এইচ বি রিতা: রাত বারোটা বারো ও অন্যান্য কবিতা

রাত বারোটা বারো

নগরী শ্বাস নেয়।
ব্রুকলিন, দম আটকে রেখেছে।
কংক্রিট ঘুমায়। এমনকি দানবরাও।
এক মৃদু কম্পন—অন্ধকারের নিজস্ব ইঞ্জিন।
নিয়ন সাইনগুলো অবশেষে তাদের চোখ বুজেছে।

এ-ট্রেনের দানবগুলো, অন্ধকার গলির ছায়াগুলো।
তারা ঘুমিয়েছে, অবশেষে ঘুমিয়েছে।
ঘুমে নিঝুম।
লালনদীর জল।
যিগফ্রিদের বিষাক্ত অথচ খাঁটি জল।
এক রাসায়নিক ঘুমপাড়ানি গান, এক বিষাক্ত
ঘুমপাড়ানি গান।
মরিচা ধরা পাইপ, প্রাচীন পাইপ।
ভুলে যাওয়া স্বপ্নের এক নদী, ভুলে যাওয়া আর্তনাদের
এক নদী।

তারা পান করেছে, আর ঘুমিয়ে পড়েছে।
এক কঠিন লড়াইয়ে জেতা ঘুম।
শব্দের চেয়েও তীব্র ছিল সেই নীরবতা।
নগরী শ্বাস নেয়।
দম আটকে অপেক্ষা করে, যতক্ষণ না সকাল আসে।

রাত বারোটা বারো।
এক ভুতুড়ে জাহাজ, ভেসে চলেছে রাতের বুকে।
এক ভুতুড়ে নগরী, ভেসে চলেছে আলোয় আলোয়।
কংক্রিট ঘুমায়।
সকাল অবধি—যতক্ষণ না আবার শুরু হয়
সেই কোলাহল।

 

পাথর ঠেলে যাওয়া মানুষ

আমি দেখি সিসিফাসকে
প্রতিদিন রাস্তায়, বাজারে, রিকশার প্যাডেলে
পাথর ঠেলে ওঠে পাহাড়ের চূড়ায়,
আর নেমে আসে সেই পাথর
আবার, আবার, আবার।

কেউ বলে না তাকে থামতে,
কেউ বলে না তার হাতের কড়া দেখে
এই ভার তোমার একার নয়।

আমি কাঁদি না চোখের জলে শুধু
আমি কাঁদি প্রমিথিউসের মতো,
বুকের ভেতর ঈগল এসে বসে রোজ,
ঠুকরে খায় সেই অংশ
যেখানে এখনো আশা বেঁচে আছে।

দেবতারা শিকল দিয়েছিল পাহাড়ে,
আমরা শিকল দিয়েছি নিজেদের ঘরে –
ভাড়ার রসিদে, ওষুধের দামে,
সন্তানের স্কুলের বেতনে।

কেউ আগুন চুরি করে এনেছিল মানুষের জন্য
আর মানুষ এখনো পোড়ে সেই আগুনে,
নিজের অসহায়ত্বের মশাল হাতে নিয়ে
রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে।

আমি এই শহরের দিকে তাকাই
আর দেখি হাজার সিসিফাস,
হাজার প্রমিথিউস –
কারো মুক্তি নেই, কারো ক্ষমা নেই,
শুধু পাথর, শুধু ঈগল,
শুধু আকাশের নিচে
একটা মানুষ, বারবার উঠে দাঁড়ানোর
নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।

 

ক্যাসান্দ্রা

অ্যাপোলো তাকে দিয়েছিল ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা,
তারপর দিয়েছিল অভিশাপ-
কেউ বিশ্বাস করেনি তার কথা।
অথচ সে দেখেছিল ট্রয়ের পতন
আগুন লাগার আগেই।

সে চিৎকার করে বলেছিল দেয়ালে দেয়ালে-
“কাঠের ঘোড়াটা খুলো না, ভেতরে মৃত্যু বসে আছে।”
লোকে হেসেছিল।
লোকে বলেছিল, মেয়েটা পাগল।
লোকে ফিরে গিয়েছিল নিজের কাজে,
নিজের ভয়ের প্রস্তুতিতে,
নিজের রাতের খাবারে।

আমার শহরেও একজন ক্যাসান্দ্রা আছে,
রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলছে—
“ওরা গুলি করছে, ওরা মারছে,
এই সংখ্যাগুলো মিথ্যা না।”

কেউ শুনছে না।
টিভিতে অন্য খবর চলছে,
সংসদে অন্য বিতর্ক চলছে
মানুষ ব্যস্ত নিজের চায়ের কাপে।

ক্যাসান্দ্রার গলা ভেঙে যাচ্ছে চিৎকারে,
তবু তার সত্যি বদলাচ্ছে না—
শ্রোতা বদলাচ্ছে না।
এই হলো অভিশাপের আসল রূপ:
সত্যি বলাটা অপরাধ নয়,
অপরাধ হলো সত্যি বলার পরেও
জানালা বন্ধ থাকা।

ট্রয় পুড়েছিল একদিন।
পুড়েছিল কারণ কেউ দরজা খুলে দেখেনি
কে দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে, রক্তাক্ত মুখে,
বলছিল সত্যি কথা।

 

বিষ ও অমৃত

দেশটা যখন মন্থন করছে নিজেকে,
মন্দার পাহাড় ঘুরছে বুকের ভেতর,
বাসুকি সাপ পেঁচিয়ে ধরেছে নিজের গলা-
দেবতা আর অসুর কেউ আলাদা নেই আর,
সবাই টানছে দড়ি, সবাই ঘামছে,
সবাই ভাবছে অমৃত উঠবে তার হাতেই।

কিন্তু প্রথমে ওঠে বিষ।
সবসময় প্রথমে ওঠে বিষ।

হলাহল, কালকূট-
সমুদ্রের তলা থেকে যে অন্ধকার
বহুদিন চাপা ছিল লাশের নিচে, ক্ষুধার নিচে,
মিথ্যা প্রতিশ্রুতির নিচে-
সে এখন ভেসে উঠছে সবার মাঝখানে,
কারো গলা বেয়ে নামছে না, ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে।

কে খাবে এই বিষ?
কার গলা নীল হবে এবার?
রাজপথে যে ছেলেটা পড়ে ছিল রক্তে,
তার গলাতেই তো প্রথম নেমেছিল অন্ধকার।

তাকে কেউ দেবতা বলেনি তখন।
তাকে কেউ শিব বলে ডাকেনি।
শুধু বলেছিল: আন্দোলনকারী।
শুধু বলেছিল: দাঙ্গাবাজ।
অথচ বিষ ওর গলাতেই থেমেছিল।
বাকি সবাই অমৃতের অপেক্ষায় রইল।

দেশ, তুমি এখনো মন্থন করছ নিজেকে-
আমি জানি না অমৃত আদৌ উঠবে কিনা।
আমি শুধু দেখছি কার কার গলা নীল হয়ে গেল
এই মন্থনের প্রথম পর্বে,
আর কারা এখনো হাত রেখেছে দড়িতে,
মুখে হাসি নিয়ে,
যেন বিষ কখনো তাদের ছোঁবে না।

 

ছকটা খাটে না

এই ছক আর খিদে মেটায় না।
কাগজের দাগে প্লেট আটকায় না।
একটা মেরুদণ্ড, ছেঁড়া ম্যাপে টানটান বাঁধা।
এখনই ভাঙবে।

রক্ত আর ডলারে দাগ টেনেছিলাম আমরা।
কালি শুকানোর আগেই চুক্তি ভেঙেছি।
এক সমুদ্র থেকে আরেক সমুদ্র — তেলে কালো।
নিজের চিন্তার কারিগর নিজেরাই।

রাস্ট বেল্টটা দেখো, তারার মতো রক্ত ঝরছে।
ম্যাপটা জানেই না আমরা কোথা থেকে শুরু,
কোথায় শেষ।
নিচে শুধু কাঁপুনি।

ডাক্টটেপ আর জেদি রাগ দিয়ে ধরে রেখেছি সব।

স্বপ্নগুলো এখন স্ট্রিপ মল আর পার্কিং লট।
কম্পাস ভাঙা। কাঁটা বনবন ঘুরছে।

নিচে অস্থির জমিন। ওপরে ঠান্ডা আকাশ।
ছকটা আর খাটে না।
সময় হয়েছে পুরো ম্যাপটা ছিঁড়ে নতুন করে আঁকার।

 

 

এইচ বি রিতা
পেশা:শিক্ষকতা, যুক্তরাষ্ট্র/ স্পেশাল এডুকেশন।
সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক সাহিত্য সম্পাদক (প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা)
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: মৌনতা (২০১৪-প্রকাশনা -অন্যধারা) ;কবিতা তুমি ভবিতব্য কষ্টের প্রতিচ্ছবি (২০১৬-প্রকাশনা -অন্যধারা);দুঃখ জলের লহরী(২০১৭-প্রকাশনা -অন্যধারা); রক্তাক্ত নীল (২০১৮-প্রকাশনা -অন্যধারা)
উপন্যাস ‘বিনু’ (২০১৯-প্রকাশনা -অন্যধারা)।
প্রবন্ধ: জোনাকির ডাকবাক্স (২০২১-প্রকাশনা-প্রিয় বাংলা);
ইংলিশ কাব্যগ্রন্থ: Diagonal Perspective-Poetry Tied to the Ribbon of Time-২০২২-ম্যাককিনলি, যুক্তরাষ্ট্র)
ইংলিশ স্মৃতিচারণ: Behind the Patina-(২০২২ম্যাককিনলি, যুক্তরাষ্ট্র)
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top