ক্ষমা মাহমুদের গল্প: সমুদ্রের কাছে দুঃখ জমা রাখি

একদম কাক ডাকা এক ভোরে গ্রীনলাইনের নন এসি বাসটা এসে কলাতলি বাসস্ট্যান্ডে আস্তে আস্তে থামলো। বাসের যাত্রীরা মোটামুটি সবাই এখনও ঘুমের ঘোরে থাকলেও সুপারভাইজারের ডাকে একটু একটু করে নড়তে চড়তে শুরু করলো। তারেক আলী চোখ দুটো পিটপিট করতে করতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো। কারো মধ্যেই ওঠার তেমন কোন তাড়া নেই, এটাই শেষ গন্তব্য।

একটু পরে একজন দুজন করে নামা শুরু করলে তারেক আলীও আড়মোড়া ভেঙে উঠে ভাবলো, ‘বাসটা তো এখানে থেকেই যাবে, ঘোড়ার মত ছুটতে ছুটতে না এসে আর একটু ধীরে সুস্থে এসে থামলে কি এমন ক্ষতি হতো, আর একটু বাড়তি ঘুমানো যেত, ভোরের ঘুমের মত আরাম আর কি আছে জীবনে!’ আস্তে করে সে নামার প্রস্তুতি নিল, ধীরে সুস্থে ব্যাগটা বের করবে বাসের খোল থেকে। সবার শেষে বাস থেকে নীচে নেমে এসে দাঁড়ালো ধীরে ধীরে। নেমে দাঁড়াতেই দূর থেকে সমুদ্রের গর্জন ভেসে এলো কানে। মুহূর্তে কান খাড়া হয়ে উঠলো, সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন আকুল হয়েছিল এই শব্দ শোনার জন্য। আহ! কত বছর বাদে আবার সেই পুরনো জায়গাতে ফেরা হলো তার!

অনেক সকাল যদিও, তবু বাসস্ট্যান্ডে যেন ভোর হয় আরো অনেক আগে। মানুষের কোলাহল, চা-নাস্তার দোকানের ব্যস্ততা, টাটকা বাতাসের স্বাদ সব কিছু মিলিয়ে কেমন যেন মুক্ত পাখির মত মনে হলো নিজেকে তারেক আলীর। লম্বা একটা শ্বাস টেনে যেন কয়েক টন স্বাধীন বাতাস ঢুকিয়ে নিলো বুকের মধ্যে। মুক্তই তো সে এখন, খাঁচার পাখি কদিনের জন্য হলেও মুক্তি পেয়েছে!

গত রাতের কথা মনে পড়লো। মুহূর্তে মুখের মধ্যে যেন একটা পচা ঢেঁকুর তোলার মত অনুভূতি হলো। উফফ্! সবকিছু থেকে কয়েকটা মাস অন্তত দূরে থাকা যাবে। নানা বিষয় নিয়ে সেলিনা ওরফে শেলী বেগমের সার্বক্ষণিক হূল ফোটানো কথা থেকে সাময়িক ভাবে হলেও তার মুক্তি মিলেছে। বহুদিন ধরে অফিসে বসের কাছে ধর্না দিয়ে, তার নানা অনৈতিক কাজের রসদ জুগিয়ে তবেই না এই মুক্তি মিললো! ঢাকা থেকে ছয়মাসের জন্য ট্রান্সফার হয়ে কক্সবাজারের এই আঞ্চলিক শাখায় এক বিদেশী অফিসের একাউন্টেন্ট চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সে, এই তারেক আলী, এখন থেকে আগামী ছয়মাস একটু আরাম করে অফিস করতে পারবে।

গত এক দেড় বছর ধরে কক্সবাজারে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ আর তাদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিয়ে তার অফিস পাগলের মত ব্যস্ত। এখানে আস্তে আস্তে তাদের পুরোদস্তুর একটা অফিস বসে গেছে। ঢাকা থেকে অনেকেই একটানা তিন, চার মাস করে এখানে কাজ করে যাচ্ছে। কিছু লোকাল স্টাফদেরও পূর্ণ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে দিন দিন সমস্যা বাড়ছে। হিসাব নিকাশে অনেক রকম জটিলতা দেখা দেওয়ায় ঢাকা অফিসে জরুরী মিটিং এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে হেড অফিস থেকে অভিজ্ঞ কেউ কিছুদিন এখানে একটানা সময় দিয়ে লোকাল স্টাফদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এখানকার একাউন্টিং সিস্টেমটাও ভালোভাবে তৈরি করে দেবে। কক্সবাজারের এই রোহিঙ্গা প্রজেক্টে আসার জন্য অনেকেই মুখিয়ে থাকে কারণ খুব ভালো একটা আর্থিক প্রাপ্তিও এর সাথে জড়িত। আরো দুজন তার মত অভিজ্ঞ একাউন্টেন্ট অফিসে থাকলেও বস মিটিং এ তার নাম প্রস্তাব করাতে অবশেষে তারেক আলীর বহুদিনের মনের ইচ্ছা পূরণ হলো। তবে এর পেছনে কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি তাকে। গতমাসেও বসের জন্য মেয়ে জোগাড় করতে হয়েছে, তাও আবার কলেজ পড়ুয়া শিক্ষিত মেয়ে, বসের আবার বাজারের মেয়েতে চলে না। এসব মেয়ে জোগাড় করা যে কত মুশকিল তা যে জানে সেই জানে। সারাক্ষণ এর ওর মাধ্যমে একটা খোঁজ খবর এর মধ্যে থাকতে হয়, অনেক সাবধানে নানারকম কৌশল করে তবেই বসের এই খায়েস পূরণ করতে হয় তাকে। এত ঝক্কি সামলে এই কাজ করতে তারেক আলীর একটুও আর ভালো লাগে না, শুধু এই ট্রান্সফারটার জন্য বসের এইসব প্রস্তাবে সে এতদিন ধরে রাজী হয়ে এসেছে আর তার ধৈর্যের মেওয়া ফল অবশেষে ফলেছে।

গতরাতের কথা ভাবতে ভাবতে চোয়ালটা আবারও শক্ত হয়ে ওঠে তার! শেলীর গম্ভীর মুখের তাচ্ছিল্যের ভাবটার কথা মনে উঠলে এখনও রাগে তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। ছয় মাসের জন্য সে বাড়ী থেকে দূরে চলে যাচ্ছে… কিন্তু তাতেও এখন আর তার জন্য কোন অনুভূতিই তৈরী হয় না শেলীর। ষোলো, সতেরো বছরের বিবাহিত জীবন পার করে এসে সমস্ত অনুভূতি যেন কবর দিয়ে ফেলেছে। শুধু বাস্তব চাওয়া পাওয়ার হিসাব নিকাশ চলে সারাক্ষণ। চলে আসার সময় দরজায় দাড়িয়ে একটু হেসে শেলীর ঘাড়ে হাত দিয়ে কিছু বলতে চেয়েছিল তারেক আলী, ‘হইছে, এত আল্লাদী করার দরকার নাই, পৌছায়ে একটা ফোন দিলেই হবে, যদি আপনের সময় হয়।’ ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল শেলী। সবসময় কি যেন এক রাগে স্বাভাবিক তুমি ডাকটাও আর মুখে আসে না যেন… আপনি বলে সারাক্ষণ দূরে দূরে রাখার চেষ্টা। তাহলে তাই হোক, দূরেই থাকবে সে, অনেক দূরে।

কিন্তু কেন, কি করেছে সে, প্রায়ই এই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়ায় তারেক আলী। অনেক বড় চাকরী করে কাড়ি কাড়ি টাকা রোজগার না করতে পারাটা তার একটা অপরাধই বটে, শেলী আর তিন ছেলে মেয়ের সব শখ আহ্লাদ সে মেটাতে পারে না। কিন্তু এই সব শখ আহ্লাদ বলতে আসলে কি বোঝায়? এর তো কোনো শেষ নেই, একটা শেষ হতে না হতেই আর একটা শুরু হয়। অথচ সারাক্ষণ এইজন্য এক অপরাধবোধে ভুগে নিজের বাড়ীতেও সে সারাক্ষণ কেঁচো হয়ে থাকে।

তার পনেরো বছরের ছেলে ইমন তো এখনই বাপের চোখে চোখ রেখে কথা বলা শুরু করেছে। মায়ের প্রশ্রয়ে তার আচরণে বাবার প্রতি তাচ্ছিল্যেও দিনকে দিন বাড়ছেই। তারেক পারতপক্ষে ছেলের সামনে পড়তে চায় না এখন আর, এমনিতেও তার সে সময় কম। চাকরী জীবনের আঠারো বছর পার করার পরেও এখনও সকাল আটটার মধ্যে বাড়ী থেকে বের হয়ে সময়মত অফিসে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় লাল কালি পড়ার ভয়ে, অফিসে পৌঁছে সময় পার হওয়ার আগে কার্ডটা পানচ করে তবেই ধরে রাখা দমটা ফেলতে পারে। দুপুরে খাওয়ার সময়টুকু বাদে বিকাল পাঁচটার আগে কোনদিকে তাকানোরও তার সময় হয় না। খুব জরুরী কিছু না হলে বাড়ীর কথা সত্যিই তার মনে থাকে না। আর মনে রেখেই বা কি করবে! শেষ কবে ছেলেমেয়ে, বৌ কারো সাথে খুব হাসি খুশি সময় কেটেছে সেটা সে নিজেই মনে করতে পারে না। মাঝে মাঝে বসের গোপন কাজগুলো করে দিলে তার কিছু উপরি পাওনা হয় আর শুধু তখনই সে দৈনন্দিন চাহিদার বাইরে তাদের শখ আহ্লাদ মেটানোর জন্য কিছু খরচ করতে পারে। তখন সবার মুখে একটু হাসি দেখা যায় কিন্তু সেই হাসির পেছনের করুণ চেহারাটা শুধু সেই দেখতে পায়, তার মনের বিরুদ্ধে যেয়ে কাজ করে এই টাকাগুলো পেতে হয় তাকে। প্রতিমাসে যা আয় হয় নিজের চলার জন্য কিছু রেখে সবই শেলীর হাতে তুলে দেয়। সে যে খুব খারাপ বেতন পায় সেটাও না, কিন্তু সবই যেন বিশাল সমুদ্রে কয়েক ফোঁটা শিশিরবিন্দু। কিছুতেই এদের অজগরের গ্রাস সে ভরাতে পারে না। এতকিছু করেও বাড়ীতে সে যে একটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ একথাটা বললে তার অসময়ের সাত বছরের মেয়ে মুন্নীও হেসে উঠবে।

ইদানিং পনেরো বছরের আদরের মেয়ে তিন্নিটাও মা ও ভাই এর মতই আস্তে আস্তে কেমন অচেনা হয়ে উঠছে তার কাছে, বছর দুয়েক আগেও যে মেয়ে কতই না বাপ নেওটা ছিল! কোথায় যেন একটা থিয়েটার গ্রুপে ঢুকেছে, মাঝে মাঝে বেশ রাতে গাড়ীতে করে কেউ না কেউ তাকে দিয়ে যায়। শেলীকে একদিন জিজ্ঞাসা করতেই সে চোখ পাকিয়ে বলেছে, ‘আমি দেখতাছি, তোমার এইডা নিয়া ভাবতে হইবো না, তুমি নিজের কাজ নিয়া ভাবো।’ চুপ হয়ে যায় সে, এই সংসারে নিজেকে কেমন যেন অচেনা ঠেকে তারেক আলীর। সারাদিন ওরা কি করে, কার সাথে মেলামেশা করে এসব ব্যাপারে বলতে গেলে কিছুই সে জানে না, মানে তাকে জানানো হয় না। শুধু টাকার প্রয়োজন আছে এমন কিছু হলে সে জানতে পারে। বাসায় ঢুকলে ইদানিং কেমন যেন নিজেকে চোর চোর লাগে, মনে হয় ভুল করে অন্য কারো বাড়ীতে ঢুকে পড়েছে।

কোন কোনদিন অফিসের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হলে বাড়ি ফেরার কোন তাগিদ পায় না তারেক আলী। অফিস আর বাড়ীর বাইরে তেমন কোন জায়গাও তার নেই যেখানে সে দুদণ্ড মন খুলে সময় কাটাতে পারে। বাড়ী ফেরার পথে তাই প্রায়ই সে পার্কে যেয়ে বসে থাকে, মানুষজন দেখে বসে বসে, কত মানুষ কত কিছু যে করে সেখানে! জোড়ায় জোড়ায় প্রেম করে, কারো মান অভিমান-ঝগড়া পর্ব চলে, কতজন কতরকম ব্যায়াম আর শারীরিক কসরত নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। বাদামওয়ালা, চা-ওয়ালা, ছেলেমেয়েগুলো তার খুব পরিচিত হয়ে গেছে, গিয়ে বসলেই ছুটে আসে কাছে। চা, বাদাম খেতে খেতে কিছুক্ষণ এটা সেটা নিয়ে গল্প করে ওদের সাথে, ওদের জীবনের ভেতর একটু উঁকি দিয়ে দেখতে বেশ লাগে তার। কখনও অল্প বয়স্ক একটা দুটো মেয়ে সেজে-গুজে তার পাশ দিয়ে ঘোরা ঘুরি করে, নির্ঘাত খদ্দের ভাবে তাকে, সে না দেখার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে থেকে ওদের এড়ায়। এভাবেই মাঝে মাঝে সন্ধ্যাটা তার বেশ একটু অন্যরকম কেটে যায়, পার্কে বসে সে একটু ভাবার ফুরসত অন্তত পায় যে তার এই জীবনের উদ্দেশ্য আসলে কি, সে আসলে কি করছে, কাদের জন্যেই বা করছে! তার জীবন ক্ষয় করে গোটা মাসের রোজগার দিয়ে এরা জীবন পার করছে তবুও কেন সে ওদের কাছের কেউ হতে পারে না সেটা নিয়েও সে ভাবে। এ-সবকিছু ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে তার ধোঁয়াশা লাগে।

জীবন নিয়ে ধোঁয়াশার ঠিক এই সময়েই যেন একটা দারুণ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের হাতছানি হয়ে এই সুযোগটা এসেছে তার একঘেয়ে, একাকী জীবনে। প্রতিদিন কেঁচোর মত, চোরের মত মাথা নিচু করে নিজেরই বাসায় আপাতত কিছুদিন তার আর ঢুকতে হবে না।

অফিসে বস যখন বললো, ওয়েল, তারেক, দি মিটিং হ্যাস পারমিটেড ইউ টু গো টু কক্সেসবাজার প্রায়মারিলি ফর সিক্স মানথস, নাউ হ্যাপি?’ মনে হয়েছিলো, কান দিয়ে যেন মধু বর্ষণ হচ্ছে! নিজেকে কি যে মুক্ত লেগেছে তারেক আলীর! অনেক দিন পর মনটা তার একেবারে ফুরফুর করছিল, মনে যে এখনও এমন আসমানী রং এর ছোঁয়া লাগতে পারে সে কথা যেন সে ভুলতেই বসেছিল। আর কিনা করেছে সে এর জন্যে! এখানে আসার আগেই তারেক আলী তার এখানকার সহকর্মী নাইমের সাথে কথা বলে তার বাসার একটা রুম আপাতত সাবলেট হিসাবে নিয়েছে, নাইমকে বলে রেখেছে একটু সেটল করে নিয়েই সে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিয়ে নেবে।

একটা রিক্সা নিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী নাইমের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো সে। তার শৈশব, কৈশোরের সেই শহরটা এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। এটা এখন রীতিমত পর্যটকদের শহর আর সেই চিহ্ন এর পরতে পরতে ছড়িয়ে। চারদিকে প্রচুর নতুন ঝাঁ চকচকে হোটেলের সমারোহে তার চেনা সেই মফস্বলীয় শহরটা যেন কোথায় লুকিয়ে পড়েছে। ‘তবুও অন্তত সকাল না হতেই গাড়ী ঘোড়ার বিকট দাপটটা তো এখানে নেই,’ ভাবলো সে। রিক্সায় যেতে যেতে সকালের কোমল বাতাস যেন গায়ে কেমন এক পুরোনো দিনের মায়ার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। আহ! কতদিন পর যেন তার গায়ে জীবনের উত্তাপ লাগছে! তাহলে কি এতদিন সে একটা জীবন্মৃত মানুষ হয়ে ছিল! সবাই থেকেও মনে হয় কিছুই নেই। কোন মমতার ছোঁয়া নেই জীবনে, রুক্ষ পাথরের মত, মরুভূমির মত বালুময় তার জীবন, যেখানে মনের কথা বলার মত কাউকে সে খুঁজে পায় না বুকের কাছে।

বাড়ী খুঁজতে বেশী কষ্ট করতে হলো না, কাছাকাছি আসতেই দেখলো নাইম এগিয়ে আসছে। হাসিখুশি একটা ছেলে, ঢাকা অফিসে নিয়মিত নানা মিটিং এ আসা যাওয়া করে, এখানে একাউন্টেন্ট হিসাবে কাজ করে বলে তার সাথেই ওর কাজ বেশী। ‘অনেক সকালেই চইলা আসছেন তারেক ভাই, রাতের গাড়ীগুলান এমন টান দিয়া আসে! কোন অসুবিধা হয় নাই তো?’ তার ঢাউস ব্যাগটা নামাতে নামাতে বলে, ‘একেবারে বাসার কাছেই আইসা পড়ছেন, নামেন।’

মূল শহরের কোলাহল ছাপিয়ে একটু ভিতরের দিকে বেশ নিরিবিলি একটা এলাকায় একতলা একটা বাসা, দেখেই খুব পছন্দ হলো তারেক আলীর। সামনে ছোট একটা উঠোন বিছানো বাসাটার সামনের দিকেই তার জন্যে বরাদ্দ ছিমছাম ঘরটা তার আরো পছন্দ হলো। ঢাকার ঐ বদ্ধ ফ্ল্যাটবাড়ির খুপরি ঘরের তুলনায় যেন স্বর্গ! ঘরটায় একটা বড় জানালা আছে যার পাশেই উঠোনটা জুড়ে ছোট বড় নানারকমের ফুলের গাছ। বড় একটা কামিনী গাছে ছোট ছোট থোকায় সাদা ফুলগুলো সারারাত ধরে ফুটে ফুটে কিছু এখনও গাছে রয়েছে আর কিছু ফুল কুচি কুচি হয়ে ঝরে গাছের নীচে পড়ে রয়েছে, একটা মিষ্টি গন্ধ সেখান থেকে ভেসে এলো। এখনও অনেক সকাল, বাড়ীর আর সবাই নিশ্চয়ই এখনো ঘুমাচ্ছে।

নাইম বললো, ‘ভাই, আরাম করে থাকেন কোন অসুবিধা নাই, আগে কয়েকটা দিন আমাদের সাথেই খাইবেন দাইবেন, পরে যদি মনে করেন অসুবিধা হইতেছে তাইলে আপনের সুবিধা-মত অন্য ব্যবস্থা কইরা নিয়েন।’ তারেক নাইমের কথা শুনে বলে, ‘আপনি যে আমার জন্য এত সুন্দর করে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছেন তাতেই আমি কৃতজ্ঞ। না হলে প্রথমে হোটেলেই উঠতে হতো।’

ঘরে একটা সিঙ্গেল খাট আর একটা ছোট টেবিল ও চেয়ার দেয়া, পাশে একটা ছোট্ট আলনাও আছে, ওয়াশ রুমটাও এই রুমের সাথে লাগোয়া, এরথেকে ভালো কিছু তারেক আলী ভাবেইনি। সাথের ব্যাগটা খুলে দরকারি জিনিসগুলো বের করে হাতমুখ ধুয়ে আরাম করে একটু বসলো সে, এতক্ষণে মাত্র সকাল সাড়ে সাতটা, অফিসে যাবে ১০টার দিকে তার আগে একটা ছোট ঘুম দিয়ে নেয়া যায়। সকালের অতৃপ্ত ঘুমটা একটু পুষিয়ে নেয়ার জন্যে বিছানায় গা টা এলিয়ে দিতেই যেন একটা আরামের অনুভূতি তার শিঁরদাড়া দিয়ে বয়ে গেল। বাড়ীর কথা এতক্ষণে মনে হলো তার, একটা ফোন করা দরকার। কিন্তু আবার মনে হলো, ওরাতো কেউ তাকে এখনো একটা ফোনও করেনি যে সে পৌঁছালো কিনা ঠিক মত, নাকি রাস্তায় এ্যাক্সিডেন্ট করে মরে পড়ে থাকলো! তাহলে তারই বা কেন ওদের কথা এত ভাবতে হবে! ফোনটা করতে যেয়েও করলো না। থাক রাতে এসে নাহয় একটা খবর দিয়ে দেবে।

কখন ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে তারেক আলী টেরও পায়নি। ঘণ্টা খানেক বাদে নাইম এসে দরজা নক করলো নাস্তা খাওয়ার জন্যে। তাড়াতাড়ি উঠে একবারে অফিসের জন্যে রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে এসে বসতেই নাইমের বউ শর্মি এসে সালাম দিলো। নাস্তা খেতে খেতে ওদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে দুজনে বের হলো অফিসের উদ্দেশ্য। কাছেই অফিস, ঢাকার মত সকালে হার্টএ্যাটাক হতে হতে অফিসে পৌঁছানো লাগবে না। নাইম বললো, ‘এখানে বাস কইরা কিন্তু খুব আরাম ভাই, আমার তো ঢাকায় গেলে পুঁটি মাছের মত দপদপানি শুরু হইয়া যায় কতক্ষণে ফেরত আসতে পারবো সেইডা ভাইবা। এইখানে আপনার খুব ভালো লাগবে, সমুদ্রও তো একদম কাছেই, শুধু ফ্যামিলির জন্য হয়তো একটু কষ্ট হবে… তা এখন তো ইন্টারনেটের দুনিয়া, সবসময় তো যোগাযোগ রাখতেই পারবেন, ভিডিও কলে দেখা,কথা সবই কইরা নিবেন।’ তারেক আলী হু হা করতে থাকে ওর কথায়, নাইম তো জানে না বাড়ীর সাথে তার এত কথা বলার তাগিদ নেই!
কথা বলতে বলতেই দুজনে পৌঁছে যায় অফিসে। প্রথম দিন, পরিচয় পর্ব সেরেই কাজের মধ্যে ঢুকে কোনদিক দিয়ে সারাদিন কেটে গেল টেরই পেল না সে। অফিস শেষ করে ভাবলো সমুদ্রের পাশে কিছুক্ষণ বসে তারপর ফিরবে। অনেকক্ষণ একা একা বসে থেকে বহুদূরের জাহাজের বাতিগুলোর দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবনার অতলে তলিয়ে যায় সে। একের পর এক সমুদ্রের ঢেউ তীরে এসে বাড়ি খেয়ে সাপের ফণার মত নুয়ে নুয়ে পড়ছে, সেটা দেখতে দেখতে ভাবে, নতুন এক জীবন শুরু হলো তার, হোকনা ক্ষণিকের। অফিসের কাজের ঝামেলা খুব বড় কিছু মনে হলো না, ঠিক করে ফেলা যাবে কিন্তু সে যেন এখানে লম্বা একটা সময় কাটাতে পারে তারও ব্যবস্থা করতে হবে একই সাথে। কিছু ঝামেলা এখানে জিয়ল মাছের মত জিইয়ে রাখতে হবে যেন অফিস বোঝে এখানে তার প্রয়োজন আছে, এত সহজে এখান থেকে সে ফিরতে চায় না। ঠিক এই সময় ফোনটা বেজে উঠলো, শেলীর ফোন। ধরতে ইচ্ছাই করছে না তবু ধরলো-
‘হ্যালো, হ্যাঁ বলো, আমিই এক্ষুণি ফোন…’ কথা শেষ করার আগেই ওদিক থেকে শেলীর গলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে,
‘কি, গেছো পরে একটা খবরও দেয়ার প্রয়োজন নাই, নাকি?’
‘না মানে… আইসা অব্দি এত ঝামেলার মধ্যে পইড়া গেছি যে সময়ই পাওয়া গেল না, মাত্র একটু ফ্রি হইলাম আরকি!’
‘এই জীবনে তোমার আর সময় হইবোও না।’
ফোনটা কেটে দিলো শেলী।
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো তারেক আলী, যাক বেশী মিথ্যা আর বলতে হলো না।
মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল, এই অর্থহীন সম্পর্ক সে কিভাবে আরো বাকীটা জীবন বয়ে বেড়াবে সেটা ভাবতেই বুকের উপর যেন জগদ্দল পাথরের চাপ অনুভব করে। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে ফুঁড়ে সমুদ্রের এই সাদা ফেনাওয়ালা ঢেউগুলোর তীরে এসে আছড়ে পড়া দেখতে দেখতে তার গোটা জীবনের দিকে সে একবার চোখ মেলে তাকানোর ফুরসত পায় যেন- নিজের পরিবারের কথা মনে হয়। মা-বাবা দুজনেই ওপারে চলে গেছেন তাও অনেক বছর হলো। ছোট দুই ভাই চট্টগ্রামে যার যার পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। সম্পর্কগুলো ফিকে হয়ে গেছে একদম, মাসে একবারও কথা হয় না আপন সহোদরদের সাথে। শেলী তাদের পছন্দ করে না তাই ঢাকায় কদাচিৎ কেউ এলেও শুধু ফোনেই কথা শেষ হয় আর বাড়িতে আসতে বললে তারাও কোন উছিলাতে সেটা বাতিল করে দুপক্ষকেই এই আলগা সম্পর্কের জ্বালাতন থেকে বাচায়। অথচ ছোট ভাইদুটো একসময় তো তার কত প্রিয়ই ছিল। চট্টগ্রামে তাদের পরিবারটা, মা-বাবা আর তিনভাই সহ একটা সুখী স্বাভাবিক পরিবারই ছিল, অনেককিছুরই হয়তো অভাব ছিল সেখানে কিন্তু তার নিজের এই সংসারের মত এমন অতৃপ্তি, এত অসুখী জীবন তাদের কখনও ছিল না। পুরো পরিবার কতবার চট্টগ্রাম থেকে এই কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছে! কলেজ পাশ করে সেই যে ঢাকায় গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে বলে, আর ফেরা হয়নি এখানে। এতগুলো বছর পর নিয়তি তাকে আবারো এখানে ফিরিয়ে এনেছে।

ঘন্টাখানেক ধরে বসে থেকে ঢেউগুলো দেখতে দেখতে সেই পুরনো দিনগুলোর অলিতে গলিতে উকি ঝুঁকি মারতে থাকে। সেই স্মৃতিগুলো ছেড়ে কিছুতেই উঠতে ইচ্ছা না করলেও একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাড়ীর পথে রওনা দিল সে। নতুন জায়গা, খাবার নিয়ে তার জন্যে হয়তো অপেক্ষা করে থাকবে ওরা। বাড়ীর দিতে হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবে, এই যে সম্পূর্ণ নতুন আর এক পরিবেশে থাকা, জীবনের মধ্যে যেন ছোট ছোট আর এক রকমের জীবন। এক জীবনে মানুষ কত রকম জীবনই না কাটায়! একজন মানুষ শুধু একাই সেই জীবনের খবর রাখতে পারে। দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির পক্ষে আরেকজনের জীবনের সবকিছুর হদিশ পাওয়া কোনমতেই সম্ভব না, সে যত কাছের মানুষই হোকনা কেন। আর কাছের মানুষ বলতে যে কি বোঝায় তারেক আলী এখন আর সেটার কোন অর্থও বুঝতে পারে না।

দিন রাত উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যা রোজগার করে সব সংসারের পেছনে ঢালে, কিন্তু বিনিময়ে সে কি পায়? এতটুকু সময় বা ভালোবাসা কিছুই নেই তার জন্যে তার পরিবারের লোকজনের। তার বুভুক্ষু মনটা কতকাল যে ওদের কারো কাছ থেকে কোন মায়াভরা ডাক শোনেনি! একটা স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশ কতকাল যে তাদের নেই! সারাক্ষণ টাকার পেছনে ছেচড়ে চলা এক জীবন। আরো চাই করতে থাকে সবাই সারাক্ষণ। এত চাওয়ার আর তল খুঁজে পায় না সে।

বাড়ীটার কাছাকাছি আসতেই দেখলো নাইম একটা মেয়েকে নিয়ে বাইরে যাচ্ছে, তাকে দেখে এগিয়ে এসে বললো, ভাই আপনার জন্যই এতক্ষণ বইসা ছিলাম, দেরী দেইখা আমি আবার মরিয়ামরে ওর বাসার দিকে একটু আগাইয়া দিতে যাইতেছি।’ তারেক মেয়েটার দিকে তাকালে নাইম বলে, ‘ওর নাম মরিয়াম, আমার ছোট বোনের মত, আপনেরে পরে সব খুইলা কমুনে, আপনে হাতমুখ ধুইয়া খাইতে বসেন শর্মি খাবার নিয়া বইসা আছে, আমি এক্ষনেই আসতাছি।’

তারেক আলী ঘরে এসে রেডি হয়ে খাবার টেবিলে বসতেই শর্মি এসে নানান গল্প শুরু করে। ওদের পাঁচ বছরের মেয়ে ঝুমুর তার সাথে দেখা করার জন্য বসে থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়েছে শুনে তারেক লজ্জিত হয়ে বলে, ‘সরি আমিতো বুঝতেই পারি নাই, কালকে নিশ্চয়ই ছোট্ট আম্মাটার সাথে দেখা হবে।’ এরমধ্যেই নাইম ফিরে এসে যোগ দিল তাদের সাথে। শর্মি একটু উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, ঠিকমতো পৌছাঁয়া দিছো তো ওরে?’ খাবার খেতে খেতে নাইম বলে, ‘তা দিছি, কিন্তু ওরে এইভাবে এই বাসায় রাখা যাইবো না আর বেশিদিন, আবার যেকোন দুর্ঘটনা ঘইটা যাইতে পারে যেকোন সময়।’
তারেক চুপচাপ শুনছে দেখে নাইম বললো, ‘ভাই, যে মাইয়াটারে দিতে গেলাম ওর কথা আলাপ করতাছি আমরা, বড় দুখী এক রোহিঙ্গা মাইয়া। বাবা মা ভাই বোন, স্বামী, ছোট এক সন্তান সবাইরে জ্যান্ত পুড়াইয়া মারছে সৈন্যরা ওর চোখের সামনেই, ওদের গ্রামে। দেড় বছর আগে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার সাথে মরিয়ামও সীমান্ত পার হইয়া এইখানে আইসা ওঠে। কিভাবে এখানে এসে পৌছায়ছে নিজেও ভালো বলতে পারে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণের কাজ করতে গিয়ে খুব খারাপ অবস্থায় ওকে আমরা পাই, ওর কাহিনী শুনে স্তম্ভিত হয়ে যাই সবাই। রাখাইনে থাকতেই ধর্ষণের স্বীকার হইছে মায়ানমার সৈন্যদের হাতে। শুধু কাঁদতো আর পাগলের মত নিজের লোকদের খুঁজতো, প্রথমেতো মনেই করতে পারতো না যে ওর চোখের সামনেই তাদের মারছে, পরে আস্তে আস্তে ওর সবকিছু মনে পড়ে। খুব কষ্টে ওকে আমরা সুস্থ করে স্বাভাবিক অবস্থায় আনছি। মেয়েটার দুঃখী, মায়াবী চেহারাটা সবার মন কাড়ে, কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর শুরু হয় নতুন উৎপাত। রাতে ওর ঘরে লোক ঢুইকা পড়তো, দালালরা হোটেলে নিয়া যাইতে চাইতো, নানারকম ঝামেলা। এখানকার অনেকেই এইসব নানা রকমের কাজে জড়াইয়া গিয়া পয়সা রোজগার করতাসে, হেইডা এইখানে সবাই জানে কিন্তু মরিয়াম কিছুতেই রাজী হয় নাই এইসব করতে। শেষে ক্যাম্প থিকা বাইর কইরা আমাদেরই একটা রোহিঙ্গা বাচ্চাদের লার্নিং সেন্টারের পাশে ওরে একটা রুমে থাকার ব্যবস্থা কইরা দিছি, সেইখানে সে রোহিঙ্গা বাচ্চাদের পড়ানোর কামও করে। কিন্তু ঐখানেও তার একা থাকাটা সেইফ না, অনেকেরই নজর আছে ওর দিকে। মাইয়াডার সুন্দর চেহারাই ওর জন্য এখন বড় ঝামেলা হইয়া দেখা দিছে। বড় লক্ষী মাইয়া, আমাদেরও খুব মায়া পইড়া গেছে ওর উপর। সে প্রায়ই আমাদের বাসায় এসে থাকে, শর্মি তাকে খুবই যত্ন করে আর আমার মাইয়াতো তার জন্যে পাগল, সেও ঝুমুররে খুব ভালোবাসে, তার মাইয়াডা নাকি ওর বয়সেরই আছিল। আমরা ভাবতাছি তারে একেবারেই আমাদের বাসায় নিয়া রাখবো পরে ভালো দেইখা একটা বিয়া দিয়া দিবো।’ মরিয়াম এর কথা বলতে বলতেই সবাই খাওয়া শেষ করে যার যার ঘরে গেলো। বিছানায় গা টা এলিয়ে দিতে দিতে তারেক আলী ভাবে, বড় আরামের ঘুম হয় এখানে! এত শান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙে না অনেকদিন, মাস, বছর!

দেখতে দেখতে মাসখানেক কেটে গেল এভাবেই। সারাদিন কাজেই কেটে যায় তারেক আলীর কিন্তু কাজের পর সময়টা কাটে বড় আনন্দে। নাইমের পরিবারটি যেন তারও পরিবার হয়ে উঠেছে ক্রমেই। ওরা স্বামী স্ত্রী আর ওদের পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে ঝুমুর যেন এই কয়েক দিনেই তাকে তাদের বাড়ীর একজন বলে কাছে টেনে নিয়েছে। ওদের সাথেই থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছে সে, পরিবর্তে মাসিক একটা থোক টাকা দিয়ে দিচ্ছে, যেটা ওদেরও বেশ কাজে লাগে, তবে তার বিনিময়ে যা পাচ্ছে সেটা শুধু টাকা দিলেই পাওয়া যায় না, একটা আন্তরিকতা দিয়ে ঘিরে রেখেছে ওরা তাকে।

আরো একজন আছে এই বাড়ীতে এখন, মরিয়াম বিবি, কিছুদিন ধরে সেও পাকাপোক্তভাবে নাইমের বাসায় থাকা শুরু করেছে। একা একটা বাসায় মরিয়ামের থাকাটা প্রায় অসম্ভবই হয়ে উঠেছিলো। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিছু নেতৃস্হানীয় মানুষ আর তাদের অফিসের যারা নিয়মিত ওদের মনিটরিং করে তাদের সাথে কথা বলে ওরা মরিয়ামকে ওদের কাছে নিয়ে এসে রেখেছে। শর্মি ওর এক ভাই এর সাথে মরিয়ামের বিয়ের কথাও ভাবছে। নাইমের বউ শর্মির মধ্যে মানুষকে আপন করে নেয়ার এক অদ্ভুত গুণ আছে। সে আর মরিয়াম যেন তাই ওদের বাড়ীর লোক হয়ে উঠেছে দিনে দিনে।

সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে বাসায় ফিরলেই একটা জমজমাট আড্ডা শুরু হয়। চা নাস্তা খাওয়ার ফাকে ফাকে চলে টিভি দেখা আর নাইমের সাথে নানান বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক, শর্মি আর মরিয়ামও জমজমাট করে রাখে পারিবারিক আবহটাকে। তবে কখনও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে টিভিতে কিছু দেখালেই মরিয়ামের সদা বিষণ্ণ মুখটা যেন আরো বিষণ্ণ হয়ে যায়, শূন্য চোখে সে তাকিয়ে থাকে টিভির দিকে, সেখানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে নানা রকমের আশ্বাসের কথা উচ্চারিত হলেও তাতে তার আর যেন কিছুই যায় আসে না। তার ফেলে আসা গ্রাম কান কিয়াতে তার বাড়ীর কেউ আর নেই, সেই গ্রামেরই আর কোন অস্তিত্ব নেই এই পৃথিবীর বুকে। কিছুদিন আগে টিভিতে একটা প্রতিবেদনে দেখাচ্ছিল যে, একসময় কান কিয়া গ্রামটি যেখানে ছিল সেখানে এখন ডজন ডজন সরকারি ও সামরিক স্থাপনা দাড়িয়ে আছে, মিয়ানমার সেনারা বুলডোজার দিয়ে পুরো গ্রামটা আরো অনেক রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামের সাথে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। তার আগে মরিয়ামের পরিবারের সবাই মিশে গেছে সেই মাটিতে, গণকবরে। মরিয়ামের জন্যে এই জায়গা আর রাখাইন রাজ্যের সেই ফেলে আসা গ্রাম দুটোই এখন সমান।

নাইমরা চেষ্টা করে এই সংক্রান্ত কোন কিছু যেন তার নজরে না আসে। লার্নিং সেন্টারে কাজের পাশাপাশি তাদের সাথে থেকে মেয়েটা যেন তার কষ্ট ভুলে থাকতে পারে সেই চেষ্টাই ওরা করে। যখনই বাড়ীতে থাকে ছুটে ছুটে সবরকম কাজে শর্মিকে সাহায্যে করে, ঝুমুরতো মরিয়ামকে ছাড়া এখন কিছুই বোঝে না। শুধু ঝুমুর না বাড়ীর অন্য সবাইও আসলে মরিয়ামের অনুপস্থিতির কথা একদিনের জন্যেও ভাবতে পারে না। প্রথম যেদিন ভালো করে মরিয়ামকে দেখে, সেদিন একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছিল তারেক আলী। সাতাশ আটাশ বছরের আশ্চর্য লাবণ্যময়ী একটা মেয়ে, হাল্কা পাতলা গড়নের জন্য বয়সটা আরেকটু কমই মনে হয়, অদ্ভুত এক নীলচে ধরণের চোখ, তেলতেলে উজ্জ্বল তামাটে গায়ের রং থেকে যেন এক আশ্চর্য দ্যুতি ছড়ায় সারাক্ষণ! শরীর ও মনের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে, বিষণ্ণ চেহারাটা দেখে সেটা কিছুটা বোঝা যায়, কিন্তু সেই ঝড় তার সৌন্দর্য কমাতে পারেনি একবিন্দু।

মাস চারেক এভাবে কেটে গেলেও তারেকের যেন মনে হয় সে কতবছর ধরেই না জানি এখানে আছে। এখানে যারা এরকম ছয় মাস আট মাসের জন্যে আসে তারা সবাই মাসে দুমাসে একবার ছুটি নিয়ে নিজের বাড়ী থেকে ঘুরেও আসে কিন্তু এই কয় মাসে তারেকের একবারও ইচ্ছা হয়নি যে সে বাড়ীতে যায়, বরং শেলিকে সে বলেই যাচ্ছে এখানে কাজের এত চাপ যে দম ফেলতে পারে না। ফোনেই সপ্তাহে একবার ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলে, তারা নিরাসক্ত গলায় রোবটের মত জিজ্ঞাসা করে ‘কেমন আছো, আসবা কিনা,’ যেন না আসলেও চলে। দিনে দিনে এই নিরাসক্তি তার মধ্যেও সংক্রামিত হচ্ছে। তার নিজেরও যেন হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যে তার একটা সংসার কোথাও আছে! মাস গেলে টাকাটা পাঠিয়ে দিয়েই সে এখন নিশ্চিন্তে থাকে। মাঝে মাঝে নাইমের বউ হাসতে হাসতে বলে ‘তারেক ভাইতো বাড়ীর কথা ভুইলাই গেছে, আমরা তারেক ভাইরে জাদু করছি…’ আসলেই যে যাদু করেছে সেটা তারেক মুখ ফুটে বলবে কিভাবে শর্মীকে!

এরমধ্যেই হঠাৎ একদিন নাইম অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে যাওয়ার আগে তাকে বললো, ‘তারেক ভাই বাসা থেকে একটা খারাপ খবর আসছে, আমি বাসায় যাই, আপনেরে পরে ফোন দিয়া জানাইতেছি কি হইছে।’ হাতের কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে তারেক দেখলো সবার মুখ গম্ভীর, শর্মী একটু পর পর চোখ মুছছে, একটা সুটকেস রেডি দরজার কাছে। শর্মীর আব্বার স্ট্রোক করেছে, এখন তখন অবস্থা, রাতের বাসেই তারা চট্টগ্রাম শহরে যাবে। নাইম বললো, ‘ভাই আপনে কোন চিন্তা কইরেন না, মরিয়াম তো আছেই, সে সব কিছু জানে, আপনের কোন অসুবিধা হইবো না, আমি সাত দিনের ছুটির দরখাস্ত দিয়া যাইতাছি, পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’ রাত নটার বাসে ওরা চলে যেতেই তারেকের পরিচিত পৃথিবীটা আবার যেন হঠাৎ একটু বেসুরো হয়ে গেল।

সপ্তাহ খানেক কাটে। তারেক আলী মনে মনে কেমন যেন এক অস্থিরতা বোধ করে। সে খেয়াল করে নাইমদের অনুপস্থিতিতে মরিয়ামের তার প্রতি যত্ন আত্তিটা যেন একটু বেশীই! এতটুকুও ফাঁক রাখে না কোনকিছুতে, কখনও এত মনোযোগ না পাওয়া জীবনে হঠাৎ সেটা পেয়ে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে, কেমন এক ঘোরও যেন লাগে! অফিস থেকে কি এক আকর্ষণে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরত আসে সে প্রতিদিন, সন্ধ্যায় দুজনে একসাথে গল্প করতে করতে চা, নাস্তা খায়, টিভি দেখে। মেয়েটা যেন হঠাৎ তার জীবনে এক নিষিদ্ধ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ইদানিং মরিয়াম তার জীবনের নানান কথা খুব আগ্রহ নিয়ে শোনে, প্রশ্ন করে। তারেকও আস্তে আস্তে অনেককিছু তাকে বলে, তার দুঃখ, বিপন্নতা, একাকীত্ব, নিজের মানুষদের আত্মকেন্দ্রিকতা-সবই বলে। মরিয়াম যেন দিনে দিনে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠতে থাকে যার কাছে নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে নিজের না বলা যত কথার ঝাঁপি খুলে দেয়া যায়। মরিয়াম নিজের কথা প্রথমে একটু কম বললেও ইদানিং তারও বাধ ভাঙা স্রোতের মত অনেক কথা বের হয়ে আসে তারেককে বলার জন্যে। তারেক ভিতরে ভিতরে কখনো আবার একটু দুর্বলও বোধ করে। মেয়েটার কেউ নেই- তার অবচেতন মন সেটার একটা সুযোগ নিচ্ছে নাতো? কিন্তু নিজে সে জানে যে এটা নিছক জৈবিক টানের কোন ব্যাপার নয়, তেমন চাইলে সে আরো আগেই অন্যখানে অনেককিছু করতে পারতো। কিন্তু দুজনেই ভিতরে ভিতরে বুঝতে পারে যে, খুব অন্যরকম একটা টানও তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে।

নাইমের সাথে প্রায় রোজই ফোনে কথা হচ্ছে, তার শ্বশুরের একটা সংকটকালীন অবস্থা চলছে, আরেকদফা ছুটিটাও বাড়িয়ে নিয়েছে এরমধ্যে। তারেক মনে মনে খুশীই হয়। যাক না আরো কিছুদিন এরকম, তার আর মরিয়ামের এই দুদিনের সংসারটার মেয়াদ না হয় আর একটু বাড়ুক। মেয়েটার উপস্থিতি তার চারদিকে যেন একটা আনন্দের বলয় তৈরি করে। সে বোঝে মরিয়ামেরও তার মতই মনের অবস্থা। সন্ধ্যায় সে অফিস থেকে ফেরার সাথে সাথে ওর বিষণ্ণ মিষ্টি মুখটায় একটা আনন্দের দ্যুতি চলকে চলকে ওঠে, যেকোন উছিলাতে সে তার কাছাকাছি থাকতে চায়।

এক-সন্ধ্যায় দুজনে মিলে একসাথে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিল, সেই সন্ধ্যাটা তাদের সারাজীবন মনে রাখার মতই হয়ে থাকলো। চুপচাপ বসে ঢেউ দেখতে দেখতে মরিয়াম একথা সেকথা বলতে বলতে তার হাতটা ধরে চুপ হয়ে গেল। তারেকেরও দমটা মনে হয় গলার কাছে এসে আটকে যায়, কিছু কি বলবে মরিয়াম? কি উত্তর সে দেবে তাকে? সে তো মরিয়ামকেই কায়মনোবাক্যে চাইছে তার জীবনে, কিন্তু কিভাবে, তার কোন কুল কিনারা করতে পারে না। তার মন কোনমতেই যেন আর ভাবতে পারে না ঢাকার ঐ প্রাণহীন সংসার জীবনে সে আবার ফেরত যাবে, কিছুতেই মনে হয় সে আর পারবে না। তার বাকী জীবনটা যে সে মরিয়ামকে সাথে নিয়ে কাটাতে পারবে না দিনে দিনে এটা ভাবা তারেকের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠতে থাকলো।

এতদিন এক বাড়ীতে থেকেও দুজনেই সংযমের যে পরিচয়টা দিয়ে যাচ্ছিলো দুদিন আগে সেটুকুও বিলীন হয়ে গেছে। সবকাজ গুছিয়ে রাতে যখন মরিয়াম কাছে এসে দাড়িয়ে বললো, ‘আমি ঘুমাইতে যাই, আপনেও আর রাত কইরেন না, সকালে অফিস আছে’- তারেকের সেদিন যেন বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠলো… মরিয়াম পাশে এসে দাঁড়াতেই পাউডারের একটা হাল্কা মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা দিলো। মন, মাথা সব যেন এক ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে উঠলো তার। ঘোর লাগা চোখে সে তাকায় মরিয়ামের দিকে, ‘না, যাবা না!’ মরিয়ামের বিস্মিত দৃষ্টির ভ্রুক্ষেপও না করে এক ঝটকায় সে তাকে তার বুকের মধ্যে টেনে নেয়। ‘যাইওনা, থাকো আমার কাছে।’

মরিয়ামের চোখেও যেন ঘোর লাগে। নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে আলতো করে তারেকের চুলের মধ্যে হাতটা দিয়ে তার মুখটা নিজের বুকের কাছে টেনে চেপে ধরে রেখে, নিজের মুখটা ওর মাথার উপর ধরে রাখে অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে করে বলে, ‘একবারে রাইখা দ্যান! আমার আর যাওনের জায়গায় বা কই আছে!’
পাথর হয়ে থাকে তারেক! কিভাবে, কিভাবে সে তার জীবনের এই মহামূল্যবান রত্নটাকে নিজের জীবনে ধরে রাখবে জানে না সে, শুধু জানে একে ছাড়া তার আর চলবে না।

তারেক আলী ভাবতে থাকে, ভাবতেই থাকে দিন আর রাত। আরো কিছুদিন চলে এভাবে, দুজন যেন দুজনের জীবনের সব আনন্দ খুঁজে পেয়েছে দুজনের মধ্যে। কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত তো তাকে নিতেই হবে। তার মন কি চায় সেটা শুধু তাকেই বুঝতে হবে। আর সেজন্যে যদি তাকে একটু নিষ্ঠুর হতে হয় তবে সে হবে। জীবনে অন্তত এই একবার অন্যর কথা না ভেবে তার নিজের কথা তাকে ভাবতে হবে।

এরমধ্যেই নাইম ফোন করে একদিন জানালো তার শ্বশুর মারা গেছেন, সব কাজ শেষ করে তারা দুদিনের মধ্যেই ফিরবে। তারেক মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে। গতকাল ঢাকা অফিস থেকেও একটা ইমেইলে বস জানিয়েছে আর একমাসের মধ্যে এখানকার সব কাজ গুছিয়ে দিয়ে তাকে ঢাকায় ফিরতে হবে, তাছাড়া তার ছয় মাসও পুরে যাবে আগামী মাসে, তাই এখানে থাকার তার আর প্রয়োজন নেই। তারেক বোঝে, আসলে বসের তাকে ছাড়া আর চলছে না।

সন্ধ্যায় অফিস শেষ করে তারেক আলী একা একা সমুদ্রের ধারে যেয়ে বসে। মরিয়াম হয়তো একটু চিন্তা করবে তবুও সে ভাবে, তার এখন একটু সমুদ্রের ধারে গিয়ে একা বসে সবকিছু গভীরভাবে ভাবা দরকার। সমুদ্রের তল খুঁজে না পাওয়ার মত তার এই সমস্যারও কোন সমাধান সে খুঁজে পায় না। শুধু জানে মরিয়ামকে ছাড়া তার বাকী জীবনটা আর চলবে না। কেউ একজন তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে, ভালোবেসে তার জন্য সবকিছু করে, এর থেকে বেশী কিছু মানুষ কি চায় জীবনে। নিজের মনের অলি গলি খুঁড়ে খুঁড়ে দেখলো সে। কি চায় ! কি চায় জীবনে এইটুকু ছাড়া! একটা ভালোবাসাময় হাতের ছোঁয়া, পাশে থাকা, ভরসা দেয়া, এটা কি জীবনে খুব বেশী চাওয়া? আর যখন তা পেল কিভাবে সে তাকে ছেড়ে যাবে? পারবে না, কিছুতেই সে পারবে না, এতকালের বুভুক্ষু মনটাকে আর কোন ভাবেই সে বঞ্চিত করতে পারবে না, কিছুতেই না।

কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিলো তারেক আলী।
কাউকে কিছু না জানিয়ে সে মরিয়ামকে নিয়ে চলে যাবে যেদিক দুচোখ যায়। এই বিশাল পৃথিবীর কোন এক কোনায় তাদের দুজনের ঠিকই একটু জায়গা হয়ে যাবে।
আর কিছু ভাববে না সে, কারো কথাই ভাববে না। জীবনে এই একবার শুধু সে নিজের মনের কথা শুনতে চায়, শুধু নিজের জীবনের কথাই ভাবতে চায়।
পকেট থেকে আস্তে করে ছাই রঙা মোবাইল ফোনটা বের করে একদৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ, তারপর ফোন থেকে সিমটা বের করে সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ঢেউয়ের সাদা ফেনার মধ্যে সিমটার সাথে সাথে তার পুরনো জীবনের সব অর্থহীন সম্পর্কগুলোও পাকিয়ে পাকিয়ে অন্ধকারে দূরে, বহুদূরে দৃষ্টির বাইরে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

 

ক্ষমা মাহমুদ

জন্ম যশোর শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক বাবা ও শিক্ষিকা মায়ের সন্তান হিসাবে ছোট থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা এবং শিল্পসাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার জন্ম। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এছাড়া প্রায় একদশক ধরে বাংলাদেশ বেতারে ইংরেজী সংবাদ পাঠিকা হিসাবে কর্মরত আছেন।

ছাত্রজীবন থেকেই নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও, পেশাগত ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘ বিরতির পর বর্তমানে ছোটগল্পের মাধ্যমে আবারও লেখালেখির জগতে বিচরণ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ও পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।