মজনু শাহ

অক্টো
21

মজনু শাহ-এর তিনটি কবিতা

অস্তিত্ব

অস্তিত্বের রঙ কী– মাঝে মাঝে ভাবি। যেমন কোনো রাজমহিষীকে দেখি নি কখনো, তবু তার মুখের রঙকাহিনি মনে পড়ে। ঐ হাবা অরণ্যের পাশে, চুম্বকের বিছানাই আমার সব। রাত্রিবেলা, প্রান্তরে, দেখা দেয় মহাজাগতিক ডিম। হারেমের রূপসীরা সেই দিকে দৌড়াতে থাকে। সবাই রঙ পেয়েছে, রসিকতাও। কেবল এই বহু ছিদ্রময় অস্তিত্ব, প্রতিমুহূর্তে অস্বীকার করে রঙ, আর সর্বত্র কায়েম রাখে তার অট্টহাসি। সেদিন সাপরাজার সাথে দেখা, বৃত্তান্ত শুনে বললেন, এইসব রেখে, কিছুকাল মেঘে মেঘে পায়চারি করুন–

***

রক্তবর্ণনার ভিতর দিয়ে যাই। হে অভিরূপ, তুমি কোন্ পাখি? নির্জন ঘাটে শুয়ে কেউ কেউ ক্ষয় হয়ে যায়। মাছরাঙা একপ্রকার আলোজাদু। কাব্যের, ইশারার সমস্ত বীজ, জবাকুসুমের মুখ থেকে শুনি। আমার মৃত্যুচিন্তা মুদ্রিত আছে ঐ কাঠবাদামের গায়ে, কাঠবেড়ালি আজ সকাল থেকে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যত অদ্ভুত আলো দেখ, সবই মাছরাঙাটির।

***

যে-কোনো সুদূরকে আজ অপরাহ্ন বলে মনে হয়। যে-কোনো প্রণয়, বল্মীকস্তূপের প্রায়। । অতি শাদা ফুলের রাত্রিসংলাপ ছুটে যায় কার পানে! মনে রেখ ঘাসেদের বিপুল অভ্যর্থনা, পতঙ্গদের মৃত্যুনাচ। আমার সবুজ অক্ষরগুলো ধুলোয় ঘুমায়। বাঁকা পথ দিয়ে যেতে যেতে কিছু শশীবাক্য আজ তোমায় শোনাতে হলো। আগামী কোনও ঝড়ে হাতি, হিতোপদেশ সবই হয়ত একসঙ্গে উড়বে।

সম্পূর্ণ…»

অগা
15

দুটি কবিতা

মজনু শাহ

 

ঘুঘু

ঘুঘুদের ডাক শোনামাত্র আমার মাথা শয়তানি চিন্তায় ভরে ওঠে। তুমিও কম বজ্জাত নও, বাজিয়ে দিয়েছ হেমঘণ্টা। কাকাবাবু, আমার কথায় কি আর মৃত তারাগুলো ঝরবে? সাদা রঙ সম্পর্কে গত ছ-সাত বছর প্রায় কিছুই ভাবি নি, রাত্রির আকাশ এখনো নিরক্ষর। সাদা মাকড়শার সঙ্গে অবশ্য মাঝে মধ্যে দেখা হয়, তারা ইদানীং ঘুমোবার জন্য বেশি পছন্দ করে তোমার না-খোলা জানালা। ঘুঘুদের ডাকের সঙ্গে, সাদা রঙের সঙ্গে এবার হয়ত মীমাংসায় যেতে হবে।

*

রামঘুঘু, তিলাঘুঘু, কণ্ঠিঘুঘু— তোমরা সব কোথায়? যখন আমি ঘুমে কাদা, গুপ্তরোগ ছড়িয়ে পড়ে তোমাদের। টেলিগ্রাফ শব্দটির আয়ু ফুরিয়ে এলো দেখতে দেখতে। আড়াই হাত লম্বা এক জাহাজবিজ্ঞানীর সঙ্গে সেদিন ঋতুবিপর্যয় নিয়ে তর্ক হলো, মাছেদের হিংস্রতা নিয়েও অল্পবিস্তর। মানুষের মধ্যেও কিছু ঘুঘু আছে নিশ্চয়! ভ্রমণাকাঙ্ক্ষা জাগে তাই সরুপথে, খালি পায়ে, রেললাইনের পাশে। হাঁটা থামিয়ে, যখন বজ্রাহত বাক্যগুলো বলতে থাকি, গাছে গাছে বানরদের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়।

 

রম্যদ্বীপ

 

 

 

মনে পড়ে রম্যদ্বীপ। কুমারত্ব হারানো অসংখ্য হাঁস ঘুরছে সবখানে। ঝরে পড়া ফিকে লাল পাতার বিছানা ঐ। একটানা উড়োশেয়ালের কান্নার ভেতর যেন তুমি নও আর সামান্য ব্রাজক।

সবজান্তা পাখিরা ফিরে আসে আর তর্ক করে।

কাল ভোরে হয়তো-বা উঠবে ভেসে গীতরত মস্তক, অর্ফিয়ূসের। আর কেন বীণা তৈরি করো, ঘুমপ্রবণ বোতাম আর শাদা নুড়িগুলো রাখো কেন গোপন ঝুড়িতে—

আঙুর, সনেটগুচ্ছ, পেকে ওঠে আর নষ্ট হয় এখনো কোথাও।

একটি অতৃপ্ত গান নানা সুরে গায় এক অন্ধ কাকাতুয়া। তুমি আজ ধূলিসম্রাটের মতো কেউ। ক্রমে গৃহ, লক্ষ্য আর স্তনচ্যুত।

বোঝে, কে কার অতল! গূঢ় সত্য লুকায় এখন তার ভুরুর ধনুকে। এসে পড়ে অন্তিম স্তবক। হোলি গ্রেইল থেকে রক্ত মুছে গিয়ে শুধু বীজ, খোসা আর তিক্ত-মধুর প্রবচনে ভরে। সঙ্গে নাও মর্মর-পেটিকা, ঢালুতে দাঁড়ানো শিউলি, ঐ শিউলিতল, তোমাকে রচনা করে, হেম যেন, শুরু হয় রাতের মৃগয়া।