টোমাজ ট্রান্সট্রোমার-এর তিনটি কবিতা


অনুবাদ: কল্যাণী রমা

অক্টোবর-এ আঁকা ছবি

জাহাজ টেনে নেওয়ার ছোট নৌকাটার গায়ে ছোপ ছোপ মরচের দাগ।
সমুদ্র থেকে এ-ত দূরে কেন নৌকা?
এ যেন ঠাণ্ডার ভিতর এক নিভে যাওয়া বাতি।
তবু গাছের গায়ে বুনো রঙ: অন্য পাড়ের হাতছানি।
হয়তো কেউ চেয়েছিল, হয়তো কোথাও ভেসে যাবে।

ঘরে ফিরবার পথে দেখি ঘাস ফুঁড়ে মাশরুম গজিয়ে উঠছে।
ওগুলো কয়েকটা আঙ্গুল, অসহায়। সাহায্য চেয়ে চেয়ে টানটান উপরে তুলে ধরছে।
একাকী কারো আঙ্গুল, অন্ধকারে কবে থেকে সে কাঁদছে।
আমরা পৃথিবীর জল আর মাটির।

মলোকাই

কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি, অনেক নিচে চকচক করছে
কুষ্ঠরোগীদের কলোনির ছাদ।
হয়তো বেয়ে বেয়ে ঠিক নিচে নেমে পড়ব, কিন্তু গভীর রাত নামবার আগে
আমরা তো কেউ উপরে পৌঁছাব না।
তাই ঘুরে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চললাম, হেঁটে হেঁটে – চারপাশে
ঝাউ-এর নীল রঙ সরু-পাতা গাছ।
এখানে শব্দ নেই, এ নীরবতা বাজপাখি এগিয়ে আসবার মতো।
এই সেই জঙ্গল যা  ক্ষমা করে সব, অথচ ভোলে না কিছুই।
ভালোবাসার জন্য ড্যামিয়েন বেছে নিল
জীবন, অখ্যাতি। এবং শেষে পেল মৃত্যু আর খ্যাতি ।
আসলে আমরা সবকিছুই দেখি উল্টোদিক থেকে: পাথরের স্তূপ
স্ফিংক্সের মুখের বদলে।

চিঠির উত্তর

আমার ডেস্কের একদম নিচের ড্রয়ারে একটা চিঠি খুঁজে পেলাম। চিঠিটা প্রথম এসেছিল ছাব্বিশ বছর আগে। অবুঝ আতঙ্কে লেখা এক চিঠি। এবং এখন দ্বিতীয়বার পৌঁছেও জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে চলেছে এই চিঠি।

একটা বাড়ির পাঁচটা জানালা: চারটা জানালা দিয়ে দিনের স্থির আলো পরিষ্কার ঝলমল করছে। পাঁচ নম্বর জানালাটা এক কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে সে বজ্রপাত, ঝড় আর বৃষ্টির দিকে। আমি পাঁচ নম্বর জানালাটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চিঠিটা।

মাঝে মাঝে মঙ্গলবার আর বুধবার-এর মাঝে এক পাতালের দরজা খুলে যেতে পারে। কিন্তু ছাব্বিশ বছর তবু এক মুহূর্তের ভিতরই পার হয়ে যায়। সময় এক সরলরেখা নয়। বরং তা এক ল্যাবারিন্থ। আর যদি দেয়ালের কাছে গিয়ে ঠিক জায়গামত চেপে টিপে ধরতে পার, দেখবে তুমি তাড়াহুড়া করে হেঁটে যাওয়া পায়ের শব্দ আর গলার স্বর শুনতে পাচ্ছ। শুনতে পাচ্ছ যেন অন্যপাশে তোমার নিজেরই হেঁটে যাওয়া।

কোনোদিন কি এই চিঠির উত্তর দেওয়া হয়েছিল? আমার মনে নেই। সেই কবেকার কথা। সমুদ্রের অসংখ্য চৌকাঠ অন্য কোনো দেশে যেন পরিযায়ী হচ্ছিল। এক মুহূর্ত থেকে আর এক মুহূর্তে হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে লাফিয়ে চলছিল, ঠিক যেভাবে এক আগস্ট মাসের রাতে ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে ব্যাঙ চলে যায়।

উত্তর না দেওয়া চিঠিগুলো জমতে থাকে। ঝড়ের পূর্বাভাস বয়ে আনা সিরোস্ট্র্যাটাস মেঘের মতো। ওরা সূর্যের রশ্মিকে আলোহীন করে দেয়। একদিন আমি উত্তর দেব। একদিন যখন আমি মারা যাব এবং অবশেষে কোনকিছুতে মনোযোগ দিতে পারব। কিংবা অন্তত এখান থেকে এত বেশি দূরে চলে যাব যে আমি আবার নিজেকে খুঁজে পাব। যখন আমি হাঁটছি, নতুন এসেছি, এক বড় শহরে, ১২৫ নম্বর সরণিতে, নেচে নেচে চলে যাওয়া আবর্জনাভরা রাস্তার উপরের বাতাসে। সেই আমি যে কিনা চেনা পথ ছেড়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে ভালবাসি। অসংখ্য শব্দ আর নামের জঙ্গলে এক বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘ট’।

[Tomas Tranströmer
“The great enigma”
New collected poems
Translated by Robin Fulton]

Facebook Comments

2 Comments:

  1. ভালো লাগলো। ধন্যবাদ। চলুক।

  2. খুবই সাবলীল অনুবাদ। বিশেষ করে খুবই ভালো লেগেছে মলোকাই। রবিন ফুলটনের করা অনুবাদে ‘গভীর রাত’ কথাটি নেই। আছে রাত নামার কথা (The climb down we could manage but we’d never make it back up the slopes before nightfall.)। দু’এক জায়গায় এরকম স্বাধীনতা নিয়েছেন রমা। এটুকু বাদ দিলে বলতে হয় তারিফ করার মতো অনুবাদ। রমার হাতে এটি হয়ে উঠেছে কবিতা। হ্যাটস অফ!

Leave a Reply to শামান সাত্ত্বিক Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *