আমার বাবা কবি অধ্যাপক আজীজুল হক আমার জীবনের একজন আদর্শ বাবা, যাঁর আদর্শে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি— তবে সব ক্ষেত্রে নয়। তিনি অধ্যাপনা পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র এই কারণে, যেন এর পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চায় সময় দিতে পারেন। তিনি একজন ভীষণ গোছালো ও স্বনির্ভর মানুষ ছিলেন। কাউকে এক গ্লাস পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য পর্যন্ত অনুরোধ করতেন না। চায়ের প্রতি তাঁর ছিল অনেক নেশা, কিন্তু চা খেয়ে কাপটা নিজেই ধুয়ে রাখতেন— তা সে নিজের বাড়ি হোক বা অন্য কারো বাড়ি।
তাঁর আদর্শের বাইরে তিনি কাউকে তোয়াক্কা করতেন না, সে যত বড় ক্ষমতাশালীই হোক না কেন। একবার ভীষণ মার খেয়েছিলাম উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে, বাংলা বিষয়ে নোট করে দিতে বলেছিলাম বলে। তিনি বলেছিলেন, “আমার কোনো ছাত্র আজ পর্যন্ত যে সাহস করেনি, তুমি সে সাহস কোথায় পেলে?” ছাত্ররা তাঁর কাছে আসতেন কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও বাংলা সাহিত্য আলোচনার জন্য। এর বাইরে তিনি কাউকে বাড়িতে আসার অনুমতি দিতেন না। আমি আজ আমার বাবার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করব।
তিনি সময় পেলে বাসায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন, পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং সেগুলো নিজেই রেকর্ডিং করতেন। আমার কাছে আজও তাঁর গান আর কবিতার ক্যাসেট আছে। সময় পেলে তিনি ছবিও আঁকতেন। রান্নাতে তাঁর ছিল অনেক আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা, কিন্তু নিজে ছিলেন স্বল্পাহারী। কলকাতাতে চিকিৎসার জন্য যখন যেতেন, নিয়ে আসতেন রান্নার সব উপকরণ আর সরঞ্জাম। যার মধ্যে বাবার আনা মাংসের কিমা করার যন্ত্রটি আজও আমার কাছে আছে। আমি প্রতি ঈদে সেটা দিয়ে শামি কাবাব বানাই, যা আমার বাবা অনেক পছন্দ করতেন। তাঁর দেওয়া প্রেসার কুকার আমার বাসায় আজও হুইসেল দেয়। বাজারে গিয়ে ভালো মাছ, মাংস, সবজি আর মুরগি কীভাবে চিনতে হয়, তিনি আমাকে তার বিভিন্ন কৌশল শিক্ষা দিতেন।
জীবনে সুস্থ অবস্থায় কখনো এক গ্লাস পানির জন্য কাউকে অনুরোধ করতেন না। রাতদিন সবসময় চায়ের ভীষণ নেশা ছিল, কিন্তু নিজের চায়ের কাপ নিজেই ধুয়ে রাখতেন। বাবার কাছেই আমার মাছ ধরার হাতেখড়ি। যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের হোস্টেলের সামনের পুকুরে বাবার সাথে বহুবার গিয়েছি মাছ ধরতে। বংশীয়ভাবে তাঁর আরেকটা নেশা ছিল, তা হলো পাখি শিকার। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন দাদার কাছ থেকে পাওয়া বাবার বন্দুকটা থানাতে জমা দিতে হয়। স্বাধীনতার পর সেটি আর ফেরত পাওয়া যায়নি। আর তাঁরও পাখি শিকারে যাওয়া হয়নি।
আমার বাবা শুধু একজন কবি, সাহিত্যিক বা অধ্যাপকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আদর্শ বাবা ও পারিবারিক শিক্ষাগুরু, যাঁর অধিকাংশ গুণাবলি আমার রক্তের মাঝে বহমান। কবি বা সাহিত্যিক কখনো বংশপরম্পরায় জন্মায় না। তাঁরা দেবতার মতো ফিরে আসেন ভিন্ন রূপে, ভিন্ন সময়ে, প্রয়োজনের তাগিদে।
যুগ যুগান্তরে আমার বাবা বেঁচে থাকুন সবার অন্তরে।
