কামরুন নাহারের কবিতা

অস্তিত্বের গহনে

কলমে কালিতে, কাগজে তুলিতে আঁকি গদ্যের মায়া;
ভুলে ভরা এই যাপিত জীবন কদাচিৎ পড়ে ছায়া;
গত জীবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এ পথ জানে,
অস্তিত্বের গহনে গেলে কতটা প্রহার লাগে!

রক্তাক্ত ভোরের পথিক কল্প লোকের বাঁকে;
স্বপ্ন ভিড়ে পদ্য লিখে বিনীত জীবন পরে;
নীলকন্ঠ, নীল মনিহার, নীল আকাশের নীচে;
ভীষণ জীবন বয়ে চলে যায় দাঁড় টানা তরী তটে;

তবুও কবি তীব্র স্বরে স্বরলিপি হয়ে আঁকে;
মান, অভিমান, প্রকৃত জীবন, ক্লান্ত ভুবন পরে;
এক পৃথিবী মায়া হয়ে যায় শত মানুষের ভিড়ে;
তবুও জীবন, তবুও প্রকৃতি, তবুও নিত্য যাপন!
কতটা সুনীল, কতটা গভীর, কতটা নীরব জ্ঞাপন;
কেউ জানে না, কবি জীবনের হাজারো নীরব কথন!

বয়ে চলা নদী দাঁড়িয়ে হঠাৎ থমকে চলকে পড়ে;
বাঁক নিয়ে ধায় নব ধারাপাতে সজল প্রভাতে;
কবি জীবনের পথে!

 

ফড়িং জীবন

ফুলের সাথে প্রজাপতির কল্প জগৎ পরে;
একটি ফড়িং বাস করে যায় ঘাস ফড়িং এর ঘরে;
নীল রঙা ঘর, লাল রঙা ঘর, রংধনুকাশ পরে;
মানুষ নামের ফানুস খোলে শুয়োপোকার তরে;

গন্ধে চেনা, সন্ধ্যা জানা, এঁটেল মাটির ঘ্রাণে;
একটি তরী দাগ কেটে যায় পাটাতনের প্রাণে;
দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টি ভেজা, ঝাপসা ঝাপসা চাঁদ!
নদীর বুকে আলো ছায়ায় আঁকে গভীর রাত!

একটি সকাল, একটি জীবন, একটি গহন কাল;
এমন করেই পার হয়ে যায় হাজার সন্ধ্যা রাত!

 

গ্রহণ

গ্রন্থালয়ের গ্রন্থ ভিড়ে একটি পাপড়ি শুকিয়ে যায় অজাচিতে; অগভীর নদী তটে একটি মাছের মৃত্যু হয় বালু তটে; সদ্য ফোটা কচুরি ফুলে গ্রহণ লাগে, শ্যাওলা জমে নীলচে আভা কালচে রঙে প্রহার করে;

তেমনি করে অযত্নে আর অবহেলায় মৃত্যুগুলো আঁতকে ওঠে;
অস্বীকৃতির অন্ধজালে, বন্দী হয়ে নীরব নদী পাটাতনের আকাশ দেখে;
কালো মৃত্যু লাল হয়ে যায় বিদ্রোহ আর বিদ্বেষে;
একটি জীবন কেমন করে এমন ভোরে কবিতা হয়ে ফুটে ওঠে! শহরতলীর বাতাস যেন তাকিয়ে ভাবে!

মৃত্যুগুলো শুকিয়ে যায়, কান্নাগুলো হারিয়ে যায়,
ছিন্নভিন্ন স্বপ্নগুলো কাচের মতো ভেঙে গিয়ে নতুন কোন গন্তব্যের কল্পলোকে হারিয়ে যায়!
এ জীবনে বেঁচে থাকাই ভীষণ দায়!

 

সুখী মানুষ

এখন কোন দুঃখ নেই, হতাশ হবার ভাবনা নেই;
ভালো থাকার চিন্তা নেই, ভুল করার কষ্ট নেই;
ভুলে পড়ার ইচ্ছে নেই, দুঃস্বপ্নের রাত্রি নেই;
দুঃখ দিনের গল্প নেই, সুখ পাখির স্বপ্ন নেই।

এখন আমি ভীষণ সুখী,শান্ত জলের পদ্ম পুকুর।
এখন আমি সোনালী রোদের কাশবনের নীরব দুপুর।
এখন আমি ভীষণ ভালো সুখী মানুষ।
এখন আমি তারার আকাশ; জোছনা আলো।
ভর দুপুরের মেঘ ভেজা নীড়।
এখন আমি স্বচ্ছ জলের কাচ ভাঙ্গা তীর।
এখন আমি রাত নিশীথের জোনাক জ্বলা আলোর মিছিল।

এখন আমার রাতের তারা স্বচ্ছ লাগে;
জীবন ভীষণ আলো লাগে।
মানুষগুলো ভালো লাগে; ভীষণ আদর।

এখন আমি রোজ জীবনের গল্প লিখি।
আর মেঘের ভেলায় উড়িয়ে দিই স্বপ্ন ডানায়।
মেঘগুলো সব চিল হয়ে যায়;
আর দূর পাহাড়ে হারিয়ে যায় ভ্রান্ত নীলায়।

এখন আমি মুক্ত মানব, ভীষণ তেজী, খুব সাহসী।
এখন আমি ঘুরে বেড়াই, উড়ে বেড়াই…
নিজের মতো;
যেন স্বাধীন কোন উদাস পাখি।

 

ফাঁদ

যাচ্ছো বলেই যেতে হবে এমন তো নয়;
ইচ্ছে হলেই থাকতে পারো, বসতে কিছুক্ষণ;
বৃষ্টি ভেজা মেঘের হাটে পা দুলিয়ে নরম ঘাসে,
হাঁটতে পারো মাটির পরে, চরণ ছুঁয়ে ক্ষণ!

আসছি বলেই আসতে হবে এমন ওতো নয়;
যেদিন খুশি আসতে পারো, থাকতে কিছুক্ষণ;
কাজের ভিড়ে ব্যস্ত হলে, কোলাহলে হারিয়ে গেলে;
পথের কোন পথিক হয়ে হতেই পারো অচেনা একজন!

থাকতে চাইলে থাকতে পারো, চলতি পথের পথিক হয়ে; রোদ মাখা এই আকাশ তটে, আলো আঁধারের চাঁদনী পাটে, জনভিড়ে, ব্যস্ততার এই ভীষণ ফাঁদে; কাঁদা জলের বন্ধু হতে লাগে কতক্ষণ!

 

কামরুন নাহার

একজন সৃজনশীল লেখক, কবি ও হাইকু লেখক; বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর ছোটগল্প, কবিতা, ফিচার ও প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকা, সাময়িকী ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২০ সালে ‘টেন স্কয়ার’, ‘Pandemic Poetry 2020’সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকলনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় এবং JALT International Conference-এ সৃজনশীল লেখক হিসেবে অংশ নেন। ২০২২ সালে তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ ‘জোছনা ঝরার কাব্য’ প্রকাশিত হয়; পরবর্তীতে ‘Paradise on Earth’ ও ‘Peace Anthology’সহ বিভিন্ন সংকলনে তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top