মুখোশের আড়ালে
মানুষেরা বেজায় জোচ্চোর
আলোতে ঢেকে রাখে মুখ
অন্ধকার পরিধান করে
আর শাবল চালায়
তারা জোড়া সাকোঁতে যায়
গানের তালিম নিতে নিতে ঠাকুর বন্দনা করে
আর উন্মুখ হয়
কোনো এক সুদিনের অপেক্ষায়!
অযথাই ভিড় করে মানকচু পাতা
ঘুম আসেনা চোখে
বর্ষা এলেই টের পাই কে যেন বসে আছে কাছে
পুরনো দালানের ছাদে কারও হাসি ঘুঙুরের মত বাজে
পুকুরের টলটলে জল, কদমের ঘ্রাণ একাকী
চিত্রল হরিণীর ত্রিমাত্রিক ছায়া
অন্ধরাত আরও অন্ধত্ব ছড়ায়
গায়ে জ্বর আসে
চেনা সুর চেনা বৃষ্টির ফোঁটা
অচেনা বল্লমের মত বুকে এসে বিঁধে
আমি গান ভুলে যাই
ভুলে যাই ঠিকানা সাকিন
অযথাই ভিড় করে মানকচু পাতা
পাতার উপরে নৃত্যময়ী শ্রাবণ অপ্সরা
নদী পাড়ে
আমাদের পুরনো দিনগুলো রেখে এসেছি
সবুজ হাওয়া, ঘাসফড়িং, পালতোলা নৌকা তাদের বয়ে নিয়ে যায়, স্মৃতি খেতে দেয়
মাঝে মাঝে ঝড়ের ঝাপট এলে, বানভাসি হলে
ঘুমন্ত মায়ের আঁচল ধরে টানে, চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নির্ভরতা, স্নেহের খুঁটি যেন…
মা জানে না এখন আমাদের কোনো দিন নেই
শুধু রাত, শুধু অনন্ত অন্ধকার….! তবুও —
যারা খুব আনন্দে থাকে তারা আনন্দে থাকুক
যারা পাশ ফিরে শুয়ে আছে শুয়ে থাক, তারা তাদের অভিমান ভুলে যাক, বালিশ বদল করে নিক, কিংবা দীর্ঘশ্বাসটুকু উড়িয়ে দিক ঠা ঠা করে… যেমন শাদা কবুতর শাদা শাদা মেঘে নির্ভার পালক ছড়ায়।
পৃথিবীকে দুঃখের কথা বলে লাভ নেই, সে নিজেই ভারাক্রান্ত, মুহ্যমান! তারচে, এসো, আমরা আমাদেরকেই গান শোনাই, বৃষ্টি কিংবা শরতের গল্প বলি আর বুক চিতিয়ে হেসে নেই হাহ হা… সা রে গা মা পা…!
মানুষেরা একাকী রাত
মানুষেরা একাকী রাত
চলে গেলে মনে রেখে কী হয়!
রাখতে চেয়েছি, বহুবার বুকের কাছে, নিঃশ্বাসের কাছে
অঙ্গে-অনঙ্গে, ঠোঁটে, জিহবায় স্বাদে-বিষাদে বিহ্বলতায়!
অজুহাত দিইনি, অপূর্ণ রাখিনি কিছুই
নিজের করে, নিজস্বতায় নিমগ্ন থেকেছি
বলিনি, বলার কিছু রাখিওনি
দ্বিধা থেকে, দূরত্ব থেকে, নিঃশঙ্ক রেখেছি চিরদিন
তবু, চলে গেলে মনে রেখে কী হবে! কী হয়!
অন্ধকার এসে কথা বলে যায়, আলো থেকে ঝরে যায় আলোর প্রসাদ
বিভক্তি রেখা বিশাল হাতির শুঁড়ের আখ্যান, চিরদিন জলভরা দিঘি জলের সাম্পান
পিতলের ঘোড়া নয় মন, মনের ভিতর হাজার দুয়ার হাজার পাখির হাজার কোরাস
দ্বিধাহীন গরিমা হয়ে ওড়ে
তুমি সেই অধরা পাখির মতো চলে গেলে, দূরে… নীরবতা নিয়ে তাই পালকের কষ্ট পুষে রাখি না
কষ্ট রেখে কী হয়, হয়েছে কখনো!
তীব্র নাড়ির টানও ভুলে যায় মানুষ
দূরে গেলে পড়ে থাকে মাস্তল
নদীহীন যারা, তারা কি জানে ঢেউয়েরও আছে একাকী রাত
সে রাতের গন্তব্য থাকে না…!
কবি মোহাম্মদ হোসাইন

সুনামগঞ্জে ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণকারী কবি মোহাম্মদ হোসাইন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা, নির্জনতা ও নৈঃশব্দ্যের অনুষঙ্গে স্বতন্ত্র কাব্যভুবন নির্মাণ করে চলেছেন। আপাত সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ ও মানবমুক্তির স্বপ্নকে ধারণ করে তাঁর কবিতা সমকালীন বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব স্বর প্রতিষ্ঠা করেছে। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ২২টি।
