অংশ
দিবসে তোমার অংশ হয়ে আছি
বাকি সব বিলুপ্ত ব্যাকরণে
কাহিনি কথনে নায়িকা আমার
ধীরে ধীরে গান আর গহনায় ভরে ওঠে।
যেন আজ বিবাহ বাতাস দিকে দিকে
কত কারণ বহিয়া আনে।
ধান
ডুবে গেলে ধান, গানে আসে বিরহের দিন
সদানন্দে শোনোÑ আনন্দ বিহীন
ওগো মহাশয়, নিবেদিত প্রাণ, নিপুণ জননী
তোমার প্রবাহে একে একে
বহুবিধ ঘ্রাণ যাথার্থ করেছ যাকে
বিগত কার্তিকে যাকে তুমি দ্বার খুলে দিলে;
দিলে, আগামি দিনের কৃষি সমাচার
নারী ও ধানের খনি।
বৃষ্টিতোয়া গান
বৃষ্টি হলো ক্ষুব্ধ রাতজুড়ে,
যাত্রীসহ পাত্রী ভেজে দাঁড়িয়ে নির্জনে
ভাবছ আকাশ কার বিরহে কাঁদে,
তোমার নাম অঞ্জনাদির মনে
এই বাতাসে বিষণœ সুর ঘোরে,
যায় ভেসে গান কৃষ্ণচূড়া লালে
গুমরে মরে দইগোটা গাছ দূরে,
উড়ছে পালক পাখির মায়াজালে
রাত নিভিয়ে কচি পাতার আলো,
রাগ কমিয়ে মেটাচ্ছে বিচ্ছেদ
মরা পাতা তা-ও তো রুখে দিলো,
ধর্ম এবং বর্ণে শত ভেদ
শীর্ণ নদী প্রাণ ফিরে পায়,
বুক জুড়ে রয় চোরা স্রোতের টান
যেদিক তাকাই শুধুই বৃষ্টিরেখা,
সখীর হাতে সখার অভিমান
নুপূর ছিঁড়ে নাচছ তো বেশ,
হায় পরিহাস হায় রে বোলের ছল
একটু থামে একটু ঝরে,
এত রূপের বৃষ্টিতে হয় রিক্ত বনাঞ্চল
রুক্ষ
মরুভূমির বালুর ওপরে তপ্ত সৈন্যদল এসেছে প্রচুর
তাদের বিচিত্র গার্ড ও গর্জনে
অহেতুক ভ্রমণ ঋতুতে কাহিনি-কথন পুড়ে যায়
চিত্রে জুড়ে প্রভুর মৃত্যুতে অশ্ব নিরুপায়।
তৃষ্ণা ও ক্লান্তির আবরণ ভেঙে চলছে খনন
অকারণে পাথুরে খাদের চারপাশে, চলছে সন্ধান।
দূরে, কৃষিখামারের কর্মী ও কোলাহল নিভে যায়
ধীরে ধীরে পড়ন্ত প্রহরে
চলে গোপনীয়তা, চলে আগত বিদ্যার আনাগোনা,
শুধু রাতকানা রাতের বাতাসে জেগে থাকে,
এলোমেলো ক্যাকটাসে ঝুলন্ত নীল জামা।
বাসর
অকারণে চোর এসে চুড়িতে রেখেছে হাত
ভয়েÑমদিরায় ডুবে আমি ধরেছি নির্ঘাত
মনে হলো বাসরের রাতÑ যথা ও যেমন
দেখি, চোর গেলে থেমে যায় চুড়ির কাঁপন।
গুরুচণ্ডালী
উঠোনসমেত একচালা ঘর, দু’টো বাতাবি লেবু আর ডুমুরের গাছ।
শীতের দুপুরে কুয়োতলায় আয়েশ করে ঘুমুচ্ছে প্রিয় বিড়াল।
গোটাকয় মেছোবক সূর্যকে সাক্ষী রেখে মাথার ওপরে উড়ছে।
এক হাতে ছিপ অন্য হাতে মাছ, বাবা ফিরছেন বাড়িতে।
জয়নালের ছেলে আয়নাল ছবি আঁকতে ভালোবাসে।
খুব যতœ করে, সময় নিয়ে উপরের দৃশ্যকাব্য
মায়ায় মুড়িয়ে স্থান দিয়েছে তার একান্ত ক্যানভাসে।
মা ফিরতেই দৌড়ে গিয়ে দেখাল,
বাবা বললÑ আমাদের মতো আধুনিক হয়েছে।
মা বললÑ বিড়াল, মাছ, বক একসাথে থাকায়
গুরুচণ্ডালী দোষে দূষিত এ চিত্র।
বাবা অশিক্ষিত, গানপাগল মানুষ, বোকাকান্ত।
মা মিতব্যয়ী, দূরের স্কুলে গণিতের দিদিমণি।
তাহিরপুর
মুক্ত হলো বন্দিদশা
উড়ে গেল পায়রাগুলো
আধেক ফেটে যেমন ঝরে
শিমুল তোমার শীর্ণ তুলো।
নাতিদীর্ঘ হৃদয় গ’লে
ঘ্রাণ পাঠালে ব্যস্ত বনে
আমার হাতে তোমার ব্যথা
পাশ ফিরেছি অবন্ধনে।
বসন্তে হয় ক্লান্তিবোধ
রক্তকমল ফুটছে ভয়ে
স্মৃতির কাছে যুক্তি এসে
বুক পেতে দেয় বাঙ্ময়ে।
পূর্ণিমা আজ গভীরতম
প্রেম করিবার বাঞ্ছা দিয়ো
চোখের মণি পাথর ক’রে
দিতেই পারি অঙ্গুরীয়।
যুক্তি ভুলে যুদ্ধ করো
শিল্প বানাও পোড়ামাটি
সায়াহ্নে এই চোখের কাছে
দৃষ্টি তোমার অধিক খাঁটি।
বৃত্ত ভেঙে রেখায় চলো
টিপ হারালে কী আর ভয়
তুলির টানে তাহিরপুরে
শিমুল-ভরা চন্দ্রোদয়।
তদন্ত
বনের গভীরে থাকে ভয়, সুনিশ্চিত।
গন্ধে ভাসে মাংসমাখানো তিত
এখানে লাল কালিতে লেখা আছে
বড় বড় অক্ষরে “বিপদ আসন্ন“।
রংচটা দিনের বিষণœ আলোয় আমি তো নগণ্য।
মোটাসোটা শতাব্দী জুড়ে তোমাকে ধাওয়া করছে
আঁদ্রে জিদের অবৈধ পত্রাবলী,
মোনালিসার ফেডআউট গাম্ভীর্য,
বৈধ নাবিকের হারিয়ে যাওয়া অবৈধ লগবুক।
আমি দ্য ভিঞ্চির আদেশে
ফ্রয়েডের ফলস্ প্রেতাত্মায় ভর করে
ধরতে এসেছি তোমার যাবতীয় ধনতান্ত্রিক অপরাধ।
চাঁদ আছে চারপাশে। আলো তার অলৌকিক।
জোনাকির জালিয়াতি ভেদ করে
ফুটে থাকা অন্ধকারে ফিরে এসে দেখিÑ
পরিত্যক্ত তাঁবুর পরিহাস, ভিতরে অনিত্য আলামত
দূরে, দুর্গ ঘেঁষে ছুটে যাচ্ছ তুমি
যেন সিঁথির মতো সরু পথ।
প্রেমিক
যখন অচেনা হাঁসগুলো চেনা ঘরে একা আসে ফিরে
যারা পালাচ্ছিল
ক্ষণিকের জন্য দাঁড়ায় বিকল বালাঞ্চি ঘিরে।
পাহাড়ের পাদদেশ থেকে হিম পড়ে গায়ে
রিখটার স্কেল ফেলে রেলব্রিজটার দিকে
উদাস দৃষ্টিতে চলে যায় কেউ পায়ে পায়ে।
ভৌতিক কণ্ঠে শুধাল অন্ধ,
বৌমা নদীর ওপারে শোনা যায় আজানের ঢেউ
রহিম তো বাড়িতে, তবে কি নায়ে আছে কেউ?
শীতকালে বিনাবৃষ্টিতে ধস নামার মতো সোনালি খামে
ঠিক তখনই সন্ধ্যা নামে।
এক অচেনা দয়াল একাই বকে যাচ্ছে
দেখুন, কেমন অলৌকিক আর আলোছায়াময়
হায় রে বিস্ময়! এতদিন পর জানলাম
পরী দেখার এটাই আদর্শ সময়।
সীমান্ত এক্সপ্রেস
ঘুম আসে না। রাত্রি যায়।
ধীর গতিতে। আশ্বিনের।
ট্রেন চলে যায়। যাত্রীদের।
চোখ মেলেছি। এই তো ঢের।
দেখার ছিল। এইটুকু।
রক্তে ভেজা। একটি লাশ।
মাতাল বটে। বলছে কেউ।
বোতাম খোলা। ভাদ্র মাস।
এই গরমে। গণ্য হোক।
কার বাবা সে। ভাইটি কার।
পুলিশ-থানা। শান্ত সব।
চাকুর পেটে। দিচ্ছে ধার।
শিবলী মোকতাদির

কবি ও প্রাবন্ধিক , জন্ম ১১ জুন ১৯৬৯, বগুড়ায়।
কবিতা, প্রবন্ধ ও মুক্তগদ্যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র সৃজনভুবন নির্মাণ করে চলেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ধানের রচনা দিলে পত্রে, ছন্দের নান্দনিক পাঠ, সোনার কার্তুজ, রৌদ্রবঞ্চিত লোক, ছন্দকথা ও অভিন্ন আততায়ী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কবি আব্দুর রউফ স্মৃতি সাহিত্যপদক, কবিকুঞ্জ পদক, বামিহাল সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেছেন। ২০২৫ সালে কবিতায় কাব্যশ্রী সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
