গৌতম চৌধুরীর কবিতা

শুধুই প্রস্তুতি আর অদৃশ্যমানতা 

বহু মন্থর প্রতীক্ষায় এই তন্ময় ত্বক, এই মর বল্কল
আরো অনেক প্রতীক্ষায় এই উদাসীন পরিচ্যুতি
প্রতীক্ষা, না কি সময়ের গম্বুজে থিতুপাথর
যে-আঁখিযুগল নিমীলিত মনে হয়, বুঝি বা ভিতর-পানে ফিরানো লেন্স
ঝকঝকে সোপান, অথর্ব কলকবজা, জমাট-বাঁধা জ্যোৎস্না
কালির গন্ধমাখা ঝাপসা ছাপাখানার প্রসবঘরে ছড়ানো
জাল নোট বা নিষিদ্ধ ইস্তাহার বা পাগলপন হরফবিপর্যয়
ফিসফিস আঁকা স্বপ্নে নামহীন কত নক্ষত্রমণ্ডল
কত আধানিবৃত্ত আকাঙ্ক্ষার বুদ্বুদে-রচা ফৌজ
ওই মিলিত পায়ের শব্দ – সে কি সংগীত, না ক্লান্ত আত্মাদের গুঞ্জন
আকাশ আড়াল-করা প্রান্তর ব্যাপী মৌমাছি
পৃথিবীর সকল মধুবহনের উৎসাহ আনন্দ গর্ব আজ তবে কি স্তিমিত
কিন্তু তবু তো প্রান্তর, বৃক্ষহীন, অবকাশহীন এক নির্মম ইশারা ১

প্রতিবেদন মাত্রেই সারিবদ্ধ অসম যুদ্ধের উৎকীর্ণ লিপি
ভাবনা কেবলই পরাস্ত, প্রকাশের নাজুকতায়
এ তো কেবল হাহাধ্বনি নয়, নয় শুধু টঙ্কার, বা শিমুলের উড়ন্ত হাসি
মুদ্রার অপর নাম শব্দ, প্রতিটি আসন সংরক্ষিত নগদ মূল্যে
শব্দের পিছনে লেপটানো একশো দুশো হাজার বছর
শত শত মাতৃগর্ভের স্মৃতি, অনপনেয় অথচ ব্যাখ্যাতীত
ভাবনাই বা কই স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, কেলাসিত
দূরবিস্তারী জালে আলতো টান পড়ে জালুয়ার
কুয়াসার মীড়ে ধীরে ধীরে স্ফুটমান সংক্ষিপ্ত জলাঞ্চল
হয়তো বাষ্পই পরিণতি, হয়তো উজাড়
হয়তো করতলে শান্ত একপাত্র অন্ন ২

মান্ধাতার আমলের স্থবির পাথরখণ্ডটি কী বিশাল ও জম্পেশ
তবু শৈল জলরাশির ক্লান্তিহীন পতনোন্মুখতা, উন্মত্ত গর্জন
ও দুর্দান্ত অভিঘাতের সমীপে সে কতই অকিঞ্চিৎকর
এক প্রান্তে আসন্ন শীতের হিমানিদেশ, অন্য প্রান্তে উষ্ণমণ্ডলের ওম
মাঝের দিগন্তহীনতায় মাতৃপাখিটির পাখসাট কি তেমনই সামান্য নয়?
পিঁপড়ের চলনপথে শায়িত এক ঢাউস পতঙ্গশরীর যেন দানবীয়
তবু নানা সংকেতে ও শ্রমে নানা ভাঙাচোরা ছন্দে
সে-দানবকে বহন করে এক নিরায়ত যূথ। সকলই অসম যুদ্ধ
অসম যুদ্ধেই চিকন তারে তারে জাগে সংগীত, যেন আকাশপ্লাবী এক বস্ত্রের রং
অসম যুদ্ধেই রুদ্ধ পাথরে, গলানো ধাতুতে, জাগে মূর্তি, যেন স্তব্ধ অবিস্মৃত সময় ৩

আবর্জনা সহজাত। আবর্জনা সহজজাত। স্তূপ আকাশচুম্বী। স্তূপ অতলগামী
চেষ্টাহীন স্বপ্নের ঘোরে শায়িত লাশ পা নাচায়, নাচায় আঁখিপাতা
কিন্তু সম্মোহন প্রবল, আচ্ছন্নতা তীব্র। যেন নিরবকাশ নেশায় কাঁপে আঙুল
কেবলই তালাশ করে আরকের। স্নায়ুগুলি ঝিমিঝিম। মজ্জা শীতল
নিদ্রা ও জাগরণের মধ্যে কার্নিশ ফারাক। সেখানে হাই তোলে অলস বিড়াল
অস্তগামী সূর্যের আলো মায়াচাদর বিছায়। আত্মধ্বংসও বর্ণিল লাগে
তবু আচম্বিতে পা নড়ে, নড়ে আঁখিপাতা। কোনও সুদূর অতীত বা দূরতর আগামী লন্ঠন
দোলে, বিলীন হয়। আবার দোলে, বিলীন হয় আবার। একটি তরঙ্গ যেন। যেন প্রাণ ৪

মন রয় বোঝাবুঝির পারে। সেই অবুঝদারিটুকুই ভরসা, খড়ের আশ্রয়
সেখানে কি শুধুই নানা দিনের নানা নদীর নানা বরন ঢেউ?
শুধুই কি মহাদেশের পর আরও মহাদেশ? না, আরও বহু মহাশূন্যদেশ?
নিরানব্বই ভাগ জলের অথই, আর মাঝে এক ভাগ সামান্য লগবগে ডাঙা
বা, আরও ক্ষুদ্র সামান্য সেই জানকারি
সামান্য, তাই উথাল সাঁতারের জন্ম – রহস্যঘোর জলরাশির পানে অভিযান
যেন কোনও অস্পষ্ট দ্বীপ আবিষ্কারের সম্ভাবনা আজই
যেন বালকের উন্মুখ আঁকশি ধায় সে-দ্বীপের আকাশের টঙে
আসমানে আসমানে শত ঘুড়ি শত রং শত ফুল বিকশিত হয়
আজ একটি মাত্র ঘুড়ি সংগ্রহের দিন, অনন্ত জলের মাঝে একটি মাত্র দ্বীপ
একটি অজ্ঞাত রাশি অজ্ঞাত মনের দিগন্তপ্লাবনে ৫

দর্শক অবসন্ন, জীবনের আমুণ্ডু অসহায়তায় গ্লানিতে ছিন্নভিন্ন
অনেক কাঠখড় দাহের পর হয়তো কায়ক্লেশে একফালি বেওয়ারিশ সময় বরাদ্দ
সে অল্পে খুশি হয় কেমনে? ঘটনাপ্রবাহের কোনও অমীমাংসায় ক্ষুণ্ণিবৃত্তি ঘটে না
সকল দ্বন্দ্বের একটি সুস্পষ্ট নিষ্পত্তি জরুরি। অন্যথায় ঘর-ওয়াপসি অসম্ভব
সমস্ত রাত্রিব্যাপী এই প্রতীক্ষা। মাথার উপরে নামুক তারাদের ঝড়, বহুক উন্মত্ত বাতাস
কিন্তু আদিম সমীকক্ষেত্রের মতো মুহুর্মুহু কোনও আর্তরব তো ধ্বনিত হয় না আর
বস্তুত এক রাত্রির দৃশ্যকাব্যে আর নিষ্পত্তিযোগ্যই নয় কোনও সংঘাত
সকল সংঘর্ষই শেষতক মুলতুবি থাকে তাই, কারণ সেগুলি চলমান
দিনের পাত্র হ’তে ছিটকায় মধু ও মৈরেয়, রাতের পাত্রে শুধু ফিসফিস স্বর
কোনও বিরতি নাই। শুধুই প্রস্তুতি। আর অদৃশ্যমানতা ৬েবি

গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরী (জন্ম: ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত) সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম বিশিষ্ট কবি, গদ্যকার, নাট্যকার ও সম্পাদক। লেখালেখিকেই তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০টি, যার মধ্যে রয়েছে ২৫টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি গদ্যগ্রন্থ এবং ১টি অনুবাদগ্রন্থ
তিনি ফল্গু বসুর কবিতা সমগ্র ও চঞ্চল আশরাফের কবিতা সংগ্রহ সম্পাদনা করেছেন এবং সাহিত্যপত্র সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ Words Crave Freedom from This Suffocating Beauty’ সম্প্রতি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলা কবিতায় পরীক্ষাপ্রবণ ভাষা, দার্শনিক অনুষঙ্গ ও স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্বের জন্য তিনি সমকালীন সাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে স্বীকৃত।

[email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top