তান্ইয়া নাহারের কয়েকটি কবিতা

১. ফিউশন

কালো একটি বিড়াল- যেভাবে ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে,
সাদা একটি বিড়াল- যেভাবে রোদের মধ্যে রোদ হয়ে,
নীল একটি মন যেভাবে পাখির ডানায় পাখি হয়ে-
উড়ছে তো উড়ছেই, ভাবছে তো ভাবছেই, দেখছে তো দেখছেই;
সেভাবেই, শ্যামা একটি আমি- তোমার মধ্যে তুমি হয়ে, ধীরে ধীরে,
নিভে নিভে, জ্বলে জ্বলে- উজ্জ্বল;
হচ্ছি তো হচ্ছিই, হচ্ছি তো হচ্ছিই, হচ্ছি তো হচ্ছিই!

৮ জানুয়ারি, ২০২৪।

 

২. বৃষ্টিকে

আমাদের যে জীবন ভেসে গেছে-
জলে, স্রোতে আর ক্ষীণ অবহেলায়;
সে জীবনও সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাক।
হারিয়ে যা পাওয়া যায়- তাকে তুই নাম দিস, প্রীতি।
কখনও মেঘের দিনে ভেবে নিস বন্ধুর মুখ- আদলে

আমার, কখনও বা ভুলে যাস এইসব ভেবে নেয়া রীতি।

তোর ঘরে গান হোক ঘন দেয়া বরষার,
মেঘেদের চাষ হোক মনে।
ভালোবেসে পুড়ে গেলে, ভিজে নিস পুরোটাই
আষাঢ়ের নীল বর্ষণে।

 

৩. ফুলবও সেই রমণী

এমন সোনাঝুরি দিনে-
হৃদয় নড়ে ওঠে হলদে বাতাসে।
নড়ে ওঠে? নাকি ওঠে কেঁপে? কে জানে!

নড়ে ওঠা, কেঁপে ওঠা কাকে বলে-
হৃদয় জানে কি!
এলোচুল রমণী সে জানে?-
শিশুটির হাত ধরে একাই যে হাঁটে?

হেঁটে হেঁটে এ রমণী যাবে ততদূর-
যতদূর থেকে খুব সহজেই ফিরে আসা যায়।

জারুলের বেগুনি ঈর্ষা বয়ে বুকে
ফিরে ফিরে আসবে সে রাধাচূড়া দিন-রজনীতে।

১৫ মে, ২০১৫।

 

৪. বেহুলা

বেহুলার কথা ভেবে হিম হয়ে আসে বুক;
কে যেন গহীন বুকে ‘বেহুলা বেহুলা’ বলে ডাকে!

পুরুষ দেখেছে প্রেম বেহুলার রাতজাগা চোখে,
খোঁজেনিকো ভয় কিবা কান্নার নীলদাগ কোন-
অভিমানী, নিষ্পলক, নিষ্প্রাণ দৃষ্টির ফাঁকে।

কে তাকে ভাসিয়ে নেয়-
শবদেহ সাথে বয়ে গাঙুরের ক্ষমাহীন বুকে?
দায়বোধ? দুঃশাসন? নাকি সেটা সত্যিই প্রেম!

নিরুপায়ে পরিহিত মন্ত্রের সুতো
বেঁধে তাকে রেখেছে কী প্রাণহীন ভেলাটির সাথে!

ফিরে যেতে পারেনা সে- লখিন্দরকে ফেলে?
পারে না গহন নদে একা ডুবে যেতে?

বেহুলার কথা ভেবে হিম হয়ে আসে বুক;
একা একা ভাসি, মরি– গাঙুরের স্রোতে।

২২ জুন, ২০১৬।

 

৫. ভাত ও বৃক্ষপ্রেমীদের যত সব বিপন্নতা

গরম ভাতের গন্ধে চিরকালই যারা কাতর হয়েছে–
খিদেয় নয় শুধু, বুঝি বা কোন ভাতঘুম স্মৃতিতে;
আমিও তাদেরই তো দলে।

ফসলের মাঠ ফেলে- তিল, তিসি ফুলেদের ঘ্রাণ ভুলে গিয়ে; এই যে কাটাই দিন-রাত; নাগরিক গরমে ও জ্যামে- সে কী শুধু তিন বেলা দুই মুঠো ভাত খাব বলে!

প্রতিদিন ভিড় ঠেলে ঠেলে আরও কিছু বেশি রোজগার-
জামা-জুতো, গাড়ি-বাড়ি, প্রসাধন, সোনা পেতে নয়;
ঘরে থাকা শিশুদের মেটে যেন ছোট আব্দার-
পেন্সিল, কলম, বই, লাল-নীল রঙিন খাতার।

যেন মাকে দিতে পারি এইবার অন্তত পছন্দের শাড়ি।

অথচ কারা যে নাড়ে কলকাঠি, অহরহ,
একদিকে ঘাম বাড়ে, আর দিকে দাম!
বৃক্ষের গোড়া কেটে যারা ঢালে পানি আগাছায়-
ছায়া নয়, চায় শুধু পকেটের বাড়াতে ওজন;
তারা কি কখনও জানে একেকটি বল্কলে কত জল,
আলো ও বাতাস, সাথে নিয়ে মমতার হাত;
গাছেরা বৃক্ষ হয়, তারপর লেখে ইতিহাস!

২ জুন, ২০২৩।

 

তান্ইয়া নাহার

 

 

 

 

 

 

 

জন্ম টাঙ্গাইলের ছোট্ট এক গ্রামে। পড়াশোনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। পেশায় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী। পড়তে ভালোবাসেন; শুধু আইন নয়, সাহিত্যও। আর ভালোবাসেন লিখতে; কবিতার মত করে রোজকার অভিজ্ঞতা, প্রাণ-প্রকৃতি ও জীবন-যাপন নিয়ে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top