ফকির ইলিয়াস

মে
18

কবিতার গ্রাফগদ্য

ফকির ইলিয়াস

নৃত্যবান্ধব নদী ও নামগুলোর এক্সিট

নৃত্যবান্ধব নদীর মুখ দেখে শুরু হয় আমার যাত্রা। এর আগে যারা চিনেছে দূরের পথ, তাদের ধূসর ছবি দেখে আমি থামিয়ে দিই প্লটযুদ্ধ। মাটির প্রয়োজন কমে যাবার পর আমারও মন ছুঁতে চেয়েছে কেবলই শূন্য আকাশের ভিত। আর খোপের জীবন ভালোবেসে নিজেকে বার বার সাজিয়েছি চিলেকোঠার সেপাই। পাই পাই করে জমানো পুঁজি দিয়ে কিনে নিয়েছি কৃত্রিম আঁধার। দিনের বেলায় ঝাড়বাতি জ্বালিয়ে মুখ দেখার গরল সংস্কৃতি! এভাবে হাঁটা যায় জানি, তবে পথ অতিক্রম করা যায় না। ‘সহজ’ নাকি ‘সঠিক’ এক্সিট চেয়ে নেবো– এমন প্রশ্নের মুখোমুখি সমর্পণ করেছি ভাঙা পাঁজর। কিভাবে জন্মজয়ন্তীর রাতে জমা রাখতে হয় অব্যাহত শপথ, তাও ভুলে গেছি খুব দ্রুত। মাঝে মাঝে অনেক কিছুই ভুলে যেতে হয়। ক্ষতের নিয়তি, ঝরা শ্রাবণের মন, আর পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার প্রস্থানদৃশ্য। এমনকি সেই শহরের নামও, যে শহরে প্রাক্তন স্মৃতিরা থাকে পেখম মেলে।

মাছির চোখ ও মানুষের স্কেচ

মাছগুলো তাকিয়ে থাকে মাছির চোখের দিকে। ভনভন আওয়াজে ঘুরতে থাকে রিকশার প্যাডেল। কে চালায় তা বুঝা যায় না। তবে নেপথ্যে কেউ নিয়ন্ত্রণ করে হাতের আঙুল, সে বিষয়ে আমরা সম্মত হই। এ পর্যন্ত আমরা আরো বেশ কিছু বিষয়ে পৌঁছে গেছি ঐক্যমতে। যত্রতত্র প্রয়োগ না করলেও আমরা সবাই মিথ্যা কথা বলতে জানি, কিংবা আষাঢ়ে নদীর চোখে রাখতে পারি নিজেদের চোখ– এমন বেশ কিছু সত্যকে মেনে নিয়েছি আমরা বেশ আগেই। আরো সম্মত হয়েছি, এখন থেকে বৃষ্টিতে নামতে গেলে বাদ দেবো ছাতার ব্যবহার। কারণ প্রকৃতির মাঝে ভিজে যাওয়ার যে আনন্দ তা পুকুর কিংবা বাথটাবে নেই।

সম্পূর্ণ…»

নভে
09

ফকির ইলিয়াস- এর কবিতা

গল্পের শিল্পকথা

আমার গল্প নিয়ে তুমি যে শিল্পচিত্র আঁকতে চেয়েছিলে
তাতে চন্দ্রের কোনো ছবি থাকবে না
সেকথা আমি তোমাকে জানিয়েছিলাম।
বলেছিলাম, এ আকাশ আমার নয় – তাই তার
সমস্ত বৈভব আর আলোর তালুক, আমাদের দূরত্বের
ছায়া হয়েই থেকে যাক। প্রদর্শিত ভোরের দক্ষিণে
প্রেমের সেতুবন্ধন হোক নদী আর তার বিধ্বস্থ স্রোত।

জানি, স্রোতের রাগিণী তুমি এর আগেও সেরেছো
তোমার বেশ কিছু শ্রেষ্ঠ বিনির্মাণ। জলের বিদ্যুত থেকে
আলো সঞ্চয় করে, সাজিয়েছো পাতার ডিজিটাল প্রিন্ট।
বৃক্ষের একাকী বিস্তারে তোমার প্রসারিত হাত
ছড়িয়েছে বীজের বিন্যাস। প্রজাপতির ডানায় তুমিই
এঁকে রেখেছো, গৌরবের বনবৃত্তান্ত।

আমি জানি, আমার গল্পগুলোও একদা সমান্তরাল
ছিল সবুজের গৌরবময় ইতিহাসের। মুক্তি ভাস্কর্যের
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে মা নিবেদন করেছিলেন
তার জীবনের সর্বস্ব, আমার বিচূর্ণ গল্পগুলো
ছিল তার সন্তান। এই মাটির সাথে আমার
গল্পের নায়ক-নায়িকারা প্রাসঙ্গিকভাবেই ছিল
যুক্ত। আর লিখিত নদীধ্যান পাঠ করে সঙ্গত
কারণেই হয়ে উঠেছিল জয়নুল-সুলতানের
সুবিশাল উত্তরবাহু। উদগত ভূমির কাছে
তারা ছিল বর্ষার অবনত কুসুম।

সম্পূর্ণ…»

অগা
23

তিনটি কবিতা

ফকির ইলিয়াস

 

পরিচিত জলধ্বনি

 

রত্নের রহস্য নিয়ে থাকো, আর রাখো বিছিয়ে আঁচল
এরকম এই ঘাটে কতোবার ছুঁয়েছি যে জল
তার হিসেব মনে আছে আমার, কৌশলে
ধারণ করে পরিচিত জলধ্বনি রঙ, পিছু ফেলে
সেইসব শকুনের নগ্ন নখর
পরিখা পেরিয়ে এসে আমিও, সাজিয়েছি উনুন প্রহর।

রূপের আয়না ধরে রাখো, আমি দেখি মুখ— সান্ধ্য সুরের
যেভাবে প্রণতি গাই সূর্যঘেরা নমিত দূরের
কিংবা কাছের মাটির কাছে রেখে যাই প্রিয় অভিপ্রায়
এ গাঁয়ে ঝড়ের পাখি গা ঝেড়ে যেভাবে দাঁড়ায়।

 

হারানো বোতাম

 

এখানে আমরা খুঁজতে এসেছি ছ’টি পতাকার দাগ। এক নবীন
শিকারী ফেলে গিয়েছিল যে দূরবীন তার কালোচূর্ণ আর একটি
শিশুর হারিয়ে যাওয়া বোতাম, লাল রঙের একটি লাটিম। যা খুব
ঘুরঘুর করে খুঁড়তো এই চত্বরের মাটি। ঘাসের ঘর্মাক্ত সিথান।

আমরা আরো খুঁজতে এসেছি আঠারো শতকের একটি বিকেলে
এই বেঞ্চে বসে কাগজ পড়েছিলেন যে বৃদ্ধটি, তার নখচিত্র।
দূর নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে যে চোখজোড়া নির্ণয় করতো সুষম
আকাশের নীল, তার পরিধিও এঁকে যেতে এসেছি আমরা। বিচূর্ণ
বৈভব নিয়ে হাঁটছি খালি পায়ে পশ্চিমের প্রত্যন্ত পার্কে, ছায়া সংসারে…

 

ঝড়ের চেকপোস্ট

 

হাঁ যাবেই তো সবগুলো সাম্পান সাজিয়ে। ভূমধ্যসাগরের চোখে রেখে
চোখ। কিংবদন্তি ভোরের বদান্যতা ছুঁয়ে এই আগলের ছায়া। যাবে রূপ
তপস্যারত রাতের নগরে। যারা আকাশ শিয়রে রেখে আরামে ঘুমায়, আর
স্বপ্ন দ্যাখে নির্মাণ করার বিশুদ্ধ মেঘমন্দির। ঝড়ের চেকপোস্ট। বিজলীর
প্রশাখা। বিরহের বিনম্র বিপণন। তারাই যাবে, যারা প্রতিভার পতংগ খুঁজে
হাত রেখেছে এইসব নুড়ির পরাণে। শিখে মানুষনামতা, দেবতার ভ্রূণচিত্রণে।