আবদুর রব: সর্বদা মাতাল থাকা উচিত

আমাদের যৌবনে বোদলেয়ারের নাম এলে তাঁকে পাক-ঘাটা কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এর মূল কারণ ছিল তাঁর ‘ক্লেদজ কুসুম’ বা ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’ (Les Fleurs du mal) বইটি। তাঁকে দেখা হতো মাতাল, লম্পট ও বেশ্যালয়ে গমনকারী এক উচ্ছন্নে যাওয়া কবি হিসেবে। আমাদেরই বা দোষ কী! খোদ ফরাসি দেশের আদালত ১৮৫৭ সালে অশ্লীলতার অভিযোগে তাঁর ছয়টি কবিতা নিষিদ্ধ করেছিল। এগুলোকে ফরাসি কর্তৃপক্ষ যৌনতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়বস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিল। আদালত বোদলেয়ারকে ৩০০ ফ্রাঙ্ক জরিমানা করে। সেন্সরশিপের এই মামলাটি সাহিত্য ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞাটি বহাল ছিল। অথচ আজ, এই কাব্যসংগ্রহটি বিশ্ব সাহিত্যের একটি মাইলফলক এবং বাকস্বাধীনতার বিতর্কের মোড় ঘোরানো অধ্যায় হিসাবে সর্বজনস্বীকৃত। প্রকাশের ১৭০ বছরেরও বেশি সময় পরেও, ‘লে ফ্লর দ্যু মাল’ বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত ফরাসি কাব্যসংকলনগুলির অন্যতম। তিনি আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের আধুনিক সাহিত্য পাঠ্যসূচির একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়ে গেছেন।

বাঙালি মধ্যবিত্ত পাঠকের কাছে বোদলেয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু। তাঁর ‘বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা’ অনুবাদগ্রন্থটি আমাদের রক্ষণশীল মনস্তত্ত্বে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছিল। বোদলেয়ার যে কেবল অবক্ষয়ের কবি নন, বরং আধুনিক জীবনের এক নির্মম ভাষ্যকার— বুদ্ধদেব বসুর হাত ধরেই আমরা তা প্রথম অনুধাবন করতে শিখি।

বোদলেয়ারের সাহিত্যদর্শনের মূলে ছিল দুটি বিপরীতমুখী শক্তির লড়াই— ‘স্প্লিন’ (Spleen) এবং ‘আদর্শ’ (Idéal)। ‘স্প্লিন’ হলো এক গভীর বিষাদ, আধুনিক নগর জীবনের একঘেয়েমি, ক্লান্তি এবং জীবনের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা। অন্যদিকে ‘আদর্শ’ হলো নিখুঁত সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক উত্তরণের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবেই এই যান্ত্রিক জীবনের ভারে (স্প্লিন) পিষ্ট, আর তার একমাত্র মুক্তি হলো শিল্পের আশ্রয়ে বা সৌন্দর্যের সন্ধানে (আদর্শ) নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দর্শন— মাতাল হওয়ার দর্শন।

১৮৬৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত গদ্য কবিতার বই ‘ল্য স্প্লিন দ্য প্যারিস’ (Le Spleen de Paris) বা ‘পতি পোয়েম অঁ প্রোজ’ (Petits poèmes en prose)-এর ‘এনিভ্রে-ভু’ (Enivrez-vous / মাতাল হও) কবিতার প্রথম লাইনেই তিনি বলেন, “সর্বদা মাতাল থাকা উচিত। আসল কথা এটাই: এটিই একমাত্র প্রশ্ন।” এই “মাতাল” হওয়া বলতে তিনি আক্ষরিক অর্থে মদ্যপান বোঝাননি; তিনি বুঝিয়েছেন কোনো কিছুতে গভীরভাবে নিমগ্ন হওয়া বা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে নিয়োজিত করাকে। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে “ফ্লো স্টেট” (flow state) বলা যেতে পারে, যেখানে গভীর মনোযোগের কারণে সময় গড়িয়ে যাওয়ার অনুভূতিই থাকে না। তিনি অসাড়তার বদলে আবেগকে বেছে নিতে বলেছেন। মনোযোগ বিচ্যুতির এই ডিজিটাল যুগে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে বা শিল্পে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার এই আহ্বান যে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা এখন বুঝতে পারি। কিন্তু মানুষ ভাবতো তিনি সত্যিকার অর্থেই মাতাল হওয়ার কথা বলছেন।

কী অসাধারণ এই কবিতা! সেই সময়েই কত সুন্দর করে গুছিয়ে বলা হয়েছিল কথাগুলো, অথচ মানুষ বুঝেছে ঠিক তার উল্টো:

এনিভ্রে-ভু (Enivrez-vous)
শার্ল বোদলেয়ার (১৮২১-১৮৬৭)

 

সর্বদা মাতাল থাকা উচিত। আসল কথা এটাই: এটিই একমাত্র প্রশ্ন।

সময়ের যে ভয়াবহ বোঝা, যা আপনার কাঁধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং আপনাকে মাটিতে নুইয়ে দেয়— তা অনুভব করতে না চাইলে আপনাকে অবিরাম মাতাল থাকতে হবে।

কিন্তু কিসে? মদ, কবিতা, নাকি পুণ্য দিয়ে— সে আপনার যা ইচ্ছা। তবে মাতাল হোন।

আর যদি কখনো, কোনো রাজপ্রাসাসের সিঁড়িতে, নর্দমার সবুজ ঘাসে, কিংবা আপনার ঘরের বিষণ্ণ নির্জনতায় ঘুম ভেঙে দেখেন যে নেশা ইতিমধ্যেই কেটে গেছে বা কমে এসেছে।

তবে বাতাস, তরঙ্গ, নক্ষত্র, পাখি, ঘড়ি— যা কিছু ধাবমান, কাতরায়, গড়ায়, গান গায়, কথা বলে— সবাইকে জিজ্ঞেস করুন এখন কয়টা বাজে;

ওরা সবাই আপনাকে উত্তর দেবে: “এখন মাতাল হওয়ার সময়!

সময়ের নিগৃহীত দাস না হয়ে বেঁচে থাকতে হলে মাতাল হোন; অবিরাম মাতাল থাকুন! মদ, কবিতা কিংবা পুণ্য দিয়ে— যা আপনার পছন্দ।”

 

এই মাতাল হওয়ার দর্শনের পাশাপাশি বোদলেয়ারের আরেকটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, “এমনকি গদ্যেও সর্বদা একজন কবি হয়ে থাকুন”। গদ্য বলতে তিনি সাধারণ জীবন, দৈনন্দিন রুটিন, কাজ, বিল পরিশোধ কিংবা প্রতিদিনের যাতায়াতকে বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে কবিতা হলো উচ্চতর উপলব্ধি, সূক্ষ্ম বিষয়ে মনোযোগ আর আবেগের নিখুঁত প্রকাশ। এই ভাবনার সাথেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্ট ফরাসি সাহিত্যের বিখ্যাত চরিত্র ‘ফ্ল্যানার’ (Flâneur)। ‘ফ্ল্যানার’ হলো আধুনিক শহরের এমন এক ভবঘুরে দর্শক, যে শহরের ভিড়ের মাঝে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটে, কিন্তু চারপাশের সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শহরের কোলাহল, ধোঁয়া, ধুলো, এমনকি কুৎসিত জিনিসের মাঝেও সে সৌন্দর্য খুঁজে পায়। আধুনিক যান্ত্রিক জীবন আমাদের অনুভূতিগুলোকে ভোঁতা করে দেয়। বোদলেয়ারের ‘ফ্ল্যানার’ আমাদের শেখায়— জীবনযাপনের নোংরামির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে যে একঘেয়েমি আসে, তার মাঝেই সচেতনভাবে সৌন্দর্য খুঁজে নিতে হবে।
তাঁর এই কথা ধরে নিলে আমাদের সাধারণ কথাবার্তায়, দৈনন্দিন রুটিনে, এমনকি ইমেইল লেখার সময়ও নিজের ভেতরে ছন্দ ধরে রাখার বিষয়টি আসে। উৎপাদিকা শক্তির সংস্কৃতি এবং অবিরাম কাজের চাপে পিষ্ট আজকের দুনিয়ায় সাধারণকে অসাধারণে উন্নীত করার এই পরামর্শটি যে কতটা মূল্যবান, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কবিতার বাইরে বোদলেয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সমালোচকও ছিলেন। তিনি ওজেন দ্যলাক্রোয়ার (Eugène Delacroix) মতো চিত্রশিল্পীদের নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। বোদলেয়ার দ্যলাক্রোয়াকে “প্রাচীন বা আধুনিক যুগের সবচেয়ে মৌলিক চিত্রশিল্পী” এবং “চিত্রকলার কবি” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দ্যলাক্রোয়ার কাজে রঙের ব্যবহার, কল্পনাশক্তির প্রকাশ এবং গভীর আবেগের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে দ্যলাক্রোয়ার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নিও-ক্লাসিক্যাল (নব্য-ধ্রুপদী) ধারার শিল্পী জ্যঁ-ওগ্যুস্ত-দমিনিক আঁগ্র (Jean-Auguste-Dominique Ingres) ও তাঁর অনুসারীদের সমালোচনায় মুখর থাকতেন তিনি। কারণ আঁগ্র রেখা (line) এবং নিখুঁত শৈলীর (style) ওপর অতিরিক্ত জোর দিতেন, যার ফলে তাঁর চিত্রে আবেগ, রং এবং আলোর অভাব থাকত। বোদলেয়ার মূলত তাঁর শিল্প সমালোচনায় কঠোর বাস্তববাদের চেয়ে মানসিক তীব্রতার ওপর বেশি জোর দিতেন।

সেসময়ের মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণির মানুষেরা শিল্পে নিখুঁত বাস্তবতা ও নৈতিকতার যে মাপকাঠি খুঁজত, তিনি তার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি হুবহু নকল বা বাস্তবতাকে যান্ত্রিকভাবে তুলে ধরার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে ফটোগ্রাফি বা কঠোর বাস্তববাদ শিল্পের কল্পনাশক্তিকে ধ্বংস করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, রোমান্টিসিজম কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বা নিখুঁত সত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি হলো “অনুভবের একটি ধরন”। তিনি চেয়েছিলেন শিল্প যেন ফটোগ্রাফির মতো নিষ্প্রাণ না হয়, বরং তা যেন দ্যলাক্রোয়ার ক্যানভাস বা এডগার অ্যালান পোর (Edgar Allan Poe) রচনার মতো শিল্পীর ভেতরের আলোড়ন, তীব্র আবেগ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার প্রকাশ ঘটায়। বোদলেয়ার ছিলেন পোর রচনার ফরাসি ভাষার শ্রেষ্ঠ অনুবাদক। পোর লেখার অন্ধকার, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং বিষাদ বোদলেয়ারকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছিল। তিনি মনে করতেন, পো এবং তিনি যেন আত্মার আত্মীয়।

আজ ৩১ আগস্ট। ১৮৬৭ সালের ঠিক এই দিনটিতেই চিরবিদায় নিয়েছিলেন এই মহান কবি। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো ছিল চরম মর্মান্তিক। সারা জীবন আর্থিক অনটন আর দেনার দায়ে জর্জরিত ছিলেন। তার ওপর যৌবনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে আক্রান্ত হয়েছিলেন সিফিলিসে। ১৮৬৬ সালে বেলজিয়ামে থাকাকালীন তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এর ফলে তাঁর শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তিনি ‘অ্যাফাসিয়া’ (Aphasia) বা বাকশক্তি হারানোর রোগে আক্রান্ত হন। যিনি সারা জীবন শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে জাদুকরী এক জগৎ তৈরি করেছিলেন, সাহিত্যের নতুন এক ব্যাকরণ লিখেছিলেন, অথচ জীবনের শেষ একটি বছর তিনি প্রায় একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি! মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।

বোদলেয়ার হয়তো ক্ষণজন্মা ছিলেন, কিন্তু তাঁর দর্শন আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। আধুনিকতার এই চূড়ান্ত যান্ত্রিক যুগে দাঁড়িয়ে বোদলেয়ার আমাদের মনে করিয়ে দেন— নিছক বেঁচে থাকাটাই জীবনের উদ্দেশ্য নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তীব্রভাবে যাপন করতে হয়। তাই সময় যখন তার ভয়াল বোঝা নিয়ে আমাদের পিষতে আসে, তখন আমাদেরও বলতে ইচ্ছে করে— “সর্বদা মাতাল থাকা উচিত!”

(শার্ল বোদলেয়ারের ১৫৯তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষ সাহিত্য ক্যাফের নিবেদন)

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top