নাইম আহমেদ: একদিন তুমুল মরে যাব হুটহাট, মুহুর্তের কফিনের ভিতর থতমত কর্পূরের মতন ও অন্যান্য কবিতা

একদিন তুমুল মরে যাব হুটহাট, মুহূর্তের কফিনের ভিতর থতমত কর্পূরের মতন।

একদিন তুমুল মরে যাব হুটহাট, কানে কর্ডলেস ইয়ারবাড গুঁজে (ওটা লোকদেখানো। কেননা হৃদয়ে মৃত্যুর বেহালা বেজে উঠলে থেমে যায় জীবনের গিটারসমূহ) তখন রাত চারটা তিরিশ বাজবে নির্ঘাত, যেহেতু এটাই তুমুল মৃত্যুর অদ্বিতীয় সময়।

জীবনানন্দের মৃত জোছনারা হেমন্তের শহরের এলোমেলো পিঠে ঝুলে থাকবে। ধুকপুক লালচে সমুদ্র দেখা যাবে টার্মিনাল থেকে ডলফিনের মোড় পর্যন্ত যে ঢাল, সেখান থেকে যতদূর চোখ যায়। (ওটা হাঙর, ডলফিনের আশা ছেড়ে দাও। ওরা অনেক দূর, কতদূর? ঠিক কতদূর গেলে দূরত্বকে কাছে পাই আমরা। ঠিক কতদূর গেলে, জানো?)
আমি ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই নেমে আসব পথে। আর একটা পাথর বোঝাই ট্রাক (হতভাগা একত্রিশ বছর ধরে ভুল রাস্তায় হাঁটছিল), আমাকে মিলিয়ে দেবে এক মুহূর্তে। বিষণ্ন নির্দ্বিধায়।

শহর ঘুমিয়ে গেলে শরীর খুলে যায় দিকবিদিক, মানে বৃষ্টিবাহী অ্যাম্বুলেন্স অথবা মুহূর্তের কফিনের ভিতর থতমত কর্পূরের মতো। এটা সময়েরই দাবি ছিল। এগুলোকে পলায়ন বলে রাজনীতি করার কোনো প্রয়োজন নেই। ঘুম ও রাজনীতি সবার জন্য না।

কোথায় কে ভালো আছে? জানা আছে? নেই? যেটুকু দেখিয়েছি, সেটুকুই দেখতে পেরেছো। এর বেশি গভীরে ভ্রমণের প্রয়োজন ছিল না কোথাও। তবু সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসতে নেই কাউকে, কখনই। বেঁচে থাকা নেহাতই পানসে হয়ে যায় তখন।

যখন জীবিত ছিলাম দুজন দুজনের কাছে, বলেছিলে: মৃতের শরীর ছুঁয়ে দেখো, সুযোগ হলে। হৃদয়ের থেকে শীতল আর কেউ নেই, কখনই। কিন্তু শরীরের হাতে হাত রাখলে ভিজে ওঠে করতল ও ঠোঁট। লাল রঙে। আমার সবগুলো হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ওরা। অথচ আমারই চোখে চোখ রেখে কথা বলে আজকাল। আমারই ঠোঁটে ঠোঁট রেখে হিস্যা চাই, চুম্বন আর সিগারেটের। যেন ভুলে গেছে বেমালুম, ঘাতক ও নিহত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
তাই তুমুল মরে যাব হুটহাট। তখন রাত চারটা তিরিশ। টার্মিনাল থেকে ডলফিনের মোড় পর্যন্ত। মুহূর্তের কফিনের ভিতর থতমত কর্পূরের মতন।

১৯ এপ্রিল ২০২৩/ এইট ডেইজ এ উইক, লাবণী পয়েন্ট, কক্সবাজার।

 

তবু, ক্ষতের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে, মানুষ বলেই – ভালোবেসে ফেলি আমরা।

কারও বিষণ্ন কষ্টের কারণ হয়ে বেঁচে থাকার মতো গ্লানিকর আর কোনো দণ্ড হতে পারে, প্রিয় যাবজ্জীবন?
মানুষ বলেই, ভালোবেসে ফেলি আমরা, বিধিনিষেধের নিকুচি করি খুব। হৃদয় বলেই খণ্ডিত হয় ক্ষত।
আমি প্রতিদিন দরজার সামনে এসে ভুলে গেছি পথ। পথের সামনে এসে বিভ্রান্ত হয়েছে ঠিকানা এবং তুমি। কলিং বেলের বুকে মাথা রেখে ফিরে গেছে গন্তব্যসমূহ। আর জুতো থেকে নিজেকে খুলে রাখার মুহূর্তে, খুঁজে পাইনি পা এবং হাত দুটোর কাউকেই। ওদের খুঁজতে গিয়ে, কী যে বিরান লাগে আমার সন্ধ্যা এবং শহর। তাই ঘরের সামনে এসে ঘর না পেয়ে ফিরে আসি, লিফটে উঠে গুলিয়ে ফেলি অনন্তকাল, আমাকে উঠতে বা নামতে হবে কততলা? থামতে হবে ঠিক কোথায়?
ক্ষতের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ক্ষয় হচ্ছি রোজ, খণ্ডিত খুব।
ঠিক যেমন: কিছুই হয়ে ওঠে না। “তবু অযথাই অনেক কিছু এতদিন ধরে আমাদেরকে – দখল করলো।”

২৭ – ৩০ মে ২০২৪/ এইট ডেইজ অ্যা উইক, লাবণী পয়েন্ট, কক্সবাজার।

 

লাশ হতে হতে যাঁদের ডোম-শিল্প জানা হয়নি কখনো।

লাশ হতে হতে যাঁদের ডোম-শিল্প জানা হয়নি কখনো। একটা থেঁতলানো সকালের পোস্টমর্টেম করার জরুরি দরকার ছিল। কেন এভাবেই জোর করে টেনে তুলতে হয়? তাহলে কি সব শেষ হয়ে গেছি অলরেডি, শুধু অনর্থক বয়ে নিয়ে যাচ্ছে দিনগুলো, অনেকগুলো ডেডএন্ডে?

যেদিন আমরা হুট করে একটা চাঁদ খুঁজে পেয়েছিলাম, ক্লান্তিকর লাল আর মুমূর্ষু। বেচারা, বোরিং বাস্তবতা থেকে পালাতে গিয়ে একটা পিচ গলা রাস্তায় আটকে গিয়েছিল, জাস্ট ফর এ সেকেন্ড। তারপর, কালো ধকধক পিচের উষ্ণতা, সাথে সূর্যের বৃষ্টি আর জীবনের মেঘে মিলে মিশে কী যে গ্লানিকর এই বেঁচে থাকা!

তাই, আমিও তোমাদের দলে ভিড়ে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতরে কেবলই নিঃসঙ্গ বিরোধিতাদের মধ্যে গুটিসুটি বসে ছিল একজন পক্ষপাতিত্ব। যেন, মাছেদের মতো করে দৃষ্টির জল দৃষ্টিতেই জ্বলে গেল খুব!

২৩ – ৩০ মার্চ, ২০২৪/ এইট ডেইজ অ্যা উইক, লাবণী পয়েন্ট, কক্সবাজার।

 

যে ছিল, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনও, পালানোর আগে বা পরে।

মাঝে মাঝে নিজেকে নিজে টেক্সট দিই। রিপ্লাই করব নাকি চুপ থাকব, ইন্ডিসিশনে ভুগতে ভুগতে, সিন হওয়ার আগেই আনসেন্ট করে ফেলি আচমকা। নিজের নম্বরে কল দিয়ে দেখি, ওপর প্রান্ত ব্যস্ত ভীষণ। বাট তোমরা যারা এগুলোকে একাকীত্বের জন্য হাহাকার বলো, এগুলো আসলে অস্তিত্বের সংকট।

যারা ভেবে দেখতে চায় একটু ভিতরে, মানে অ্যাটলিস্ট চোখের পিছনে যে মঞ্চ মনের রক্ত সেচে মুক্তো কুড়োতে গিয়ে ম্লান হয়ে গেছে। তারা বুঝবে, মানুষ দিনশেষে কত একা, অসহায় আর বিষণ্ন। এই এত নেটওয়ার্কিংয়ের ভিড়ে গুমড়ে হাসফাঁস, স্ট্যাটাস আর ইমেজের ক্লান্ত অক্সিজেন মাস্ক মুখে।

যেভাবে দরজা খোলা থাকলেও কখনও কখনও ভিতরে যাওয়া যায় না। নামের পাশে সবুজ আলো জাজ্বল্যমান তবু মানুষ মরে গেছে নিজের গহীনে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধূধূ শূন্যতা জুড়ে এখন যেখানে কেবল পলাতক প্রত্যেক নিজস্ব সত্তা (যে ছিল, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনও, পালানোর আগে বা পরে)।

২৩ জুন ২০২২/ এইট ডেইজ এ উইক, লাবণী পয়েন্ট, কক্সবাজার।

 

যেন আকাঙ্ক্ষার খাদ জুড়ে গড়ে উঠছিল জীবন।

ভেঙে পড়ছে সব। এর মধ্যে আমরা অসংখ্য ছেঁড়া পাল বুকে ছুটে চলছি। ভেঙে যাচ্ছে সময়। ফালি কুমড়ো একটা দুপুরবেলার। অবাধ্য প্লেটলেট যেন।

আমার রক্তের সমস্ত ইটভাটা হয়ে গেল নীল জারুল। গলার ভিতর গর্জনের স্লিপার – কলিজা থেকে অক্সিজেন বয়ে আনছে তন্দ্রার মেল ট্রেন। বৃষ্টি নামছে নীল রঙ গলে। সুয়ারেজের পালতোলা অন্ধকারে আটকে আসছে শহরের চোখ। ভেঙে পড়ছে সূর্য। সাদা রঙের খই যেন এক ঝুড়ি। সমস্ত শহর জুড়ে দুর্বার কালো একটা অ্যাম্বুলেন্স ছুটে গেল। আর সব জারুল ফুল হয়ে ঢুলছে নীল ব্রোমাজিপাম।

তোমার ভয় নেই কবিতা। তোমার জন্য পৃথিবীর সর্বশেষ ব্লাড ব্যাংক রেখে যাচ্ছি। তুমি ভাঙবে না। ডুববে না। গলবে না। অথবা তোমাকে গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিয়েছি বলে পথ এত মজবুত। টলমল হাতির ঝিল, তোমাকে ডুবিয়েছি বলে স্বপ্নগুলো এমনই ভঙ্গুর। উড়িয়েছি বলে বাতাসে কেবল মাস্তুলের লবণ দোহাই। অথবা তোমাকে পুড়তে হবে পেট্রোলিয়াম। বলতে হবে মুঠোফোনে: ভালো আছি। উড়ে উড়ে ঢাকতে হবে মুখ-আঁচল-ফ্লাইওভারের ফ্লোরোসেন্ট ডানা।

তোমার ভ্রূণ। আমার বীর্য। আমাদের সন্তান। শরীর শুষে বেঁচে থাকা? হঠাৎ কবির চুল, পশম দুর্দান্ত পালক হয়ে গেল। আর কবিতা ভেঙে পড়ল একটা কিশোরী মোনুমেন্টের মতো। যেন আকাঙ্ক্ষার খাদ জুড়ে গড়ে উঠছিল জীবন।

২০১৩, মাস্টারদা সূর্যসেন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা।
 

অথবা হতে পারে, এগুলো কেবল ওভার থিংকিং।

আমাকে ডেকো না মেঘ, আমি খুব হারানো মানুষ। দরজা লাগিয়েই হারিয়েছি চাবির গোছা। রিকশায় মানিব্যাগ। অফিসে জুতো আর কফিশপে ল্যাপটপ।

এ শহর ভুলোমন। এ সময় এলোমেলো। আমাকে ডেকো না মেঘ। আমি খুব হারানো মানুষ।
আসলে ভালোবাসার থেকে ঘৃণা বেশি শক্তিশালী। তার থেকে বেশি অভিমান। তারও থেকে বেশি, আত্মগ্লানি। তবে তারপরও। কিছু কিছু উপেক্ষা প্রাপ্তি-অপেক্ষা শ্রেয়। যেমন, তোমার চারপাশে ঘুরে মরি। কত কিছু বলার থাকে। বলব বলব করে থমকে যায়। তুমি ব্যস্ত ভীষণ। কখনও জীবন্ত আর কখনও জীবনের মুখোশ মুখে ক্লান্ত। অথবা হতে পারে, এগুলো কেবল ওভার থিংকিং।

“কখন কিসের টানে মানুষ, পায় যে খুঁজে বাঁচার মানে।” – আমি বলিনি। অঞ্জন বলে গেছে। আমি এতটা সত্যি বলার সক্ষমতা এখনও অর্জন করতে পারিনি। তাই তোমার লাল নীল হাসিতে ভারী শহরটা চাপা পড়ে রয়, অনন্ত কিছুক্ষণ। মানে সন্ধ্যা শেষে রাতের শুরু।

জানো? আজকাল রিকশা আর অটোওয়ালাগুলোও জেনে গেছে সব আদ্যোপান্ত। ভুলেও জানতে চায় না আমার কাছে, “কোথাও যাবেন? কোথায় যাবেন?”
অথবা হতে পারে, এগুলো কেবল ওভার থিংকিং।

২৯ জুন ২০২২/ এইট ডেইজ এ উইক, লাবণী পয়েন্ট, কক্সবাজার।

 

তাই আসো, বেঁচে উঠি পুনর্বার প্রিয় মেলানকোলিয়া!

কেউ কেউ জোছনা আর চাঁদের মাঝে থেকে বেছে নেয়: রাত্রির। জীবনের কিনারে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর দিনগুলো ভালো। অন্ধকারের সামনে নতজানু হাতের মুঠোয় মরে যাই, এফিমেরাল মেঘেদের ডানাসমূহ। আসো, বেঁচে উঠি পুনর্বার, প্রিয় মেলানকোলিয়া!

অ্যাবসলিউট সাবমিশনের দিনগুলোতে তোমারই ঠোঁটের নিচে তিলের কাছে। আত্মহত্যা করেছিলাম আমরা দুজন। লাল পাথরের গোঁড়ালিতে, ফিলোফবিক কালো সমুদ্র। অথচ আমাকে খুঁজে পাবার পর জানা গেল, আমার সাথে সেদিন কেউই ছিল না!

১০ অক্টোবর, ২০২৪ এইট ডেইজ অ্যা উইক, লাবণী পয়েন্ট, কক্সবাজার।

 

নাইম আহমেদ 
জন্মদিন : ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ ,
জন্মস্থান : কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।
লেখাপড়া : স্নাতকোত্তর (সমাজবিজ্ঞান , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সোশ্যাল পলিসি, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়)
বর্তমানে উন্নয়ন কর্মী হিসেবে কক্সবাজারে কর্মরত। মোবাইল ও হোয়াটস-অ্যাপ : +৮৮০১৮৩২৫৯২৯৩৩, ই-মেইল : [email protected]

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top