অন্ধকারের উত্তরাধিকার
আমাকে ঘিরে রাখে শহরের ক্লান্ত কোলাহল,
নিয়ন-আলোয় ঝুলে থাকে অব্যক্ত পরাজয়।
কাঁচের গ্লাসে রাত ঢালি—নেশা নয়, বিস্মৃতি;
যে স্মৃতিগুলো পোড়াতে চেয়েছি, তারাই ছাই হয়ে
ফিরে আসে প্রতিরাতে আমার শিরায় শিরায়।
কত সহজে মানুষ বদলায়—
মুখের ভেতর মুখ রাখে, অথচ হৃদয় রাখে না;
কত সহজে ভালোবাসা একদিন
নামান্তরিত হয় অভ্যাসে,
আর অভিমান—নিঃশব্দ নির্বাসনে।
আমি তো চেয়েছিলাম সামান্য আকাশ,
একটি নির্ভেজাল বিকেল, দু-চোখ ভরা বিশ্বাস;
অথচ নিয়তির অদৃশ্য কেরানিখানায়
আমার নামে জমা হয়েছে
কত শত ঋণ, বিষাদ আর অসমাপ্ত হিসাব।
একটা ফুলের আত্মকথা
তুমি বলেছিলে—
বিকেলের শেষে লেবুবনে দেখা হবে,
আমি তখন কেয়াবনের ভেতর
একটি দীর্ঘ অপেক্ষা হয়ে হেঁটেছিলাম।
তুমি এলে না।
চোখের কোণে জমে উঠল
দু-এক ফোঁটা স্বচ্ছ বৃষ্টি।
আমি গলে গেলাম—
ঝাড়বাতির নিচে
শেষ আলো হারানো মোমের মতো।
তারপর বসন্ত
আমার ঠিকানা ভুলে গেল।
এখন কোনো হাঁসফুল নেই,
ঘাসফুল নেই,
কোনো মাধবীলতার সুবাসও নেই।
শুধু আমি আছি—
পথের ধারে পড়ে থাকা
একটি নামহীন ফুল;
যাকে কেউ তুলে নেয় না,
কেউ ভালোবাসে না।
সমুদ্রলিপি
একটা বেলা লবণ-নক্ষত্রের অন্তঃসমুদ্রে অবগাহন চাই—
তুমি, পশ্চাতে প্রশান্তের প্রস্তরীভূত নীলিমা।
তোমার চক্ষু—নিমজ্জিত সারেঙের প্রেত-দূরবীক্ষণ।
ডাঙা নয়, বিলুপ্ত জোয়ারের গূঢ় ব্যাকরণই শুঁকি।
আমাদের কুকরিমুকরি—রক্তপলির আদিম মহাফেজখানা।
তোমার অ্যানোডে দিগন্তদগ্ধ জ্যোতি, আমার ক্যাথোডে শৈবাল-অন্ধকার।
প্রবাল-অস্থিতে নিদ্রিত থাকে কৃষ্ণসূর্যের লবণ-উপাখ্যান।
সৈকত কিউনিফর্মে উৎকীর্ণ করে অনুচ্চারিত জল-উপনিষদ।
হিয়রোগ্লিফ ভেঙে জোয়ার উচ্চারণ করে অনন্তের নৈঃশব্দ্য।
তবু তোমার নাম কোনো জোয়ারেই সম্বোধন করি না।
সিমুমের করাল শ্বাসে ছিন্নভিন্ন হয় সহস্র সীগালের শোকসংহিতা।
সমুদ্র—নিজস্ব অতল লিপিতে আমাকে ক্রমাগত বিস্মৃত করে।
নির্জন বর্ষার বিলাপ
নিভৃত রাত্রির নৈঃশব্দ্যের বর্ষা তুমি—
পাথরের কণ্ঠে ঝরে পড়া কোনো প্রাগৈতিহাসিক বিলাপ;
তোমার চোখে আজও দেখি নির্বাসিত জ্যোৎস্নার ক্ষত,
শিউলি-ঝরা পথে পড়ে থাকে বিস্মৃত ঋতুর আলাপ।
প্রিয় দিন, অন্ধকারে প্রজাপতি—
কার কাছে রেখে গেলে তোমার রৌদ্রদগ্ধ পাখা?
বৃষ্টিধারার নির্জন উল্লাসে যামিনী রায়ের ছবির মতো
কোনো কেয়া-ঘেরা পুকুরে আজও কাঁপে নিঃসঙ্গ চাঁদ।
স্বপ্নের শুদ্ধ স্বর্ণলতা ছুঁয়ে আকাশ যখন বিষণ্ন হয়,
প্রতিশ্রুতির অব্যক্ত ছায়া তখন দীর্ঘতর করে রাত;
কোথাও কি হঠাৎ সর্বনাশ হয়ে গেছে—তুমি নেই বলে,
নাকি আমারই অস্থিমজ্জায় জন্ম নিয়েছে এই অনন্ত বর্ষার প্রপাত?
প্রেমের পরমায়ু
এই রাতে তোমার ছায়া উড়ে যায় নীল করবীর গন্ধে,
এই রাতে নক্ষত্রেরা পরিধান করে নির্বাসনের শোক।
তোমার অনিদ্রার দীর্ঘ শ্বাস
নেমে আসে আমার অস্থিমজ্জায়—
আমি অসীম নিঃশব্দতায়
দেখে যাই তোমার অন্তর্লীন মুখ।
হঠাৎ কেঁপে ওঠে
শিমুলের রক্তাভ নৈঃশব্দ্য—
কার অদৃশ্য বাঁশি
এত দূরের ভিতরেও রক্তের মতো বাজে?
খাঁ খাঁ করে প্রাচীন প্রাসাদ।
তোরণ।
পরিখা।
পরাজিত প্রেমের অনুলিখিত মহাকাব্য।
আজ শুধু এই রাত্রিটুকুই জানে,
অভ্রভেদী এই নৈশযাপনই জানে—
আমরা দুজন
ধূলিরও অধিক ক্ষীণ এক আলোকরেণু ধরে
মৃত্যুরও ওপারে
পা বাড়িয়েছি।
ইফতেখার রবিন

কবি,লেখক ও শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, ঢাকা
বর্তমান ঠিকানা:ঢাকা কলেজ আবাসিক হোস্টেল, উত্তর ছাত্রাবাস
Facebook Comments
