে দৃষ্টি রেখে অদৃশ্য ঈশ্বরের কাছে কিছু চাইলেন কি? কোনোদিন ডাকেননি। তার নিজের জন্য কোনো চাওয়া নেই। মানুষের দরজায় দরজায় অনুনয়-বিনয় আর ঠোকর খেতে খেতে বিশ্বাস-অবিশ্বাস স্বপ্নদোলা। এই পৃথিবীর সভ্যতায় অন্যায়-অনাচার-অবিচার-অত্যাচার দেখেছেন। চারপাশে দুর্নীতি-লুটপাট-ধর্ষণ-হত্যা কি নেই? নিজেও কি কম অত্যাচারিত বঞ্চিত হন নাই? ঈশ্বর এমন করতে পারেন না। অথবা তিনি কীভাবে সহনীয় থাকেন? বুকে সবটুকু অভিমান আজ শুষ্ক পাথর। সেই পাথরও গলে গেল। আজ তিনি খড়কুটোর মতো ঈশ্বরের সামান্য করুণার জন্য কাঙাল হয়ে উঠলেন।

একপাশে ঘেরা দেয়া বিশাল বাগান। গোলাপ গাঁদা ডালিয়া কত জানা-অজানা ফুল। স্বর্গপুরী। কসমস ফুলগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে আন্দোলিত হয়ে চলে। এখানে ওখানে সবুজ ঘাসের উপর মানুষ-জন গুচ্ছভাবে বসে আছে। কোথাও দাঁড়িয়ে। অনেকেই পরীক্ষার্থি। দু-চারজন অভিভাবক আছেন। ছেলে বা মেয়েকে এসকর্ট করে এনেছেন। তিনি একটু ছায়া-একটু রোদ দেখে কাঁধের ব্যাগ নিচে রেখে ঘাসের উপর বসে পড়লেন। রুনা চলমান মাসের সাধারণ জ্ঞানের পত্রিকা বের করল। ডিসেম্বর মাস। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তলগ্ন-সমাপনী দিনকাল। রাস্তার উপর দিয়ে একটি রিকশা লাউডস্পিকারে দেশাত্মবোধক গান বাজাতে বাজাতে পশ্চিমে চলে যায়। সেই রক্ত-উদ্বেলকারী বাণী আর সুরের মূর্ছনা বাতাসে ধ্বনির তরঙ্গ তুলে তুলে প্রতিধ্বনিত হয়ে আকাশ দিগন্তে মিশে যায়। তার মনে কোনো ঢেউ তরঙ্গ জেগে উঠল কি? আজও কি সেই স্বপ্নদোলা মন রাঙায়? তিনি জানেন না।

একাত্তরের চব্বিশে মার্চ বুধবার দিবাগত গভীর রাতে বাড়ির সামনে সড়কের উপর ভারী বুট শব্দের মিছিল। ‘নারায়ে তাকবির…আল্লাহু আকবার, নারায়ে তাকবির…আল্লাহু আকবার, পাকিস্তান…জিন্দাবাদ।’ মা-বাবা-মামা সকলে ভয়ে-আতঙ্কে বিছানা ছেড়ে তাদের সকলকে নিয়ে বাড়ির পেছনে অন্ধকার-নোংরা-চিপা গলিতে আশ্রয়। শত শত মশার কামড়ে নিশ্চুপ নিঃশব্দ। ঝোপঝাড়। সেখানে তিন কোণায় তিনটি সার্ভিস ল্যাট্রিন। রাতে ঘুরে বেড়ানো শূকরেরা সেই ময়লার মধ্যে গা ভিজিয়ে বসে থাকে না কি কোন্ কারণে হুটোপুটি করে, সেগুলোও থমকে স্তব্ধ হয়ে থাকে। বাতাসে ভাসমান তীব্র দুর্গন্ধ তাদের নাকে এসে হামলে পড়ে না। প্রাণের ভয় জীবনের মায়া বড় প্রভাববিস্তারকারী। সব অনুভূতি উপলব্ধি স্থির হয়ে যায়। যেমন সময় থমকে স্থবির। তেমনকিছু হয়নি। পরদিন আরও কয়েকটি পরিবারের মতো তারা সকলে গ্রামে পালিয়ে গেল। শহরের পরিস্থিতি ভালো নয়। যে কোনো সময়ে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। মানুষের চোখে চোখে অবিশ্বাস…আতঙ্ক। কখনো হন্তারক জিঘাংসা। আস্তিনের পেছন থেকে খঞ্জর বের করে হেনে দেবে পরিচিত বন্ধু মানুষ। তার মহল্লা বিহারি প্রধান। প্রাণের ঝুঁকি বেশি। সুতরাং বাবা কোনো কথাই শুনলেন না। দুঃসম্পর্কে এক চাচার বাড়ি আশ্রয় নেয়া হলো। তারপর সে কি যন্ত্রণা-দুর্ভোগ! বেঁচে থাকবেন কি না, থাকা যাবে কি না, দাফন-কাফনের সৌভাগ্য হবে কি না এসব উদ্বেগ-ভাবনা-আতঙ্কে মানুষের উন্মুখ চোখে চোখে কাতর চাহনি।

তখন কত বয়স তার? এগারো কি বারো। গ্রামের ছায়া ছায়া অন্ধকার আর অনভ্যস্ত জীবনে নিজেকে অনেক কষ্টে মানিয়ে রাখার চেষ্টা। তারপর প্রাণের ভয়। অনাহার অর্ধাহার ইত্যাদি। একদিন সকলের চোখ এড়িয়ে খুব ভোরে নদীর ধারে এসে দাঁড়ালেন। নদী পেরিয়ে এক-দুই মাইল এগোতে পারলে ভারতীয় সীমান্ত। কোনোমতো সেখানে পা রেখে মুক্তিফৌজে নাম লেখাবেন। কিন্তু পারলেন কোথায়? ছোটভাইটি বিনে-চিকিৎসায় ওষুধ ছাড়া ধুকে ধুকে মরে গেছে। নদীর পাড় জঙ্গলে তার নতুন কবর। বাবার দুচোখে ঘুম নেই। সকালে এসে দোয়া-দরূদ পড়েন। ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়। তিনি দেখে ফেলেন। তারপর পেছন থেকে খপ করে হাত চেপে ধরলেন। মা-বাবার জন্য পারলেন না তিনি। ফিরে গেলেন। নইলে মানুষ দুটি মরে যাবে।

বিকেল গড়িয়ে এলে তিনি আরেকবার উঠলেন। হিম-বাতাসের ঢেউ। কাছে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে হয়তো। শীতের মধ্যে বৃষ্টি হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা জাগিয়ে তুলেছে। অফিসে গিয়ে খোঁজ নিলেন। বগুড়া শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ছয়টা বেজে যেতে পারে। যে লোকটি নাম-ক্রমিক ধরে ডেকে উঠছিল, তাকে জিজ্ঞেস করেন, –

‘তা হলে দিনাজপুর রংপুর কি আগামীকাল হবে?’

‘না না, যত রাইত হউক স্যার শেষ কইরবেন। স্যার কাইল তো থাকবেন না। ঢাকা যাইবেন।’

‘কীভাবে যাবেন? ট্রেন-বাস-প্লেন তো…।’

‘আ রে জ্বালা! সাহেবেরা কি এসবে যাতায়াত করেন? সরকার গাড়ি দেছেন কি কইরতে?’

‘তাই তো…তাই তো!’

তখন যুগপত দৃষ্টিতে দুটি বিষয় আছড়ে পড়ে। বিভাগীয় কমিশনার শামসুল হক’এর নেমপ্লেট। নামটি চেনা চেনা। দ্বিতীয় বিষয় প্রতিবেশি এক যুবক। সে এগিয়ে আসছে। তার সঙ্গে অন্য একজন। হয়তো বন্ধু।

‘আঙ্কেল…আপনি এখানে? কে পরীক্ষা দিচ্ছে?’

‘রুনা। তুমিও ক্যান্ডিডেট নাকি?’

‘উঁ না না মানে হ্যাঁ আঙ্কেল। স্যার আমাদের সদরে ছিলেন না, আব্বুকে বলেছিলেন যেন অ্যাপ্লাই করি।’

‘ও! তা হলে তো তোমার বাবার জানাশোনা অফিসার।’

‘সেই সূত্রে কথা বললাম সকালে। বাবা একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কড়া মানুষ। পড়ে দেখলেন না। তেমন করে কথাও বললেন না।’

‘মেধাবান নীতিবান মানুষ। না হলে এত উপরে উঠে যেতে পারেন!’

সাদিকের বাবা সরকারি কর্মচারি। তার হাত দিয়ে বিবিধ ফাইল নড়াচড়া হয়। অনেক ক্ষমতা। পেছন বাড়ির সেই লোকের কাছে যখন তখন অনেক মানুষ-জন আসে। তারা নিশ্চয়ই হাওয়া খেতে আসে না। কাজ করে নিতে। কাজের বিনিময়ে কিছু পাওয়া যায়। অথবা ফেলো কড়ি মাখো তেল। তাই সামান্য অবস্থা থেকে শহরে দুটি বাড়ি, গ্রামে জমিজমা ইত্যাদি এলাহি কাণ্ড করে নিতে বেশি দিন লাগেনি। এসব ভেবে তার মন এতটুকু হয়ে গেল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, –

‘আমাদের সদরের জন্য কয়টি পোস্ট?’

‘শুনেছি চারটি। এরমধ্যে মন্ত্রীর একজন আছে। বাকি থাকল তিন। যাদের চাকরির আবেদন বয়স শেষের দিকে তাদের প্রিফারেন্স আছে। বিভিন্ন কোটা, মুক্তিযোদ্ধা, তাদের ছেলেমেয়ে-নাতি-নাতনি, প্রতিবন্ধী আর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা। তবে আঙ্কেল মহিলা কোটাও আছে। রুনা তো অনেক মেধাবী। একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো। আঙ্কেল আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা না? চেষ্টা করে দেখেন। ’

‘আর সেই চেষ্টা!…শুরু হবে কখন?’

‘এই তো আর তিন-চারজন আছে। তারপর টি-ব্রেক। মাগরিবের পরপর শুরু হয়ে যাবে মনে হয়।’

সাদিক বেশ হাসিখুশি। আনন্দ-উচ্ছল। সে চলে গেলে তিনি ক-মুহূর্ত সন্দেহদোলা হতাশায় স্থির থমকে থাকলেন। সব অহেতুক। তারপর ফিরে এসে এই কথা বলবেন কি না ভাবতে ভাবতে অথবা বেখেয়ালে বলে ফেললেন। সতর্ক ছিলেন না। মেয়ের মন খারাপ হতে পারে। তখন আকাশে ছায়া পড়ে গেছে। সন্ধে নামছে। একেবারে ডালপালা ছড়িয়ে। রুনার কোনো ভাবান্তর বা প্রতিক্রিয়া তার চোখ এড়িয়ে গেল। নিজেকে কোনোদিন অন্যের সঙ্গে তুলনা করেননি। আজকাল করেন। মন খারাপ হয়। কোথায় তার অযোগ্যতা? এসব কথা আর ভাবনার মধ্যে হুড়মুড় করে অন্ধকার নেমে আসে। রাত। শীতের দিন যত ছোট…রাত দীর্ঘ প্রলম্বিত। এবার শুরু থেকে যে চিন্তা মাথায় ঘুরঘুর ব্যতিব্যস্ত ছিল, বুকে হামলে পড়ে খোঁচাতে লাগে। কোথায় থাকবেন? ভাইভা শেষ হতে হতে রাত নয় দশ অথবা তারও বেশি হয়ে যাবে। অনেকদিন আগের চেনা তার এই অচেনা শহরে নিরাপদে রাত কাটানোর জায়গা নেই। তিনি একলা হলে ভাবনা-দুর্ভাবনা ছিল না। এবার তো মেয়ে রয়েছে। সকল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তাকে ঘিরেই।

যখন ইউনিভার্সিটি পড়তেন, রাস্তা-সড়ক বিভিন্ন বিল্ডিং জনমানুষ এত ভিড় আর কোলাহল ছিল না। বিভাগীয় শহর হলেও মফস্বলের লাজুক-লাজুক পরিবেশ। আজ অটোতে বসে শহরের বিস্তৃত রাস্তা, সুউঁচু ভবনের সারি, বিশাল বিলবোর্ড, মানুষের গতিময় চলাচল আর ব্যস্ততা দেখে অবাক-বিস্মিত। সব কেমন অদ্ভুত। কর্পোরেট কালচার। সেই চেনা গাছপালা ফুলের বাগান ফুটপাতের দোকান কিছু নেই। নির্জন সময়ের মানুষ ব্যস্ত কোলাহলে আছড়ে পড়ে চোখ-মুখ উদভ্রান্ত করে ফেললেন। কী করবেন? আজকের রাত কোথাও তো কাটাতে হবে। হোটেলগুলোয় মানুষের ভিড়। আসার পথে কখনো সেগুলোতে দৃষ্টি দিয়েছেন। রিসিপশন বা আশপাশে এমন সকল মানুষ-জন, দেখলে বুকে ছলকে আতঙ্ক এসে যায়। সেগুলো কতটুকু নিরাপদ? আজকাল হোটেলগুলোয় কি না হয়! কেউ যদি একটি ছুরি বুকে চেপে ধরে, উপায় কি? তার বুকে ভয়ের হিমস্রোত। সকাল সকাল ভাইভা হয়ে গেলে তো কোনো সমস্যা নেই ট্রেনে চড়ে বসবেন। যদি না হয়…তা হলে কী করবেন? শেষে স্টেশন প্লাটফরমে বসে থাকবেন না কি? সেখানে জনসমাগম…হয়তো তেমন ভয় নেই। তারপর কি ভাবনায় ব্যগ্র হয়ে দৃষ্টিসীমায় সাদিককে খুঁজতে লাগলেন। ছেলেটি হয়তো একটু দিশা দিতে পারে। একটু নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা। তাকে দেখতে পেলেন না।

দিনাজপুর হতে আগতদের ভাইভা শুরু হলো আটটার দিকে। ততক্ষণে অফিস কম্পাউন্ডের বাহির আঙিনা প্রায় ফাঁকা। অনেকেই এসে বসেছে ভেতরের হলরুমে। সেখান থেকে উপরে উঠে যাওয়ার সিঁড়ি। সেখানের কোনো একটি রুমে পাঁচ সদস্যের ভাইভা বোর্ড বসেছে। হলরুমের একটি প্রান্ত থেকে সেই সিঁড়ি দেখা যায়। রুনার সিরিয়াল আসতে আসতে আরও কুড়ি-পঁচিশ মিনিট চলে গেল। তিনি সিঁড়ির দিকে ভালো করে তাকানো যায় এমন জায়গায় গিয়ে বসলেন। মেয়ে তার সেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাবে এমন আকুল প্রত্যাশা বুকে গুনগুন করে ওঠে। মেয়ের হাতব্যাগ আর চাদর কোলে ধরে রাখলেন। ট্রাভেলিং ব্যাগ পায়ের নিচে চেয়ারে কাছে রয়েছে। ইতোমধ্যে মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে। সকল ক্যান্ডিডেট বিভিন্ন উপজেলার। একেকজন প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট। কেউ পাঁচ মিনিটেই বের হয়ে আসছে। তখন কেউ কেউ তাকে ঘিরে ধরে। ‘কি কি জিজ্ঞেস করছে?’ অনেক প্রশ্ন। জানা-অজানা উত্তর। কেউ ভাইভা শেষ করে আর তেমন দাঁড়ায় না। চলে যাচ্ছে। সকলকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। সারাদিনের প্রতীক্ষা আর ক্লান্তি অবসর-বিশ্রাম চায়। তাকেও ভাইভা শেষ হলে মেয়েকে নিয়ে কোনো আশ্রয়ে যেতে হবে। কোনো ভালো আবাসিক হোটেল ছাড়া উপায় কি! তিনি এই অবসরে মনে মনে একটি ছক কাটতে শুরু করলেন। তখন পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল।

‘স্যার ভালো আছেন? আপনার মেয়ে ভাইভায় গেছে না?’

‘হ্যাঁ…এই মাত্র গেল। আপনি?’

‘আমার নাম মুস্তাফিজ। ফুলবাড়ি।’

‘কয়জন নেবে জানেন?’

‘শুনছি তো চার-পাঁচজন। এরমধ্যে একজন ফাইনাল হয়ে আছে। সকালে স্যারের সাথে দেখা করেছে। চার-পাঁচ লাখ দেয়া-নেয়াও নাকি হয়েছে। মন্ত্রীর ক্যান্ডিডেট।’

‘মন্ত্রীর লোক…তারপরও টাকা! কে সেই ভাগ্যবান?’

‘আপনি চিনবেন? ওখানকার এক কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপালের ছেলে রফিকুল।’

‘চিনি না। আপনিও ভাইভায় এসেছেন…সিরিয়াল কখন?’

‘আমি ক্যান্ডিডেট না স্যার। রফিকুলের বন্ধু। ওর ভাইভা হয়ে গেছে। রেজাল্ট নিয়ে যেতে হবে। তাই বসে আছি।’

‘ও।’

‘স্যার আপনি কি মুক্তিযোদ্ধা?’

তিনি জবাব দিতে পারলেন না। বুকে হতাশার ডালপালা অন্ধকার ছায়া ঝুলিয়ে দিয়েছে। ঝাপসা হয়ে গেছে আলোকিত অন্ধকারের চারপাশ। কী করবেন? একটি স্বাধীন দেশ। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে নতুন মানচিত্র। মুক্তির নতুন বাতাস। অথচ তিনি কিছু করতে পারলেন না। সে-সময় পাকিস্তানি আর্মি কিংবা বিহারিদের দিকে দু-চারটি ঢিল মারলেও মনে কিছু সান্ত¡না থাকত। চাই কি একটি সার্টিফিকেটও পেয়ে যেতেন। নিজের অনেক সুবিধে হতো। মাস গেলে একশ চোদ্দ টাকায় পয়ত্রিশ কেজি চাউল, ত্রিশ কেজি গম, পাঁচ কেজি চিনি আর আট কেজি করে সয়াবিন মসুর ডাল পেতেন। ভাতা হিসেবে মাসে নগদ দশ-বারো হাজার টাকা। সন্তানের চাকুরি। তার সন্তানের। তিনি তবে কী করলেন? বিহারিরা পর্যন্ত নানান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে গেল, তিনি কিছু করতে পারলেন না।

শহর ছেড়ে গ্রামে পালালেন। পঁচিশে মার্চ, বৃহস্পতিবার ঢাকায় নেমে এলো অন্ধকার কালো রাত। পাকিস্তান আর্মি গণহত্যা শুরু করল। তাদের এককথা ‘আদমি নেহি…মিট্টি চাহিয়ে। নারায়ে তাকবির…আল্লাহু আকবার। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

মানুষ প্রাণের ভয়ে ঘর-দোর-ধান-গরু-সহায়-সম্পদ সবকিছু ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে। দিনাজপুর সীমান্ত জেলা। মানুষ দলে দলে, কখনো একলা যে যা পারে হাতে ধরে হাতে নিয়ে উত্তর-দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ছুটছে। মা-বাবা আর ভাই-বোনের সঙ্গে তিনি ছুটলেন পুবে। সময় তারিখ সকাল নয়টা, তেরোই এপ্রিল; মঙ্গলবার। দুঃসম্পর্কের এক চাচার আশ্রয়ে। তিনি এবং তার পরিবার বেঁচে আছেন কি না সেও অজানা। সৈয়দপুর আর পার্বতীপুর থেকে হাজার হাজার বিহারিসহ পাকিস্তানি আর্মি দশ-মাইল দিয়ে শহরে প্রবেশ করছে। দুম দুম করে মর্টার শেলে কেঁপে উঠছে মাটি। আকাশে কালো ধোঁয়ার ছায়ামেঘ। দেখতে দেখতে নিরিবিলি সাধারণ ছোট শহর হয়ে গেল থমথমে আতঙ্কের বিরান এলাকা। শহরে লুকিয়ে থাকা বিহারিরা গরু-ছাগল জবাই করা ছুরি, চাকু, বল্লম নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। তারপর আর্মির সঙ্গে যোগ দিয়ে বাঙালির ঘরে ঘরে আগুন জ্বালাল, লুটপাট করল, যারা থেকে গিয়েছিল; হত্যা করল। নারীদের তুলে নিয়ে গেল। এদের অনেকেই মানুষ হত্যা করে শরীর থেকে দুল-চুড়ি-চেইন-ঘড়ি বিবিধ অলংকার খুলে নিতে ছাড়ল না। এই গল্প শোনা নয়, মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সেই গল্প গ্রামের মানুষেরা নিশ্চুপ গোপনে বসে বসে করে। তিনিও সেই গল্প শুনেছেন। দেখেছেন। দেশ স্বাধীনের পর ফিরে এসে পেয়েছেন প্রমাণ। তাদের বাড়ির কোনোকিছুই আর ছিল না। বিহারিরা আম-কাঠাল কাঠের দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে। তাই নয়, গরুকে পানি খাওয়ানোর আধভাঙা বালতি সেটিও প্রতিবেশি বিহারির উঠোনে পড়ে থাকতে দেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের এই কয়েকটি মাস ছিল ভয়াবহ আতঙ্কের মৃতপ্রায় জীবন। ঘোর গ্রাম। থানা থেকে কুড়ি-পঁচিশ মাইল দূরত্ব। ভালো যোগাযোগ নেই। তারমধ্যে কাঁচা-আধাকাঁচা রাস্তায় তিনটি নদী বা খাল। ঝুম ঝুম বরষা। পাক-আর্মি বিহারিদের সঙ্গে নিয়ে হানা দেয়। মধ্যরাতে তাড়া করে। হুঙ্কার ছুড়ে: ‘নারায়ে তাকবির…আল্লাহু আকবার। পাকিস্তান…জিন্দাবাদ।’ তারপর খড়ের গাদায়, ঘরের চালে আগুন দেয়। মানুষ ধরে। তাদের চিৎকারে আকাশ প্রকম্পিত। হুঙ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মারধর। ‘শালে লোগ আব তুমহারা মাজাবার বাবা কিদার হ্যায়? বোলো বোলো জেয় বাংলা বোলো…মাদারচোদ। সব শালে মালাউন…মালাউন হ্যায়। মারো শালে লোগকো।’ এরপর বেয়োনেট চার্জ। আচমকা গুলির শব্দ। প্রাণ ছেড়ে যাওয়ার আর্তচিৎকারের মধ্যে হারিয়ে যায় ভয়ার্ত মিহি ক্রন্দন। কিশোরী-যুবতী-বয়স্ক নারী কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পায় না। পাক-আর্মি আর বিহারিরা অকুস্থলে মাতোয়ারা হয়। কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। দলবেধে একে একে সাচ্চা মুসলমান বাচ্চা পয়দা করার ঈমানি কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই গ্রাম আর নিরাপদ থাকে না। নিরাপত্তা কোথায়? হায়েনারা ছড়িয়ে পড়েছে ধন-ধান্যে পুষ্পে ঘেরা আঙিনার সর্বত্র। এরমধ্যেই বেঁচে থাকার আকুলতা। গ্রাম ছেড়ে শহরে ফিরে এলো তারা। ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে যুদ্ধে নেমে পড়েছে। পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ। কিছুদিনের মধ্যে বেতারে ভেসে এলো সেই ঘোষণা। ‘মানিক শাহ্-কি এ্যয়লান…হাতিয়ার ডাল দো।’ এই একটি প্রত্যাশার বাণী শোনার জন্য কত না গোপনীয়তা! কত না সতর্কতা! অবশেষে দেশ স্বাধীন হলো।

ভারতীয় আর্মির গাড়ি খানপুর সীমান্ত দিয়ে শহরে এসে পড়েছে। ট্রাকের উপর মুক্তিযোদ্ধা। তাদের কারও কারও গালভর্তি দাড়ি। মাথায় লম্বা চুল। গলায় গামছা। হাতে চকচকে অস্ত্র। উৎফুল্ল জনতার সঙ্গে কোলাকুলি। ট্রাক মিছিলের উপর থেকে আনন্দ বিস্ফোরণ। শত শত গুলির গগনবিদারী আওয়াজ। ‘জয় বাংলা…জয় বাংলা…জয় বাংলা।’ সেই শ্লোগানে তারও কণ্ঠ ছিল। মুক্তিযোদ্ধার আনন্দ-কণ্ঠের মধ্যে মিলেমিশে গিয়েছিল। তিনি গলির মাথায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শত যোদ্ধার উল্লাস তরঙ্গ নিজের বুকের মধ্যে প্রতিধ্বনিত করেছেন। ঢেউ তুলে ভাসিয়ে দিয়েছেন সকলের বুকে। সেখানে বিষাদের সুরও ছিল। ট্রাকের উপর যখন সাবু, বাচ্চু, নাজিম আর সে-সব সহপাঠিদের দেখেছেন, যাদের হাতে রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি, কারবাইন আর কি কি সব নাম জানেন না, তারা খেলনার মতো আগুন ছড়িয়ে দেয় আকাশে, সেই শব্দতরঙ্গ তার মনেও উদাসী বাতাস হয়ে দোলা দিয়েছে। তিনি হয়তো যুদ্ধে যেতে পারতেন। কেন গেলেন না?

তখন বোঝেননি একটি সার্টিফিকেট জীবনের মোড় পালটে দিতে পারে। অসীম ক্ষমতা সেটির। তার এই নিরানন্দ-অনিরাপদ জীবন আর বেঁচে থাকায় কাঙ্ক্ষিত অনেককিছু হাতে পেতেন। ছাত্র হিসেবে খারাপ ছিলেন না। তার কিছু হলো না। এসব তাল-বেতাল ভাবনার মধ্যে আকস্মিক বাঁ-হাতের কবজি উপরে তুলে ধরেন। নয়টা বেজে পনেরো পেরিয়ে গেছে। রুনা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে পাশে ধপ করে বসে পড়ল। তিনি ভাবনা বিধুর বিষণ্নতা এড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, –

‘কেমন হলো মা?’

‘চারটি অঙ্ক দিয়েছে। সব ঠিক করেছি। ট্রান্সলেশন চারটি বাক্য। তিনটি ঠিক হয়েছে। আর দিনাজপুরে এলএসডি গোডাউন কয়টি? দেশের মোট খাদ্য চাহিদার কতটুকু অংশ দিনাজপুর থেকে আসে…হয়নি। আমার কাছে যে তথ্য ছিল, সেগুলো নাকি গত বছরের। এইসব প্রশ্ন। বাবা আমাদের সদরে খাদ্য গোডাউন কয়টি? গম কেনার জন্য কতটুকু মাত্রার ময়েশ্চার গ্রহণযোগ্য? জানো?’

‘সে তো মা জানি না।’

‘তা হলে কী জানো তুমি বাবা? একটি মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটও তোমার নেই। তুমি কেন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারোনি বাবা? কত সহজে একটা চাকুরি হতো আমার।’

তিনি আর কী বলেন? মেয়ের কষ্ট তার বুকে অগ্নুৎপাতের হলকা হয়ে নিশ্চুপ আঘাত করে গেল। কথা আছে…হয়তো কথা নেই। তিনি ‘টু’ শব্দ করতে পারলেন না। অনেকসময় নিজেকে বাধ্য করে নীরব রাখতে হয়। মেয়ে খুব কষ্ট করে। পড়ালেখায় কোনো ক্লাসে প্রথম বই দ্বিতীয় হয়নি। রাত জেগে জেগে শুধু পড়ে আর পড়ে। একটি কাজ পাওয়ার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম। অথচ মেধায় নয়, কোটার জন্য পেরে উঠছে না। এ কোন্ দেশে বসবাস করেন তিনি? এর জন্যই মুক্তিযুদ্ধ? তার দুচোখ বাইরের অন্ধকারের মতো ঝাপসা হয়ে গেল।

‘চলো বাবা, ফেরার তো ট্রেন বা বাস নেই। আমাদের আত্মীয়-স্বজনও এখানে নেই। কোথায় থাকব?’

‘কোনো হোটেল বোর্ডিং-এ উঠতে হবে…উপায় কি।’

তিনি হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা ব্যাগ তুলে নিলেন। কেন জানি অনেক ভারী মনে হতে লাগল। জীবন আর অস্তিত্বের এই যাত্রাপথে ব্যর্থ বিষাদের মতো বহন-অক্ষম আর কিছু নেই। এখন কোনো আবাসিক হোটেলে আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু কোনটি নিরাপদ ভেবে স্থির করতে পারছেন না। সেদিন পত্রিকায় দেখেছেন, মা-বাবাকে বেঁধে যুবতী দুই মেয়েকে ধর্ষণ। তখন তেমন ভাবেননি। আজকাল দেশের আনাচে-কানাচে হরহামেশা এসব ঘটছে। এখন কেন জানি অচেনা অজানা ভয় বুকে চেপে বসে হাত-পা ঠান্ডা করে দিতে লাগল।

‘বাবা আগে ভাত খাব…খুব ক্ষুধা লেগেছে।’

‘সকাল থেকে তো প্রায় না খাওয়া মা। চল একটি রিকশা নেই।’

এরপর শহরের আলোকিত জনমানুষ ব্যস্ত রাস্তায় একজন পিতা তার আদরের মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে ফিরে চলে।

 

[email protected]

Facebook Comments

One Comment:

  1. সুন্দর লিখেছেন, ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *