কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা [ছায়ানাট্য]: আজীজুল হক

(মূল পাণ্ডুলিপিতে চরিত্রলিপি আলাদাভাবে যুক্ত ছিল না পাঠকদের সুবিধার্থে পাণ্ডুলিপিতে উল্লেখিত অভিনয়শিল্পী নাটকীয় চরিত্রগুলোকে এখানে পৃথকভাবে বিন্যস্ত করা হলো)

মূল অভিনয়শিল্পী সূত্রধর:

  • আরজু: সূত্রধর এবং আহত ছাত্র
  • কাজল: সূত্রধর এবং প্রগতিশীল ছাত্র
  • কামাল: সূত্রধর এবং ছাত্রসভার ১ম বক্তা
  • ঘুনু: সূত্রধর, ছাত্রসভার ২য় বক্তা, বিরোধী শ্রোতা এবং আহত ছাত্রের সঙ্গী
  • কিচলু: জনৈক ছাত্র
  •  মুজিবর: দ্বিতীয় ছাত্র ও বিউগল বাদক
  • মুনীর & সিরাজ: প্রগতিশীল ছাত্রনেতা

দৃশ্যভিত্তিক চরিত্রসমূহ:

  • ঐতিহাসিক পর্ব: নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীর জাফর, মোহনলাল ও মোহাম্মদী বেগ
  • মধুর ক্যান্টিন পর্ব: মধু (ক্যান্টিন মালিক), ডেভী, সামসির, পল্টু, জালাল ও পটলা
  • ছাত্রী বিশ্রামাগার পর্ব: নাহার, ফিরোজা, নীলা ও মিস পলি
  • ছাত্রসভা আন্দোলন পর্ব: রাজনৈতিক নেতা, ৩য় বক্তা, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী ও পুলিশ বাহিনী

 

 

[প্রথম অঙ্ক]

 

(স্বপ্ন দৃশ্য: উন্মুক্ত উধাও প্রান্তর। তিনটি গুল্ম ও একটি ঝাপসা বড়ো গাছ। ঊর্ধমুখী মিছিলের এক চতুর্থাংশ। অগ্রনায়কের বড়ো ছায়া ধীরগতি দীর্ঘ মিছিল। অগ্রনায়কদের কণ্ঠে গান:)

গান : শোনো ভাইবোন শোনো শোনো বন্ধুরা…
(সূর্যচক্রপাত।
জ্যোস্নাপাত।
রক্তিম ঊষাকিরণ পাত।
পুষ্প ও পুষ্পশোভিত বৃক্ষ স্থাপন।
গান শেষ। নিম্নাংশ অন্ধকার।
নর্তকীর অবস্থান গ্রহণ।
অন্ধকার দশ সেকেন্ড। জ্যোতিষ্ক মণ্ডলীর ছায়া।
পৃথিবীর ছায়া।)

(সংলাপ: সংলাপ চলা কালে জ্যোতিষ্ক মণ্ডলী, ময়ূর, ঝিলিমিলি ইত্যাদির ছায়াপাত)

আরজু: এই আমাদের পৃথিবী, গ্রহতারা, রবি-শশী পরিবৃত সুন্দর পৃথিবী। এই পৃথিবীর মানুষের চোখেই ছায়া ফেলে ফুল-পাখি গান, সবুজ পাতার নিবীড় ছায়াঢাকা নীড়, প্রেম ও শান্তির স্বপ্ন, হৃদয়ের নিভৃতে জাগে অন্ধকারহীন এক জ্যোতির্ময় জীবনের তৃষ্ণা। ঊর্ধ্বের নীল আকাশ তাকে দেবে আলো আর আলো, বাতাস দেবে গানের তরঙ্গ, মাটি দেবে সবুজ মাঠ আর সোনালী ফসল, নদী-সমুদ্র দেবে জীবনের আবেগ ও প্রশান্তি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কত শিল্পী কবির হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়েছে এই পৃথিবীর বন্দনাগীতি — ‘আমার প্রণতি গ্রহণ করো পৃথিবী’।

কাজল: “তব নীলাকাশ তব আলো
তব জনপূর্ণ লোকালয়, সিন্ধুতীরে
সুদীর্ঘ বালুকাতট, নীল গিরিশিরে
শুভ্র হিমরেখা, তরুশ্রেণীর মাঝারে
নিঃশব্দ অরুণোদয়, শূন্য নদী পারে
অবনতমুখী সন্ধ্যা — বিন্দু অশ্রুজলে
যত প্রতিবিম্ব যেন দর্পণের তলে
পড়েছে আসিয়া।”

আরজু: “শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়ানে:
সমস্ত প্রাণে কেন যে কে জানে
ভরে আসে আঁখি জল —
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা,
বহু দিবসের সুখে দুঃখে আঁকা,
লক্ষ যুগের সঙ্গীতে মাখা—
সুন্দর ধরাতল।”

কাজল: “স্বর্গ তো পৃথিবীর মানুষেরই আকাঙ্কার প্রতিচ্ছায়া। মানুষের স্বপ্নই সেই পারিজাত ফুল, যা শুকায় না, ঝরে না। মানুষের প্রেমই তা অমৃত — মানুষই তো অমৃতের সন্তান। আর মানুষের এই স্বপ্নসমুদ্র মন্থনেই একদিন উঠে এসেছিল নৃত্যচঞ্চল বিলোল-হিল্লোল উর্বশী:
(নর্তকীর উত্থান ও স্থির নৃত্য)

আরজু: “সুর সভাতলে সবে নৃত্য করো পুলকে উল্লসি
হে বিলোল হিল্লোল উর্বশী,
ছন্দে ছন্দে নাচি উঠে সিন্ধু মাঝে তরঙ্গের দল,
শস্য শীর্ষে শিহরিয়া কাঁপি উঠে ধরার অঞ্চল,
তব স্তনহার হতে নভস্তলে খসি পড়ে তারা
অকস্মাৎ পুরুষের বক্ষমাঝে চিত্ত আত্মহারা
নাচে রক্তধারা,
দিগন্তে মেখলা তব টুটে আচম্বিতে
অয়ি অসম্বৃতে”

(বৃত্তপাত।
গান ও নৃত্য:
মম চিত্তে।
জ্যোস্নাপাত।
ময়ূর ছায়া।
জ্যোতিষ্ক মণ্ডলী।
উন্মুক্ত পর্দা।………. নৃত্য শেষ হবার আগে থেকেই ক্রমান্বয়ে দৃশ্যাবলী অপসারণ। কঙ্কাল দৃশ্য স্থাপন।
নগ্ন নাতজানু বন্দীদের অদৃশ্য অবস্থান গ্রহণ।
নৃত্য শেষ।)

কঙ্কাল, শৃঙ্খল দৃশ্য:
(পত্রহীন দুটি ছোট গাছ [বাম পাশে]
পত্রহীন একটি বড়ো গাছ— পর্দা জুড়ে — ক্রমে ডান পাশে গিয়ে স্থির। শকুন।
ঈগলের ছায়া।
কঙ্কালের ছায়া:)

সংলাপ: হো: হো:, হা: হা: হা: হা: ….. (ইত্যাদি ভৌতিক অট্টহাসি। বিকট মিউজিক। কঙ্কালকে বড়ো গাছের কাছে স্থাপন।
স্তব্ধতা।
সেতারে করুণ সুর।)

সংলাপ: হায় পৃথিবী, কঙ্কালের অট্টহাসিতে কোথায় মিলিয়ে যায়…
তোমার সুন্দরের স্বপ্ন! ঝরে যায় ফুল, পাতা, কিশলয়। কে দেয় শূন্য করে ফসলের মাঠ, শ্মশানকে ডেকে আনে লোকালয়ে, জনপদে, কুটিরে কুটিরে? পত্রহীন ফুলহীন বৃক্ষের কঙ্কালে বাসা বাঁধে শকুনের ঝাঁক, ছায়া ফেলে তীক্ষ্ণচক্ষু ঈগলের ডানা।
“আমাদের সকল সম্পদ
আমাদের আলো বায়ু জল শস্যকণা
আমাদের শ্রম আর স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম
লুঠ করে নিয়ে যায় সম্রাটের তস্করের দল,
বিনিময়ে দিয়ে যায় হাতে পায়ে লোহার শৃঙ্খল,
দিয়ে যায় মহামারী দুর্ভিক্ষ মড়ক,
ক্ষুধার নরক।
রাশি রাশি জমে ওঠে মানুষের হাড়
তারি পরে গড়ে ওঠে সম্রাটের ঐশ্বর্য পাহাড়
আর সেই ঐশ্বর্যের সিংহাসন তলে
ক্ষুধা ক্লিষ্ট মানুষের অন্ধকার চোখের কোটরে
মৃত্যুশিখা মিটি মিটি জ্বলে।”

গান: জাগো, অনশন বন্দী-ওঠরে যত…। (নগ্নদেহীদের মিছিল)
(গানের প্রথম স্তবক সুস্পষ্ট, বাকি অংশ মাইক থেকে দূরে মুখ নিয়ে গাইতে হবে। সংলাপ শেষ হবার আগেই গান সম্পূর্ণ থেমে যাবে। গান শুরুহতেই বন্দীরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াবে ও ধীরে ধীরে অগ্রসর হবে।)
(মিছিলের ছবি প্রস্তুত)

সংলাপ: (গানের প্রথম স্তবক একবার গাওয়া হলে পর)
আরজু: “জগতের এই সব লাঞ্ছিত ভাগ্যহত মানুষের মিছিল চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, এক মহাদেশ থেকে আর এক মহাদেশে, এক ইতিহাসের অন্ধকার থেকে আর এক ইতিহাসের অন্ধকারে। এদের শৈশব নেই, কৈশোর নেই, যৌবন নেই— এদের অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই। আছে কেবল চিরকালের যন্ত্রণাকাতর নিষ্ঠুর এক বর্তমান। এরা কোনো দেশের নয়, এরা সর্বদেশের — মিশর, ব্যাবিলন, গ্রীস, রোম, ভারতের — এরা ইয়োরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার — আফ্রিকার। এরা কোনো কালের নয়, এরা সর্বকালের। এদেরই কঙ্কালের ওপর গড়ে ওঠে রাজার প্রাসাদ, ফারাওয়ের পিরামিড আর প্রেমবিলাসী সম্রাটের তাজমহল। মানুষের গড়া দুর্ভাগ্যের কারাগারে এরা চিরবন্দী, ধনীর কারখানার গড়া লোহার শৃঙ্খল এদেরকে এক ও অভিন্ন করে রাখে।
(মিছিল ও গান ইতিপূর্বে দূরে চলে গিয়ে শেষ হবে।
শৃঙ্খলিত বন্দীদের উদ্দত ছবি। ক্রুশবিদ্ধ মানুষ ও ঈগল।)

আরজু / সংলাপ: শৃঙ্খল, শৃঙ্খল আর শৃঙ্খল! তবু এই শৃঙ্খলিত অভিশপ্তদের মাঝেই জন্ম নেয় বিদ্রোহী স্পার্টাকাস, জ্বলে ওঠে রোম, গ্রীস, স্মার্ণা ও স্পেন, রক্তে লাল হয়ে ওঠে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি, তারপর আবার একদিন সারি সারি ক্রুশবিদ্ধ গ্ল্যাডিয়েটর্সদের স্কন্ধের মাংস আর চোখের মণি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় তীক্ষ্ণচঞ্চু ঈগলের দল। “মানুষের ইতিহাস তো এই শৃঙ্খল আর শৃঙ্খলমুক্তিরই ইতিহাস।”

বাংলার দৃশ্য:
(বৃত্তপাত।
শৃঙ্খলাবদ্ধ দুটি হাতের বৃহৎ ছায়া।
সিরাজ ও মোহনলালের গোপন অবস্থান গ্রহণ।)

সংলাপ: এই সেই লোহার শৃঙ্খল। বাংলার অর্থে গড়ে এনেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ইংল্যান্ডের কারখানা থেকে। কুখ্যাত ক্লাইভের হাতে তা ঝন ঝন করে বেজে উঠেছিল। সেই শৃঙ্খলের শব্দ ধ্বনিত হয়েছিল বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের কুটিল হাসিতে।

মীর জাফর: হে: হে: হে: …… (নেপথ্যে)
(বৃত্তে সিরাজ-মোহনলালের ছায়া)

মোহনলাল: গোস্তাকী মাফ করুন জাঁহাপনা। নিশ্চিত জয়লাভের মুখে আগামীকাল সূর্যোদয় পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে আমরা বিস্মিত হয়েছি মাত্র। প্রধান সেনাপতির আচরণের প্রতি কটাক্ষ করার কোনো উদ্দেশ্যই আমাদের ছিল না জাঁহাপনা।

সিরাজ: মোহনলাল! ভুলে যেও না, মীর জাফর আলী খান আমার একান্ত বিশ্বস্ত সেনাপতিই নন, তিনি আমার পরম হিতৈষী আত্মীয়ও বটেন। হ্যাঁ, আমি জানি, ক্লাইভের পাঁচহাজার নিকৃষ্ট সৈন্যের সঙ্গে এই অসমযুদ্ধে, পঞ্চাশহাজার সুশিক্ষিত সৈন্যের সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁ-র কাছে আজকের সূর্যাস্ত আর আগামীকালের সূর্যোদয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

মীর জাফর: হে: হে: হে: হে:…… “তোমার দিন ফুরিয়ে এসেছে সিরাজ! বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদের চাবিকাঠি এখন আমার হাতের মুঠোয়। ইয়া আল্লাহ, পাক পরোয়া দেগার। (মোনাজাত)
(জায়নামাজে মোনাজাতরত সিরাজ। [নর্তকীর অবস্থান গ্রহণ]
মোহাম্মদী বেগের সনন্তর্পণে প্রবেশ ও খঞ্জর উত্তোলন।)

সিরাজ: তুমি? তুমি মোহাম্মদী বেগ? তুমিও!! (খঞ্জরাঘাত ও পতন)
(শৃঙ্খলিত স্বদেশের যন্ত্রণাকাতর স্থির নৃত্য।
সিপাহী বিদ্রোহের সৈনিকদের ছবি প্রস্তুত)

আরজু / সংলাপ: “পলাশীর আম্রকুঞ্জে সেদিন যে মর্মরধ্বনি ধ্বনি শোনা গিয়েছিল, তা সবুজ পাতার মর্মর ধ্বনি নয়, তা শৃঙ্খলের শব্দ। হতভাগ্য সিরাজের রক্তে লাল হয়ে বাংলার আকাশে প্রতিদিন সূর্য ওঠে আর সূর্য অস্ত যায়। তার পরের দুশো বছরের ইতিহাস নিরন্দ্র অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সে ইতিহাস প্রত্যক্ষ রক্তপাত অথবা গোপনে নিঃশব্দে রক্ত শোষণের ইতিহাস; শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, শিল্প, বাণিজ্য, জল-মাটি-হাওয়া-আলো — সব রকম মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোটি কোটি মানুষকে বিকলাঙ্গ পঙ্গু ও অসহায় দাসে পরিণত করার কাহিনী। মাঝখানে একবার সারা উপমহাদেশ জুড়ে দুলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুণ — ১৮৫৭ সালের সেই সিপাহী বিদ্রোহ।”
(বিউগল ও ড্রামবাদ্য। ছবির আড়ালে দাঁড়িয়ে বর্ষা-তলোয়ার হাতে সিপাহীদের স্লোগান:)

স্লোগান:
সিপাহী-জনতা কি : জিন্দাবাদ!
সিপাহী-জনতা কি : জিন্দাবাদ!
দিল্লী চলো : দিল্লী চলো (২ বার)
লাল কেল্লা : আজাদ করো (২ বার)
আজাদ করো : হিন্দুস্থান (২ বার)
বাদশাহ বাহাদুর শাহ কি : জিন্দাবাদ!
মঙ্গল পাণ্ডে কি : জিন্দাবাদ!
তাঁতিয়া টোপি কি : জিন্দাবাদ!
ফিরোজ শাহ কি : জিন্দাবাদ!
বখত খান কি : জিন্দাবাদ!
আজাদ করো : হিন্দুস্থান (২ বার)
হিন্দুস্থান : হামারা হ্যায় (২ বার)
সিপাহী-জনতা কি : জিন্দাবাদ! (২ বার)

(ছবি অপসারিত। সারিবদ্ধ বন্দী-সিবাহীদের ধীর পদক্ষেপ। করুণ মিউজিক।
বন্দীরা বসে পড়বে)

সংলাপ: সিপাহী যুদ্ধের অগ্নিশিখা ক্রমে ক্রমে নির্বাপিত হয়ে গেল। শেষ বন্দী-সিপাহীরা চলেছে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে, দ্বীপান্তরে অথবা ফাঁসির মঞ্চের দিকে। পেছনে পড়ে রইলো স্বপ্ন — স্বাধীনতার স্বপ্ন, সামনে সীমাহীন নিরন্ধ্র অন্ধকার।

কামাল:
“নিরন্ধ্র মেঘে অন্ধ আকাশ, অন্ধ তিমির রাতি,
কুহেলি অন্ধ দিগন্তিকার হস্তে নিভেছে বাতি…।
অন্ধকারের বন্ধ দুয়ারে যথায় বন্দী জাগে,
যথায় বধ্যমঞ্চ নিত্য রাঙিছে রক্ত-রাগে,
যথা প্রাণ দেয় বলির নারিরা ….কাষ্ঠের ফাঁদে,—
সেই পথে চলে অন্ধ দেবতা, পথ চলে আর কাঁদে;—।”

আরজু / সংলাপ: কিন্তু জনশক্তির মৃত্যু নেই, সে অমর। ইতিহাসের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসা যে আগুনের শিখা আমাদেরকে স্পর্শ করে, তা সেই কোটি মানুষের, আমাদের পিতা-পিতামহদের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের আগুন,— আমাদের কানে এসে পৌঁছায় শৃঙ্খলাবদ্ধ সেই জনশক্তি, পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের গর্জন। (বন্দীরা শৃঙ্খলিত হাতে উঠে দাঁড়াবে)

ঘুনু: বিংশ শতাব্দীর জাগ্রত জনতা শুনলো সেই দুশো বছরের কারাগারে গুমরে মরা সিংহের গর্জন, শুনলো সেই ‘অন্ধ দেবতার’ আহ্বান, অন্ধকারের প্রাচীর ভেদ করে শয়তানের হাত থেকে সূর্যকে ছিনিয়ে আনার আহ্বান।

গান : কারার ঐ লৌহ কপাট…। (বজ্রমুষ্টি ঊর্ধ্বে উৎক্ষেপ সহকারে পর্দায় মিছিল।)
(গান ও মিছিল চলাকালের স্লোগান। গানের মাঝামাঝি সময়ে স্লোগান শুরু হবে। এবং গান সমাপ্তির আগেই গানের তালেই শৃঙ্খলিত স্বদেশের নৃত্য শুরু হবে।)

স্লোগান:
নারায়ে তকবির: আল্লাহু আকবর (২ বার)
ব্রিটিশ শাসন: ধ্বংস হোক (৩ বার)
সাম্রাজ্যবাদ: ধ্বংস হোক (২ বার)
সাম্রাজ্যবাদের দালালরা : নিপাত যাক (২ বার)
আমাদের দাবী: মানতে হবে (২ বার)
Our demand: আজাদী (৩ বার)
লড়কে নেঙ্গে : আজাদী (৩ বার)
ব্রিটিশ শাসন: ধ্বংস হোক (২ বার)
(নৃত্য: শৃঙ্খলিতা স্বদেশের শৃঙ্খল মুক্তি প্রয়াসের নৃত্য)

(নাচের এক পর্যায়ে প্রচণ্ড ঝাঁঝের শব্দ হলে গান ও বাদ্য হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যাবে—এবং শৃঙ্খল মুক্তি ঘটবে)

সংলাপ: অট্টহাসি।
(শৃঙ্খল মুক্তির পর নর্তকীর উল্লাস নৃত্য। অপর দুজন নর্তকীর নৃত্যে যোগদান।
গঠাৎ আবার প্রচণ্ড ঝাঁঝের শব্দ। ঈগলের ছবি।
ভয়াবহ ভৌতিক হাসি: হা; হা; হা;……………………………..।
শৃঙ্খলসহ দানব হস্ত নর্তকীর দিকে প্রসারিত।
ভীতা নর্তকীদের ক্রমে ক্রমে ভূতলে ঝিমিয়ে পড়া।
বাদ্যযন্ত্রে করুণ সুর।)

 

[দ্বিতীয় অঙ্ক]

ভাষা আন্দোলন দৃশ্য: ১৯৪৮ এবং ভাষা আন্দোলন দৃশ্যঃ ১৯৫২ [পুলিশ প্যারেড]

(এটাই ছাত্র জনসভা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আম্রবৃক্ষতল। শ্রোতারা ভূমিতে উপবিষ্ট। বাকি শ্রোতারা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে।
বৃত্তপাত। [পুলিশের মার্চ])

ঘুনু (নেপথ্যে সংলাপ): Urdu, and Urdu shall be the state-language of Pakistan.
সমস্বরে: NO, NO.
নেপথ্যে: Urdu and Urdu shall be the state-language of Pakistan.
সমস্বরে: NO, NO, NO!
(পুলিশের প্রস্থানের পর)
(ব্যানার হাতে শ্লোগান দিতে দিতে ছাত্রদের সভায় যোগদান: রাস্ট্রভাষা! বাংলা চাই। [৫ বার])

কামাল (১ম বক্তা): “বন্ধুগণ! দুশো বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে এই সেদিনমাত্র, ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট আমরা আজাদী লাভ করেছি। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করিনা, আজাদীর অর্থ এক শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে শাসনভার আর এক শাসকগোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়া। স্বাধীনতার অর্থ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, স্বাধীনতার অর্থ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মৌলিক মানবিক অধিকারের স্বাধীনতা, সংস্কৃতির স্বাধীনতা, ভাষার স্বাধীনতা। আমাদের আজকের সংগ্রাম– ভাষার সংগ্রাম, বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের সংগ্রাম।”

ঘুনু: শ্লোগান: রাষ্ট্রভাষা: বাংলা চাই [৩ বার]

কামাল: বন্ধুগণ, আপনারা জানেন, আজাদীলাভের প্রথম বছরেই করাচী শিক্ষা সম্মেলনে, বাংলা ভাষাকে প্রকাশ্য আঘাত হেনে কেবল উদুকেই রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র করা হয়। ১৯৪৭-এর ৬ই ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে… আমরা এর প্রতিবাদ ঘোষণা করেছিলাম। আপনারা জানেন, ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পূর্ববাংলার কণ্ঠকে চিরকালের মতো রুদ্ধ করে দেবার নগ্নকুটিল ষড়যন্ত্রের কথা। আমরা এর প্রতিবাদে ২৬শে ফেব্রুয়ারী ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে ১১ই মার্চ সারা প্রদেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছিলাম। বন্ধুগণ, সমগ্র পূর্ববাংলা সেই ১১ই মার্চে উত্তাল সমুদ্রের মতো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ১৪৪ ধারা, লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস, গুন্ডাদের হামলা, বন্দুকের গুলি ও গ্রেপ্তার — প্রভুভক্ত পূর্ববাংলা সরকারের সব কটি অস্ত্রই সেদিন ভোঁতা হয়ে গিয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী জনাব খাজা নাজিমুদ্দিন জনতার দাবীর কাছে নতি স্বীকার করে ১৫ই মার্চ এক চুক্তিপত্রে প্রকাশ্যে স্বাক্ষর করে ঘোষণা করেন যে, তিনি আসন্ন অ্যাসেম্বলী অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাব তুলবেন এবং কেন্দ্রর কাছে সুপারিশ করবেন। কিন্তু তার পরের ইতিহাস এক জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস।

ঘুনু (বিরোধী শ্রোতা): Stop all that nonsense!
শ্রোতারা: এই-এই- কে, কে? চুপ, চুপ!
কিচলু (জনৈক ছাত্র): (কাছে গিয়ে) আপনি কী বলতে চান? আপনার ভালো না লাগলে চলে যেতে পারেন। আর, কিছু বলার থাকলে বলুন।
ঘুনু (বিরোধী শ্রোতা): No, I shall not move an inch from here. The campus belongs not to the communist conspirators.
কিচলু (জনৈক ছাত্র): মিথ্যা কথা। আপনার বক্তব্য থাকলে সভাপতির অনুমতি নিয়ে বলুন — এবং বাংলায় বলুন।
ঘুনু (বিরোধী শ্রোতা): No! I seek no permission. I shall speak here, and now, and in the language of This — and this, Thus and Thus. (ঘুষি মেরে দ্রুত প্রস্থান)
সমস্বরে: ধর-ধর-ধর (কয়েকজনের পশ্চাদ্ধাবন)
মুজবর (দ্বিতীয় ছাত্র): সভাপতি সাহেব, আমরা এই গুণ্ডামীর প্রতিবাদ করছি।
সমস্বরে: আমরা প্রতিবাদ করছি।

কামাল (১ম বক্তা): শান্ত হন বন্ধুগণ! আমরা এই হামলার প্রতিবাদ করছি। কিন্তু আমাদের উত্তেজিত হলে চলবে না। ভাষার শত্রুদের পরাজয়ের দিন ঘনিয়ে এসেছে, তাই তারা আজ এত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। এবং আন্দোলনকে বানচাল করে দেবার জন্য নতুন ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু আমরাও প্রস্তুত।
বন্ধুগণ, যা বলছিলাম। প্রধানমন্ত্রী জনাব খাজা নাজিমুদ্দিন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন ১৫ই মার্চ। আর ২১শে মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে, এবং ২৪শে মার্চ কার্জন হলে, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, একমাত্র উর্দূকেই রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করে, একনায়কতন্ত্রের দম্ভ প্রকাশ করলেন। ‘না-না’ চিৎকার করে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ জানালো, এবং সেই প্রতিবাদ চললো সারা মার্চ মাস জুড়ে। আর এর কদিন পরেই প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন সাহেব, কায়েদে আজমের দোহাই দিয়ে, তার চুক্তিপত্রকে অবমাননা করলেন।

সমস্বরে: ছি: ছি: ছি:
কামাল / ১ম বক্তা: তারপরের ইতিহাসও আপনাদের জানা আছে। গণ অসন্তোষের ভয়ে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হলো। কিন্তু বাংলাভাষাকে অন্যভাবে পঙ্গু করার ষড়যন্ত্র শুরু হলো। বাংলাকে আরবী হরফে লেখার ষড়যন্ত্র, রোমান হরফে লেখার ষড়যন্ত্র! এজন্য হাজার হাজার টাকা ব্যয় করা হলো। আমরা সে ষড়যন্ত্রকেও ব্যর্থ করে ‘দিয়েছি’।

স্লোগান: রাষ্ট্রভাষা: বাংলা চাই (৩ বার)

ঘুনু (২য় বক্তা): … কিন্তু বন্ধুগণ, ভাষার শত্রুরা এবার সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই এসেছে। গত ২৬শে জানুয়ারী আমাদের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সাড়ে চার কোটি মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়ে পল্টন ময়দানে নতুন করে ঘোষণা করেছেন — উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিবাদে আমরা ৩০শে জানুয়ারী ক্লাস বর্জন করেছি। “সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ” সিদ্ধান্ত নিয়েছে — আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারী সারা প্রদেশে সভা, শোভাযাত্রা ও হরতালের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে। আসুন আমার সংগ্রামী ছাত্র-ছাত্রী ভাইবোনেরা, আমরা একুশের কর্মসূচীকে সাফল্যমণ্ডিত করে তুলি।
(করতালি)

স্লোগান:
রাষ্ট্রভাষা: বাংলা চাই (২ বার)
সাম্রাজ্যবাদ: ধ্বংস হোক
উপনিবেশবাদ: ধ্বংস হোক (২ বার)
রাষ্ট্রভাষা: বাংলা চাই।

সংলাপ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন।
(দৃশ্য: মধুর স্টল। প্রয়োজনীয় চেয়ার টেবিল, কাপ-পিরিচ ইত্যাদি।)

[প্রথম টেবিল]

ডেভী: বয়! Come here (এলে পর) Three cups, three omlets—double. You understand. Little dog?
মধু: হ বুঝছে না, আপনাগো চা খাওয়াইয়া পটলা আর বাংলা কয়না। পটলারে আপনারা এককারে ইংরেজীর, জাহাজ বানাইয়া ফালাইছেন না।
ডেভী: What nonsense. If he cuts again joke with me, I shall knock him down.
মধু: হ, আপনার কাছে তিনশো ট্যাকার বাকির ডাউল তো খাইয়াই আছি। পঞ্চাসটি ট্যাহা দিয়া দিয়েন সাব।
সামসির: Spore m brother, আমার ক্লাস আছে।
পল্টু: ক্লাস? রাবিশ। Professor Choudhury’s class? All nonsense. যত্তো rotten মাল ঝাড়বে ক্লাসে. A native clown in a shabby chess, Lacking every modern conception of the world. I mean, he dreams, dreams. Juliet, but does not know Thirty eight……. and thirty of Merilin Monroe. Shocking indeed!
ডেভী: But I think, you shall have to admit that he has got a big qualification. I mean, he has got a very very beautiful daughter. Isint it?
পল্টু: Oh, Miss Shahana?
সামসির: Damn your Shahana, a student of Bengali Littérature, useful in the kitchen only. She cuts sorry figure in the society.
পল্টু: Leave her then aside. I think, Miss Polly is the girl. (সমস্বরে হাসি)

[দ্বিতীয় টেবিল]

কাজল: (চায়ে চুমুক দিয়ে) মধু।
মধু: শুনছি, কন।
কাজল: এদিকে উঠে এসো। (কাছে এলে)
এটা কি? চা? না কবরেজী পাচন? না পানের পিক দেয়া ঘোলের পানি? না তোমার শ্রাদ্ধের গঙ্গাজল?
মধু: গঙ্গা পাইবো কই সাব, হে তো ইন্ডিয়ায় পড়ছে, আমাগো বুড়ীগঙ্গার জল আর কি। পটলা, হালার পুত করছস কি! এই সাবেরও ‘ইসপিসাল’ চা দিয়া ফালাইছস? থাপ্পর মাইরা নাকডা ফাটাইয়া ফালাইমু। জা: ‘অডিনারী’ কইয়া আন। বাকি খাওয়াইয়া তেমন অসুবিধা হইত্যাচে না, এই হালার পুত পটলাডাই আমারে ডাউন কইরা ফালাইচে।
মুনীর: মধু দা, তুমি যদি এখন একটা সিগ্রেট বাকি দাও, তবে একবছর পর পাশ করে, পাঁচ বছরের মাথায় চাকুরী পেলে, আর এই কাজল প্রথম মাসে টাকাটা মেরে না দিলে, বৌদির জন্যে একটা ফুটানির ব্যাগ, আর তোমার জন্যে এই ‘ইস্পিছাল’ চা-রঙের একটা ট্রপিক্যাল স্যুট বানিয়ে দেবো। তখন বৌদি হয়ে যাবে ‘বেউডী’ — মানে বিউটি, আর মধুদা হয়ে যাবে — মঢুসুডান ডাট্ । (সমস্বরে হাস্য)
মধু: হ-অ..অ.! পেল্লাই কতা একটা কইচেন সাব। আরে — এই মধুর খাতায় বাকি খাইয়া পসা না দিয়া, কম কইরা অইলেও আড়াই ডজন সিএসপি হইছে। তারা খায়েশ করলে অহন এই মধুরে ছোনা দিয়া মুড়াইয়া রাখপার পারে। পারে না, কন? দ্যাহা নাই। আমার বাকির খাতায় চা আর আন্ডা খাইয়া মেজাজ শরীফরে ‘হট’ কইরা ঐ ব্যাল গাছ আর আমগাছ তলায় গরম গরম ল্যাভচার দিয়া সাথে চার ডজন ন্যাতা, এমেলে আর মন্ত্রী হইছে। ট্যাহাও নাই, দ্যাহাও নাই। আমার চা খাইয়া —
সিরাজ: বা! বা! বা!, মধুদা, এবার আমগাছতলায় তোমারে দিয়ে বক্তৃতা করিয়ে নির্ঘাৎ ‘ন্যাতা’ বানিয়ে ছাড়বো।
অন্য টেবিল থেকে: মধু?
মধু: পটলা, এইহানে তিনডা সিরকাট দিয়া যা, গোলফিলাগ দিবি! (প্রস্থান)
কামাল: এই মধুকে আমরা কিন্তু খুব ঠকাই মুনীর।
মুনীর: যাকগে। শোনো, তোমাকে একটা কথা বলে রাখি। আজ বিকালে তোমাদের সাঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে না, মার অসুখ, নারায়নগঞ্জ যাচ্ছি। বাকি কাজগুলো রাতেই শেষ করে রাখবে। ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর জন্য ভাবছি না আমরা। আমাদের প্রধান ভাবনা ‘একুশ’। (জালালের প্রবেশ)
জালাল: হেল্লো মুনীর ভেইয়া, এক কাপ চা পিলাতে হোবে।
মুনীর: আরে জালাল, বসো বসো। তোমারে আমাদের খুব দরকার।
জালাল: কুছু দোরকার নেই। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা দিতে হোবে’তে হামি আছি। ইয়ার-সাগরেদকে আমি সোব সোমায় হর্দম বলি — উর্দূ-বাংলা ভাই-ভাই আছে। আরে বাবা, রাষ্ট্রভাষা একটা কেন, পাঁচঠো হলে নুকসান কি আছে? মিসর মুল্লুকমে দোঠো আছে, সুইজারল্যান্ডে তিনঠো আছে। সোভেট রাসায় কঠো State-language আছে তোম জানতে নেই?
সিরাজ: সতেরোটি।
জালাল: Seventeen State languages! দেখো ইয়ার, পাকিস্তানমে একঠো State language হোনেসে তো পাকিস্তান একঠোই রাহেগা। ইয়া আল্লা, রহেগা। ইয়া খোদা, Save us! (অন্য টেবিলে হাসির শব্দ)

[প্রথম টেবিল]

পল্টু: (ব্যঙ্গস্বরে) রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! অ্যাবসার্ড ইম্পসিবল! কদিন পরে বলবে য়ুনিভার্সিটি উঠিয়ে দাও মেডিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, সব মডার্ন এডুকেশন অ্যাবোলিশ করে শুধু পাঠশালা বানাও। Cart behind the cows! চালাও রেল লাইনের ওপর দিয়ে গরুর গাড়ী — ঘড়র ঘড়র, ঘটর ঘটর ঘট। Silly!
ডেডী: These paid language-mongers are being indulged by half educated ambitious political leaders. They should be taught a good lesson.
সামসির: Exactly so. আমার ড্যাডি যখন ন্যুঅর্কে ছিলেন, তাঁর সঙ্গে বাংলায় কথা বলার জন্যে তাঁর স্টেনোকে ঘুষি মেরে নাক ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। এখন সে না কি ইংরেজীতে নামাজ পড়ে। আর নাকটা থেবড়ে যাওয়ায় নাকি সুরে বলে, ইয়েস স্যার, নো স্যার। (সমস্বরে হাসি)

[দ্বিতীয় টেবিল]

কাজল: অসহ্য! (উঠে প্রথম টেবিলে গিয়ে) দেখুন ভাষাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার সময় এটি নয়। আপনাদের এইসব রসিকতা উদ্দেশ্যমূলক এবং আপত্তিকর।
পল্টু: What? What do you mean by this?
সামসির: Did I say that you are the brother-in-law of my Daddy’s steno?
কাজল: বাংলায় বলুন; আপনি ভুল উচ্চারণ করছেন।
ডেডী: ও আপনি কি বঙ্গভাষার ন্যাতা? ইংরেজী শুদ্ধ করতে এসেছেন নাকি?
কাজল: দেখুন, আপনারা এমন একজনের সাথে কথা বলছেন যে ইংরেজী অনার্সে ফার্স্টক্লাস, এবং এম,এ-তেও ওটা দাবী করছে। আপনারা বাংলায় কথা বলতে লজ্জা পান, ওদিকে ইংরেজীও ঠিক শেখেন নি।
ডেডী: ও আপনি বুঝি University student? But you look otherwise. Excuse me please.
জালাল: ঠারো, ঠারো দোস্ত। আপ কোন জবাব মারতা হ্যায়। বাংলা? ইয়ে রাম থাপ্পড় হামারি পাছ হ্যায়। দেখো, এয় গেট বরাবর ক্যামাসকা বাহারমে নিকাল যাও। ফিন বাত করো তো হিব্রু আউর চাইনিজ exercice শুরু হো যায়গা। ঠিক হ্যায়? (নীরব ক্রোধে তাদের প্রস্থান)
মধু: চায়ের দামটা দিয়া যাইয়েন সাব। না খাতায় লেখ্যা রাখমু?
জনৈক ছাত্র: ইংরেজ শাসন শেষ হয়েছে, কিন্তু তাদের জারজদের আর শেষ নেই।
মুনীর: কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই এক নতুন জাত গজিয়ে উঠছে।
সিরাজ: গজিয়ে উঠছে না, নতুন জাত তৈরি করা হচ্ছে।

(দৃশ্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বিশ্রাম কক্ষ।
পাঁচ ছ’ খানা চেয়ার, লম্বা একটি টেবিল। অথবা ছোট দুটো টেবিল। নাহার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকে টেবিলে ঠেস দিয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। অন্যান্যরা কেউ নোট-বই ইত্যাদি পড়ছে। কেউ গল্প করছে। নীলা খাতায় মুখ গুঁজে আছে।)

ফিরোজা: কী হলো নাহার আপা? বাঘে তাড়া করেছে?
নাহার: দাঁড়াও বাপু, একটু দম নিয়ে নিই। কিচ্ছু কানে শুনছিনা। (বার কয়েক লম্বা দম নিয়ে) বল কি বলছিলি। বাঘ? বাঘই তো। আর একটুতেই হেড-স্যারের সামনে পড়ে গিয়েছিলাম আর কি! দুদিন তাঁর ক্লাসে যাইনি, তিনটি টিউটোরিয়াল বাকি, আজকেও তাঁর ক্লাস ফাঁকি দেবো, উপায় নেই। সিঁড়িটা প্রায় এক লাফেই পার হয়ে ব্যস, আমি হাওয়া।
ফিরোজা: হাওয়া তো নয় ঝড়। আর একদিন ঝড়ের মতোই তুমি কোথায় উড়ে যাবে।
নাহার: বসন্ত সমীরণ এ দেশে চলবে না। আর আমি-তুমি না চাইলেও ঝড় আসবে। আসছে। তবে তোমরা সব ভালো মেয়ে, পড়াশুনা করো, পাশ করো; বাবা-মাকে রেহাই দাও। আমার কথা ভেবো না।
ফিরোজা: কিন্তু হেড-স্যার বলেন, তুমি ইচ্ছে করলে ফার্স্ট ক্লাস নিতে পারো।
নাহার: পারি নাকি? তা হলে নেবো। কিন্তু বলতো, এ দেশে ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ড ক্লাস নিয়ে কি হবে? ঢেঁকি তো স্বর্গে গিয়ে ধানই ভানবে। বরং দেখা যাক, ঢেঁকি গুঁতিয়ে কোনো দরজা ভেঙে একটু বাতাস আনা যায় কিনা।
নীলা: দরজা ভাঙতে না পারলেও সাত-আট ফুট পাঁচিল টপকানোর অভ্যাস তোমার আছে। “থাকিতে চরণ মরণে কি ভয়— নিমেষে যোজন ফরসা..।”
নাহার: খুব কথা বলা শিখেছো আজকাল নীলা। পুলিশের তাড়া খেলে তোমার মতো খোঁড়া নবাবজাদী ও রাণে ফার্স্ট হয়ে যাবে। বইয়ের পোকা কোথাকার; কী পড়া হচ্ছে?
নীলা: উদ্ধার কর ফিরোজা। না হয় নে তোর খাতা (খাতা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে) বয়ে গেছে আমার পদ্য মুখস্ত করতে। (মিস পলির প্রবেশ। কেশ ও প্রসাধন পরিচর্যা)
ফিরোজা: না: কাউকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। দেখো তো নাহার আপা, একি,, আমায় দিয়ে হবে? নীলাকে বললাম, তুই গান টান করিস, দে না ছেড়ে একবার গলাটা নজরুল – সুকান্তের কবিতায়। বলে, চেঁচামেচি করলে গলাটা যাবে।
নাহার: তার মানে নীলার ধারণা, ষাঁড়গুলোই ভালে আবৃত্তি করে।
ফিরোজা: আমি কিন্তু মরে গেলেও পারবো না।
নীলা: তোমার ঐ বিস্কুট-ভাঙা মুরমুরে গলায় হবেও না কোনোদিন।
নাহার: কি ওটা দেখি! (খাতা চোখের সামনে নিয়ে) হুঁ, সব কান বন্ধ করো।
“দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে সন্দেশ, সেই —” অ্যা, সন্দেশ? স্বন্দেশটা আবার কি?
ফিরোজা: (হেসে) — সন্দেশ নয়, স্বদেশ — স্বদেশ।
নাহার: তোমার মাথা। কি বিচ্ছিরি হাতের লেখারে বাবা!
“দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানালাম।
জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে…
কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে
হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে?
যারা আজ এই মিথ্যার দায়ভাগী
আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।
ইতিহাস, জানি নীরব সাক্ষী তুমি,
আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশভূমি…
বিদ্রোহী মন! আজকে করো না মানা,
দেবো প্রেম আর পাবো কলসীর কানা,
দেব প্রাণ দেবো মুক্তির কোলাহলে
জীন ডার্ক যীশু, সক্রেটিসের দলে।
ইতিহাস, নেই অমরত্বের লোভে,
আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ…!”

নীলা: অপূর্ব! চ-ম-ৎ-কা-র!
ফিরোজা: এইবার ধরে ফেলেছি নাহার আপা। তোমাকে দিয়ে আমার আবৃত্তি করিয়ে তবে ছাড়বো।
মিস পলি: Rubbish, simply rubbish.
ফিরোজা: কি রাবিশ? আপনি?
মিস পলি: আমি নই, রাবিশ এই সব বাংলা পদ্য। কি জানি, হয়তো আপনারাও।
নীলা: আপনার কিন্তু খুব গায়ে পড়ে কথা বলার অভ্যাস আছে। এইসব অযাচিত ক্যুৎসিত মন্তব্য করার জন্য আমরা তো আপনাকে ডাকিনি। মানসিক চিকিৎসার জন্য আপনি আপাতত: ডাক্তার মিত্রের সাথে দেখা করতে পারেন।
ফিরোজা: আমরা রাবিশ। কিন্তু উনি মূল্যবান পদার্থ যে। দেখিস না, নিজেকে ornaments আর cosmetic-এর দোকান সাজিয়ে কেমন উনি ক্লাস করতে আসেন। — “শাক দিয়ে মাছ যায় নাকো ঢাকা, ডেকে নিয়ে আসে মাছিকে।”
পলি: Stop it, please! খদ্দর পরলেই বিপ্লবী হওয়া যায় না। I know the revolutionaries. যারা রাস্তায় রাস্তায় বিপ্লব আর মিছিলের অজুহাতে লোফারদের সঙ্গে ধিঙ্গিপনা করে বেড়ায়, মিটিং-এর নামে Scoundrelদের সঙ্গে আড্ডা মেরে বেড়ায়, তাদের আমি চিনি। I know them all, বুঝি এসবের মানে।
নাহার: মিস পলি! ফিরোজা! তোমরা দুজনেই মুখের লাগাম ছেড়ে দিয়েছো। মিস পলিকে বলছি, আপনি বাংলা ভাষার একটি প্রসিদ্ধ কবিতাকে রাবিশ বলেছেন। ভাষা আন্দোলনকে আপনি কোথাকার ও স্কাউন্ড্রেলদের ব্যপার বলতে চেয়েছেন। এর উত্তর দিতেও আমি ঘৃণা বোধ করি। তবে সত্যিই আমরা কি করি না করি তা স্বচক্ষে দেখার জন্য আজকে আমাদের সংগ্রাম কমিটির সভায় আপনি হাজির থাকতে পারেন — মিছিলে না হয় নাই-বা গেলেন।
মিস পলি: Absurd. Is it your order? Then I am very much pleased to disoblige you.
নাহার: অর্ডার আমি কাউকে কখনো করি না। অনুরোধ করেছি আপনাকে, তবে অনুরোধটাকে প্রবলতর করে তুলতে চাই।
মিস পলি: Silly! Ofcourse, আমি মিটিংও করি, মিছিলও করি। তবে আপনাদের মতো নয়। খালি পায়ে রাস্তায় হেঁটেও নয় — গাড়ীতে, অস্টিনে — ফোর্ডে, ব্রাইডাল কিংবা ক্লাবের পার্টিতে। আপনারা প্রবল অনুরোধ করুন তাদের, যাদের ফাদার, আঙ্কল অ্যান্ড কাজিনরা ইডেন বিল্ডিংস-এর শেডগুলোতে কলম পেষে, আর আমার ড্যাডির অফিসে পিওন-অর্ডালির কাজ করে। টিউশান ফি কমাও, ডাইনিং চার্জ কমাও আন্দোলন করেই যদি বেড়াতে হয় তবে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসেছেন কেন? হায়ার এডুকেশন গরীবদের জন্য নয়। Better go back to village, get married and breed ugly creatures to help your fathers and husbands in the field. Am I clear?
ফিরোজা: বাঃ, চমৎকার বলেন কিন্তু আপনি মিস পলি। যাত্রা-থিয়েটারে নামলে ভিলেনের সখির ভূমিকায় সেরেফ উৎরে যাবেন। আমাদেরকে শোনানের জন্যেই কি আপনার পার্টটা মুখস্ত করে এসেছিলেন?
নীলা: বেশী বলিসনি ফিরোজা। উনি রেগে গেলে মেক-আপটা আবার নষ্ট হয়ে যাবে!
মিস পলি: Please! (সবেগে উঠে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধভাবে প্রস্থানের আগে)
All the accomplices of political rogues. I spit on your dirty faces. (থুথু নিক্ষেপের শব্দ করে প্রস্থান)
নীলা: এসব সহ্য করতে হবে নাহার আপা?
নাহার: ভূঁইফোঁড় এই এক জাত গজিয়ে উঠেছে এই দেশে। মেক-আপ আর আভিজাত্যের মুখোশ পরে থাকে, কিন্তু ভেতরটা জঘন্য , কুৎসিত।।

অমর একুশের দৃশ্য:
(স্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর পাড়ের বেলতলা।
জরুরী ছাত্র-জনসভা। বাইরে রাস্তার ধারে পরিদৃশ্যমান দুটি কৃষ্ণচূড়ার গাছ।
নেপথ্যে শ্লোগানঃ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!……
১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করো… ২বার
রাষ্ট্রভাষা……………! [সভা গঠন না হওয়া পর্যন্ত ])

রাজনৈতিক নেতা: … ভাইসব, আমি এই ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে–
মুনীর: না- না, আমরা সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে ইতিহাস শুনতে চাইনা। আমরা ধর্মঘট পালন ও মিছিল বের করতে চেয়েছি, কিন্তু সরকার ব্যাখ্যাহীন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। আমরা আইনের অপব্যবহারের নিন্দা করছি। এখন আমাদের কি করতে হবে তাই বলুন।
রাজনৈতিক নেতা: ভাই ও বোনেরা আমার! আমরা যেন হঠাৎ ভাব-প্রবণ হয়ে কোনো কাজ না করি। ধীরে সুস্থে চিন্তা করে কাজ না করলে আমাদের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। গতরাত্রে “সর্বদলীয় কর্মপরিষদে’র এক জরুরী অধিবেশনে ১১-৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। কারণ, আমরা যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করি, তা হলে দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে সরকার জরুরী অবস্থার অজুহাতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। আমরা সরকারকে সে সুযোগ দিতে চাই না।
সিরাজ: আপনি বক্তৃতা বন্ধ করুন। আমরা রাজনীতি চাই না। নির্বাচন ও মন্ত্রীত্বের গদী চাইনা, আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। আজ যদি আমরা সুবোধ বালকের মতো ঘরে ফিরে যাই তবে ভাষা আন্দোলনের এখানেই অপমৃত্যু ঘটবে।

৩য় বক্তা: আমার সংগ্রামী ছাত্র-ছাত্রী ভাই বোনেরা! আজ আমরা এক চরম সংগ্রামের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। চারকোটি মানুষের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র এতদিন প্রচ্ছন্ন ছিল, এখন তার স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। কোটি কোটি মানুষের সিংহ গর্জনে যে শৃঙ্খল ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে খসে পড়েছিল, সেই লৌহ শৃঙ্খল, সেই লোহার সাপ, ২৬ শে জানুয়ারি পল্টন ময়দানে, পূর্ববাংলার হৃৎপিণ্ডে প্রকাশ্যেই বিষাক্ত ছোবল মেরেছে। আজ আবার আমাদের একুশের কর্মসূচীকে বানচাল করে দেবার জন্য রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র ঢাকা জেলায় ১৪৪ ধারা জারী করেছে। এ শুধু আমাদের মাতৃভাষা বাংলার উচ্ছেদ সাধনের ষড়যন্ত্র নয় সমগ্র পূর্ববাংলার ভবিষ্যৎকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র।
বন্ধুগণ, আপনারা কি চান, সাম্রাজ্যবাদীর দালালরা আমাদের গণতন্ত্রকে হত্যা করুক?
সমস্বরে: না-না।
৩য় বক্তা: আপনারা কি চান স্বৈরাচারী চক্র আমাদের মানবিক অধিকারকে কেড়ে নিক?
সমস্বরে: না-না।
৩য় বক্তা: আপনারা কি চান যে,আমাদের মায়ের ভাষাকে, বুকের ভাষাকে কেড়ে নিয়ে কেউ আমাদের কণ্ঠকে রুদ্ধ করে দিক?
সমস্বরে: না-না।
৩য় বক্তা: তবে রুখে দাঁড়ান। আমরা যদি আজ এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই তবে কালের বিচারে আমাদেরকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আমরা এই সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা, ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এই বলে সতর্ক করে দিতে চাই যে, যদি তারা ছাত্র জনতার রায়কে মেনে না নেন, তবে আমরা তাদেরকে ঘৃণা ভরে বর্জন করে বিশ্বাসঘাতক বলে ঘোষণা করবো (করতালি)
আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করতে চাই যে–আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে আমরা এক চুলও নড়বো না। (করতালি) আসুন আমার ভাই ও বোনেরা, আসুন পূর্ববাংলার চারকোটি মানুষ, কোটি মানুষের একটি জনতার সিংহ কণ্ঠে ধ্বনিত হোক– রাষ্ট্রভাষা! বাংলা চাই! (৩ বার)
১ম বক্তা: বন্ধুগণ, আমি আপনাদের হয়েকটি প্রশ্ন করবো। এই প্রশ্নের উত্তরের উপরই আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনারা ১৪৪ ধারা মানবেন কি মানবেন না?
সমস্বরে: না-না, মানবো না।
আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন —
১ম বক্তা: যে মুহূর্তে আমরা ১৪৪ ধারা অমান্য করবো, সেই মুহূর্তেই “সর্বদলীয় কর্মপরিষদ” বাতিল হয়ে যাবে এবং আন্দোলনের সমস্ত দায়িত্ব আমাদেরকে — অর্থাৎ এই ছাত্র সমাজের বহন করতে হবে। আপনারা এর জন্য প্রস্তুত?
সমস্বরে: হ্যাঁ-হ্যাঁ, প্রস্তুত।
১ম বক্তা: আমার তৃতীয় প্রশ্ন: আপনাদের প্রথম ও প্রধান গন্তব্যস্থল কোথায়?
কাজল: আমরা এখান থেকে মাত্র কয়েকশো গজ দূরে অ্যাসেম্বলী হল পর্যন্ত যাবো। সেখানে আইন-পরিষদের অধিবেশন চলছে। সেখানে গিয়ে জাতীয় নেতাদের কাছে আমাদের দাবী আমরা পেশ করবো।
১ম বক্তা: আপনাদের সবার মত?
সমস্বরে: হ্যাঁ — তাই।
১ম বক্তা: আমার চতুর্থ প্রশ্ন। আমরা শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করবো। আমাদের হাত শূন্য, আমরা অস্ত্রহীন। আমরা আঘাত করতে পারবো না, করবো না। কিন্তু যে-কোনো রকমের আঘাত আমাদেরকে সহ্য করতে হবে। এবার বলুন, আপনারা ১৪৪ ধারা মানবেন, কি মানবেন না?
সমস্বরে: না-না-না। মানবো না।
১ম বক্তা: তবে আমার একটা প্রস্তাব আছে। আমরা মাত্র দশজন দশজন করে রাস্তায় মিছিল বের করবো। এতে ১৪৪ ধারা অমান্য করাও হবে, এবং একই সঙ্গে ব্যাপক হাঙ্গামাও এড়ানো যাবে। আপনারা এই প্রস্তাবের জবাব দিন।
সমস্বরে: তাই হোক, তাই হোক।
১ম বক্তা: তা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণের ভেতরেই আপনারা শৃঙ্খলার সাথে মিছিল গঠন করুন।
(ড্রাম বিউগল …। সঙ্গে সঙ্গে মিছিল গঠন করতে শুরু করবে)

সংলাপ: এই সেই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর মহামিছিলের একাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্কীর্ণ প্রাঙ্গণে অজগরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ফটকের মুখে এসে ফুঁসে উঠছে। ফটকের ওপারে পূর্ববাংলা সরকারের সশস্ত্র প্রহরীরা দণ্ডায়মান। এ পাশে পূর্ববাংলার চারকোটি মানুষের অসন্তোষ ও বিক্ষোভ, পুঞ্জীভূত যন্ত্রণার বারুদ মুহূর্তেই বিষ্ফোরিত হয়ে উঠতে চাইছে।
(পুলিশের ছায়ার পর্দা অতিক্রম। বাঁ দিক থেকে ডান দিকে)

মুজিবর: বিউগলের হআহ্বান (অথবা কাউন্ট ডাউন)
প্রথম দশজনার মিছিল। শ্লোগান: নারায়ে তকবীর : আল্লাহু আকবর (২ বার)
রাষ্ট্রভাষা : বাংলা চাই (২ বার)
(পুলিশের লাঠি কর্ডনে গ্রেফতার)
ড্রামের শব্দ: ২য় দশজনের মিছিল। অনুরূপ স্লোগান ও অনুরূপভাবে গ্রেপ্তার।
ড্রামের শব্দ: ৩য় দশজনের মিছিল ইত্যাদি—
(নৈঃশব্দ। পর্দার অর্ধাংশে শুধু পুলিশের ছায়া। বাকি অংশ সাদা।)

সংলাপ: একুশের সেই বীর ছাত্রজনতা, নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ শৃঙ্খলার সাথে, দশজন দশজন করে আইন অমান্য করে গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ অধৈর্য। না: এ সহ্য করা যায় না। এবার আঘাত করতে হবে। শক্তি প্রয়োগে চিরকালের মতো স্তব্ধ করে দিতে হবে পূর্ববাংলার এই আন্দোলনকে। Now, or never. দরকার হলে গুলি চালাও, লাঠি চালাও— দরকার হলে গুলি।
নেপথ্যে: Fire! (৪র্থ মিছিল বের হতেই)
(তিনটি ছোট কাঁদুনি গ্যাস ফাটার শব্দ)

নেপথ্যে: চার্জ! (লাঠি চার্যের দৃশ্য)
নেপথ্যে: ফায়ার! (তিনটি গুলির শব্দ)
(ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাবার দৃশ্য। মঞ্চে ৩ জন আহত হয়ে পড়ে গেল। পুলিশ থাকবে না। দুজন ছাত্র দৌড়ে এসে আহতদের ধরে উঠিয়ে বসাতে চেষ্টা করছে। সমস্ত মঞ্চে স্তব্ধতা। অতঃপর করুণ মিউজিক।)

আহত ছাত্র: আঃ আঃ আঃ… ভায়েরা আমার! আঃ, আমরা কি, আ:, আমরা কি আমাদের কথা বলতে পেরেছি? (বন্ধুরা নিরুত্তর) আঃ আঃ, তোমরা, তোমরা, তোমরা, কথা বলছো না কেন!
ঘুনু/সঙ্গী: আমরা শুধু বলিনি ভাই, আমরা ঘোষণা করেছি।
আরজু / আহত ছাত্র: তবে, তবে আমরা জয়ী হয়েছি? আ:, হবে না! এই দ্যাখো না, এ রক্তের ফোঁটা নয়, লাল লাল রক্তার বিন্দু। ওরা, আ:, ওরা আমাদের মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল, এই বুক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এই কথার স্রোত — কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো লাল লাল কথার স্তবক! মুখের কথা কি বন্ধ করা যায় বন্ধু! কোনো দি-ন-ও যা-য়-না। (মৃত্যু)
ঘুনু/ সঙ্গী: (চিৎকার করে কান্নার শব্দে শহীদ বন্ধুর গায়ের ওপর ঢলে পড়ে) না! না! না! যায় না!!
(সঙ্গী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। নীরব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ভূতলের বন্ধুদের দিকে। তারপর গভীর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে)
(অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।
জোৎস্নাপাত। লাল কৃষ্ণচূড়া প্রস্তুত। বেহালায় করুণ সুর (বাঁশী))

আবৃত্তি: “এ কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরে না অশ্রু?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং!
এ কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মহনীয় ধারা…।”

(সমস্ত পর্দা লাল কৃষ্ণচূড়ায় আচ্ছন্ন। কালো পতাকাসহ শহীদ মিনারের ছায়া। মিনার ঘিরে ছাত্র-ছাত্রীদের নত মস্তকে নীরবে অবস্থান গ্রহণ।)
গান: (একবার মাত্র)
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…। (১ম ও শেষ স্তবক মাত্র)
(জ্যোস্নাপাত প্রত্যাহার।
লাল কাগজ খুলে একজনের কবিতা পাঠ:)

আজীজুল হক —
“……যাঁদের হারালাম, তারা আমাদের বিস্তৃত করে দিয়ে গেল
দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, কণা কণা করে ছড়িয়ে দিয়ে গেল
দেশের প্রাণের দীপ্তির ভেতর মৃত্যুর অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে।
আবুল বরকত, সালাম, রফিকউদ্দীন,জব্বার
কি আশ্চার্য, কি বিষন্ন নাম! একসার জলন্ত নাম।
হে আমার জ্ঞান, একটি মাত্র উচ্চারণের বিষ আমাকে দাও
যা হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছড়ায়,
ওষধি জন্মের মতো একবার স্পন্দিত হয়ে সে ঘৃণা আর
কখনো মৃত্যুকে জানে না, হে আমার জ্ঞান!
হে আমার দেশ, বন্যার মতো
সমস্ত অভিজ্ঞতার পলিমাটিকে গড়িয়ে এনে একটি চেতনাকে
উর্বর করেছি,
এখানে আমাদের মৃত্যু ও জীবনের সন্ধি, …
এখানে আমরা ফেরাউনের আয়ূর শেষ কটি বছরের
ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি
এখানে আমরা পৃথিবীর শেষ
দ্বৈরথে দাঁড়িয়ে,…
আজতো জানতে একটুকু বাকি নেই মাগো
তুমি কি চাও, তুমি কি চাও!”

(শহীদ মিনারে লাল পতাকা উত্তোলন। সকলের হাতে পতাকা)
স্লোগান: আমাদের সংগ্রাম — চলবেই চলবে!
গান: আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে…।
(একে একে আরো অনেকের আগমন)

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top