তিনটি কবিতা

সুকুমার চৌধুরী  

নিষ্ক্রমণ

পালিয়ে আসি। সে তো অতি সাধারণ বলে।
খড়কুটোও হতে পারি নি বলে
হয়তো বাঁচাতেও পারি না
                ডুবু ডুবু মানুষদের।
একটু যে লজ্জা হয় না তা নয়
কিন্তু তাও কেটে যায় কিছুদিন পর
আমাদের জীবনে প্রতিদিন নতুন নতুন লজ্জা
                    গ্লানি ও মেচেতা।
পালিয়ে আসি। সে তো অতি সাধারণ বলে।
খড়কুটোও হতে পারি নি বলে
কিন্তু যখন কানু সান্ন্যালের আত্মহত্যার কথা শুনি
                         কষ্ট শুরু হয়।
মনে হয়
তাহলে কি
বিষাদই অন্তিম আমাদের
               আর অবশেষ সরে যাওয়াটুকু।

পালিয়ে আসি।
এমন ভাবনা থেকে, বিশ্বাস অন্তরা থেকে…

৯ চৈত্র ১৪১৬

কুম্ভস্বয়ম্ভু

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
                      তবে একলা চলো রে
                               —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এভাবেই একা একা লড়ে যেতে হবে
এই গূঢ় সত্যটুকু আমি এতদিনে বেশ বুঝে গেছি।
এখন আমি অনেকটাই শক্তপোক্ত, ঈষৎ মরিয়া,
এখন আমি ক্লান্তিহীন এগিয়ে চলি, লক্ষ্য স্থির।
এখন আমি সারাক্ষণই সতর্ক এবং যুযুধান থাকি।

এখন আমার শত্রু লাগে না, মিত্র লাগে না,
শুভৈষী লাগে না, প্রণয়ী লাগে না, কুম্ভীরাশ্রু লাগে না,
শুধু একা একা এগিয়ে চলি …

যারা যুদ্ধাবসানের খবর শোনে মিডিয়ায় অথবা ফলাফলের জন্য
দাঁড়িয়ে থাকে বিপত্তারণ আবডালে
তাঁরা আসলে একটা সিঁড়ির প্রতীক্ষায় থাকে, যা তাঁদের স্বর্গে
নিয়ে যাবে কোনদিন। আমি জানি, আমার জন্য তাঁদের কোন মাথাব্যথা নেই,
আর থাকবেই বা কেন, এতদিনে আমি বেশ বুঝে গেছি
ভগবান আমাকে একা একা লড়ার জন্যই পাঠিয়ে দিয়েছেন এই পৃথিবীতে
আর অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি যারা বিজয় উল্লাস কিংবা সিঁড়ির প্রতীক্ষায় থাকে
আসলে তাঁরাও আমার কেউ নয়, শত্রু অথবা মিত্র কিংবা কোন আত্মপরিজন, …

বুঝতে পারি তাঁদের প্রার্থনা বা অভিশাপ
আমার কোন কাজেই লাগে না।
তাঁদের বিচিত্র সব কলরব আর অনন্ত সার্কাসে
আমার যুদ্ধকালীন তৎপরতা বলা বাহুল্য অব্যাহতই থাকে। আর
এভাবেই আমাকে একা একা লড়ে যেতে হবে
এই গূঢ় সত্যটুকু আমি এতদিনে বেশ বুঝে গেছি …

৮ চৈত্র ১৪১৬

 

খিদেভাষা

খিদের ভাষা খুব সার্বজনীন
ভাষাদিবসে আজ ঘোর সন্ধ্যেবেলা
একা, একা, কেন জানি মনে হলো।

অলীক পাওনার টাকা নিতে এলো
সর্বস্বান্ত এক চাপলুস। সে আমার প্রতিবেশী।
যৎসামান্য থেকে কিছু দিতে দিতে
মিচকে শয়তানের মতো মুখে অল্প হাসি
ফুটে উঠেই কেমন মিলিয়ে গেল
যেন চুরি, যেন এক পাঁড় ভিখিরির
গূঢ় আক্কেলসেলাম।

যাওয়া হয়নি আমার, খবর পেয়েছিলাম
এসেমেসে আমন্ত্রণ পেয়ে কেউ কেউ
আজ ভাষাসঙ্গীত শুনতে
ধানতোলির গীতা রায় মঞ্চে গিয়েছিল।

গেঁয়ো যোগী আমি
যৎসামান্য থেকে শুধু
কানাকড়ি বিলোতে বিলোতে কেন জানি
ভাবছিলেম
একদিন সব ভাষা এক হয়ে যাবে,
অনেকটা খিদেভাষার মতোই
ভারি সার্বজনীন…

২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।