ওলে শোয়িঙ্কা: আফ্রিকার বিবেক

ন্‌গুগি ওয়া থিয়োঙ’ও

ভাষান্তর : গৌরাঙ্গ মোহান্ত

[ওলে শোয়িঙ্কা (জ. ১৩ জুলাই ১৯৩৪, আবেকুটা, নাইজেরিয়া) বিশ্বখ্যাত নাট্যকার, কবি ও প্রাবন্ধিক; ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং ‘আফ্রিকার বিবেক’ নামে পরিচিত হন।
স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থানের কারণে ১৯৬৭ সালে প্রায় ২২ মাস কারাবন্দি হন এবং নব্বইয়ের দশকে সানি আবাচার শাসনে নির্বাসিত হতে বাধ্য হন।

The Lion and the Jewel, Death and the King’s HorsemanAke: The Years of Childhoodসহ তাঁর রচনায় ইয়োরুবা সংস্কৃতি, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আফ্রিকান আত্মপরিচয় শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

৯২ বছর বয়সেও তিনি বর্ণবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার; তাঁর জীবন ও সাহিত্য প্রমাণ করে, সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। – সাহিত্য ক্যাফে]

[ন্‌গুগি ওয়া থিয়োঙ’ও (৫ জানুয়ারি ১৯৩৮–২৮ মে ২০২৫) ছিলেন কেনিয়ার বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। ঔপনিবেশিক নাম ‘জেমস নগুগি’ ত্যাগ করে নিজস্ব গীকুয়ু পরিচয়ে ফিরে আসা এই লেখক তাঁর সাহিত্যে ঔপনিবেশিক শাসন, মাউ মাউ বিদ্রোহ, আফ্রিকান সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক ও সমাজসচেতন নাট্যকর্মের কারণে ১৯৭৭ সালে তিনি বিনা বিচারে কারাবন্দী হন। পরবর্তী সময়ে গীকুয়ু ভাষায় সাহিত্যচর্চাকে তিনি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম করে তোলেন এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। – সাহিত্য ক্যাফে]

 

উগান্ডার কাম্পালায় মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের সুপ্রসিদ্ধ ‘কনফারেন্স অফ রাইটার্স অফ ইংলিশ এক্সপ্রেশন’-এ উপস্থিত হওয়ার আগেই, গিটারবাদক কবি, নাট্যকার ও সদ্য প্রতিষ্ঠিত 'মবারি রাইটার্স ক্লাব'-এর সদস্য হিসেবে ওলে শোয়িঙ্কার খ্যাতির সংবাদ সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল; আর এ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা জেরাল্ড মুরের প্রদত্ত বর্ণনা ভূমিকা রেখেছিল। সে সময় মুর মাকেরেরের এক্সট্রামিউরাল বিভাগের পরিচালক ছিলেন এবং উলি বেয়ারেরও বন্ধু ছিলেন; এক বছর পর তিনি বেয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে Penguin Book of Modern African Poetry সংকলনটি প্রকাশ করেন। অ্যাচেবের Things Fall Apart যেভাবে সম্মেলনে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, শোয়িঙ্কার কোনো লেখা সেভাবে সম্মেলনে প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে আমার মনে পড়ে না; আবার কবিদের জন্য তিনি কবিতা লেখেন বলে ওকিগবোর সরস মন্তব্য যেভাবে আগুন জ্বেলে দিয়েছিল, শোয়িঙ্কার কোনো মন্তব্যও সেভাবে আলোড়ন তুলেছিল বলে আমার মনে পড়ে না। তবু সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিমধ্যে শোয়িঙ্কা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাহিত্যকর্ম লিখে প্রকাশ করেছিলেন; এর মধ্যে ছিল The Swamp Dwellers, A Dance of the Forests এবং The Lion and the Jewel শীর্ষক নাটকসমূহ। তিনি যে সাহিত্যিক বিচিত্রমুখিতা ও বিপুল সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীকালে, ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে, তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়। কিন্তু সম্মেলনে তিনি অন্য লেখকদের মতোই একজন লেখক হিসেবে গণ্য ছিলেন—এ লেখকগণের সংবেদনশীলতা গড়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবৈষম্য ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। আফ্রিকার জন্য একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সম্পর্কিত একটি দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁদের একত্রিত করেছিল। চিরবাস্তববাদী শোয়িঙ্কা অবশ্য A Dance of the Forests-এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেকোনো স্বপ্নবিলাসী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ইতিমধ্যেই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

অন্যত্র তিনি সতর্কতামূলক সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি রচনা করেছিলেন: “বাঘ তার ব্যাঘ্রত্বের গান গায় না; সে ঝাঁপিয়ে পড়ে,” কৃষ্ণাঙ্গ চেতনার কিছু কাব্য যেগুলো আফ্রিকার অতীতকে গৌরবময় ও দ্বন্দ্বহীন হিসেবে চিত্রিত করেছিল সেগুলোর প্রবণতার প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথাটি বলেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে শোনা পূর্ববর্তী গল্পের কারণে আমি আশা করেছিলাম, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে Telephone Conversation কবিতাটি আবৃত্তি করবেন—এ কবিতার কথা জেরাল্ড মুর সব সময় বলতেন, অথবা মুর যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন, সেভাবে গিটার বাজাবেন। তিনি কোনোটিই করেননি। তবে একবার আমি তাঁকে টপ লাইফ নাইটক্লাবে দেখেছিলাম—সে সময় সেটি ছিল কাম্পালার সবচেয়ে বিখ্যাত নৈশবিনোদনকেন্দ্র; সেখানে তিনি চা-চা নৃত্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি অন্য কয়েক জোড়া নাচের জুটিও তাঁর নাচ উপভোগ করার জন্য থেমে গিয়েছিল।

তখন আমি মাকেরেরেতে ইংরেজি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত কয়েকটি ছোটগল্পের রচয়িতা। কেনিয়া বা উগান্ডার বাইরে আমি কখনো পদার্পণ করিনি এবং শোয়িঙ্কার ইবাদান, লিডস ও লন্ডনের রয়্যাল কোর্টকে ঘিরে থাকা জগৎটি আমার কাছে ছিল অত্যন্ত দূরের। আমাদের আর কখনো দেখা না হলেও, আমার মনের ভেতর নাচ-ফ্লোরে বিরাজমান শোয়িঙ্কার সেই ছবিটি থেকে যেত—মাকেরেরে ও কাম্পালার প্রাণোচ্ছল জীবনের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে; এমন এক সৃজনশীল সহনশীলতা ও মতভেদ মেনে নেওয়ার জীবন, যা কয়েক বছর পর ইদি আমিনের উত্থানে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

তবে আমাদের পথ মূলত বিভিন্ন সম্মেলনে বারবার একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়; আফ্রিকা, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব স্থানগুলোতে যেমন, তেমনি কারাগার ও নির্বাসনের প্রতীকী পরিসরেও।

মাকেরেরে-পর্বের সেই সাক্ষাতের সময়ও, যদিও আমি তা জানতাম না, ইতিহাসের ভেতরে ইতিমধ্যেই আমাদের দেখা হয়ে গিয়েছিল। লন্ডনে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কেনিয়ার হোলা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবস্থান নিয়েছিলেন; সেই হত্যাকাণ্ডে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি বন্দিশিবিরে মাউ মাউ মুক্তি আন্দোলনের এগারোজন সদস্যকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আমার কাজিন গিচিনি ন্‌গুগি—মাউ মাউ আন্দোলনের সেই চরমপন্থি সদস্যদের একজন, তখন হোলায় ছিল—যারা সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছিল তাদের চরমপন্থি বলা হত; আর আমার ভাই ছিল মানিয়ানির অনুরূপ একটি বন্দিশিবিরে। বহু বছর পর তাঁর নোবেল বক্তৃতায় ওলে শোয়িঙ্কা সেই হত্যাকাণ্ডের কথা অথবা, তাঁর ভাষায়, ‘এগারোজন মানুষের মৃত্যুর সেই সামান্য ব্যাপার’ উল্লেখ করেছিলেন। তবে সেই ‘সামান্য ব্যাপার’ ছিল মূল বিষয়।গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছিল। রয়্যাল কোর্ট থিয়েটারের অনুষ্ঠানে সাম্রাজ্যই ছিল বিচারাধীন। এভাবে মাকেরেরেতে উপস্থিত লেখক তখনই কেনিয়ার ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রামের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। মাকেরেরের পর আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎ হয় ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে, সুইডেনের উপসালায় অনুষ্ঠিত আফ্রো-স্ক্যান্ডিনেভিয়ান লেখক সম্মেলনে, যার আয়োজক ছিলেন পের ভেস্টবেরি। ড্যান জ্যাকবসন, ওলে সোয়িঙ্কা ও আমার ওপর আমাদের শৈশবস্মৃতি নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের দায়িত্ব ছিল।

কোনো কারণে আমি আমার শৈশব সম্পর্কে বলার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে সে সময়ে আমি লিখছিলাম এমন উপন্যাস A Grain of Wheat থেকে একটি অংশ উপস্থাপন করেছিলাম। কিন্তু জ্যাকবসন ও শোয়িঙ্কা তাঁদের শৈশবের প্রথমদিকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে শোয়িঙ্কার উপন্যাস Aké যে রূপ ধারণ করে তার উৎপত্তিস্থল ছিল সম্ভবত উপসালা। তবে সম্মেলনে শোয়িঙ্কার শৈশবের স্মৃতিই মুখ্য হয়ে ওঠেনি; বরং সামাজিক সংগ্রামে বন্দুক ও কলমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নটিই প্রাধান্য পেয়েছিল। এর সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৬৪ সালের সেই ঘটনা থেকে, যা সুবিদিত হয়ে উঠেছিল—অভিযোগ ছিল, শোয়িঙ্কা বন্দুকের মুখে একটি রেডিও স্টেশন দখল করে লাডোকে আকিনটোলার দাপ্তরিক বিজয়-ভাষণের পরিবর্তে নিজের সমালোচনামূলক বক্তব্য প্রচার করেছিলেন।

শোয়িঙ্কার সংক্ষিপ্ত গ্রেফতার ছিল তার পরবর্তী কারাবাসের পূর্বলক্ষণ; তিনি এমন এক সংঘাতের ভেতর শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন যে তা বায়াফ্রার
বিচ্ছিন্নতা আন্দালনকে কেন্দ্র করে নাইজেরিয়াকে গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত করেছিল; এবং এ অভিজ্ঞতা থেকেই রচিত হয় তাঁর কারাজীবনের স্মৃতিকথা, ‘The Man Died’।

বইটি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু তখন আমার ধারণাই ছিল না যে পাঁচ বছর পর The Man Died আমার কাছে কামিতি ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি কারাগারে এসে পৌঁছাবে। কামিরিথু কমিউনিটি থিয়েটারের সঙ্গে আমার কর্মকাণ্ডের কারণে আমাকে কামিতিতে বন্দি করা হয়েছিল; বিশেষত এর কারণ ছিল আমার নাটক I Will Marry When I Want, যা আমি ন্‌গুগি
ওয়া মিরির সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছিলাম। সেখানে একদল রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে আমি যুক্ত হয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের ছিল নির্জন কারাবাস, প্রতি কক্ষে আমরা ছিলাম একজন করে। আমাদের কলম ও কাগজ দেওয়া হতো না, এবং বাইবেল ও কোরান ব্যতীত কোনো বই-ই না। কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার বইয়ের একটি প্যাকেট আমার কাছে পাঠাতে অনুমতি দেওয়া হয়। যেকোনো উপাদান, যাতে ঔপনিবেশিকতাবাদ শব্দটি ছিল, তা সেন্সর করা হতো। রাজনৈতিক বিষয়বস্তু রয়েছে—এমন কোনো রচনা ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হতো না। আশ্চর্যের বিষয়, ধর্মীয় এবং আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ বিবেচিত লেখাগুলোর মধ্যে শোয়িঙ্কার The Man Died আমার কাছে পৌঁছানোর অনুমতি পেল। আমি সব সময় ভেবেছি, তারা কি বইটিকে ধর্মীয় কোনো লেখা মনে করেছিল, নাকি মৃত্যু সংশ্লিষ্ট কোনো অধিবিদ্যামূলক আলোচনা বলে ভেবেছিল। সর্বোপরি, আমার সেল-ব্লকটি ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ব্লক ও যাদের মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বলে মনে করা হতো, তাদের ব্লকের মাঝখানে। রাজনৈতিক বন্দিদের প্রত্যেকেই শোয়িঙ্কার The Man Died পড়েছিল প্রত্যাশার দলিল হিসেবে, মৃত্যু বিষয়ক কোনো গ্রন্থ হিসেবে নয়। আমার নিজের কারাস্মৃতিকথা Detained-এ আমি এ কথা বর্ণনা করেছি। আজও এ পঙ্‌ক্তিটি আমাকে অনুপ্রাণিত করে: “স্বৈরাচারের মুখোমুখি হয়েও যে মানুষ নীরব থাকে, সে তার ভেতরেই মারা যায়।”

কর্তৃত্ববাদী বিগ ম্যান জোমো কেনিয়াট্টার মৃত্যু এবং একনায়ক বিগ ম্যান ড্যানিয়েল আরাপ মোয়ের ক্ষমতায় আরোহণের পর, ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে আমি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করি। আমার মেয়ে নজোকি, যার জন্ম আমার কারাবাসকালে, পরিবারের সদস্যদের একজন হিসেবে আমাকে বাড়িতে স্বাগত জানিয়েছিল। সংহতির এক নিদর্শন হিসেবে শোয়িঙ্কা তার নাম রেখেছিলেন আয়েরুবো—যে নাম আজও সে বহন করছে।

এর চেয়ে ঘরের কথা আর কী হতে পারে? নির্বাসিত লেখক হিসেবে অভিন্ন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে আমরা অন্যান্য জায়গায় একসঙ্গে মিলিত হয়েছি। সবচেয়ে স্মরণীয় সময় ছিল ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে লিডসে, যখন আমার সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদানের অনুষ্ঠানে শোয়িঙ্কা আমাকে আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন—যে সম্মান তিনি স্বয়ং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে অর্জন করেছিলেন। ঘটনাটি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে লিডস আমাদের দুজনেরই অভিন্ন আলম্যা ম্যাটার। মাকেরেরের পর ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে আমি লিডসে গিয়েছিলাম এবং সেখানে শোয়িঙ্কার প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছিলাম—কারণ তিনি আমার আগে সেখানে অবস্থান করেছিলেন। আমার সময়ের লিডস সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের একত্র করেছিল। এখনও আমার মনে আছে ইরাকের সেই দুই শিক্ষার্থীর কথা, যাদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার অভিযোগ এনে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতায় আসা বাথপন্থি নেতৃত্ব তাদের অনুপস্থিতিতে তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিল। আমার চোখে তারা ছিল চিহ্নিত মানুষ, কিন্তু তাদের দেখে মনে হতো না যে তারা এ নিয়ে খুব বেশি উৎকণ্ঠিত। আমি যখন ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে পড়লাম যে একনায়ক সানি আবাচা শোয়িঙ্কাকেও তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তখন লিডস ক্যাম্পাসের সেই দুই ইরাকি শিক্ষার্থীর ছবি আমার মনে ভেসে উঠেছিল। শোয়িঙ্কা যখন আনুষ্ঠানিক হুডটি আমার গায়ে পরিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন সেই দুই শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এবং তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা আমার মনে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

আমার বর্তমান আবাসস্থল সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় হওয়ার মধ্যেও এক ধরনের পরিহাস রয়েছে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের মাকেরেরে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দিকে ধাবিত আমাদের দুই পথ শেষ পর্যন্ত আমাদের দুজনকেই নিয়ে এসেছে সিটি অব অ্যাঞ্জেলস-এ। জ্যাক দেরিদার সঙ্গে শোয়িঙ্কা ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, আরভাইনের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর রাইটিং অ্যান্ড ট্রানস্লেশন-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন; এই কেন্দ্রই ২০০২ খ্রিস্টাব্দে আমাকে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে আকর্ষণ করে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক হিসেবে কেন্দ্রটি পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছিল। আরভাইন লয়োলা মেরিমাউন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে মাত্র আধঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত, যেখানে শোয়িঙ্কা আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আমরা শেষবারের মতো ২০১০ খ্রিস্টাব্দে লয়োলা মেরিমাউন্টে একই মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছিলাম। আমরা দুজনেই আমাদের স্মৃতিকথা থেকে পাঠ করেছিলাম—তিনি Aké থেকে, আর আমি Dreams in a Time of War থেকে। আমাদের এমন পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু দুজনেই এমন অংশ পড়েছিলাম, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমাদের শৈশব ও বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছিল। আমাকে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের আফ্রো-স্ক্যান্ডিনেভিয়ান লেখক সম্মেলনের কথা স্মরণ করতেই হয়েছিল, যেখানে আমাদের শৈশবের স্মৃতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।

ওলে শোয়িঙ্কাকে উদ্‌যাপন করার অর্থ হচ্ছে একজন অসাধারণ সাহিত্যিক, কর্মী ও বিবেকবান মানুষের বিস্ময়কর যাত্রাকে উদ্‌যাপন করা। তিনি এক বায়রনিক বীর, আরও যথাযথভাবে বললে, একজন রেনেসাঁস ব্যক্তিত্ব—তেজস্বী, অদম্য ও দুঃসাহসী। তাঁর রচনাগুলো—নাটক, কবিতা, স্মৃতিকথা ও উপন্যাস—একটি অভিন্ন ব্যানার বহন করে: “স্বৈরাচারের মুখোমুখি হয়েও যে মানুষ নীরব থাকে, সে তার ভেতরেই মারা যায়।” গত পঞ্চাশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি নিয়ে একজন লেখক ও সর্বজনবিদিত বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছেন—তিনি হয়ে উঠেছেন আফ্রিকার নৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিবেক।

 

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি, গবেষক ও অনুবাদক ড. গৌরাঙ্গ মোহান্ত ৭ জানুয়ারি ১৯৬২ সালে লালমনিরহাটের দেউতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন; শৈশব-কৈশোরও কাটে সেখানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে বি.এ. (১৯৮৩), এম.এ. (১৯৮৪) এবং নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে ‘Robert Frost: A Critical Study in Major Images and Symbols’ বিষয়ে পিএইচডি (২০০১) অর্জন করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘আধিপ্রান্তরজুড়ে ছায়াশরীর’, ‘শূন্যতা ও পালক প্রবাহ’, ‘ট্রোগনের গান’, ‘জলময়ূরের শতপালক’, ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’, ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’, ‘A Green Dove in Silence’ এবং গবেষণাগ্রন্থ ‘Robert Frost: A Critical Study in Major Images and Symbols’; সম্পাদনা করেছেন ‘বেগম রোকেয়া স্মারকগ্রন্থ’ ও ‘পুথি রহিব নিশানী: হেয়াত মামুদ’। তিনি বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক; বিবাহিত, দুই সন্তানের জনক এবং দেশি-বিদেশি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদে শৈল্পিক অনুভব, সত্তার বিশুদ্ধায়ন ও জীবনসত্যের গভীর প্রকাশ প্রধান অন্বেষণ।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top