লেখা, গান
আমরা অক্ষয়।
বইপত্রে পেয়েছি আশ্রয়।
সহজ ছিল না এখানে আসাটা।
দারোগা চাইতো ঘুষ, বাড়িওয়ালা চাইতো চড়া ভাড়া।
লেখকের সাথে জীর্ণ চিলেকোঠায় তথাপি রয়ে গেছি।
ক্ষুধার আগুনে জন্ম নিত ক’টা পংক্তি,
যেন বনঘুঘুর বুকের নরম মাংস—
শিকারির থাবার আগেই
ছাপাখানায় সটকে পড়েছি, আমরা আজ বেশ আছি।
২
আমি অন্ধ বেহালাবাদক হলে হয়তো গানকে
এতদিনে চিনে ফেলতাম। গানও আমাকে বুঝত।
লেখালেখি বন্ধ করে কোনো দিকে চলে যেতে পারতাম।
বাক্যের রহস্যে বুঁদ হয়ে পড়ে আছি।
যাকে দেখি তাকেই জিজ্ঞেস করি—
পাতায় কী লেখা আছে—কেউ হাসে।
কেউ ব্যস্ততার ভান করে সরে যায়।
জানি, এক ফ্রক-পরা খুকি পাতা কুড়িয়েছে।
জমিয়ে রাখবে বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে।
হয়তো তার সাথে পথে পথে খেলা করবে গান।
কখনোই কবিকে চিনবে না।
৩
ফুল বলে কিছু নেই, আছে লাল-নীল উক্তি।
গান বারবার এই কথাই বলে যায়।
আমাদের দুঃখের ধার সে ধরে না—দারিদ্র্যও চেনে না।
কিছুদিন ধরে এই মুশকিল হয়েছে—যেখানেই যাই,
পিছনে তাকে দেখি—সবজির দোকানিকে বলে,
‘আনাজের দাম চড়বে, তোর পোয়াবারো’;
‘পরীক্ষার প্রশ্ন এবার সহজ হবে’—
পাড়ার পড়ুয়াদের সাহস দেয়।
সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে,
তার খোঁজে ফুলের দোকানে যাই। গিয়ে দেখি—
লাল, নীল কমলাদের সাথে
দিব্যি গল্প জমিয়েছে গান।
কবি
পালিয়ে এসেছি—আছি বনের কুটিরে।
উদ্ভিদবিদ্যার বইয়ে দিন কেটে যায়,
মাঝে মাঝে বনমোরগের লাল পাখা গুনি।
কুটিরের দরজাটি সারাক্ষণ বন্ধ রাখি।
তবু শুনতে পাই ওপাশে পশুর চলাফেরা,
হাতির উপদ্রব বনে বাড়ছে দিনে দিনে।
বেশ কিছুদিন ধরেই অদ্ভুত নেশাও
পেয়ে বসেছে আমাকে—
হাতের বই সরিয়ে রেখে একটানা
তাকিয়ে থাকি
বন্ধ কাঠের দরজায়;
নিঃশ্বাস আটকে তার চিত্রকল্প পড়ি।
রঙের এক অভিধান গড়ে তুলছি ক্রমেই।
এই কিছু আগে এক দমকা হাওয়া বয়—
উড়ে আসে মোরগের লাল পালক;
চোখের ভেতর এত লাল ঢুকে যায়,
যন্ত্রণায় তৎক্ষণাৎ তীর ছুড়ে মারি।
গাছেরা আহত এখন—
রঙের ঝরনা বইছে।
অভিধান মুছে গেছে।
জল
এক পাত্র জল রোদে রেখে শিশু বসে থাকে—
কখন মাছের জন্ম হবে, দুমুঠো ভরে নেবে ধরে।
জলই প্রথম ঘাস দেখে তার নাম শেখে।
পৃথিবী এখনো নানা পাত্রে জল সাজিয়ে দেখে
দেহে রূপ, জলে উচ্চারণ।
জল পান করি।
তার রূপই আমাকে বয়ে নেয়।
২
প্রতিটি সভ্যতাই জন্ম নেয় নদী তীরে।
সভ্যতা মরে গেলে নদী প্রথম অদৃশ্য হয় মানচিত্রে।
ফুল ভেসে এলে নদীজলে—ভালো লাগে ভাবতে,
উজানে শুভ-অশুভের যুদ্ধ এইমাত্র থেমেছে;
একটি মেয়ের খোঁপা জয়ী—ফুলে তারই ইশারা।
ত্রস্ত হাতে তুলে নিই ফুল—
অচিরেই বুঝি হারাবে নদীটি।
৩
এ ঘাটে রোজ চারুলতা আসে,
পদ্ম তার রূপ ছড়িয়ে দেয়,
ঢেউরা ভুলে যায় দিনের আলো।
এক বেকার যুবকও এসে দাঁড়ায়।
কপালে আজ ফাঁড়া—পাড়ার বড়রা থানায়,
দারোগা কড়া মেজাজের;
দু-দশ দিন লকআপ—কে ঠেকাবে?
চারু ও জলে যে মজেছে, সে কি ভয় পাবে?
৪
আমার সামান্য বুদ্ধি।
যখন সকলে তীরে উঠে যায়, নদী পার হয়—
জলস্রোতে ভাসি আর তরঙ্গকে নানা প্রশ্ন করি।
বলি ঢেউ মাত্র গান—জ্যামিতির কোনো সূত্রই মানে না।
লোকে হাসে, খুবই মজা পায়।
আমিও জবাবে বলি—যদি সবই জেনে বসে থাকো,
তবে বলো—
জলে ঢিল পড়তেই তরঙ্গে যে বাক্য দোলে,
তাতে কী লেখা থাকে?
৫
সুরবালা নামে এক মেয়ে—
রসিকিনী—ডাকে আমায়:
এসো, দুজনে ডুবে ডুবে মরি।
আমি বলি—তুমি পাগলিনী।
তুমি জানো না,
ঢেউ এখনো এক গাছের গল্প বিশ্বাস করে,
আর শিমুল গাছটি জলে ফেলে দেয় একে একে তার ফুল।
শুরু হয় এক কাড়াকাড়ি—
চরাচর জুড়ে লাল রঙ আর ঢেউ—
গাছে চড়ে গান, কী বালাই!
এত প্ররোচনা! শেষে নিজেই ধরি গান:
সব উপহারই জলে ভাসে,
শ্রীমতী যা দিতে চায়,
কিন্তু যায় না যে ধরা।
পাতা
একদিন কোনো সরল দুপুরে ঠিক একটি বনে গিয়ে—
পাতার নিহিত বাক্য পড়ে নেব;
তখন আর কিছুই জানা বাকি থাকবে না—প্রাজ্ঞ হয়ে যাবো।
আপাতত আলোর বিজ্ঞানটুকু বুঝতে চাই—তার রান্নাটুকু,
যার নানা পদ, সব প্রাণই আহার করে,
বুঝে নিতে বুকে হেঁটে বাদাবনে যাই।
দেখি—পাতা সুপ রান্না করছে ভূত-পেতনির জন্য,
নিকটে যেতেই বলে—চেখে দেখো, মসলাটা ঠিক আছে কি না।
এই অবিশ্বাস্য সুযোগে উঁকি মারি প্রেতদেশে—
যেখানে শিশুর গল্প, রূপকথা ও ভয়ের
চিরোজ্জ্বল কালো জামা তৈরি হয়।
২
রাধাবিতান থেকে কেনা পুতুল হারিয়েছিল—
পাতার নিচে দেখি পড়ে আছে।
মৃদু বাজনা শুনি—
বুঝি, পাতারা শ্বাস নিচ্ছে।
একটি শোভাযাত্রাও চলছে—
কোথাও শিয়ালের বিয়ে—
পাতার মুকুট পরে নানা জীব চলেছে সেদিকে।
চাকা ঘুরাতে ঘুরাতে এসে পড়েছি এখানে—
তবে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে আমি ভীত হবো কেন?
রেশমের কারখানা ছেড়ে রোদে উড়ছে রেশম—
সেই সাদা জামা-পড়া দৈত্যের সাথে তবে দেখা হবে?
বাড়ি ফিরেই সুন্দরের খামে পাঠাব চিঠি।
সুন্দরলোকে কিছুদিন থাকব—
পাতার ভুবনে।
ঘরমঙ্গল
চট করে লোকে বলে দেয় জিনিসের নাম-ধাম,
আমি থতমত খাই,
তবে জলপাত্রটি এত বোকা নয়—
বলতে চায় না, অথচ সবই জানে।
কাল রাতে কলহের পর অন্য কথা হয়েছিল,
তৃষ্ণা নামে দেবী জল এক চুমুকেই পান করেছিল,
সাগর শুকিয়ে যাবে এমনই চুমুকের টান ছিল,
হায়, এসবই জলপাত্র ছাড়া আর কেউ জানে?
২
ঘরের দেয়াল বলি, তার কান আছে,
কত নাটকের সাক্ষী, গার্হস্থ্যের প্রায় সবই জানে;
কোথায় রাখছ সদ্য কেনা ত্বক ফর্সা করবার ক্রিম,
কার কোলে মাথা রেখে অন্য কার মুখ মনে করে থাকো!
মাঝে মাঝে সে আরও পরীক্ষা করে—
বালিশে মাথা রাখলে আদৌ ঘুম নামে কিনা।
আলো নিভলে সে মাছদের ডেকে আনে—
দেখ পলেস্তারা ফুঁড়ে ঘরের দেয়ালে জেগে ওঠে
লাল, নীল মাছ—আলোড়িত রাত্রি!
আলো
অকারণেই সুর লেগেছে আমার পিছে।
গণিত, জ্যামিতি বুঝে জানি—
আলো চলে না সরল পথে,
হঠাৎ ঢুকে পড়ে তাঁতির ঘরে।
জানতে চায়—সেই মিলু ছেলেটার
অসুখ সেরেছে কি না।
রঙিন সুতো চুরি করে
যে গাছ থেকে গাছে টেনে দিত—
মুহূর্তেই জমে উঠত খেলা।
আঘাতের পরে আজ দেখছি—
রাজার ছেলে, কানামাছি—
সব দৌড়োচ্ছে সেই আলোর সুতো ধরে।
২
সূর্যমামা বসে রেশন দোকানে।
লাইনে যে সবচেয়ে উৎসাহী,
হাসিখুশি, সে কাঠের তৈরি।
খড়ের বাঘেরা আনন্দে ঘুরছে
দোকানের কাছে-পিঠে।
এখন থেকেই ছড়ার কন্যার বিয়েতে যাব—
আমরা সবাই
ফুলতলি পেরিয়ে,
রোদ ও বৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
৩
কমলাবাগানের দিকেই মাঝে মাঝে যাই,
এই ফলে দাঁত বসালেই আলো বেরোয়—
ভাবা যায়—পয়সা দিয়েই কেনা যায়!
স্বর্ণ, রৌপ্য, হলুদের বাটা,
পাতে ভাতে ডালে আমলকি—
এসব আলোরই কারুকাজ।
ডাস্টবিনে কাড়াকাড়ি—পেছনে
দৌড়ায় ক্ষুধার্ত আলোর কুকুরেরা।
৪
রোদে আমারও হিংস্রতা জাগে—
দেখবে—হঠাৎ সিংহ বেরিয়ে পড়েছে,
সোনালি কেশর ছিঁড়ে রোদ ঠিকরে উঠেছে।
আমি আগুন-ঢাকা কাঁথা মুড়ে
ঘুমিয়েও যেতে পারি রৌদ্ররথে—
রং, মৌমাছি, ফুলের আক্রমণে,
সৌন্দর্যের তাপে
নিজেই কি রূপান্তরিত হব শেষে?
প্রায়ই ভঙ্গুর, রুগ্ণ—
তবু রৌদ্রের পুলকে
গাছের সামান্য এক ডালেই
বজ্রচোরকে সামলে দিতে পারি।
৫
কমলারা রোদে ছড়িয়ে পড়ে—
আমি বলি, একটু ফাঁক রাখো।
গান এলে পাখিদেরও জায়গা চাই।
লাল, নীল, সাদা—
এদের দাবিও কম নয়।
সাত রং, সাত সুরে
আলো নিজে এক গান-পাখি।
৬
রঙ-পেন্সিলের বাক্স থেকে রোদে
বেরিয়ে পড়েছে কিছু তেজি রঙ।
রোদে পাতার শিরা-উপশিরা ধরে
ছুটছে আলো—
কত কাজই বাকি আছে,
পিশাচরা রাতে জানালায় উল্কি এঁকে রেখে গেছে।
উন্মাদরা এবার সত্যিই যদি বেরিয়ে পড়ে,
কে বুনবে উলের সুতা, সাদা-কালো মিশিয়ে?
কোন জামা পরে শিশুরা আজ স্কুলে যাবে?
৭
রোদে কাক দেখি কেন? ধান বেচে, হলুদ-মরিচ বেচে
কিনলাম সোনার বালাটা—কার কুনজর পড়েছে!
রোদ তোর বাপ নয়! আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু রং চিনি—
চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারি কার গায়ে কতটা হলুদ বাটা।
একবার কালাজ্বর হয়েছিল—অনেকদিন শুয়ে ছিলাম। শেষে
বাইরে এসে শিয়ালের সাথে দেখা। বলল, বালা গড়ে নে—
বালাই দূর হবে।
পানিতে পড়েছিল—এক ডুবেই তুলে আনি।
তুই বলিস সুরুজকে দিয়ে দিতে? জান দিয়ে দেব!
গরিবরে বলিস কুকথা? অন্ধকার নিয়ে তুই থাক,
আমাদের লাগে জান-উপচানো সোনামাখা রোদ!
৮
একটা কাঠের চাকা—তবু
উৎসাহ কম নয়, টগবগে ফুর্তিতে,
চলেছে গঞ্জের হাটে শিশুদের নিয়ে।
সেখানে উঠেছে হাতি-ঘোড়া, টিয়া-বউ।
রঙিন চরকি ঘোরাতে ঘোরাতে
তারা পাড়ি দেয়
এক রৌদ্র-তেপান্তরে।
উন্মাদ
অস্বাভাবিক যা, তা-ই ভালো লাগে।
নতুন বৌয়ের সাথে গল্পও ভালো লাগে।
তাতেই সুখের আশা ফিকে হয়ে আসে।
ঘুম ভেঙে একদিন ভাবি—
সদ্য কথা বলা শিখেছে এমন
এক বিদেশি কুকুরের সাথে দেখা হবে।
তার কাছ থেকে নতুন দেশের বহু কথা শোনা যাবে।
গল্পের রাখাল সত্য বলতে শুরু করেছে—সেটাও শোনা যাবে।
বাঘ হিংস্রতা ভুলে গেছে সেই দেশে।
কিন্তু দেখি, সবই জাগতিক নিয়মে চলছে।
একটি গোঁফের সাথে অন্যটির মিল,
রঙের দোকানে রং বিক্রি হয়,
গাছ থেকে ফল পড়ে।
মনে মানে না।
তাই কেউ কেউ হঠাৎ জানালা ভেঙে
অন্য আকাশে উড়ে যায়।
২
রাস্তায় একটা কাগজ কুড়িয়ে পাই,
নাবিকের ডায়েরির ছেঁড়া পাতা।
জাহাজডুবির পর সে কী কী দেখেছিল—
‘অনেক কাঠের বাক্স, মুক্তার গহনা, নীল সাপ’
বাক্যখানি খুব দ্রুত পড়ে ফেলি।
হতে পারতাম মাছিমারা কেরানি,
বা লেস-ফিতা বিক্রি করা হকার।
পোস্ট অফিসের সামনে
পত্রলেখকরা নেই কেন?
টানা-হাতের অক্ষরে তারা লিখে দিতে পারত
আমাতে জাগছে যে স্বপ্ন-সুদূরতা।
সেই ছেলেটিও নেই—
যে এক তুড়িতেই তাড়াত সাবান-চুরি-করা কাক।
কী বলব উকিলের কাছে গিয়ে?
নীল সাপের সাক্ষ্য কি আদালত নেবে?
৩
গাছের একটা চোরাস্রোত আছে,
মুদ্রারও আছে নিজস্ব প্রবাহ।
উন্মাদ, যে রাত্রিভর জল মাপে,
সে শুধু স্রোতই দেখে।
কেউ কি বালিশ থেকে পড়ে গেল—
পাখির খাঁচা কি ভেসে গেল—
চিঠিখানি হাতে কেউ জল থেকে উঠতে চাইছিল।
সবই লেখা ছিল—কী হবে নিমেষ পরে।
দরজা-জানালা ভাঙি,
কাঁধ দিয়ে পৃথিবী ঠেলি।
স্থিতি চাই—
চরাচর ভেসে যাওয়ার আগেই।
রৌদ্র
রোদে দুঃখ দুঃখ লাগছে। যদিও
উজ্জ্বল ব্যায়ামাগার দেখা হলো—দিন ভালো যাবে।
আরও এগিয়ে যাই। ফুটপাতে
দোকানি কমলা সাজালো। আরও হাসি।
সুন্দরী নার্সরা হাসছেন। আর
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে এই হাসি।
আমি কি না খ্যাপা—একা পড়ে আছি !
আর এই রোদ এক শখের গোয়েন্দা; পিছে পিছে চলে।
বলি, আমি তো সামান্য লোক, কিনি চাল, ডাল।
যদি পারো, ধরো নিখিল-চোরাচালানিকে—
যে পাচার করে সোনা, রূপা—নানা মাল-মসলায়
খদ্দের ঠকিয়ে।
রোদে ঘোরা ভিটামিন ডি-এর জন্য ভালো, স্বাস্থ্য ঠিক থাকে।
তবে যারা দুঃখী ও পাপী আমার মতন,
পতিতপাবন হয়ে করো তাদের উদ্ধার।
২
আমি তোমার উদ্দেশ্যে যা রচনা করি
আগেই রচিত হয়ে গীত হয়ে গেছে,
পরে এসে বানানের ভুলে দেখি কি না
দু-একটা পদে সুর লেগে গেছে।
দেব দেবতার গান কিন্তু নয়,
শোনে আমিষ খেতে উৎসাহ বাড়ে;
হায় প্রভু তুমি কেন শুধু
পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় এখন কথা বল?
একদিন রুটি আর ঈশ্বর অভেদ ছিল!
জল আর পদ্ম
জলে পদ্ম আছে, মাছ আছে।
অস্তিত্ব নামের এক দ্বীপ হতে এসব দেখছি আমি।
এ দ্বীপ তরঙ্গে কাঁপে।
বিভেদকাতর।
যদি একবার ঝাঁপ দেওয়া যেত অদ্বৈতে।
সেদিন আলতাকুমারিকেও দেখলাম
দুপুরের রোদে
অফিসের জানালার পাশ দিয়ে দিব্যি
ভেসে যেতে।
সব গাছই কিন্তু জলের দিকে মুখ করে—
সৌন্দর্য যে সেখানেই।
২
প্রত্যেকের একটা নকল রূপ জলে থাকে; এর বয়স বাড়ে না।
এর ছেলেমানুষির শেষ নেই। আসল লোকটি বুড়ো হয়ে গেল,
আর তরঙ্গের মাঝে সেই আরেক জীবন তেমনই রয়ে যায়।
তার খেলা চলে, জলফড়িংয়ের পিছে ছোটাছুটি চলে।
তার তৃষ্ণা জলে হলুদ পাতার মাছ হয়ে খেলা করে চিরদিন।
৩
বিলের কাজল জলে ফুটে আছে সত্যপদ্ম—
চৌষট্টি পাপড়ি তার, কামে-রূপে থরথর কাঁপে,
মাটি থেকে ছেঁকে তুলে যত রূপ-তাপ-মোহ-মদ্য
স্তরে স্তরে, শিলাস্তরে যত শৈলী, পাপড়িতে মাপে।
ভ্রমর দূরত্বে থেকে দেখে নেয় জলগর্ভ ধরে
কত কত রংধনু। তার কিছু রং পদ্মে ফোটে
আর বাকি রং সব নীরবে অতলে যায় ঝরে।
রত্নলোভী মধুকর লোভে তবু ছোটে।
ফুলে শেষে যেই বসে, সৌন্দর্যের তাপে জ্বলে যায়।
রূপ ও তস্কর পরে পরস্পর গড়ে তোলে দ্বীপ—
সেই দ্বীপে ছোটে আজ কবিতা আমার, হায়,
তাপদগ্ধ, হাহাকার, পাখনায় মরণপ্রদীপ।
৪
জল চিনত আমাকে সে-শৈশবে।
মায়ের কাঁকন, চিরুনি, আলতার কৌটা—
পানা-পুকুরে ফেলে দিয়ে
ঢেউয়ের হাসির দিকে অবাক তাকিয়ে থাকতাম।
বকুনি আসত পরে।
বৃষ্টিতে রঙিন মার্বেল লাফাতে দেখেছি ফুটপাতে,
খেলনা ঘোড়ারা আনন্দে দৌড়ে যেত।
মাঠ জুড়ে গড়িয়ে যেত সূর্যের বল।
৫
অন্ধ বেহালাবাদকই জানে—
সুর সমে পৌঁছে গেলে
জল থাকে, লাল, নীল মাছ থাকে,
আর সব মুছে যায়।
আমরা সামান্য যারা, উড়ন্ত ডানার দিনে
পাতা একটা একটা করে ছেড়ে দেব,
ঘুরে ঘুরে জলে নেমে তারা হবে
মাছ-প্রাণবান।
গ্রামে হাঁটাহাঁটি
গ্রামের সড়ক ধরে হাঁটি। এই হাঁটা সাদামাটা নয়।
চাষীদের বাড়িগুলি জ্যামিতিক, রাবীন্দ্রিক নয়।
নজরুলভক্ত বলে গরুদের সম্মান করি। শিং-টিংও আছে।
এনজিও-প্রীতি নেই। সমস্যা দেখি সমস্যা আকারেই।
গ্রামমধ্যে স্কুল আছে। ক্লাসে ফুকো-টুকো নয়, সিনট্যাক্সই পড়াতে হবে।
আমগাছের পাশেই জামগাছ; পাতাশুদ্ধ কাঁপে ভাবাবেগে।
বাজারের দিক হতে কারা যেন এদিকেই আসে,
পিছনে হাঁটছে সিনেমাপোস্টার থেকে নেমে আসা সরকারি গোয়েন্দারা।
উল্টো দিক হতে আসে হাঁস; প্রতীকী তাৎপর্যে আমি মুহ্যমান।
চট করে বলি গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলা হবে। শিগগির।
২
ফলফলাদিসহ গ্রামবাংলা জানা দরকার।
এই জানা কোনো হাপিত্যেশ নয়, ফোক গান শিখে কোক স্টুডিওতে বিক্রি নয়।
পুরুষানুক্রমে আমরা শহরে আছি।
কলোনিয়াল মাইন্ডসেট। রাগেরও শেষ নাই। বাজারে দেনার ভার। বোঝাপড়া দরকার।
মোরগের পালক কিনতে এই গ্রামে এসে গাছে গাছে বিদ্যা দেখে বেজায় বেকুব।
হরিতকি নেহায়েতই কোনো ফল নয়; দুপুরের রোদে তার ঝরে পড়া
এক শুদ্ধ গ্রামভাবনার দিকে দ্রুত ঠেলে দেয়।
ঈশা খাঁর বাড়ি নিয়ে আলোচনা সেরে
খাদ্যবিরতির ফাঁকে গদ্যকবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে ঈষৎ ভাবছি।
বনে যাত্রা
প্রকাশ থাকে, সেদিন আমরা বনের কাছে ছিলাম।
আমরা নেশা করি না, তাম্বুলেরও দোষ নাই;
অন্য মহাপুরুষদের নিয়ে অবশ্য কানাঘুষা আছে।
মূলাধারচক্র হতে আজ্ঞাচক্র নিয়েই ব্যস্ত আমরা।
সে বিষয়ে অন্যত্র আলোচনা বিধেয় হবে।
কথা এই, তখন বেলা দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি।
অত্র অঞ্চলে বাঘের উপদ্রব নাই। সহসাই
“বাঘ বাঘ” চিৎকারে আঁতকে দেখি সহকারীকে।
মাত্র কদিন আগে দলে যোগ দিয়েছে। আনাড়ি।
এর ব্যাপারে কী বলব! ঘুমের মধ্যে ডুকরে কাঁদে, বাড়ি পলাতক;
শখ ছিল সার্কাসে নাম লেখাবে। সাত-ঘাটের জল খাওয়া বাকি এখনও। প্রখর
রৌদ্রে মাথা দিচ্ছে চক্কর, আর এটি কিনা করছে নাটক। যত্তসব।
যত কুষ্মাণ্ড জুটেছে, বনের গভীরে গিয়ে আর কী যে করবে।
২
প্রথমত পদ্যেই পত্রটি লেখা হউক। অন্যথায় ভাবপ্রকাশে
বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা আছে। আজকাল ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটছে,
সতর্ক করে দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাবো। বনে আমরা চুপিসারে আসি
নাই। কিন্তু আমাদের সন্দেহ করা হলো। বনরক্ষীর ব্যবহার খারাপ,
তদুপরি চাঁটগাঁয়ের ভাষায় কথা বলে। গোমরও তার কম নয়। বলে
হরিণের সংখ্যা গুনে রাখা নাকি চাট্টিখানি নয়। সুন্দরীগাছের মাপ
ঘন ঘন নিতে হয়। অদ্যাবধি শিকারির দেখা পাই নাই। তবে দেখছি, বন হতে বনে
প্রাণ ও অপ্রাণের চোরাচালান চলছে ব্যাপক। এটি বোঝার বিদ্যা তার
আছে নাকি? বনরক্ষী আমার বরাতে এইসব বলে নাই, ভাবানুবাদ করছি।
বাগান
বাগানে আমার ভয় হয়। এই ভয় ভৌত—
এই ভয় জ্যামিতিক। অংক জানলে হবে কি,
এ বাগানের কোণা কয়টা,
পরিধিই বা কত—হিসাবে মেলে না।
সাথে আনা লাল, নীল সুতা দিয়ে
সৌন্দর্যকে মেপে দেখি।
রঙ চিনবারও চেষ্টা করি।
ড্রাগনফুলের কাছে হার মানি।
খসে পড়া প্রতি পাতা পার হতে বহু দিন লাগে।
প্রতিটি পাতাই যেন একেকটি ঋতু।
রং তাড়া করে;
আর পথ ভুলে যাই।
কয়দিন ধরে এক বাচ্চা শিয়ালের পেছনে হাঁটছি একটানা।
২
চিত্রপটে ফুল বলে তুমি অন্ধ হয়ে পড়ো—
এখানে রঙের ত্রাস।
রক্তজবা খুব জেদি,
গাঁদাকে নিরীহ মনে হলে হবে কী—
সে এক হলুদ চিঠি পেয়ে খেপে আছে।
ঘাসফুলটাকে অবহেলা করে এলে—
তার দুঃখে দূর হতে আমরা গাই গীত।
গ্যালারিতে পড়ে থাকি—
দেখি না কিছুই।
সাবধানে যেও—
রঙ নীরবে জ্বলে।
৩
ফুল দেখে হীনমন্য হই, কিছু কি আমার
দেওয়ার মতন আছে, দেহে হাড় ঠনঠন করে,
পেশীরা রাখছে ঢেকে, উপায় নেই যে দেখবো
প্রয়োজনহীন, সৌন্দর্যে রঙিন কিছু আছে কি না,
একখানা অঙ্গ দিয়ে যে গৌরবে বলি, দাতা নই,
তবে বিপদে-আপদে আস্থা রেখো, কিছু গান
আমারও জানা আছে।
ফুল—আমার দৈন্যতা ঠিক জানে,
আমাকে সাজায়, দেয় আভা, বলে তুমি মদ আর
খেয়ো না, এবার পানশালা হয়ে ডাকো অন্যদের।
বৃষ্টি
নানা ঘটনার ডালপালা গজাতেই থাকে—
পুরনো রথের চাকা কাদায় আটকে যায়,
পাতার আগুন নিভে যায়,
কাঠের সৈনিকরা হারিয়ে যায়,
বৃষ্টি শুরু হলে এসবই এক এক করে দেখি।
কিছু পরে বুঝি আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে,
কিছু দূরে বাদকেরা
বাজিয়ে চলেছে রঙিন ছাতাকে ঘিরে,
মেয়েটি সেখানে কারও খোঁজে।
সুর খানিক থমকে—
কিছু ঘটবার ঠিক আগের মুহূর্ত।
লক্ষ্য করি সামনের মোড়ে
এক নারী—
যার বাম হাতে পাখি বসে আছে,
ডান হাতের আঙুল ফুঁড়ে শস্য জন্ম নিচ্ছে।
পথে পথে আজ নানা কিছু ঘটতেই থাকবে।
এসব না দেখে ফিরতে পারি না।
২
যা অব্যক্ত—মানে যা বলতে ভয় পাই—
শেষে দেখি তা-ই মেঘ হয়ে উড়ে যায়।
আমরা জীবনে এক তীরে শুষ্ক বসে থাকি,
আর অন্য তীরে নামে বর্ষা।
সারাজীবন দুঃখ করি;
আমাদের দুঃখের সব কথা অন্য তীরে মেঘ হয়ে ওড়ে।
দূরের মেঘ দেখে জীবন শুষ্কই থেকে যায়,
তবু সেই মেঘ দেখেই আমাদের বেলা বয়ে যায়।
৩
এক কাঠের টুকরো নিয়ে উন্মাদ পালায়—
বনের বাতাস, বৃষ্টির শব্দ,
বিদ্যুতের শিষ—সবই তাকে তাড়া করে।
কাঠুরিয়া দূর থেকে দেখে
ভাবছে, গাছেই লুকানো সকল রত্ন!
সে কাঠ কাটায় ব্যস্ত হয়ে থাকে।
বনকর্তার মেয়েটি নিখোঁজ হয়েছে,
অনুসন্ধানীরা কয়েক দিন খুঁজেও পাচ্ছে না।
মেঘের আড়ালে তার হাসি,
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে;
সেই হাসি কাঠে ভরে উন্মাদ ছুটছে।
৪
বৃষ্টি—
রুটি, মদ, আর এক চারা গাছের মতো।
আমি সেই গাছ,
যার কোনো জমি নেই,
বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি কিছু দিতে পারি—
কিন্তু তার আগে
ছুঁড়ে ফেলতে হবে ছলাকলা,
পোশাক, পালক,
যা কিছু তোমাকে ভারী করে রাখে।
কাজের মেয়েটি একদিন
বারান্দার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল—
তার অশ্রুই বৃষ্টিতে ঝরছে।
প্রাণবৃক্ষ
গল্পের পাতাদের আজ গাছে দেখছি।
পাখিরা আমাকে ঠিকই চিনেছে।
রংধনু নিয়ে লেখা আমার পংক্তি
মেঘলোকে তারা অনেক পড়েছে।
আজ নিশ্চয়ই ডালপালা বেয়ে
পার হব গিরিমালা, জন্তুর ডাক।
ফাঁকে ফাঁকে দেখে যাবো
ফুল-ফল ফোটাতে ফোটাতে
নিচ থেকে শিখরে ওঠা
অরণ্যকাহিনী।
২
আমি নিজের ভিতরে গাছ দেখি, সবসময় না,
আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেবার মুহূর্তে তো নয়ই।
মাছের আড়তে চুরি করি,
ইমারতচূড়া কেনা বেচা করি,
গাছদের ঘোড়া বলে ডাকি,
লোকের নামে নিন্দামন্দ করি, বাজে বকি—
তবু প্রাণবৃক্ষ বেড়ে যায়।
৩
মাঝে মাঝে ঘরে নানা জায়গায় ফুল লাগাই
ঘোরের মধ্যে—
দেখি আলনার ফুলগুলো টগবগ করছে উত্তাপে,
বিছানায় হাঁসফুল সাঁতার কাটছে,
দু-চারটে পাখা হয়ে ঘুরতে চাইছে—
বাড়াবাড়ি দেখে
ঘরের বিড়াল ঘুম ছেড়ে ছুটে আসে,
দ্রুত লাফ দিয়ে
দু-একটা উড়ন্ত ফুল থাবা দিয়ে লুফে নেয়।
খাঁচার পাখিটি যেই গান ধরে—
সব খুলে যেতে থাকে,
ফুলের রাজত্ব দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে।
বায়ু
ঘোড়া চুরি করে যারা এদেশে পালিয়ে এল,
তাদের নরম শয্যা দাও—
আঙুর, মদ দাও।
তাদের ঘোড়ার কেশরে
বায়ুর গৌরব জ্বলে।
ঘোড়াদের দাও খড়, দানাপানি।
২
যারা এখন লিখছে, জল আর বাতাসে নাড়া দিয়ে,
তারা অনেক কিছু বোঝে—বাতাসের কথাবার্তা।
সে বলে—মাছের বাজারে যাও, দরদাম করো,
দর্জির দোকানে গিয়ে সেলাইকলের নতুন জামার সুখ দেখ,
চুড়িওয়ালাদের কাছে শিখে নাও লালের ভাষা, নীলের ক্রোধ।
শহরের উঁচু ঘড়ি সবই দেখে ফেলে—দ্রোহ ব্যর্থ হয়ে যায়।
৩
তবু সম্প্রীতির বায়ু আছে—
পাড়ায় পাড়ায় ঝগড়া থেমে যায় বাতাস বইতে শুরু করলে।
এক পাড়ার ঘুড়ি আরেক পাড়ার গাছে গিয়ে আটকায়,
বালকেরা বড়দের মতো হতে চায়, কিন্তু বালকই থাকে—
লাল, নীল ঘুড়ির টানে সব ভুলে অন্য পাড়ায় ছুটে যায়।
প্রথমে মেয়েরা হাসে, তারপর বড়রা হাঁফ ছাড়ে—
আমাদের কলহ-বিবাদ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে বাতাসে।
৪
সার্কাসের দিক থেকে বায়ু বয়ে এলে
গাছের গায়ে নখের আঁচড়ের দাগ টের পাই।
হাতির খেলার গল্প শহরে ভেসে ওঠে,
আর কৌতূহল তীব্র হয়ে ওঠে—কে যেন অল্প বয়সেই গৃহপলাতক হয়েছিল।
বাতাসে আহ্বান—হারিয়ে যাওয়ার, গৃহপালানোর।
৫
গ্রীষ্ম আসে। রং-তুলি নিয়ে যাবো দূরের পাহাড়ে,
সাথে থাকবে কিছু বাক্স, একটি অভিধান,
জামা, জুতা,
হয়তো গানের খাতা।
চূড়ার বাতাসে খুলে দেব সব—
মৌমাছিরা উড়তে থাকবে।
শিবলী সাদিক

জন্ম কিশোরগঞ্জে; শিক্ষা বুয়েট ও ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে। বর্তমানে কানাডায় বসবাসরত। মানুষের হারিয়ে-ফেলা অ্যানিমিস্টিক চেতনা ও নব্য-রোমান্টিক পরিবেশ-পরাবাস্তবতা তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেখানে জল ভাবে, পাতা লেখে, বাক্য হাঁটে, রোদ গোয়েন্দাগিরি করে, মাছ স্মৃতি বহন করে, দেয়াল গোপন কথা শোনে—সমগ্র জগৎই প্রাণসম্পন্ন ও কথক। লোককল্পনা, শিশুমনের বিস্ময়, প্রকৃতির গূঢ় প্রাণশক্তি ও আধুনিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যভাষা। বর্ণনার চেয়ে প্রতীকের পুনরাবৃত্তি ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তিনি নির্মাণ করেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাব্যবিশ্ব।
