মণিকা চক্রবর্তী: যাপনের দিন ও অন্যান্য কবিতা

যাপনের দিন

দিনের পর দিন, দীর্ঘশ্বাস, পোড়া গন্ধ,
অবিশ্বাসের বিষে, কান্না নয়, রক্ত আসে চোখে–
যত যাপন, ভুল রাত, ভুল দিন
মিথ্যা ও মোহের ঘূর্ণিপাকে, এই পাকদণ্ডী পথ
তবু সংসারের খাড়াই বেয়ে উঠি।
পাথরে পাথরে ভরা মন আজ
ঠুকে ঠুকে আগুন দাউদাউ
তবু, ক্রোধ স্তিমিত হয়ে এলে
নিজেকে চিনে নিতে চাই
রূপান্তরের পৃথিবীতে।

 

বসন্ত বিমুখ

বন্য সবুজ ফার্নের ভীড়ে
দুলেছিল একা, ছোট্ট বনফুল
বড়ই একা, তবু লাস্যময়ী,
মাথায় দোলানো ফুলের মুকুট।
সে কি জানতো! সেদিন বসন্ত!
শহরজুড়ে তখন চৈত্র মাস
শহরজুড়েই রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, শিমুল।

কর্পোরেটের কংক্রিট দেয়ালে
ছোট্ট ফুল, রঙে ভরপুর–
জটিলতার হিসাব শেষে, অফিস শেষের বিকেলে
রং হীন ক্যানভাসে, বসন্ত বিমুখ।

সময় চলছে ধেয়ে, তবু পিছনে তাকিয়ে দেখি,
তাকেই দেখি, সময়ের আড়ালে, একা ফুলটিকে–

 

বিষণ্ণ ট্রেন

শুধু কি সবার সামনে কাপড় খুললেই শ্লীলতাহানি বোঝায়!
তা বোধ হয়, না।
বার বার মৌখিক অপমানের পর
ক্ষত থেকে যে রক্ত গড়িয়ে পড়ে
তাও কি সে-ই শ্লীলতাহানিই নয়?
এই সব স্তব্ধতার দিন ও রাতে
আমি যেন প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা
শীতের বিকেলের বিষণ্ণ ট্রেন।
সমস্ত বিষময় ধোঁয়া
গিলে ফেলবার পর।

 

তারপর

এখানে লাল পাতা ঝরানো নিবিড় দুপুর
আচ্ছন্ন কবিতার মতো
চশমা লাগানো চোখে,
আমি তার বিষাদের রঙ দেখি।
সতেজ তরুণ-তরুণীরা এইসব উপেক্ষা করে–
কাটে জন্মোৎসবের কেক।
সব কথা শেষ হলে , অতঃপর
নীরবতার ফ্রেমে পরে থাকে
এইসব জলরং ছবি, আঁকা-বুকি

নিথর সময়-নিথর জীবনের মুখোমুখি।
ল্যাম্পপোস্টের বিষণ্ণতায়, হলুদ আলোয়
বিগত স্বপ্নগুলো হয়ে ওঠে, প্রতারিত ছায়া
বিবর্ণ হলুদ রং শুষে নিতে চায়
জীবনের শেষ উত্তাপ, অভিমান।

 

পায়ের উৎসবে

উদ্দামতার তরঙ্গের ভঙ্গিমায়
সাদা, কালো-বাদামী পাগুলো–
সারি সারি হেঁটে যায়, ছন্দে
ভাস্কর্যের উদ্ধত সৌন্দর্যে–
উরু থেকে নীচে, জৌলুস ছড়িয়ে।

সুনসান দীর্ঘ রাস্তায়, দৃপ্ত পদক্ষেপে
সবকিছু পার হয়ে চলে ওরা
রক্তে গতির নেশা,রং তাজা–

চোখে ঘোর লাগে, ঘোর কেটে গেলে বুঝি
জীবন থেকে বরখাস্ত আমি এক
তবু আড়ালে খুঁজি, দুরন্ত বলগা–
সুদূরের দিকে যতদূর চোখ যায়
ভাসে অনন্ত আকাশে, নিরুদ্দেশের বেদনা।

 

লেখক পরিচিতি

মণিকা চক্রবর্তীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তেরোটি। তিনি উপন্যাস, ছোট গল্প,কবিতা, প্রবন্ধ এবং অনুবাদের কাজ করেছেন। তাঁর লেখাগুলো বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় নানা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ‘যখন ভেসে এসেছিল সমুদ্র ঝিনুক’ দ্বিভাষীক কাব্যগ্রন্থ ‘অপার্থিব গান’, রাশিয়ার প্রথম সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী লেখক ইভান বুনিনের ‘মিতিয়াস লাভের অনুবাদ, ও ছোট গল্পের বই ‘হাওয়ার সংকেত ও অন্যান্য’ এবং ‘ছায়ান্ধকার’ ইত্যাদি। প্রবন্ধের বই, ‘মেঘের আখরগুলো,’ পাঠকের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। ২০২৬ -এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বারোটি গল্প নিয়ে ইংরেজি অনুবাদ বই, ‘Beyond The Body And Other Stories’। বইটি পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে।

লেখালেখির বাইরে তিনি বাগান করেন এবং সংগীতের অনুরাগী। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top