গোধূলি
বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে দুরন্ত শৈশবের
অর্বাচীন ধূসর বেলা!
ইট-পাথরের যাপিত জীবন ছেড়ে
কোনো গোধূলিক্ষণে মন চলে যায়ー
শান্ত নদীর জলের ধারায়,
ক্ষণিক আবেগ জড়ানো ভেজা স্পর্শে
দাঁড়িয়ে থাকি স্থির
হৃদয় গহীনে ক্রমাগত আছড়ে পড়ে
সমর্পণের ঢেউ।
কখনো চুলের সিঁথির মতো সরু পথ
বেয়ে উঠে যাই পাহাড় চূড়ায়,
বিশাল প্রকৃতির মাঝে তাকিয়ে থাকি নির্বাক
বিস্মিত মনে সহসা জাগে ক্ষুদ্র অস্তিত্বের
আমিত্ব বোধ
অনন্ত শূন্যতায় ডুবতে থাকি মুহুর্মুহু।
কখনো বৈকালিক প্রান্তরে থমকে দাঁড়ায়
অস্থির পদক্ষেপ
অটবির শ্রান্ত ছায়ায় নিবিড় আত্ম-সমর্পণ।
ঘরে ফেরা সান্ধ্য পাখিদের ঝাঁকে-
জোনাকের গৃহস্থ সংসারে-
বন্দি করি অব্যক্ত অভিমান!
কখনো চোখের ক্যানভাসে আঁকা
সেই বিকেলটি এসে দাঁড়ায় দৃষ্টির সম্মুখে,
খোলা প্রান্তরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা একলা বকটির সাথে
ভাগাভাগি করি নীরবতা,
একাকিত্বের উত্তাপ!
জীবন বৃত্তান্তের সাঁঝবেলায়
দুটো অসম জীবন খুঁজে ফেরেー
নিদারুণ অস্তিত্বের সঠিক সংজ্ঞা,
আর
হারিয়ে ফেলা আমিটুকু!
অমিয় মগ্নতা
জীবনের দৌড় প্রতিযোগিতার শীর্ষবিন্দুটা
ছুঁয়ে দেখার দুর্দান্ত নেশা।
কিন্তু, পথ আটকে পিছনে টানছে স্বজন-প্রিয়জন,
যেন হা-ডু-ডু খেলার মাঠ
প্রতিপক্ষー
কেউ হাত ধরে
কেউ পা ধরে
কেউবা সারা শরীর জাপটে ধরে
দমিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা।
তবুও জয়ের অদম্য নেশায় শৃঙ্খলিত দেহে
নীরব ছুটে চলা,
নীল সমুদ্রজলে ডুবে যায় পায়ের পাতা
কন্টকাকীর্ণ পথে রক্তাক্ত মন
রোদের ভাঁজে নুয়ে পড়ে দেহ।
বিষণ্ণতা ভর করে আষ্টে-পৃষ্ঠে
কপাট বন্দী আশ্রয় কাঁদে নিঃশব্দে,
দুঃখ রেখার সূতিকাগারে জন্ম হয়
মহাশূন্যতার
জড়িয়ে ধরে বিধ্বস্ত সময়…
ক্ষণকালে, অনাদি কালের জয়ের নেশা
আবারও কড়া নাড়ে অস্ফুটে,
আড়মোড়া ভেঙে পুনশ্চ জেগে উঠি
আপন ব্যাখ্যায়,
পুনর্জন্মে অমিয় মগ্নতা।
লোচন
চোখ যেন তার গভীর জলের
বিমূর্ত চিত্রকল্প
আঁখির পাড় জুড়ে পদাবলি কাব্যের
দুর্লভ শব্দকোষ,
সহস্র উপমার সমুদ্র বিশাল।
চোখের ভাষা যেন অতলান্তিক গভীর
নিবিষ্ট দৃষ্টির প্রগাঢ়তায় নির্জন ভূমেও
চোরাবালি ঝড় ওঠে!
সম্মোহন সংকেতে উন্মোচিত হয় মনের
গহীনের লুকানো সব
গোপন থাকেনা গোপন কিছু!
দৃষ্টি যখন স্থির কবিতার ভূমেー
নবজন্মে অনুরণিত হয় ব্যতিক্রমী
কাব্যের ফলিত নির্যাস,
তুমুল ছন্দে পত্র পল্লবিত শুষ্ক বৃক্ষের
মৃত বুক
বিমুগ্ধ উপোসী মন!
ব্যাকুল আঁখি যখন আকুল প্রেমেー
শ্রাবণ ভেজায় শুশ্রুষার জলে,
বিমর্ষ আয়ুরেখায় আগামী নকশার
বাঁচার তাগিদ,
পিদিম জ্বলা রাতের কুহেলি মায়ায়
দেয়াল জুড়ে স্পর্শচিত্রের নিখুঁত টান,
যুক্তাক্ষরে যাপিত জীবন
থৈ থৈ জোছনার মন্ডিত নীড়!
ঝড়ো হাওয়া
একটি ঝড়ো হওয়ার উন্মাদ স্বাক্ষরে
নির্জন দ্বিপ্রহরের বুকে ঝড় ওঠে
পলাতক চৈত্রের।
গোধূলি মায়ার বুকে ঘন ছায়ার
নীরব বিসর্জন
অন্তহীন নীল কষ্ট প্রলেপে চৌচির
নির্জন মাটির গহীন তল
কলমের ঠোঁটে মুখস্থ কোটেশনের
জমাটবদ্ধ শব্দ অক্ষর
আশ্চর্য চিহ্নে পূর্ণ সাদা পৃষ্ঠার
শূন্য বুক।
দাগটানা সময়ের ভাঁজে গড়িয়ে পড়ে
মিথ্যা প্রতিশ্রুতির এক প্রহর অবিশ্বাস।
ভুলের মাশুলে নির্জীব অস্তিত্বের
আয়ুরেখা।
বৃষ্টিবিন্দু সিক্ত করে সারাদিনের
রোদের উষ্ণতা
শীতের কাঁথার নকশি ফোঁড়ে
মন ভাঙনের নীরব শব্দ…
উপশম
তুমি ছাড়া ভীষণ এলোমেলো
ভীষণ অবিন্যস্ত সংজ্ঞা আমার
তোমাকে ঘিরে অনন্ত ঘুর্ণন।
তোমার জন্য উৎসর্গ করি
একজন্ম ইতিবৃত্ত
তোমার জন্য উৎসর্গ করি
প্রণয়ের উড়ন্ত খেয়াল।
উড়নির ভাঁজে লুকিয়ে রাখি
সুগন্ধি সুবাতাস
আগামীর করপুটে জমা করি
পরশ্রীকাতর অভিমান
জমা করি সহস্র অভিসার।
তবুও বিরহ আসেー
জলরঙা জলোচ্ছ্বাসে!
বিরহ দীর্ঘ হলেー
তুমি না হয় নতজানু হয়ো বারংবার
নীলখামের বুকে, অব্যর্থ সংলাপে
পাঠিয়ো উপশম।
আতিকা হাসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর।
জন্ম ১৯৭২ সালের ১৫ আগষ্ট সিরাজগঞ্জ শহরে। বর্তমান নিবাস ঢাকার রামপুরা, বনশ্রী।
পেশা: শিক্ষকতা। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: একক ৪টি এবং যৌথ ৪টি।
প্রকাশিত গল্পগুচ্ছ: “গ্রন্থিত প্রহর” এবং উপন্যাস: “জয়িতা”
