‘এত যুত কইরা সেলাই দেই—তাও সালার সুপারভাইজার বকা দেয়—এটা বাঁকা হইছে তো সেটা বাঁকা হইছে। সুঁচ ঠিকভাবে বসে নাই। সুঁচ ওর জায়গামতো দিলে বসবে ভালা কইরা।’
তামান্না ফোঁসফোঁস করে আর পাশের মেশিনের শায়লাকে এভাবে বলতে থাকে। কাজ তাদের বন্ধ হয় না।
একটু বাথরুমে গেলে এসে দেখবে বিশ-পঁচিশ পিস বডি ঝুড়িতে জমা হয়ে আছে। সেই জমার কাজ শেষ করতে গিয়ে ঘাম ছুটে যায়। তার ওপর লাইন সুপারভাইজার জবেদা তো আছেই। এর জ্বালায় তামান্নার কাজের গতি কমে যায়। যখনই সে ঝুড়ি প্রায় ফাঁকা করতে বসে, তখনই জবেদার চেলা টেকনিশিয়ান সামাদ আর কোয়ালিটির বাবু এসে তার কাজে খুঁত ধরে। সেলাই বসে না, সুতা আলগা হয়, পাকারিং—ইত্যাদি ইত্যাদি।
মেশিনে এক নাট খোলে তো আরেক নাট টাইট দেয়।
তামান্না কাজ আগাবে কী! তার কাজের গতি আরও কমে যায়। আবার ফ্লোর ইনচার্জ যখনই এসে দেখে ঝুড়িতে অনেক বডি জমা, তখনই পুরো ফ্লোর মাথায় তোলে।
‘এ লাইনের সবাইকে ছাঁটাই করতে হবে, এরা কোনো কাম পারে না। বডি পার না করলে আমার চাকরি থাকবো?’
তারপর জবেদাকে ডেকে ইচ্ছামতো বকাঝকা করে সে অন্য লাইনে চলে যায়।
তামান্না এ অফিসে মাস দুয়েক হলো জয়েন করেছে। এর আগে একটি বিদেশি ফ্যাক্টরিতে মেশিন অপারেটরের কাজ করত। কী পরিবেশটাই না ছিল সেখানে। যিনি বিদেশি মালিক, তিনি হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাওয়ায় তাঁর শেয়ার দেশি মালিক কিনে নেয়। তারপর শুরু হয় ছাঁটাই।
সেখানে অনেকের সঙ্গে তামান্নারও চাকরিটি চলে যায়। মাস দুয়েক ঘুরে এই বাঙালি ফ্যাক্টরিতে জয়েন করেছে সে।
সকাল ৭টা থেকে অফিস টাইম শুরু। দুপুরের খাবারের জন্য এক ঘণ্টা দিলেও সেই এক ঘণ্টা পূরণের জন্য এক ঘণ্টা আগে অফিস শুরু হয়। প্রতিদিনই ৩-৪ ঘণ্টা করে ওভারটাইম করতে হয়। ওভারটাইম না করলে যে বেতন, তাতে ঘরভাড়া দিতেই শেষ হবে। দুই মাস যখন তামান্নার কাজ ছিল না—চলতে খুবই কষ্ট হয়েছে তার।
বাপ-দাদা তোর আর জমিদারি রাইখ্যা যায় নাই—শুধু জন্ম দিয়াই শেষ—বাঁচো এখন নিজের মতো।
তামান্না শুধু নিজের সঙ্গে সমাজের মানুষের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করে। সে ভাবে, যদি কখনো টাকা-পয়সা হয় একজন লেখক নিয়োগ করবে সে। যে লেখক তার জীবনের সত্য ঘটনাগুলো কলমের ডগা দিয়ে কাগজে বন্দি করবে। মানুষ পড়ে যদি বুঝে একজন তামান্না কীভাবে ভেতর থেকে মরে যায়।
তামান্নার কোনো কষ্ট-দুঃখই আর তেমন শরীরে লাগে না। জবেদা, টেকনিশিয়ান সামাদ, কোয়ালিটির বাবু বা ফ্লোর ইনচার্জ কাইয়ুমের কোনো কথাই সে গায়ে মাখে না। মুখে যাই বলুক, শরীরে তো আর হাত দেবে না। অবশ হওয়া মনের আবার শরীর! তামান্না ভাবে।
কোয়ালিটির বাবু বেহাইত্তা স্বভাবের—মাঝে মাঝে তামান্নারে উল্টাপাল্টা কথা বলে। সকালে চুল ভেজা থাকলে খোঁটা দেয়—
‘কী রে তামান্না, চুল শুকানোর টাইম পাস নাই? কী রে, গোসল না কইরা আওন যায় না? এই যে আমি তিনদিন থাইক্যা গোসলের সময় পাই না।’
তারপর বাবু হি হি করে হাসা শুরু করে। তামান্নার শরীর কাঁচা মরিচের মতো জ্বলা শুরু করে। বাবু থামে না—
‘ভেতরের লাল ফিতা কবে কিনলি! সাইজ কত রে এটার? বেশ ভারী তো মনে হয়।’
ফের তার কাটখোট্টা হাসি শরীরে আগুন ধরায়। তামান্না মাঝে মাঝে ভাবে, এই শুয়োরটারে একদিন কষে গালে একটা চড় বসিয়ে দেবে। কিন্তু সে চাকরিটার কথা ভাবে। মাত্র দু’মাস কাজ না থাকায় কী সংকটেই না তাকে পড়তে হয়েছিল। সে মনে মনে মেনে নেয়—লাল ফিতাই তো দেখছে, ধইরা তো আর টান দেয় নাই।
লাইনের তামান্না একটু দেখনেহারা। কোঁকড়ানো রেশমি চুল, দুধের সরের মতো শরীর—দোহারা গড়নের। ফিটফিটে লম্বা, আবার ফর্সা। এমনিতে অন্য লাইনের দু-একজন পুরুষও হুদাহুদি তার লাইনে এসে ছবক দিয়ে যায়।
‘কী রে নায়িকা, কাজ পারস! তোরে তো দেখতে শাবনূরের মতো লাগে। তোর টিকটক আইডিটা দিস তো।’
তারপর ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো নাচতে নাচতে ফ্লোর পার হয়। তামান্না ওই দিকে কান দেয় না। সে মেশিনের দিকে মন দেয়। বডি জমলে আবার বকাঝকা শুনতে হবে।
তামান্না ভালো কাজ পারে না বলে জবেদা এইচআরে অভিযোগ দিয়েছে। ফ্লোর ইনচার্জ তামান্নাকে অপারেটর থেকে বাদ দিয়ে অন্য লাইনের হেল্পার হিসেবে দেওয়ার কথা বলেছে।
তামান্নার দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে। মেশিন অপারেটর থাকলে একটু বসে কাজ করা যায়। বেতনও একটু বেশি। কোয়ালিটিতে সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। বসার কোনো সুযোগ নাই। তামান্নার এমনিতেই কোমরব্যথা। মেরুদণ্ডের সমস্যা। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে তার শুয়ে রেস্ট না নেওয়া পর্যন্ত ব্যথা সারে না।
জবেদা তামান্নাকে ডাক দেয়—কানে ফিসফিস করে কী যেন বলে!
সেদিন তামান্না পুরো অফিস সময়ে আর কারও সঙ্গে তেমন কথা বলেনি। মেশিনের কাজ দ্রুত চলতে থাকে। অন্যদিনের মতো বডি আজ আর জমেনি। ওয়াশরুমে বেশি সময় কাটালেও জবেদা এসে খেঁচখেঁচানি করেনি।
উলাইলের বংশী নদীর পাড়ে ব্যাংক টাউনে অনেকগুলো আবাসিক ভবন। কারখানার বড়ো বড়ো কর্তারা সেখানে ভাড়া থাকে।
পরের দিন সকালবেলা তামান্না সেখানকার একটি বহুতল আবাসিক ভবন থেকে বের হয়। সে ভবনের তিনতলায় ফ্লোর ইনচার্জ কাইয়ুম থাকে।
হাঁটা রাস্তা পেরিয়ে রিকশা নিয়ে রওনা দেয় কারখানার দিকে। ওড়নাটা বুকে জড়িয়ে সদ্য ভেজা রেশমি চুলগুলো খোলসা করে। আশ্বিনের হালকা শীতের সকালের দোলনাছনে বাতাস রিকশার গতিতে হামলে পড়ছে তার ভেজা চুলগুলোয়।
লুৎফর রহমান মণ্ডল

জন্ম, বেড়ে উঠা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সাংবাদিকতার হাত ধরে লেখালেখি শুরু। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় তাঁর লেখা কলাম, ফিচার নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। এখন নিয়মিত গল্প লিখছেন। কর্মজীবনে তিনি ব্যাংকিং পেশার সাথে আছেন।
