আহ্‌মেদ লিপু: পার্থ-প্রথম পার্থ দ্বৈরথ কিংবা তপন বড়ুয়া

কৌন্তেয় কর্ণ সূর্য-বংশীয়। জন্মসূত্রে অর্জিত  সূর্যের অমিত তেজ  ও বিভায় পরাক্রমশালী এই বীরকে তাঁর মা একদা লোকলজ্জার ভয়ে জন্মের পরই বিসর্জন দেন। নিয়তির অমোঘতা ও কৃষ্ণের কূটচালে তিনি কুরুক্ষেত্রে পার্থের সঙ্গে দ্বৈরথে পরাজিত হন। বলা বাহুল্য, পরাজিত হবার কথা তাঁর নয়। বরং তাঁর বীরত্বে ত্রস্ত কুন্তী তাঁর স্বীকৃত পাঁচ সন্তানের প্রাণ রক্ষায় মাতৃত্বের দাবি নিয়ে তাঁর (কর্ণের) কাছে গোপনে ছুটে গিয়েছেন; আকুতি জানিয়েছেন যেন তিনি ভ্রাতৃঘাতী না হন। সাহিত্যাচার্য বুদ্ধদেব বসু তাঁর প্রথম পার্থ কাব্যনাট্যে এই ঘটনারই বয়ান উপস্থাপন করেছেন। বিনির্মিতভাবে তিনি কর্ণকে এতে অভিহিত করেছেন  প্রথম পার্থরূপে।

‘তপন’ সূর্যের সমার্থক শব্দ। এই শাব্দিক ব্যঞ্জনাকে নিছক কাকতাল হিসেবে অবলোকন করা তখনই সম্ভব যদি জীবন-জগতের নানা বিবর্তনকে  নিছক যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়—অন্তত যখন আলোচ্য একজন তপন বড়ুয়া। তাঁর সম্পাদিত ছোট কাগজের নাম গাণ্ডীব, অর্থাৎ অর্জুনের ধনুক। গাণ্ডীব যাঁর যুদ্ধাস্ত্র (প্রাতিষ্ঠানিক স্রোতের প্রতিকূলে বিকল্পের চর্চা যুদ্ধই বটে!) তিনি পার্থোপম। সার্বিক বিবেচনায় তিনি যতটা না পার্থ তারও অধিক প্রথম-পার্থ (আমাদের এমন মনে হবার পেছনের যুক্তিতে পরে আসছি)। আর তাঁর (বড়ুয়ার) জীবন ও কর্ম যেন পার্থ ও প্রথম পার্থের দ্বৈরথ।

তিনি গাণ্ডীব  প্রকাশ শুরু করেছিলেন আশির দশকে। তৎকালীন প্রভাবশালী দৈনিকগুলোর (ইত্তেফাক সংবাদ প্রভৃতি) সাহিত্য-পাতা তারুণ্যের দ্রোহ ও নিরীক্ষাকে স্থান দিতে যখন ছিল অক্ষম। তখন সময়টা ছিল প্রচল দৃষ্টিভঙ্গি ও শৈলীর অধিকারী বয়োজ্যোষ্ঠ সাহিত্যিকের কিংবা বিদ্যায়াতনিক মোড়লের/ মোড়লদের—যাঁরা অতিব্যতিক্রমবাদে সাহিত্যকে নিয়েছিলেন পেশা বা শখ হিসেবে, প্যাশন  হিসেবে নয়। অথচ সাহিত্যচর্চার নবোন্মাদনা তখন তরুণের রক্তে মজ্জায় কলমে। এদিকে রাষ্ট্রীয় জীবনে জেঁকে বসেছে স্বৈরাচার। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্পৃহাও তারুণ্যেরই। অথচ তারাই প্ল্যাটফর্মহীন। এইসব অশুভত্বের দিকে গাণ্ডীবের তীর নিক্ষপ্ত  হয়েছিল—দ্রোহ ও আক্রোশ নিয়ে।  তিনি সাহিত্যচর্চা করতে এসেছিলেন সম্ভবত হোটেল ইন্টার কন্টিন্টালের চাকরি ছেড়ে। সাহিত্যচর্চা তাঁর কাছে শখ বা পেশা নয়, ছিল প্যাশন—তারুণ্যের ধ্বজাধারী এক অজেয় ধনুর্ধর হিসেবে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন লক্ষ্যভেদী  গাণ্ডীব।

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে আশির দশকে লিটলম্যাগ চর্চার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার প্রত্যায় যুক্ত হয়। সম্ভবত এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অর্থ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অনাচারের শক্ত প্রতিবাদ—প্রতিষ্ঠানহীনতার বা প্রতিষ্ঠান-উচ্ছেদের নয়। অবশ্য ঐতিহ্যগতভাবেই লিটলম্যাগ ধারনাটির সঙ্গে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ অন্তর্নিহিতভাবে জারি থেকেছে। স্বল্পসংখ্যক ছোটকাগজ মার্ক্সীয় ধ্যান ধারণা চর্চার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। মোদ্দাকথা শিল্প-সাহিত্য চর্চার এই বিকল্প প্ল্যাটফর্মটি মূলধারার একচেটিয়া বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ক্লেদাক্ততা, সুবিধাবাদিতা, আপোষকামিতা ইত্যাদির বিরোধিতা জারি রাখতে চেয়েছে—সচেষ্ট হয়েছে চর্চায় সিরিয়াসনেস ও কমিটমেন্ট  নিশ্চিত করতে।

ছোটকাগজের একটি প্রধান মোটো কেন্দ্রবিরোধিতা। ক্ষমতার কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্কে তাঁর অবস্থান প্রান্ত অনুগামী। যদিও এই বঙ্গদেশে লিটিলম্যাগ চর্চা যেন অনেকটাই কেন্দ্রাভিমুখী। ঢাকাকেন্দ্রিক ছোট কাগজের কর্ণধারগণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কিংবা মফস্বল থেকে আগত ছোটকাগজ কর্মিদের সমস্যা/বাস্তবতা অনুধাবনে অনেকটাই অক্ষম। যারা ঢাকায় স্থায়ী তাদের পেশা যা-ই হোক, যাপনের  স্বাচ্ছন্দ্য-অস্বাচ্ছন্দ্য যাই থাকুক, রাত্রি যাপনের কিংবা মোটা চালেডালে ক্ষুণ্ণিবৃত্তির নিশ্চয়তা অন্তত থাকে।

মায়ার শহরে নবাগত ছোটকাগজ কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই বাস্তবতার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে একসময় যে প্রতিষ্ঠান পূর্বে ছিল তাঁদের সার্বক্ষণিক আক্রমণের লক্ষ্য, সেখানেই যোগ দিতে বাধ্য হয় বা  হয়েছে। নতুন কর্মক্ষেত্রে তারা সমবয়সী/সতীর্থের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। কারণ জীবনের একটি  উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের অন্যত্র ব্যয় হয়েছে। যদি তারা বিকল্প প্ল্যাটফর্মেই থেকে যেতে পারতো, (অধিকাংশেরই সেই চেষ্টাটা থাকে) তাহলে তাদের অপনেন্ট হয়ত কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতো। কিন্তু, এই না-পারার প্রধান কারণ, তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতা—দারিদ্র্য। তাছাড়া, লিটলম্যাগ প্লাটফর্মটির  উল্লেখযোগ্য কুশীলবই কবি। যদিও এই প্ল্যাটফর্মটির বড় বিজ্ঞাপন একজন গল্পকার। প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র ইত্যাদির অবস্থা এখানে করুণ।  কবিমন মরুভূমিতে উচ্ছল ঝর্ণাধারা দেখতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক; যেন এর শীতল জলে গা জুড়িয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, পানির অভাবহেতুই মরুভূমির উদ্ভব। তাই বলা যায়, গভীর চিন্তাশীল বা দার্শনিক মনোভাবাপন্ন লোকজন অল্প পরিমাণও যদি যথাস্থানে থাকতো, তাহলে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছোটকাগজকর্মীর এই প্ল্যাটফর্মে থেকে যাওয়ার অর্থনৈতিক, সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলেও হতে পারতো।

 

তপন বড়ুয়ার সঙ্গে আলাপ  আমার ঢাকা-বাসের প্রারম্ভে, ২০০১-০২ সনে। সূত্রধর কে ছিলেন, মনে নেই। কিন্তু এ্টা মনে আছে অন্তরে রেস্তোরাঁ, আজিজের পাশে টুকুর চায়ের দোকান, এলিফ্যান্ট রোড়ের কফি হাউজ (যা এখন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে রূপান্তরিত হয়েছে), বিউটি বোর্ডিং, শাহবাগ গণগ্রন্থাগারের সম্মুখে এক একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ ও এর নিচের সন্ধ্যাকালীন চাল ভাজা বিক্রেতাকে আবিষ্কার   করেছিলাম তাঁর সহযোগে। তিনি বলতেন—চা, রুটি আর কলা এই তিনে চারুকলা। আজিজের বিজ্ঞান চেতনা পরিষদের বিভিন্ন আলোচনা চক্রতেও তাঁকে প্রায়শই দেখতাম। সেখানেই তাঁকে ফুকুয়ামার এন্ড অফ হিস্ট্রি এন্ড দ্য লাস্ট ম্যান নিয়ে আলাপ করতে শুনেছি। একদিন শাহবাগ মোড়ে পূবালী ব্যাংকের সামনে চায়ের আড্ডায় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, গাণ্ডীবকে তিনি আদর্শ লিটলম্যাগ মনে করেন কি-না? —উত্তরে বলেছিলেন, ‘গাণ্ডীব গোষ্ঠীর কাগজ’। তখন এর মর্মার্থ না বুঝলেও এখন হয়ত বুঝি।

তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে ছিল আমাদের সান্ধ্য আড্ডা ও পাঠচক্র। কেন্দ্রের বিভিন্ন পাঠচক্রের  তুলনামূলক মেধাবী ও পরিণতরা সেখানে মিলিত হত। মনে পড়ে, তাঁর জাপানি শিশু, সহযাত্রী এবং জলভারা কণ্ঠ এবং শান্তনু চৌধুরীর উৎস থেকে বহ্নি থেকে কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনার এন্তেজাম করেছিলাম। সেখানে উভয়েই আমন্ত্রিত ছিলেন। বিভিন্ন অধ্যয়ক যখন পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন, তখন তাঁদের অনেকের বক্তব্যেই একধরনের অস্বচ্ছন্দ্য ফুটে উঠেছিল। বুঝতে পারছিলাম, কেন্দ্রের সাহিত্য-সার্কেল পরিভ্রমণ শেষেও যেহেতু উপর্যুক্ত গ্রন্থদুটি মূল্যায়নে অনেকেই স্বচ্ছন্দ হতে পারছে না, অতএব সেখানে কিছুটা হলেও মৌলিকত্ব বিদ্যমান।

অনুমান করি বড়ুয়ার ঐকান্তিক চাওয়া ছিল গাণ্ডীব কাগজের (গোষ্ঠীর) মাধ্যমে বাংলা কবিতার ভূগোলে একটি স্থায়ী বাঁক পরিবর্তন করা। বেশ মেধাবী কয়েকজন সঙ্গীও পেয়েছিলেন— সাজ্জাদ শরিফ, শোয়েব শাদাব, বিষ্ণু বিশ্বাস, শান্তনু চৌধুরী প্রমুখ। সাজ্জাদ শরিফ দারিদ্র্যের ভয়ে এবং সম্ভবত কিছুটা মতভিন্নতায়  সরে যান। ভোরের মন্দিরের কবি বিষ্ণু বিশ্বাস সম্ভবত দেশের সাম্প্রদায়িকতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে সবার অগোচরে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান। পরে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। সবেধন নীলমণি শান্তনু চৌধুরী  এখনও তাঁর সঙ্গে আছেন। কিন্তু এক চড়ুইয়ের ডাকে তো বসন্ত আসে না! আর আহমেদ নকীব সম্ভবত ‘সমগ্রতাবাদী ইশতেহার’ মেনে কবিতা লেখেন না। তাছাড়া, তরুণ কোনো কবি এই ইশতেহার মেনে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কবিতা চর্চা করেছে এমন দৃষ্টান্ত সম্ভবত নেই।

তপন বড়ুয়া  গল্পকার হলেও গাণ্ডীব  সম্পাদক হিসেবেই সমাধিক পরিচিত। তিনি নিজেও সম্ভবত সম্পাদক হিসেবেই লিটলম্যাগ মুভমেন্টে যুক্ত থাকতে চেয়েছেন, কন্ট্রিবিউট করতে চেয়েছেন, নেতৃত্ব দিতে চেয়েছেন। কিন্তু হায় (!) মুভভমেন্টটি  মরুপথে দিশা হারিয়েছে! তাঁরই ভাষ্য, গাণ্ডীবের ‘প্রথমদিকে সব সংখ্যায় অলমোস্ট পাঁচশোর মতন করে বিক্রি হতো। প্রথম সংখ্যা বইমেলাতেই বিক্রি হয়েছিল সাতশ।‘ ‘কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে কেউ আর আগের মতো কেনে না।‘ এক সংখ্যা বিক্রির টাকা দিয়ে নতুন সংখ্যা করা যায় না।

 

রাষ্ট্রের প্রায় সব পর্যায়ের লোকজনই আপসকামী হয়ে পড়েছে। মোটাদাগে দ্রোহ যেন কোথায় কর্পুরের  মতো উবে গেছে। দার্শনিক ভাব ধার করে বললে বলতে হয়, ‘হেগেলের দাস’ হয়ে গেছে। মানুষ স্বভাবতই নির্যাতিত-নিপীড়িত হতে অপছন্দ করে। এর অপোনদন চায়। কিন্তু শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে অপারগ হলে সে নিজেই শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সচেষ্ট হয়। শোষণ অপনোদনে বিপ্লবের পূর্বের  মানুষ ‘হেগেলের দাস’, পরবর্তী স্বাধীন মানুষ ‘ফানোর মানব’। বিপ্লব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে জন্মানো মানুষ ‘ফুকো মানব’ । তারা ভাষা কর্তৃক সৃষ্ট সম্মোহনে সামাজিক ও রাষ্ট্রিকভাবে লাভবান হতে সচেষ্ট; বিনিময়ে সমাজ-রাষ্ট্রে বিদ্যমান অন্যায্যতাকে কৌশলে বৈধতা দেয়। বর্তমান সময় এমন  এক সময়। এ-সময়ের সাধারণ মানুষ, লেখক, শিল্পী-সাহিত্যিক প্রমুখ প্রায় কেউ-ই এর বাইরে নয়। ব্যতিক্রম যে  নেই এমন নয়। তবে তারা খুবই কো্ণঠাসা।

মার্ক্সের সারা জীবনের সাধনাই ছিল দার্শনিকভাবে এটা প্রমাণ করা, কীভাবে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে ‘অংশ’ ‘সমগ্রে’র চেয়ে বড় হতে পারে! তা না হলে বিপ্লব সম্ভব নয়। তিনি এটিও প্রমাণে সক্ষম হয়েছিলেন, কীভাবে  গুণ (quality) পরিমাণের (quantity) ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে।

এই বিশ্বায়নের যুগে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে নিরীক্ষাধর্মী লেখা-পুস্তকের প্রকাশ তেমন কঠিন ব্যাপার নয়। তাছাড়া, বিস্তর দৈনিকের সাহিত্যপাতা আছে। মুস্কিল হল, এইসব পাতার দায়িত্বরতদেরকে সাম্পাদকের মান্যতা দিয়ে লেখা। অতিব্যতিক্রমবাদে এরা সংগ্রাহকমাত্র। অনেকে ফেসবুকে লেখেন। এই প্ল্যাটফর্মটি কবিতার জন্য বেশ উপযোগী, বিশেষত ছোট কবিতার জন্য। এছাড়া আছে ওয়েবপোর্টাল। এখানে সম্পাদকীয় অভিনিবেশ নিশ্চিত করে প্রবন্ধ উপন্যাস চিত্রকলা ইত্যাদির চর্চা সম্ভব। তাই বলা চলে, প্রকাশজনিত মোড়লত্বের অবকাশ এই সময়ে নেই। তবে এটা ঠিক ভার্চুয়াল এই স্পেসও দ্রুত পঙ্কিল হয়ে উঠছে। তবে অবস্থা এতটা নাজুক হয়ে ওঠেনি যে, দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করলে এখানে কাঙ্ক্ষিত কাজটি করা যাবে না।

সম্পাদক হিসেবে বড়ুয়া গাণ্ডীবে কবিতার পাশাপাশি সাহিত্যের অন্যান্য অনুষঙ্গ যেমন: গল্প, উপন্যাস,  প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রকলা ইত্যাদির প্রতি মনোযোগ দেননি এমনও নয়। হালামলের ভাষা-দর্শন পর্যন্ত এখানে পত্রস্থ হয়েছে। ভিটগেস্টাইনের ট্রাক্টেটাস লজিকো ফিলোসফিকাস, নির্দিষ্ট করে বললে, শব্দের অর্থ ও তার ব্যবহারের ওপর প্রতিচ্ছবি তত্ত্ব (picture theory) নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ পত্রস্থ হয়েছে। যদিও যথাযথ একাডেমিক  রিভিউ হলে এদের একটিও পত্রস্থ হতো কি-না সন্দেহ।

 

মহাভারতে রূপকের মাধ্যমে জীবন ও জগতের অনেক সত্যই বিবৃত হয়েছে। পঞ্চপাণ্ডব ও গান্ধারীর শতপুত্রের মধ্যে যে যুদ্ধ, তা ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে দ্বন্দ্ব বৈ কিছু নয়। আইরনি হচ্ছে, ন্যায়ের পক্ষে যারা যুদ্ধ করে তারা কিছুটা কূটচাল ও ভ্রষ্টাচারের মাধ্যমেই অন্যায়কে পরাজিত করে। কুন্তীপুত্র কর্ণ স্বাভাবিকভাবেই পঞ্চপাণ্ডবের পক্ষে থাকার কথা, কিন্তু নিয়তির পরিহাসে কোনো অন্যায় না করেও তিনি অন্যায়কারীদের পক্ষাবলম্বন করেন। শ্রেয়তর ও  বীর হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণের কূটচালে অর্জুনের সঙ্গে দ্বৈরথে পরাজিত হন। শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় মূলধারা ও বিকল্পধারার দ্বন্দ্ব যেন অনেকটা কৌরব-পাণ্ডবের সংঘাতের মতোই। এখানে বড়ুয়ার অবস্থান যেন অনেকটাই পূর্বোল্লোখিত পার্থ-প্রথম পার্থের মতো। না-কি তাঁর অবস্থান অনেকটা হস্তিনাপুরের রাজসভায় পণ্ডিত যুধিষ্ঠিরাদির পিতৃব্য বিদুরের ন্যায়। রাজ আহ্ববান উপেক্ষা করে যার গৃহে কৃষ্ণ অন্ন গ্রহণ করেছিলেন।

ঘটনা যাই ঘটুক, মিস্টার বড়ুয়ার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। বিশেষত তিনি যখন কর্মক্ষম আছেন এমনাবস্থায়।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top