সাখাওয়াত টিপুর ভাষাপ্রকল্প: তত্ত্ব ও প্রয়োগের ধর্ম


শাহমান মৈশান

ব্যক্তির সৃজনীপ্রতিভায় উৎপাদিত ভাষার সাথে অধিপতিশীল ক্লিষ্ট ভাষার বিরোধিতার মধ্যে জনগণের জীবন ও অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক ভাষার একটি জটিল ও বহুমুখী বাস্তবতায় কবি সাখাওয়াত টিপুর কবিতা তথা ভাষা বিচার্য। ‘এলা হি বরষা’ (২০০২), ‘যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে’ (২০০৪), ‘শ্রী চরণে সু’ (২০০৭) এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের একটি বৈশিষ্ট্যময় ভাষাপরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে কবি টিপুর চতুর্থ কাব্যবহি ‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’ এই চার সহি কিতাবের মাধ্যমে টিপুর ভাষাপ্রকল্প পরম্পরায় প্রমূর্ত হয়।

‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’ নামমহিমায় মূর্ত কবি টিপুর ভাষাপ্রকল্পটির পরিপূরক ও সম্পূরক দুটি যুগপৎ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হতে পারে। প্রথমত, সাখাওয়াত টিপুর কাব্যশৈলী। দ্বিতীয়ত, কবির সামগ্রিক ভাষাপ্রকল্প তথা দর্শন। টিপুর কাব্যশৈলী গড়ে ওঠে প্রচলিত শব্দের সমাজ থেকে চরিত শব্দের অপ্রথাগত ভাষা অর্জনের মাধ্যমে।

দৃষ্টান্ত:

আমি আমি আর আমি
আমার স্বামীর নাম আমি
আমি নামে কাল পর্বে
আমি উঠি কাল পর্বে

[সূত্র: তিন চিল্লা (২. বেটা ত্রৈলোক্যনাথ), বুদ্ধিজীবী দেখ সবে, পৃ. ১১]

কবির বিবৃত ‘আমি’ বাংলাভাষার সমাজে এর অহংতাড়িত দ্যোতক। কিন্তু টিপুর বিন্যস্ত শব্দ সৃষ্ট বোধের দ্যোতনায় সামাজিক উৎসের অর্থ হারিয়ে ফেলে। উৎসগত অর্থকে কবি খারিজ করেন সামাজিক অর্থের আধিপত্যকে প্রতিরোধের তাড়নায়। একাধিপত্যকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী বিশ্বায়িত পৃথিবীর কর্পোরেট অহংকে প্রতিরোধের বাসনায় কবি ‘আমি’কে দ্যোতিত করেন। সময়হীনতা ও সমষ্টির অনস্তিত্বকে বিদ্যমান করার তীব্র লক্ষ্যে। এই বিশিষ্ট লক্ষ্যতাড়িত শব্দের বিন্যাস টিপুর কবিতাকে ভাষার সমাজ থেকে বিচ্যুত করে। আর এই বিচ্যুতি হল কবির মুকুট। বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে কর্পোরেট আধিপত্য দ্বারা ছিনতাই হওয়া শব্দ ও সমাজকে বিনির্মাণে ব্রতী হন কবি সাখাওয়াত টিপু। তাই সমাজে বিদ্যমান ‘আমি’ আত্মকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্নতাকে দ্যোতিত করে। আর টিপুর ‘আমি’ ত্রিকালভিত্তিক সমষ্টির অস্তিত্বের প্রবাহকে একটি একক রাশির দ্যোতনায় পুনঃসংজ্ঞায়িত করে। এভাবে কবিতার মধ্য দিয়া ‘আমি’ অহংকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মানুষের প্রতি পরম আবেগে অহং বর্জিত অহংকে ক্রমাগত সম্প্রসারনশীল দ্যোতকে পরিণত করে।

নব্বইর দশকে নতুন কবিতার সন্ধানে যে-কাব্যযাত্রা শুরু হয় তা মূলত জীবনানন্দীয় লিরিসিজমের পৌনঃপুনিক বৃত্তেই আবদ্ধ হয়ে থাকে। অভিজ্ঞতার সুনির্দিষ্টতাকে বা পার্টিকুলারিটিকে ভিত্তি করে দার্শনিক ধারনা সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন কবিতা কিংবা সার্বিক কাব্যভাষা নির্মাণের লক্ষ্যে দ্রোহী অভিযাতিকদের মধ্যে ব্যতিক্রম হয়ে ওঠেন সাখাওয়াত টিপু। শব্দের উৎসগত বিদ্যমান অর্থকে খারিজ করার দোলাচল ভিত্তিক খেলার মধ্য দিয়া টিপু এমন এক গীতিময়তা সৃষ্টি করেন যা জীবনানন্দীয় বিষণ্নতা কিংবা রূপসী বাংলার মোহমুগ্ধ গীতিময়তা থেকে সরে আসা মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যধারার গীতিময়তার পুনঃনির্মাণ কিংবা বিনির্মাণ হয়ে ওঠে। বহিরঙ্গের দিক থেকে টিপুর বিশিষ্ট গীতিময় শব্দের বিন্যাস এমন একটি সুবাধ কাঠামো সৃষ্ট করে যা মূলত মধুসূদন, সুধীন্দ্রনাথ, আল মাহমুদের উত্তরাধিকার বাহিত। টিপুর কবিতায় উপযুক্ত উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যের পরম্পরায় নির্মিত।

দৃষ্টান্ত:

‘কী তার সচল রূপ দোজখের ওম
দুহাতে রেখার জাল পাতিল পরম’
মীনের সুরত আপনে পরানে পরশ
নিখিল নিখিল ডাকে দেহের আরশ

[সূত্র: কিরোর বউ (ঔ), বুদ্ধিজীবী দেখ সবে, পৃ. ৪৪]

শব্দের পান (pun) ও অনুপ্রাসের প্রয়োগ টিপুর কাব্যশৈলীর আর দুই প্রফুল্ল নির্ণায়ক।

যেমন:

বলি লাবণ্য লাবণ্য
সে কে? কার অন্য

(সূত্র: রাম কানাই, বুদ্ধিজীবী দেখ সবে, পৃ. ৪০)

কিংবা:

সহমিয়া সাজে
কমল মগজে
রজ কী না কানায় কানাই!
(সূত্র: প্রাগুক্ত)

লাবণ্য একই বানানযুক্ত হলেও অর্থ দ্যোতনায় অ্যামবিগুইটি বা দ্ব্যার্থকথা সৃষ্টি হয়। লাবণ্য ব্যক্তিবাচকতা ও ব্যক্তির গুণবাচকতার দুটোরই দ্যোতক হয়ে একাধিক অর্থদ্যোতনা নির্মাণ করে। আবার, ‘কানায়’ ও কানাই’ ভিন্ন বানানময় হলেও অনুপ্রাসশক্তির মাধ্যমে অর্থের কিনারা প্লাবিত হয় অর্থের অসহজ জলের স্রোতে। এভাবে, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, উপমা ও ছন্দ বৈশিষ্ট্যে আত্মীকৃত দক্ষতার মধ্য দিয়ে টিপুর কাব্যশৈলী গঠিত হতে থাকলেও শেষ বিচারে কবির এই কৌশল বা দক্ষতাই কবিকে কবি করে তোলে না। জ্ঞানের মারফতে জগৎ-বিচার কবিকে ক্রমাগত কবি বানায়। আর এখান থেকেই শুরু হয় সাখাওয়াত টিপুর কাব্যকৌশল অতিক্রান্ত ভাষা-প্রকল্প। টিপুর কৌশল বাহিত আঙ্গিকই মুখ্য নয়। নিরীক্ষা ও স্থিরীকৃত নির্মাণ টিপুর আঙ্গিককে সুগঠিত করলেও আঙ্গিকের অন্তর্গত বোধ, সমপ্রসারিত অর্থে চেতনা, আরো সমপ্রসারণশীল গভীরতার অর্থে দর্শনই মুখ্য মুখ এবং মুখের পাতাল।

সাখাওয়াত টিপুর চতুর্থ ভাষা-প্রকল্পের দার্শনিক ধারাটি গড়ে ওঠে বুদ্ধিজীবীকেন্দ্রিক একটি প্রত্যয়কে অবলম্বনের মাধ্যমে। প্রকৃতি, বস্তুবিশ্ব এবং রাষ্ট্র ও সমাজের কোন বিষয়গুলোর সহযোগিতায় কাতর হবেন একজন কবি শুধু তাই জানেন না। আর শুধু তা জানলেই চলে না। বিরোধিতার ভাষা ও বিষয়কেও একজন কবির জানতে হয়। বুদ্ধিজীবীকেন্দ্রিক প্রত্যয়টিকে ঘিরে টিপুর জ্ঞান, এস্টিমেট গড়ে ওঠে বিরোধিতার জ্ঞানে। বিরোধিতা শুধু সমালোচনা নয়। সমালোচনা শুধু মস্তিস্কের গভীর আঙ্গিনায় চিন্তাশীল চিন্তামাত্র নয়। সমালোচনা একটি কর্ম বা প্রয়োগ। তাই টিপু প্রয়োগের ভাষায় বিরোধিতা থেকে প্রতিরোধের স্তরে উত্তীর্ণ হন। বিরোধিতার ভাষায় সৃষ্ট সমালোচনার প্রয়োগ কেন্দ্রিক উত্তরণ শেষপর্যন্ত মোকাবিলার একটি ক্ষেত্র বানায়, শানায়। টিপুর এই দ্বন্দ্ব বা মোকাবিলা বা ডায়ালেকটিকসের বিপ্রতীক প্রত্যয় হল আন্তোনিও গ্রামশি কথিত প্রথাগত বা ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল। আমরা এখানে ট্র্যাডিশনালিটিকে চিহ্নিত করতে পারি টিপিক্যালিটি হিসেবে। বুদ্ধিজীবীর এই টাইপ সামন্ততান্ত্রিক সমাজে সামন্তপ্রভূর মোসাহেব বৃত্তির অনুকরণে রাষ্ট্রের তোষক, কর্পোরেট পুঁজির পালিত বুদ্ধিজীবীর স্বার্থপূর্ণ ঐতিহ্যের পরম্পরায় শ্রেণীচরিত্র দ্বারা নির্মিত হয়। এই টাইপ বুদ্ধিজীবীতার বিরোধিতা ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে টিপুর দ্রোহী কাব্যভাষাপ্রকল্প কিংবা প্র্যাক্সিস অব পোয়েটিক্স গড়ে ওঠে। টিপুর প্রতিরোধের শব্দে বিদ্ধ বুদ্ধিজীবীকে দুটো পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করা যায়।

দৃষ্টান্ত:

টেকা দিয়া কিনে রাখো
বুদ্ধিজীবী ঘরে
অর্থ কাম ধর্ম নাম
পাবে হস্ত ভরে

(সূত্র: তিন লোকের হিতোপদেশ, বুদ্ধিজীবী দেখ সবে, পৃ. ৫)

এখানে লক্ষনীয় যে কবি ক্রয়যোগ্য একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীকে দ্যোতিত করছেন। যদিও এরা বিশেষ শ্রেণীভুক্ত কিন্তু টিপুর ভাষাপ্রকল্পে বুদ্ধিজীবীর শ্রেণীবিভাজন লুপ্ত হয়। বুদ্ধিজীবীতাকে অবলম্বন করে গণবিচ্ছিন্ন আত্মকেন্দ্রিক, পররসগোল্লাভোগী বুদ্ধিজীবীদের কোন শ্রেণী নেই, বিশেষ নেই, নির্বেশেষ।

কাঁচাবাজারে পতিত এই বুদ্ধিজীবীরা সরকার, গণমাধ্যম পুঁজিকেন্দ্রিক কিন্তু আধ্যাত্মিকতাবর্জিত রাজনীতিলিপ্ত বহুস্তরায়িত ক্ষমতা সম্পর্কেও মানদণ্ডে হয়ে ওঠে পরাক্রমশীল ও পরিব্যপ্ত অস্তিত্বের অধিকারী। সাবান-শ্যাম্পুর প্লাস্টিক প্যাকেটে পরিণত বুদ্ধিজীবীর এই সমাজকে ছদ্ম ও অজৈবনিক-অজৈবিক হিসেবে চিহ্নিত করেন সাখাওয়াত টিপু। টিপুর চিহ্নায়নে সূচিত হয় নাস্তি, নঞর্থকতা, নেগেশন। কাব্যভাষার টিপিক্যাল সমাজের কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে ধূমকেতু টিপুর ভাষাপ্রকল্পে হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক ‘না’। ‘না’ মানে অস্বীকার ও প্রতিরোধ। বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, আধ্যাত্মিকতা এবং এই দেশের ভূমি ও স্বপ্নঘনিষ্ঠ জীবনের যাপন ও যুদ্ধের স্পিরিট থেকে বিচ্ছিন্ন মেট্রোপলিটান সু[দুঃ]শীল সমাজের বিরুদ্ধে নিজস্ব কাব্যধর্ম নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে টিপুর রাজীনতিক পর্যটন আরো অগ্রসর হতে থাকে। এই অগ্রসরতা চূড়ান্ত রূপ নেয় একটি বিশেষ প্যারাডাইম নির্মাণের মধ্য দিয়ে। জীবন-বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিজীবী সমাজের বিরুদ্ধে টিপু এক নতুন প্যারাডাইম চিহ্নিত করেন। এই প্যারাডাইম ‘আহমদ ছফা’।

টিপুর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বুদ্ধিজীবীদের বিকল্প অভিজ্ঞতা হিসেবে আহমদ ছফা চিহ্নিত হন। তবে টিপুর ভাষা শেষপর্যন্ত মতাদর্শিক। সাখাওয়াত টিপুর মতাদর্শ ভাষার মধ্য দিয়া গড়ে ওঠে। এ ভাষা হল কবিতার ভাষা। টিপুর কাব্য ও ভাষা তাই রোমান্টিক নয়। জগৎ ও জীবনকে নির্ণয় করার ভাষা। টিপুর কবিতা তাই তত্ত্বজ্ঞেয় প্রজ্ঞার ভাষা হয়ে ওঠে, রাজনীতি হয়ে ওঠে, শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠে মতাদর্শ, কাব্যভাষার সংখ্যালঘু। কিন্তু এই লঘুত্ব এক প্রকার ঝাঝাঁলো অস্তিত্ব ও ক্ষমতা অবশেষে যা মানুষ ও মনের পক্ষে যেতে থাকে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *