ভোর চারটে, দুঃখিত
সবই ফুরোয়, মানুষ উবে যায় বাষ্পে
আর আমি বদ্ধ ঘরে আনমনে
ঠোক্কর খেয়ে চলি আসবাবে আসবাবে,
হাত ফসকে পড়ে যায় বই,
অপেক্ষারত মাইক্রোওয়েভ অকাতরে
ডেকে যায় হারিয়ে-যাওয়া আমায়,
দেয়ালে মাথা খুঁড়ি, ছুরি ভিজিয়ে ফেলি
নিজেরই রক্তে— আমি লজ্জিত, সংকুচিত!
আমি দুঃখিত, আমি দুঃখিত, আমি দুঃখিত।
মেঘ-পাহাড়ি ডায়েরি
চশমার কাচে ধর্মচক্র ঘোরে,
হাতের তালুতে নাচে ব্যালেরিনা ফুল,
যখন আঙুল ছুঁয়ে দিয়ে মেঘ চলে গেল
নড়ে উঠল রোদ, মাথার উপরে গাছের সামিয়ানা—
ঘুঙুর পায়ে বৃষ্টির চারগুণা বোল।
রাতের বারান্দায় গল্প নামে,
চারিদিকে নাম না-জানা কীটের কলরব।
দুই পা ছেয়ে গেছে অসংখ্য জোঁকে,
রক্ত শোষে, ঘুম ভাঙে ট্রেনের কামরায়,
নিভৃত উদ্বেগ নামে গাল বেয়ে, চিবুক ছুঁয়ে,
গলার কাছে— “সিট পেয়েছেন?”
হাউল
রাতের ছাদ, সামনে জ্বলজ্বল করছে গগনচুম্বী অট্টালিকা—
কী আলো! কী আলো!
কেউ যেন তারা ছিঁড়ে এনে তাকে তাকে
সাজিয়ে রেখেছে দানবীয় বুকসেল্ফে!
এত সুন্দর, দেখে মনে হয়—
নক্ষত্রখচিত স্কাইস্ক্র্যাপার বুকে নিয়ে
জ্বলে আছে পেছনের আকাশটা!
এ হল আমাদের সাউথসিটি,
ওপরে রোশনাই, মাটির নিচে
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার যান্ত্রিক আকুতি,
শ্রমিকের ঘাম, কয়েকটা রক্তজল করা সংসার,
করুণ স্যাঁতসেঁতে বস্তিবাড়ির মায়া,
ভেঙে যাওয়া পরিবার, ছোটো ছোটো সন্তান,
রক্ত, কান্না …
ওই হাইরাইজের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি—
অনির্বচনীয় সুন্দর, গ্যালাক্সি দাঁড়িয়ে চোখের সামনে!
দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয়—
ওই আলোকস্তম্ভগুরোর দিকে মুখ তুলে
বাতাস কাঁপিয়ে নেকড়ের মতো হাউল করে উঠি।
ব্লাডিমেরি ১
সাড়া দাও! সাড়া দাও! সাড়া দাও!
আমার হাত থেকে পেয়ালা কেড়ে নিতে গিয়ে
কেটে দিয়েছ আমার আঙুল
আর আমি ফোঁটা ফোঁটা করে কেচাপ ঢেলে দিচ্ছি
তোমার রয়্যাল জিন পুলে— যেখানে ভাসছে
তোমার ফেলে দেওয়া বালিকাদের লাশ—
যারা বারবার নিয়ে গেছে তোমায় …
তুমি কি ভেবে দেখেছ, কার থেকে কোথায় এবং কেন?
আমার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে ‘উম হুঁ’ বলছ তুমি,
অথচ দেখছ না, আমার চোখ বেয়ে নেমে আসছে ব্লাডিমেরি—
ভীষণ নোনতা! আমিও রক্তকান্না কাঁদি, রাতভোর,
তোমার মাংসের বুকে মাথা রেখে!
ব্লাডিমেরি ২
আমার লিপস্টিক ভেবে খেয়ে ফেলেছ আমার ঠোঁট
আর বলছ— সুন্দর দেখাচ্ছে আমাকে …
আমি আয়নায় দেখছি ওষ্ঠ-অধরহীন রক্তাক্ত এক মুখ—
তুমি পরম যত্নে লিপবাম মাখিয়ে দিচ্ছ
আমার এবড়োখেবড়ো দাঁতে!
এরপর আমাদের আর কোনো গন্তব্য নেই,
পাকদণ্ডী বেয়ে আমরা নেমে আসছি
আমোদিনী মোমোর দোকানে— সেই আপেলরমণী
ছোটো ছোটো কোকুনে ভ’রে তুলে দিচ্ছে তার সন্তান।
দুরন্ত গতিবেগে আমরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি কাচের ওপারে,
যার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আমিই হাসতে হাসতে বলছি—
ব্লাডিমেরি, ব্লাডিমেরি, ব্লাডিমেরি …
ঠিক তিনবার!
সীমিতা মুখোপাধ্যায়

১৯৮২ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর হুগলী জেলার গরলগাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বেড়ে ওঠা একই জেলার উত্তরপাড়ায়। তিনি প্রাণী বিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত মোট বইয়ের সংখ্যা ৬টি। বইগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
দশভুজা সার্কাস (কবিতার বই)- ২০১৫, আমার অসময়গুলি (কবিতার বই) – ২০১৮, মিহি কুয়াশায় (কল্পবিজ্ঞানের গল্পের বই) – ২০২২, জন্মান্তর, ছিন্নপত্র (উড়োচিঠিগুচ্ছ)– ২০২৪, আনোখা ব্লুজ (কবিতার বই)– ২০২৪, অক্ষরখেলার অবসরে (কবিতার বই) – ২০২৬।
