(প্রিয় শাখাওয়াত, বিপ্লু, এমদাদ, শফিউলকে)
আহত মাটির ক্রোধ
ভাঙন দেখছি অতিথির মতো
উল্লাস দেখছি অতিথির মতো
দুঃখী দেশ ভেঙে স্তব্ধ হলো আজ
নিচু হয়ে গেলো আয়ত সমাজ।
যে সন্ধ্যা দেখে না সে-একটা রুগ্ন
খোয়ারের শিকে থাকে সংলগ্ন।
না-জানলে বীজ বপনের মন্ত্র
মৃত্তিকা হয় না শস্যবতী নম্র।
এই শালদীঘা, বৃষ্টি, মহালয়া
মাতৃত্বের গ্রামে সবটুকু ছায়া।
ভোরের রহস্য দেখলো না যারা
শূন্যতায় রুগ্ন হাকাকার যারা
অনর্থক বাঁশি বাজিয়ো না তারা
অন্ধত্বের আয়ু বাড়িয়ো না তারা।
কথা
আমি চাই কথা হোক। জেগে ওঠো পথ, শিশুর স্থপতি।
নিস্তব্ধ শ্রাবণে খুলে যাক মুখমণ্ডলের নীলকোষ
নির্মম স্তব্ধতা।
আমি চাই গান হোক
মুমূর্ষু সজল পৃথিবীতে
ভেঙে যাক অন্ধ অপরাধ।
এই হতভাগ্য কিংবদন্তির দেশে সবটুকু খুলে
বুকের পাঁজর রক্তের লহর নামুক সদরে।
পাতার সবুজে আবারো জাগুক স্বপ্নমুখী ছাত্রদল।
একা জ্বলে ওঠা কালিকলমের মুমূর্ষু চণ্ডাল
জেনে গেছে আজ মৃত্যুর চেয়েও হীনমন্য এই
খরার মাটিতে স্থির বেঁচে থাকা।
কথা হলে ব্যথা নীল রঙে নাচে বাঁচার বিপ্লবে
পুত্রের লাবণ্যে
কবিতার মতো কথা হোক পূর্ণ ঝোড়ো নজরুল।
আহত মাটির লাল লাল ক্রোধে খুলে যাক কণ্ঠ
তুলসী পাতার মিহির আলোতে
শস্য বুননের তাজা এক স্বরে কথা হোক সলতে মাধুরি।
তোমাদের হাতে হাত রাখলেও নিঃস্ব মঞ্জিলের
উত্তরাধিকারে কথা হোক আজ আমার দহন।
বয়সে
বয়স বাড়লে লাল ঘোড়ারাও ভাবে
এ-কোথায় পৌঁছুলাম!
আতা ফলের আমুদে শুধু শুধু দৌড়ুলাম।
শীত প্রহরের ঢালু সর্ষে ক্ষেতে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে।
মেলার হরিণ পৃষ্টায় পৃষ্টায় হাসে।
কোথায় খুঁজবে হাত-পা হারানো মুখ।
সর্বত্র অসুখ।
নদী পেরুলেই অন্ধ গায়কের বাড়ি।
বয়স বাড়লে ক্ষত ও দৃশ্যের ছড়াছড়ি।
মাটিও
মাটিও কাঁদছে
তুমি ওর চোখ কীভাবে মুছবে!
তাই, বর্তমান বলে কিছু নেই।
সবকিছু লোকাল নদীর অতীত কিংবা গোধূলি!
ঘড়ির কাঁটায় ধাবমান
ধান-পাট, নীল নক্ষত্রের খোঁজে
অনেকেই ইয়াবা ট্যাবলেটের ঘোরে
আয়নাতে গুম হয়ে গেছে।
প্রতিচ্ছবিতে যে শহরকে দেখ
সেও বর্তমান নয়।
আইসিইউয়ের বিলের টাকা জোগাড় করতে
মালটার বাগানে হাঁটছে।
সেই নাম
আমার রয়েছে আশা ও আশ্বাস।
নদীর দু’কূল ঘুরে এই যে কবিতা লিখি
এসব কে দেখে, পড়ে তাও-তো জানি না।
অন্ধ প্রাচুর্যের একেকটা সমাজ ডিঙিয়ে
ঘন শ্রাবণের রঙে এখানে এসেছি
হিজলে-কদমে নুয়ে আছি ভাটির গায়েন।
স্বার্থসেগুন গিটারে
তোমাদের শয়তানি ঠেলে
আত্মার দরজা খুলে দেখি
আমার একটা নাম আছে।
সেই নাম বেঁচে আছে।
একা
এখানে এসেছি একা।
বহুকাল ঘুরে বৃষ্টির ভেতরে
কতো কিছু দেখলাম আনন্দে, ভোজসভায়।
পর্যাপ্ত জীবন পেয়ে পঞ্চাশেও
চিনতে পারিনি যে সমাজ
আর কি সুযোগ হবে চেনার-জানার
নদী ঘাস ফুলে পুনরায় তাকাবার।
মরার আগেই মরে যায় মন।
অসংখ্য নদীর নামে মুছে যায় মানুষের নাম।
নদীর অস্তিত্বে বেঁচে থাকি। খাই। বাজারেও যাই।
সেগুন পাতার চেয়ে দুখি এই দেশ
আমার হৃদয়।
মেঘ
হাঁক মাঝিদের কন্ঠে-হাওয়ায়
যাপন মাখিয়ে নামছি নামছি
করে ঝুলে আছে গাছের কিনারে।
জাম্বুরার গোলাকারে ধর্মে
যখন সময় হবে
রাষ্ট্র ও রাজার নদীকে ভাসিয়ে
কৃষক পরির গায়েনের
পাগলা দোতারা হয়ে সে নামবে।
সুর শেফালি মাটিতে
কাউকেই কেউ আটকাতে পারবে না।
সরোজ মোস্তফা

গারো পাহাড়ের নদী মগরার তীরে ছোট শহর নেত্রকোণায় জন্ম। কর্ম ও পৈত্রিক পরিচয়ে এই ক্ষীণস্রোতার পাশাপাশি স্বচ্ছ বসবাস। পেশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক।
‘সকাল সন্ধ্যার বীজতলা’, ‘কাগজে সমুদ্র লিখি’, ‘লাল রক্তের ব্রহ্মাংশ’, ‘হলুদ খামের হিমঘর’, ‘সুরমা নদীর দস্তখত’ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। ‘যতীন সরকারের মাস্টারি’, ‘গৌরাঙ্গ আদিত্যের জীবন ও সাধনা’, ‘বিপ্লব চক্রবর্তী: গায়েনের সংগীতযাপন’, ‘কৃষ্ণলীলার প্রথম নারীকবি সুলা গাইন’ তার প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ। হাওরাঞ্চলের ভাবুকতা, ধ্যান জনসংস্কৃতিকে তিনি যাপন করেন ও লেখেন।

স্যার, আপনার দেওয়া কবিতাগুলো খুব মনোযোগ ও আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। সত্যি বলতে, শুধু পড়িনি— কিছু কিছু পঙ্ক্তি আমাকে থেমে গিয়ে ভাবতে এবং নতুন করে অনুভব করতে বাধ্য করেছে। আপনার কবিতায় মাটি, মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, সময়, ব্যক্তিসত্তা, দুঃখ, ক্ষোভ ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা— সবকিছুই এক গভীর জীবনবোধের সঙ্গে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে ‘আহত মাটির ক্রোধ’ কবিতার— “ভোরের রহস্য দেখলো না যারা… অন্ধত্বের আয়ু বাড়িয়ো না তারা”— এই পঙ্ক্তিগুলো যেন অন্ধত্ব ও আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে এক গভীর সতর্কবার্তা মনে হয়েছে।
‘কথা’ কবিতার— “আহত মাটির লাল লাল ক্রোধে খুলে যাক কণ্ঠ…” এবং “কথা হোক আজ আমার দহন”— এই উচ্চারণের মধ্যে প্রতিবাদ, যন্ত্রণা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে।
‘বয়সে’ কবিতার— “বয়স বাড়লে লাল ঘোড়ারাও ভাবে— এ-কোথায় পৌঁছুলাম!”— এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই যেন জীবনের দীর্ঘ পথচলা, ফিরে তাকানো এবং আত্মজিজ্ঞাসার এক গভীর অনুভূতি খুঁজে পেয়েছি।
‘মাটিও’ কবিতার— “মাটিও কাঁদছে তুমি ওর চোখ কীভাবে মুছবে!”— এই পঙ্ক্তিটি যেমন হৃদয় স্পর্শ করেছে, তেমনি “আইসিইউয়ের বিলের টাকা জোগাড় করতে মালটার বাগানে হাঁটছে”— এই বাস্তব চিত্রটি সমাজের বৈষম্য ও মানুষের অসহায়তার নির্মম দিকটি নতুন করে ভাবিয়েছে।
‘সেই নাম’ কবিতার— “আত্মার দরজা খুলে দেখি / আমার একটা নাম আছে / সেই নাম বেঁচে আছে”—এই অংশে আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের যে গভীর অনুভব রয়েছে, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে।
আবার ‘একা’ কবিতার— “পর্যাপ্ত জীবন পেয়ে পঞ্চাশেও / চিনতে পারিনি যে সমাজ / আর কি সুযোগ হবে চেনার-জানার”— এই আত্মজিজ্ঞাসা আমাকে মানুষের জীবন, সময় ও সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
আর ‘মেঘ’ কবিতার— “রাষ্ট্র ও রাজার নদীকে ভাসিয়ে / কৃষক পরির গায়েনের / পাগলা দোতারা হয়ে সে নামবে”— এই চিত্রকল্প ও প্রতীকী প্রকাশ আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।
স্যার, আপনার কবিতার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো— শব্দগুলো অনেক সময় সহজ, কিন্তু তাদের ভেতরের অর্থ ও অনুভূতির পরিসর অনেক গভীর। কিছু পঙ্ক্তি প্রথমবার পড়লে শুধু ভালো লাগে, কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়লে তার ভেতরের আরেকটি অর্থ অনুভব করা যায়। আপনার কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে আমার মধ্যেও সেই দ্বিতীয়বার ভাবার জায়গাটা তৈরি হয়েছে।
আপনার একজন ছাত্র হিসেবে, আপনার লেখা পড়ার সুযোগ পাওয়া, আমার জন্য সত্যিই আনন্দের ও সৌভাগ্যের। কবিতাগুলো পড়ার জন্য লিংকটি দেওয়ার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, স্যার। আপনার লেখা আমাকে শুধু একজন পাঠক হিসেবে আনন্দ দেয়নি; বরং কিছু কিছু জায়গায় থামিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং নিজের চারপাশের মানুষ ও সমাজকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে।
আপনার কলমে মানুষের কথা, মাটির কথা, সময়ের কথা এবং সত্যের কথা আরও গভীরভাবে উচ্চারিত হোক— এই প্রত্যাশা ও শুভকামনা রইল, স্যার।