ক্ষমা মাহমুদ: আন্দিজানের সোনার মানুষ- বাদশাহ বাবর

জীবনের কোন স্বপ্ন, যদি সত্যিই সত্যি হয়ে ওঠে, তাহলে সেটা প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্বাস করা কঠিন হয়, কেমন যেন ঘোর লাগে, তারপর চিমটি কেটে পরখ করে দেখতে ইচ্ছে করে জেগে আছি নাকি স্বপ্ন দেখছি! আন্দিজানে নেমে আমার ঠিক তেমনই অনুভূতি হলো। মনের মধ্যে শুধু অনুরণিত হচ্ছিলো, এই সেই ফারগানা ভ্যালি, এই সেই আন্দিজান, ভাগ্য বিড়ম্বিত মহান মোগল সম্রাট বাবরের জন্মস্থান, যে শহরকে তিনি বারবার স্মরণ করে বলেছেন, ‘আন্দিজান- সেখানেই আমার প্রাণ!’ আমৃত্যু তিনি যে শহরে ফেরার স্বপ্ন বুকের মধ্যে লালন করেছেন সেই শহরে এসে  দাঁড়িয়েছি আমি; এতদিনের লালিত স্বপ্নটা সত্যি হলো তাহলে!

 

মোগলদের রূপকথা

সেই কোন ছোটবেলায় মোগল সাম্রাজ্যের রূপকথার মত গল্প গুলোর সাথে পরিচয়। বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী মায়ের বইয়ের বিশাল সংগ্রহের তালিকা থেকে আনিস সিদ্দিকির ‘মোগল হেরেমের অন্তরালে’ হাতে তুলে নিয়েছিলাম কবে তা আজ আর মনেও নেই। সেই বই দিয়েই মোগলদের রাজ্যে প্রবেশের শুরু এবং এখন পর্যন্ত সেই আগ্রহ একই রকম আছে, তবে সেই আগ্রহের মধ্যমণি হয়ে আছেন মধ্য এশিয়া থেকে এসে গোটা ভারতবর্ষ জয় করে নেয়া মহান উজবেক সম্রাট বাবর, যিনি শুধু বিশাল এক নতুন সাম্রাজ্যেই এই উপমহাদেশে গড়ে তোলেননি, সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন মধ্য এশিয়ার অতুলনীয় সৌন্দর্যবোধ, কাব্য প্রেম, রসনা বিলাস আরো কত কি! ছোটবেলায় সব মোগল সম্রাটদের নাম ধারাবাহিকভাবে মনে রাখার জন্যে বলতাম, ‘বাবার হইলো একবার জ্বর, সারিল ঔষধে’ – এভাবে মনে রাখতাম, বাবর, হূমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের শাসনের ধারাবাহিক শাসনকাল । উপমহাদেশের মানুষের সংস্কৃতিতে মোগলরা ‌অনেক নতুন কিছু সংযোজন করেছে তাই তিন শতাব্দীব্যাপী সাম্রাজ্যের সেইসব গল্প আমার কাছে সবসময়ই বিশেষ আগ্রহের জায়গা হয়ে আছে। যখনই যেখানে মোগলদের উপর কোন বই হাতে পেয়েছি, গোগ্রাসে গিলেছি। তবে সবকিছুর উপরে আমার অসম্ভব প্রিয়, চাগতাই তুর্কি ভাষায় লেখা সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী, তুজরুক-ই-বাবর বা বাবরনামা‌, অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে যে বই। যাদুঘরে সংরক্ষিত বহু ভাষায় অনূদিত বাবরনামা

 

অতীত অথবা বাবরনামা 

ফারগানার বাদশাহ, পিতা উমরশেখের অকাল মৃত্যুতে মাত্র বারো বছর বয়সে মসনদে বসতে হয় সম্রাট বাবরকে। সেই অল্প বয়সেই নানান ষড়যন্ত্রে নিজের রাজ্য ফারগানা ভ্যালি ও সমরখন্দের মসনদ হারিয়ে বারবার তা ফিরে পাওয়ার যে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল সেই যুদ্ধ আর থামেইনি তার পুরো জীবনে। জীবনভোর এই মসনদের যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছে তাকে কিন্তু তার মন পড়ে থাকতো কবিতার খাতায়, শিল্পের রাজ্যে! বাবরনামার পুরনো নাম ‘অতীত’ যা তিনি তরুণ বয়স থেকে লিখে গেছেন কিন্তু যুদ্ধ বিগ্রহে জড়িত থাকার কারণে লেখায় ধারাবাহিকতার অভাব ছিল। তবে যখনই সময় পেয়েছেন, লিখেছেন। ফারগানা, আন্দিজান বা সমরখন্দে কাটানো দিনগুলোর বর্ণনার পাশাপাশি অল্পবয়সী এক শাহজাদা তার সাতচল্লিশ বছরের জীবনে কিভাবে মধ্য এশিয়া থেকে এসে একদম নতুন এক ভূমি, আফগানিস্তান থেকে সমগ্র ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য বিস্তার করলো বাবরনামা’য় সেই বয়ানের পাশাপাশি আরো আছে সেই সব জায়গার অনুপম বিবরণ। তার কবি মন কাবুলের দর্শনীয় বস্তুগুলির বর্ণনা দেয়ার সাথে পাহাড়, নদী, গাছপালা, জীবজন্তুরও বর্ণনা দিয়েছেন। এমন দোর্দন্ড প্রতাপশালী সম্রাটের কাব্য প্রেম, উদ্যানপ্রিয়তা এবং স্থাপত্যশিল্পের প্রতি অনুরাগের এক অনুপম সাক্ষী তার এই আত্মজীবনী- তার অনন্য জীবন সংগ্রাম এবং বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কাহিনী। বাবরনামা পড়তে পড়তে আমি ভেবেছি, মানুষটার নিয়তি যদি যুদ্ধ আর মসনদ নিয়ে না হতো তবে তিনি অবশ্যই হতেন একজন বিশিষ্ট কবি বা শিল্পী। ছেলে হূমায়ুন যখন পনেরো বছর বয়সে ব্যগ্র হয়ে পড়তে চেয়েছেন পিতার ‘অতীত’ – তাকে বলেছেন, ‘এত ব্যস্ত হয়ো না শাহজাদা, জেনো, আমার জীবন যেদিন শেষ হবে, সেদিন ঐ বইটিও লেখা শেষ হবে।’ মোগলদের রূপকথার মত এইসব গল্প আমাকে সবসময়ই মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, বিশেষ করে এই সাম্রাজ্যের যিনি স্থপতি, গাজী জহিরউদ্দিন মুহম্মদ জালালউদ্দিন বাবর, যার নামের আরবী অর্থ সিংহ, যিনি শুধু এক বীর সম্রাটই ছিলেন না, যোদ্ধার‌ অ‌ন্তরালে ছিলেন এক বিষন্ন শিল্পী, মহান কবি এবং এক উন্নত মানবআত্মা- তার আমি গুণমুগ্ধ!  মহান সম্রাট জহিরউদ্দীন বাবর

প্রখ্যাত সোভিয়েত উজবেক লেখক পিরিমকুল কাদিরভ সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী অবলম্বনে অসম্ভব কুশলতায় লিখেছেন এক অসাধারণ যাদুকরী উপন্যাস, ‘বাবর’- যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন, মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাচ্যের সুপরিচিত গীতিকবি হিসাবে সম্রাট বাবরের জীবন ও কাব্যসম্ভার। একই ব্যক্তির চরিত্রের মধ্যে কবি ও শাসক এই দুই বিপরীতধর্মী গুণের মিলন কি করে সম্ভব সেই খোঁজ পাওয়া যায় তার এই উপন্যাসে।

 

আন্দিজানের পথে 

উজবেকিস্তান মানেই অনেকের কাছে তাসখন্দ, বুখারা আর সমরখন্দ হলেও এর বাইরে আছে দেখার মত আরো কিছু রত্নখচিত জায়গা, সে খবর খুব বেশী মানুষ রাখেনা। ভ্রমণ আড্ডার এক আসরে হঠাৎ কানে এলো উজবেকিস্তান সফরের একটা আলোচনা হচ্ছে, যার উদ্যেক্তা ভ্রমণ আয়োজক  সৈয়দ আবু জাফর। একটুও দেরী না করে তাকে বললাম যেতে চাই আমার এই স্বপ্নের দেশে আর অন্য সব দ্রষ্টব্য জায়গার সাথে অবশ্যই যেতে চাই সম্রাট বাবরের জন্মস্থান ফারগানা ভ্যালিতে, তিনিও বললেন, ‘আচ্ছা, চেষ্টা করা হবে।’ জাফর ভাই এর উদ্যেগে কয়েক দফা মিটিং, সিটিং আর ইটিং এর মধ্যে দিয়ে নয় জনের এক দারুণ ভ্রামণিক দল হয়ে আমরা এক সুন্দর সন্ধ্যায় উজবেকিস্তানের উদ্দেশ্যে পাখা মেললাম।

উজবেকিস্তানে গিয়ে প্রথমে তাসখন্দ থেকে সমরখন্দ, বুখারা ও খিভা ঘুরে ফের তাসখন্দে ফিরে এলাম,  ততদিনে আমাদের দলের পাচঁজন তাদের সফর শেষ করে দেশে ফিরে গেছেন।বাকী যারা আমরা রয়ে গেছি এবার তাদের গন্তব্য আন্দিজান, সম্রাট বাবরের জন্মস্থান, যেটি ফারগানা উপত্যকার দক্ষিণাংশে অবস্থিত একটি প্রদেশ। ফারগানা, নামাঙ্গান ও আন্দিজান এই তিনটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত ফারগানা উপত্যকা যার সাথে রয়েছে কিরঘিজস্তান ও তাজিকিস্তানের সীমানা। যাওয়ার সময় ফারগানা গিয়েছি ট্রেনে করে এবং আসার সময় গাড়ী করে সড়ক পথে। যাওয়া আসার এই পুরো পথে এই দেশের অপরূপ ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য দেখার যে দুই ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা চিরদিনের জন্যে হৃদয়ে গেঁথে আছে!

সকাল সাতটার মধ্যেই প্রচন্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমাদের চারজনের দল এবং সাথে উজবেক গাইড মির্জা বেগ রুজমেতভ ইসমাইলোভিচ তাসখন্দ ট্রেন স্টেশনে গিয়ে হাজির। আবার সেই নীল সাদা স্নিগ্ধ চেহারার ট্রেন এ্যাফ্রোসিয়াবে করে আমাদের গন্তব্যে যাত্রা- যদিও এটা আমাদের এর আগের যাত্রাগুলোর মত বুলেট ট্রেনে করে নয়, তবে সৌন্দর্য আর ব্যবস্থাপনায় খুব বেশী পার্থক্য করা গেলনা, গতিও যথেষ্ট ভালো। ট্রেন স্টেশন যে কত শৈল্পিক আর সুন্দর হতে পারে এবং তার সার্বিক ব্যবস্থাপনাও যে কতটা গোছালো হতে পারে উজবেকিস্তানে গত বেশ কিছুদিনের ট্রেন ভ্রমণে তা জেনে গিয়েছি। ঠিক সময়মত সকাল সাড়ে সাতটায় ট্রেন ছাড়লো। স্থানীয়দের সাথে কিছু বিদেশী পর্যটকও ট্রেনে আছে চোখে পড়লো। সারি সারি সবুজপাতাবিহীন বাদামী রং ধারণ করা পপলার এবং আরো নাম না জানা গাছের সারির মধ্যে দিয়ে ছুটে চললো আমাদের ট্রেন। চারপাশের বাড়ীঘর, মানুষ যাকিছু  চোখে পড়ছে, মনে হলো রুশ সাহিত্যে পড়া সব দৃশ্যমালা! সে পথ এত অচেনা, এত সুন্দর যে চোখ ফেরানো দায়! যাত্রার ঘন্টা দুয়েক পরেই পাহাড়ের পাশ দিয়ে এক নদীর ধীর, স্থির চেহারা চোখে পড়লে মির্জা বলে উঠলো, আমরা কিন্তু সির দরিয়া নদী পার হয়ে যাচ্ছি। বেশ কিছুটা রাস্তা ধরে তার বয়ে চলা দেখা গেল, কিছুটা বরফে ঢাকা- খুবই শান্ত সে নীল- সবুজ পানির চেহারা, জনমনিষ্যির চিহ্নও দেখা যাচ্ছেনা কোথাও। কত লেখায় পড়েছি সির দরিয়া, আমু দরিয়ার কথা, সেসব নদীর সাথে তবে দেখা হলো হেথা।

 

এলেম বরফের দেশে

ট্রেন থেকে দেখি শুভ্রবসনা প্রকৃতি

ঘন্টা দুই আরো এমন চলার পরেই দেখি কুয়াশার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল রঙের ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা। ধীরে ধীরে পাহাড়ের আকার বড় হচ্ছে আর সেই সাথে চোখে পড়ছে পর্বতের গায়ে কোথাও হালকা, কোথাও গাঢ শ্বেত শুভ্র বরফের আচ্ছাদন। রেলপথের পাশেই পাহাড় কেটে কেটে সড়ক পথও রয়েছে। রাস্তাঘাট সব বরফে ঢাকা তবে তার মধ্যেও মানুষের কাজ কর্ম থেমে নেই, ঘোড়া ও ভেড়ার দল এদিক সেদিক দাঁড়িয়ে ঘাস চিবিয়ে চলেছে, পপলার আর জুনিপারগুলো যুঝে চলেছে বরফের সাথে। ছোট ছোট বরফে জড়ানো শহরতলী পার হয়ে যাচ্ছি একের পর এক, টালি দেয়া একতলা বাড়িঘর গুলো সব স্ফটিকের মত চকচক করছে রোদের আলো মাখা বরফে, এমন একটা কিছু আর চোখে পড়েনা যা শ্বেতশুভ্র নয়! এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি চলে যাচ্ছি পাঁচশো বছর আগে- চোখের সামনে সিনেমার দৃশ্যের মত ভেসে উঠছে, বাদশাহ বাবর তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলেছে এইসব পথ পাড়ি দিয়েই! শুভ্রবসনা এই পাহাড় পার হয়ে পথ চলার সেই স্মৃতি কোনদিন ভুলবোনা। উজবেকিস্তানের ভূ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বরফ ঢাকা এই পর্বতের বুক চিরে এই পথে না গেলে অজানা রয়ে যেত!

 

এক গ্লাস অন্ধকার – কামচিক পাস 

অনন্তকাল ধরে চলা এক বরফের রাজ্য পার হতে হতে  হঠাৎ ট্রেনের মধ্যে ঘোষনা হলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা আঠারো কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেলের মধ্যে দিয়ে যাবো এবং তখন সব বাতি বন্ধ হয়ে যাবে, সুতরাং কেউ ওয়াশরুম সংক্রান্ত জরুরী কাজ থাকলে যেন সেরে নেয়। ঘটনা কি জানার জন্য আমাদের গুগলম্যান মির্জাকে জিজ্ঞাসা করতেই সে বললো, এখন আমরা নামাঙ্গান প্রদেশের নামাঙ্গান ভ্যালী পার হচ্ছি যার একপাশে কিরঘিজস্তান আর অন্যদিকে তাজিকিস্তান সীমান্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন কামচিক পাস অতিক্রম করবে যেটা পূর্ব উজবেকিস্তানের কুরামা পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২০০ ফিট উপরে! নামাঙ্গান ভ্যালীর কামচিক পাসের ভিতর দিয়ে এই টানেল বানানো হয়েছে। সময় বাঁচানোর জন্য তাসখন্দ থেকে নামাংগান প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশ তাজিকিস্তানকে বাইপাস করে ফারগানা প্রদেশে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এটি। ফারগানা ভ্যালির একটা অংশ পড়েছে তাজিকিস্থানে আর বেশীর ভাগটা পড়েছে উজবেকিস্তানে। এই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে কিভাবে এত দীর্ঘ টানেল বানিয়েছে আল্লা মালুম! টানেল পার হওয়ার পুরো সময়টা আমরা অন্ধকারে এবং বলতে গেলে শব্দহীন।  হঠাৎ বাতি জ্বলে উঠলো; ঘড়ি দেখলাম, প্রায় কুড়ি মিনিট লেগেছে টানেলটা পার হতে। টানেল শেষ হতেই রোদ ঝলমলে চারদিক! বরফের শুভ্রতা সরে গিয়ে চোখে পড়ছে দুইদিকে খাড়া লাল পাহাড়, তার গায়ে গায়ে জমে থাকা বরফের স্তুপ। কিছু কিছু গাছের কংকাল দেখা যায়, তাদের গায়ে জমে থাকা বরফগুলো নীচে পড়ছে টুপটাপ করে। সারি সারি পাতাহীন পপলারের ফাঁকে ফাঁকে কিছু সবুজের দেখাও মেলে। কিছুক্ষণ পরপর অল্প কিছু গাছে সাদা আর হালকা গোলাপী রঙা অদ্ভুত সুন্দর চেরী আর এ্যামন্ড  ফুল ফুটে আছে। মার্চের এই সময়ে অফিসিয়ালী এখানে বসন্ত এসে গেছে, কিছুদিন পরেই নওরোজ, তাই ফুলেরাও ফুটতে চাচ্ছে কিন্তু বরফের কারণে পুরোপুরি ফুটতে পারছেনা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব জায়গাতেই টের পাওয়া যায়।

 

বরফের রাজ্য

ছয় ঘন্টার এই ট্রেন যাত্রায় কত যে বিচিত্র বাড়িঘর, মাঠ ঘাট, রেল স্টেশন, নদী, পাহাড়, বরফ পেরিয়ে গেলাম – সে বলে শেষ করার নয়। একে একে পার হয়ে গেলাম দৃষ্টি নন্দন কোকান্দ, মার্গিলান রেলস্টেশন- যেসব নাম পড়েছি বাবরনামায়।

ট্রেন থেকে দেখা বরফের রাজ্য

তার মানে আমরা প্রায় ফারগানার কাছাকাছি। মনের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা!  অসম্ভব সুন্দর এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কোন ফাঁকে ফুরিয়ে গেল বাইরের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে, টেরইতো পেলাম না! কেমন এক শূন্যতাও বোধ হলো! খুব সুন্দর কোন কিছু উপভোগ করার পাশাপাশি বুকের মধ্যে

কেমন এক অজানা হাহাকারও তৈরী হয়, ক্ষনস্থায়ী সেই সৌন্দর্য এখুনি শেষ হয়ে যাবে, আর তাকে দেখতে পাবো না, সেকথা ভেবে হয়তো!

ফারগানা ভ্যালি থেকে ফিরে আসার সময় এই একই রাস্তা ধরে আমরা ফিরে এসেছিলাম কিন্তু কোন জায়গা ধরে যে সেই ট্রেনলাইন এবং সেই টানেল ছিল তার আর কোন চিহ্ন পরে খুঁজে পাইনি, সে যেন এক দা

রুণ জাদু! আসার পথেও গাড়ি  ছোট ছোট টানেলের মধ্যে দিয়ে এলো কিন্তু কামচিক পাস পার হওয়ার অভিজ্ঞতার তুলনায় সেটা কিছুই নয়। যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে যে বরফের রাজ্য দেখছিলাম, সড়কপথে ফেরার সময় সেসব জায়গায় থেমে থেমে, কনকনে ঠান্ডায় বরফ নিয়ে উচ্ছাস আর মাতামাতির কমতি হলোনা কোন। ট্রেনে এবং গাড়িতে যাওয়া এবং ফিরে আসার সম্পূর্ন দুইরকম পথ ভ্রমণের যে অতুলনীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে ফারগানা উপত্যকা থেকে ফিরেছিলাম তা এই জীবনে ভোলার নয়।

আন্দিজান- এখানেই আমার প্রাণ

দুপুর দুটো নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম আন্দিজান। খুব সুন্দর, ছিমছাম আর এদেশের ট্রেডমার্ক রঙ নীলের ছোয়ায় রাঙানো এক দৃষ্টি নন্দন রেলস্টেশন- বিল্ডিংয়ের  উপরে বড় করে নীল রঙে লেখা – আন্দিজান। স্টেশনে নেমেও বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমি দাঁড়িয়ে আছি এই শহরে!

‘বাবর’ উপন্যাসে পড়া আন্দিজানে যুবরাজ বাবরের কাটানো দিনগুলোর বর্ণনা মনে পড়লো-“শহরের বাইরে উঁচু দেওয়াল ঘেরা সুন্দর বাগানবাড়ির ফটকে সাধারণ প্রহরা বসানো। বারোবছর বয়সী বাবর মির্জা মত্ত হয়ে যুদ্ধবিদ্যা শিখছে। মাঠের ওপর দিয়ে জোর ছুটছে তার ঘোড়া, এবারে লাগাম ছেড়ে দিয়ে ধনুকের ছিলায় টান দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে তীর ছুঁড়ল, ফাঁপা একটা আওয়াজ তুলে তীর গিয়ে বিঁধল চাঁদমারি হিসাবে ব্যবহৃত কাঠের তক্তাটায়-’

কিশোর বাবর যখন এ শহরের দুর্গে যুদ্ধবিদ্যা শেখা নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু নিশ্চিন্ত জীবন পার করছেন কিংবা অবসরে বাগানবাড়ির বইঘরে প্রিয় কবি ফেরদৌসী, শেখ সাদী বা আলিশের নবাইয়ের শত শত কবিতার মধ্যে মুখ ডুবিয়ে রয়েছেন ঠিক সেই সময়ে যেন সৌভাগ্যের প্রতীক হুমা পাখি এখান থেকে উড়ে চলে গেল অন্য কোথাও আর একটা মন্দ বাতাসের মতো তার কাছে এসে হাজির হলো, ফারগানার বাদশাহ পিতা উমরশেখের অকাল  মৃত্যেুর খবর এবং সারাজীবনের জন্যে তার নিশ্চিন্ত জীবনটা পাল্টে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভরে উঠলো!

একটু থিতু হয়ে নিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখি ঠিক বিপরীত পাশে বিশাল, সুন্দর এক পার্ক- যেন বলছে- সম্রাট বাবরের জন্মস্থানে স্বাগতম। আমরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে সেদিকেই আগে এগিয়ে যাই। ঢুকতেই একটা বড় বিলবোর্ডে সম্রাটের ছবি, জন্ম ও মৃত্যু সাল, সাথে  উজবেক ভাষায় কিছু লেখা।

 

সম্রাটের শহরে

আরো একটু এগিয়ে ভেতরে যেতেই অসাধারণ এক ভাস্কর্য চোখের সামনে! ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন তিনি, সেই অসামান্য এক মানুষ- মোগল সাম্রাজ্যের স্থপতী সম্রাট বাবর। মনে হলো, আমার জীবনে দেখা অন্যতম সুন্দর এক ভাস্কর্যের সামনে আমি দাড়িয়ে আছি। বুকে হাত রেখে ভীষণ তেজী এক কালো রঙের ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন বীর যোদ্ধা, মহান শাসক,  তবু কি কমনীয় মুখের ভাব। তার ব্যক্তিত্বের আভা যেন ভাস্কর্য ভেদ করে দুত্যি ছড়াচ্ছে, এতো জীবন্ত! মুজতবা আলী তার দেশে বিদেশে’তে লিখেছেন, “বাবর ফারগানার রাজা নন, আফগানিস্তানের শাহানশাহ নন, দিল্লীর সম্রাটও নন। আত্মজীবনীর অক্ষরে অক্ষরে প্রকাশ পায়, বাবর এসবের অতীত, অত্যন্ত সাধারণ মাটির গড়া মানুষ। হিন্দুস্থানের বর্ষার প্রথম দিনে তিনি আনন্দে অধীর, জালালাবাদের আখ খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ- সেই আখ আপন দেশ ফারগানায় পোঁতবার জন্যে টবে করে হিন্দুকুশের ভিতর দিয়ে চালান করেছেন, আর ঠিক তেমনি হিরাত থেকে গৌহরশাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান শিল্পকলা টবে করে নিয়ে এসে দিল্লীতে পুঁতে ভাবছেন এর ভবিষ্যত কী, এ তরু মন্জরিত হবে তো?”

পুরো ভাস্কর্যটা ঘুরে ঘুরে দেখলে মনে হয়, বুঝি মেঘের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন মহান সম্রাট। শত শত বছর পরেও কোন সুদূর থেকে এখানে এসেছি আমরা শুধু তার কথা স্মরণ করেই, কত মানুষই না এমন করে আসে! শুধু বীর যোদ্ধা বা শাসক হলেই এই সন্মান হতোনা, তাকে আমরা স্মরণ করছি তেমন ভাবেও, একজন মহান কবি বা শিল্পী হিসেবে যেমন ভাবে কাউকে স্মরণ করা হয়। ভাস্কর্যের পেছনটা সবুজ গাছপালায় ঘেরা, মানুষ জনও আছে কিছু আশেপাশে। আবহাওয়া আমাদের একটু প্রতিকূলেই ছিল। প্রচন্ড শীত আর ঠান্ডা বাতাসে যে ছবিগুলো তুলেছি তাতে আলোর অভাব আছে। অনেকটা সময় সেখানে দাঁড়িয়ে তার ভাস্কর্য দেখতে থাকি মন্ত্রমুগ্ধের মত এরপর এগিয়ে যাই শহরের দিকে, তার সমাধির উদ্দেশ্যে। যে পথ ধরে আমরা শহরের দিকে এগোলাম, মির্জা বললো, এই পথ কিরঘিস্তান হয়ে সোজা চীন পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। শহরটা দেখতে দেখতে এগোই আর মনের মধ্যে ‘বাবরনামা’য় পড়া আন্দিজানের যে ছবি এঁকে রেখেছি তার সাথে মিলিয়ে নিই। চারপাশের পর্বতমালা ঘেরা পিতৃভূমি ফারগানা উপত্যকার সৌন্দর্য বাবর ভুলতে পারেননি কখনও। লিখেছ্ন বাবরনামায়- ‘চারপাশের পর্বতমালার মাঝে ফারগানা উপত্যকা বড় সুন্দর, রূপকথার স্বর্গের মত, উপত্যকা কুসুমিত হয়ে নির্যাস ছড়ায়-‘

আন্দিজান, সম্রাট বাবরের প্রাণপ্রিয় শহর, মাত্র বারো বছর বয়সে এই রাজ্যের রাজা হয়েছিলেন তারপরে আবার হয়েছেন সমরখন্দের বাদশাহ। স্বপ্ন দেখতেন, সমরখন্দ, ফারগানা ভ্যালিকে একসাথে করে, দৃঢ, সংঘবদ্ধ বিশাল এক সাম্রাজ্যে গড়ে তুলবেন, যে দেশ হবে শিল্প-সাহিত্যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, মনুষত্বে উন্নত। সমরখন্দে তৈমুর লঙ নির্মিত বা উলুগবেগের মাদ্রাসার মত পাথর, তৈলস্ফটিক, চমৎকার টালি দেয়া সমস্ত দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য তৈরী করার স্বপ্ন দেখতেন। পূর্ব পুরুষ আমির তৈমুরের বংশধর হিসাবে পরিচয় দিতেও ভালোবাসতেন। তৈমুরের যুদ্ধজয়, প্রচন্ড শক্তি, নাম, প্রতিপত্তি তাকে আকর্ষণ করতো, তার মত বীর যোদ্ধা হতে চাইতেন কিন্তু তার নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি মোটেও চাইতেন না। শাসকের যে জীবন সেখানেও বারবার তার নরম কবি মন তাকে নিষ্ঠুরতার পথে যেতে বাধা দিয়েছে, কিন্তু তার নিষ্ঠুর যুদ্ধবাজ বেগদের কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেইসব নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে ক্রমাগত। তার সংস্কারমুক্ত মন আর উদারতাকে ভুল বুঝেছে তার দেশের মানুষ। পূর্বপুরুষ উলুগবেগের  মানমন্দির সংস্কার করতে পারেননি তিনি ধর্মান্ধদের বাধার মুখে। সমরখন্দ জয় করতে ইরানের শাসকের সাহায্যে নেয়াতে, শিয়া-সুন্নীর মতবিরোধিতায় শিয়া অপবাদে সমরখন্দ ছাড়তে হয়েছে তাকে। ফারগানা আর সমরখন্দের মহান শাসক একসময় সম্পূর্ন রাজ্য হারা হয়ে পড়েন আত্মীয়স্বজন ও বেগদের  বিশ্বাসঘাতকতায়। এমনকি সেই দুঃসময়ে প্রথম স্ত্রীও ছেড়ে গেছেন তাকে। সব কিছুর উপর বিতশ্রদ্ধ হয়ে একসময় দরবেশ হতে চেয়েছেন। লিখেছেন, ‘আমি সেই দলের একজন যারা চিনেছে ক্ষমতার ছলনাময় প্রলোভনকারী রূপ, জেনেছে শাসকের জীবনের ব্যর্থতা ও ব্যস্ততা।’

বারবার পিতৃভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছেন বাবর। সমরখন্দে পরাজয়ের বেদনা, গ্লানি ভুলতে পারেননি কখনও। আবারও ঘুরে দাড়িয়ে এবার নতুন রাজ্য জয়ে কাবুলের দিকে পা ফেলেছেন। সেই দুর্গম পথের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন, এই পাহাড়ের সারি পেরিয়ে সমরখন্দ থেকে হিরাট বা কাবুলে পৌঁছাতে পারবেন কি? সারি তো একটা নয়, এই বিশাল পর্বতমালার পেছনে পামির, পামিরের পরে হিমালয় আর হিন্দুকুশ! এসব পেরিয়ে পৌঁছাতে হবে হিরাট! চলতে চলতে খাবার ফুরিয়ে গেছে, ঘোড়া, উট মেরে সবাই খিদে মিটিয়েছে। খাড়া পাহাড় খাড়া পথ … বাবর নিজের ঘোড়া তার মাকে দিয়ে নিজে হেঁটে চলেছেন। আমুদরিয়া পার হয়ে মাত্র দু’শো চল্লিশজন সৈন্য নিয়ে কাবুলে পৌছান এবং নানা ঘটনার পর কাবুলের শাসন ভার গ্রহণ করেন। পিতৃভূমিতে না হলেও অবশেষে তার স্বপ্ন  সফল হয়েছিল ভারতবর্ষে।

 

মোগল কেন হলো 

খুব অদ্ভুত এক বিষয় হলো, মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর হলেও বাবর মোগলদের নিষ্ঠুরতাকে ঘৃণা করতেন মনে প্রাণে। কারণ সেই সময়ে মোগলদের কাজই ছিল কোন রাজ্য আক্রমণ করে লুটপাট করা এবং নৃশংসভাবে সব ধ্বংশ করা। বাবর বা তার বংশধরেরা নিজেদের কোন নথিপত্রে বা সেই যুগের কোন ঐতিহাসিকই তাদের রচনায় নিজেদের মোগল নয় বরং তুর্কি বলে অভিহিত করতেন কারণ তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন তুর্কিভাষী বারলাস উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, যারা এখনও মধ্য এশিয়াতে হাজারে হাজারে ছড়িয়ে আছে। বিষয়টা হলো, উত্তরদিক থেকে যারা ভারতবর্ষ আক্রমন করতো তাদেরকে বলা হতো মোগল এবং এই তথ্যকেই পশ্চিমের দেশগুলো তথা ইংরেজরা তাদের দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে যাদের কাছে বাবরের রচনা প্রতিভা বহূদিন পর্যন্ত অজ্ঞাত ছিল এবং তাকে শুধু ‘প্রখ্যাত মোগল’ বলে উল্লেখ করা হতো। সিপাহী বিদ্রাহ বা এই সব ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে বাবর ও আকবর সৃ্ষ্ট শক্তিশালী সার্বভৌম রাজ্যের অতীতের মহিমাকে ঢেকে দেয়ার জন্যেও এটা ইংরেজদের অপপ্রচারের অংশ ছিল। তবে যে নামেই তারা পরিচিত হোক না কেন তিনশো বছর ধরে এই সাম্রাজ্য তার অস্তিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি ভারতবর্ষ ও পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী এক মহান সাংস্কৃতিক প্রভাবও বিস্তার করে রেখেছে বলাই বাহুল্য।

 

মোগলাই কাবাবের আদি বাড়ি

লাঞ্চের সময় হয়ে যাওয়ায় গাড়ি থামিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি এক রেস্তোঁরায়। আশপাশের দোকানগুলোতে দেখি কাবাব তৈরীর প্রস্তুতি চলছে, নানান ধরণের মাংসের কাবাব মেরিনেট করে রাখা। রুটির সুগন্ধ আর কাবাবের খুশবুতে চারদিক মৌ মৌ করছে। খুবই সুস্বাদু আন্দিজানি রুটি আর কাবাব গোগ্রাসে খেতে খেতে ভাবলাম ভারতীয় উপমহাদেশে আজকে মোগলাই কাবাব মাংসের যে রমরমা অবস্থা তাওতো এই উজবেকদেরই  অবদান। রুটি-কাবাবের একেবারে সেই আসল জায়গায় এসে পড়েছি। খাওয়া শেষে আমাদের গাড়ি আবার ছুটলো সম্রাটের সমাধির দিকে। সম্রাট বাবরের মৃত্যু হয় আগ্রায় কিন্তু তার শেষ ইচ্ছা অনুসারে কাবুলে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৯০২ সালে এক প্রলংকারী ভূমিকম্পে এখানকার বহূ স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। বাবরের প্রাচীন সব কিছুও নষ্ট হয়ে যায়। পরে উজবেক সরকারের উদ্যেগে কাবুলের মূল সমাধি থেকে মাটি এনে তার জন্মস্থানে তাকে স্মরণ করে এই সমাধি চত্বর গড়ে তোলা হয়েছে।

ধ্যানস্থ হয়ে আছেন মহান এক কবি সম্রাট

 

আন্দিজানের সোনার মানুষ- 

দূর থেকেই চোখে পড়লো নীল রঙের গম্বুজ। কাছে গিয়ে  দেখলাম চারদিকে বাগান ও গাছপালায় পরিপূর্ণ বিশাল এবং সুন্দর এক সমাধি চত্বর। ঢুকতেই একদম  সম্রাটের মুখোমুখি- বাগানের ঠিক মাঝখানে উচুঁ একটা বেদীতে যেন ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন সম্রাট; কিছু একটা ভাবছেন, সুস্থির, যে সুস্থিরতা তার জীবনে কখনও ছিলনা। ভীষন নিরিবিলি চারদিক, শুধু বাগান পরিচর্যা কারী কয়েকজন নারী বাগান পরিচর্যার জিনিসপাতি পাশে রেখে গল্পে মেতে আছে নিজেদের মধ্যে। দূরে নীল পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে অটল প্রহরী হয়ে, একদম গম্বুজের বিপরীত দিকে, বুঝিবা পাহারা দিচ্ছে আন্দিজানের শ্রেষ্ঠতম সন্তানের প্রতীকি সমাধি।

বাবর যাদুঘর – 

আমরা প্রথমেই সমাধিতে না গিয়ে বাগান সংলগ্ন ‘বাবর যাদুঘরে’ গিয়ে ঢুকলাম, শৈল্পিক নকশায় সুন্দর এক ভবন। শীতের ছুটির কারণে যাদুঘর বন্ধ কিন্তু মির্জা আগে থেকেই যোগাযোগ করে রাখায় কিউরেটর খালিদা ছুটির মধ্যেও এই কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে আমাদের সাদরে গ্রহণ করলেন যাদুঘরের ফটকে, বেশ প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও আমাদের জন্যে যাদুঘরের দরজা খুলে রেখে। যথেষ্ট সময় দিয়ে ঘুরে দেখালেন গোটা যাদুঘর। যাদুঘর ভবন ও কিউরেটর খালিদার সাথে

বাবরের সময়ে চালু বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র, বাবরের সিল, সেই সময়ের পোষাকের নমুনাসহ বাবরের উপর নানাধরণের স্মারকসমূহ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সম্রাটের জীবনের উপর অসংখ্য বই আছে এখানে, আছে একত্রিশটি ভাষায় বাবরনামা অনুবাদের সংরক্ষিত কপি। সম্রাট বাবর আরবী ও প্রাচীন তুর্কী অক্ষরের অনুকরণে নতুন ধরণের সহজ সরল ভাষা চালু করেছিলেন যে ভাষায় তিনি বাবরনামা লিখেছেন, সেই স্বরলিপির নমুনা আছে এখানে।

সম্রাটের সিল ও তার আবিষ্কৃত অক্ষর

তুর্কিভাষায় লেখা বাবরের কবিতা ও স্মৃতিকথার সেই সহজ সরল ভাষা সেই সময়ের প্রচলিত সাহিত্যের তুলনায় অনেক ‌এগিয়ে ছিল। বর্তমানে উজবেকিস্তানের উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পাঠ্যপুস্তকে অর্ন্তভুক্ত চিরায়ত উজবেক সাহিত্যের অন্যতম এই প্রধান লেখকের রচনাবলি বা বাবরনামার উদ্ধৃতিগুলো ছাত্ররা তাই অনায়াসে বুঝতে পারে। উজবেকিস্তানের বিয়ের উৎসবে আজও তার রচিত গজল গাওয়া হয়। তার সমস্ত সাহিত্যকর্মকে ভারতবর্ষের মানুষও  নিজেদের সাংস্কৃতিক সম্পদ বলে মনে করে।একজন মহান শাসক ও কবি হিসাবে তার অবস্থান তাই দেশকালের গন্ডির বাইরে। খালিদা বললেন, তাদের পক্ষে যতটা সম্ভব, সম্রাট বাবর সম্পর্কিত সবকিছু সংগ্রহ করে সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে অবিরত যা এই যাদুঘরকে আরো সমৃদ্ধ করবে। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা এগিয়ে যাই সেইদিকে যা দেখার জন্যে পেরিয়ে এসেছি হাজার মাইল।

সবুজে ঘেরা পাহাড়ের গায়ে যেখানে সম্রাট বাবরের মার্বেল পাথরে গড়া প্রতিকী সমাধি, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম। খুব রাজকীয় নয়, এমনই  সাদাসিধে সমাধিই নাকি তার মনোস্কামনা ছিল। বলেছিলেন, ‘কাবুলে আছে একটা বাগিচা, পাহাড়ের ওপর, আমার চিরবিশ্রাম সেখানেই হোক, বেশি জাঁকজমকের দরকার নেই- সেখান থেকে নিচের চমৎকার উপত্যকাটা দেখা যায়।’ শেষ বিশ্রাম চিন্তায়ও প্রকৃতিপ্রেম ও সৌন্দর্যবোধ তাকে ছেড়ে যায়নি। ‘দেশে বিদেশে’তে মুজতবা আলী লিখেছেন, ‘হিরাটে দেখার মত যদি কিছু থাকে তবে তা সম্রাট বাবরের সমাধি।’

চেরি ফুল ঝরে পড়ে, সমাধি পরে-

সবুজে ঘেরা পাহাড়ের গায়ে যেখানে সম্রাট বাবরের মার্বেল পাথরে গড়া প্রতিকী সমাধি, সেখানে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম। খুব রাজকীয় নয়, এমনই  সাদাসিধে সমাধিই নাকি তার মনোস্কামনা ছিল। বলেছিলেন, ‘কাবুলে আছে একটা বাগিচা, পাহাড়ের ওপর, আমার চিরবিশ্রাম সেখানেই হোক, বেশি জাঁকজমকের দরকার নেই- সেখান থেকে নিচের চমৎকার উপত্যকাটা দেখা যায়।’ শেষ বিশ্রাম চিন্তায়ও প্রকৃতিপ্রেম ও সৌন্দর্যবোধ তাকে ছেড়ে যায়নি। ‘দেশে বিদেশে’তে মুজতবা আলী লিখেছেন, ‘হিরাটে দেখার মত যদি কিছু থাকে তবে তা সম্রাট বাবরের সমাধি।’ ইউটিউবে দেখেছি সেই সমাধি, অনেকটা সেটার মত করেই এখানে সমাধি চত্বরটা তৈরী করা হয়েছে।

সম্রাট বাবরের প্রতিকী সমাধি 

বড় বড় চেরি গাছগুলো ফুলে ফুলে ভরে রয়েছে পুরো চত্বর জুড়ে – সাদা ফুলের মধ্যে একটু একটু রঙের ছোঁয়া, স্বর্গীয় সে সৌন্দর্য! চিনার ও এ্যাপ্রিকট গাছেরও ছড়াছড়ি। বিশাল সব চিনার গাছের শুকনো খয়েরী রঙা পাতাগুলো ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। সম্রাট বাবর উদ্যান প্রিয় ছিলেন- যুদ্ধ থেকে ফিরেই বাগানে ঢুকে যেতেন এবং তখন তিনি একদম অন্যরকম মানুষ হয়ে যেতেন। সমাধির পাশে  দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ খানিকক্ষণ, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একের পর এক তার জীবনের যত ঘটনা, যা তিনি লিখে গেছেন বাবরনামা’য়। সমাধির ঠিক পাশে চেরি ফুলে ভর্তি গাছ

শিল্প ও যুদ্ধ এই দুইয়ের মধ্যে আছে যে খাদ বারবার তিনি সেই খাদ ডিঙাতে চেয়েছেন জীবনভোর। শেষ পর্যন্ত সেই আশা ছাড়তে হয়েছে তাকে নিষ্ঠুর বাস্তবের হাতে, শুরু করেছেন ভারতবর্ষ অভিযান। দিল্লীর সুলতান ইব্রাহীম লোদির স্বার্থপর শাসনে অসন্তুষ্ট ভারতবাসীরা চাইতেন এমন শাসক যিনি গোটা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে। কাবুলে বসে আবার সেই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। লুটপাট চালানো কখনই তার জীবনের লক্ষ্য ছিলনা তিনি ছিলেন উন্নত চিন্তার শাসক, কিন্তু বারবারই সেই পথে যেতে তিনি বাধায় পড়েছেন, হতাশ হয়েছেন, কষ্টে ভেঙে পড়ে লিখেছেন রুবাই;

‘যেখানেই যাই, দুখ হাঁটে পাশে পাশে

ডানে বাঁয়ে ফিরি। ফের দেখি যন্ত্রণা

নেই কো শান্তি, উদ্বেগ শুধু গ্রাসে,

কার এত দুর্ভাগ্য, কষ্ট যাতনা?

মাত্র সাতচল্লিশ বছরের জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ভারতেশ্বরের মনে হলো, ’কিসের সিংহাসন, কিসের রাজ্য, আমার শুধু দরকার একটু বিশ্রাম, দরকার প্রিয়জনদের সান্নিধ্য, দরকার নিজের জন্যে একটু সময়, রুবাই লেখার একটু ফুরসত- পৃথিবীতে থাকার সময় শেষ হয়ে আসছে!’ সম্রাট বাবর তার পোষাকে পারস্য উপকথার পৌরাণিক হুমা পাখির ছবি সম্বলিত সোনার বোতাম লাগাতে ভালোবাসতেন, যে পাখি ছিল সুখ ও সৌভাগ্যের প্রতীক। ফুল ভারে নমিত চেরি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো উপকথার সেই হুমা পাখির দেখা কি এই জীবনে শেষপর্যন্ত সত্যিই পেয়েছিলেন এই মহান কবি সম্রাট!

————————-

নোট- এই লেখা তৈরী করার জন্যে তিনটা বইয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। বইগুলো হলো, সম্রাট বাবর রচিত বাবরনামা, পিরিমকুল কাদিরভ লিখিত উপন্যাস বাবর এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে।

 

 

ক্ষমা মাহমুদ

জন্ম যশোর শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক বাবা ও শিক্ষিকা মায়ের সন্তান হিসাবে ছোট থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা এবং শিল্পসাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার জন্ম। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এছাড়া প্রায় একদশক ধরে বাংলাদেশ বেতারে ইংরেজী সংবাদ পাঠিকা হিসাবে কর্মরত আছেন।

ছাত্রজীবন থেকেই নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও, পেশাগত ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘ বিরতির পর বর্তমানে ছোটগল্পের মাধ্যমে আবারও লেখালেখির জগতে বিচরণ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ও পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখছেন।

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top