ইতিহাসের লোকজন
নর্দা পেরুলেই আমাকে নেমে যেতে হবে
পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কিছু নেই
আমরা যে-যার মতো ইতিহাস লিখি বলে
পৃথিবীর ইতিহাস সুসমন্বিত নয়
আমরা যে-যার মতো নেমে যাই
অথবা আমাদেরকে ফেলে কে-বা-কাহারা
নেমে যাচ্ছে পথে সৃষ্টিলগ্ন থেকে
এই যে যে-যার মতো নেমে যাওয়া
গুলিস্তান অথবা জিরাবোয়
কিংবা এই যে নর্দা পেরুলেই আমাকে কোনো একদিন
নেমে যেতে হবে
যদিও আমার পিঠের ওপর
দৃষ্টি ফেলবে একশো জোড়া চোখ
আসলে আমরা কেউ কারো নই বলে
পৃথিবীর ইতিহাস সুসমন্বিত নয়
আমাদের জানা নেই
এত অচেনা লোকের ভিড়ে
একটি শহর কখনো কারো চেনা হতে পারে না
আর ইতিহাস তো এইসব অচেনা অজানা
অলিখিত বিষয়-আশয়
আজ নর্দা পেরুলেই আমাকে নেমে যেতে হবে
পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কিছু নেই।
পাখি
পৃথিবী তুমি বিপরীতক্রমে ঘুরে এসে সামনে দাঁড়াও
আমাকে একবার অসংসারী ডানা মেলে উড়ে যেতে দাও
যদি পাখা পাই, হে পৃথিবী, উড়ে যাব— কার কাছে যাব বলো—
মায়ের পেটের ভেতর?— মা ভালোবাসে না আমাকে;
অথবা প্রেমিকা?— আমার চুম্বন যার প্রতারক প্রেমিকের স্মৃতি বয়ে আনে!
—কে দেবে আমাকে দেহের অধিক কিছু?
ইচ্ছা হয় একা হয়ে যাই,
কারো মন থেকে চিরতরে মুছে যাই,
ওই আকাশে নীল হয়ে ঘুরে বেড়াই;
আকাশই-বা কী দিতে পারে বিপুলতা ছাড়া?
—ক্ষুদ্রতার মতো বিপুলতাকেও আমার ভালো লাগে না;
তবে কি ডানায় ভর করে মরে যাব?
—তাতেও যে ভয় লাগে; যদি ব্যথা পাই!
আমার কোনো স্মৃতি নেই অথবা সংসার,
দৈনন্দিন ক্লীব লাগে— বড়োই অসার;
যদি মরে যাই, তুমি বলো দেখি
কেন মরে যাব, কেন মরে যাই?
—বরং পতঙ্গ করো, হে পৃথিবী, আমাকে
খেয়ে নিক কোনো পরিযায়ী পাখি!
মতিভ্রম
সুদীর্ঘ সময় ধরে, অন্ধকারে
যেটুকু দেখেছি, তাকিয়েছি
যতটা সময়, মনে হয়
সেটুকু প্রকৃত দর্শন; এমন
অন্ধকারেই চেনা যায়, পায়
প্রকৃত স্বরূপ, অপরূপ
যাহা-কিছু তাহা-কিছু পিছু
হাঁটে অন্ধকারেই; আলোতেই
সব মিথ্যে হয়ে যায়, হায়
এই চেনাজানা, এই জানাশোনা
—অন্ধকারে দুয়ে-দুয়ে চার, আর
আলোতেই কিছু-কম, কিছু-বেশি
পাখি জানে, মানুষ কি এখনও জানে না!
পাখি জানে, তার পাখি
যতটা পারে
তার চেয়ে বেশি পারে না
কোনো নরকের কীট;
জীবনের মধ্যদেশে এসে
একটি পাখি তাই মরে যেতে চায়
আর আমি গভীর আবেগে তার এপিটাফ লিখি;
তার ব্যর্থ মুখ আয়নায়
ভেসে ওঠে— একটি পাখির ছানা
তাকে মরে যেতে দেয় না;
পাখি জানে, মানুষ কি এখনও জানে না—
সঙ্গী যা দিতে পারে, তার বেশি তাপ দিতে
কখনো পারে না কোনো দোযখের ওম
তাই কি মানুষেরা বেঁচে থাকে
আর বেঁচে থাকে নীল আকাশ, দু-একটি পাখির ছানা
কতদিন আমিও ভেবেছি—
পৃথিবীর বৃক্ষ-ফুল-নদী আর আকাশের আলো
সব ফুরিয়ে গেলে
এ দারুণ সংসার, তার মাকে চিনে চলে যাব দূরে—
সেখানে যদিও কেউ নেই, তবু কেন ভেসে ওঠে কোনো
পিতৃহীন মুখ— পাখির পালক
—আমি তাই মানুষের মতো বেঁচে থাকি
আমি তাই পাখিদের মতো বেঁচে থাকি
দূরত্বের দেয়াল ভেঙে মৃত্যু আমার আর
নিকটে আসে না
—পাখি জানে, মানুষ কি এখনও জানে না!
একগুচ্ছ জুঁই
৬.
মার্কিন যুদ্ধবিমান আকাশে মহড়া দেয়
স্থল পথে তোমার প্রেমিক
জানি, জুঁই, তোমাকে পাহারা দেয়
—কোন পথে তোমার কাছে যাব!
৯.
তোমাকে ভালোবেসে অন্ধকারে
খেয়ে নিয়েছি নষ্ট বাদাম
হারিয়ে ফেলেছি লাল ফুল
বুঝেছি— ঈশ্বর আছেন
তারও বেশি আছে তোমার মহিমা
জুঁই, শুধু তুমি নাই।
১১৩.
কফিশপ— মুখোমুখি বসে আছ; তবু তাকালে না—
তুমি বাইরে তাকিযে আছ;
‘যে দিকে তাকাও দেখতে পাবে
একটি কালো মুখ, তার বড়ো বড়ো জুলফি’—
এই কথা বলতেই, কালো কোনো মুখ দেখবে না ভেবে
চোখ ফিরিয়ে নিলে কফির মগে—
সেখানে দেখতে পেলে সেই কালো মুখ;
তার বড়ো বড়ো জুলফি!
—জুঁই, আজ একটি বার আমার মুখের দিকে ফিরেও তাকালে না!
১১৫.
একটি দেশের ছবি এঁকে ঢুকে পড়েছিলাম
তারপর একটি শহর ও এক
নির্জন কক্ষ ছিল— তা-ও এঁকেছিলাম;
থরে থরে সাজানো ছিল বাংলা-ফাইভ,
গ্রে গুজ; নানান অচেনা শয্যা ছিল
তাতে— আঁকিনি, এমনিতেই ছিল;
তাতে কী লাভ হয়েছে বলো, জুঁই—
তুমি তো আমাকে ভালোই বাসো না!
১১৬.
জুঁই, তোমাকে হৃদয় দিয়েছি, ভেবেছি
সেখানে লুকাবে তুমি; অথচ লুকালে তোমার
সত্তার আড়ালে— তবু কত-যে তোমাকে খুঁজেছি;
এভাবেই দূরে সরে যাও— তোমাকে খুঁজে আমি পাই না কোথাও
যদিও দু-চোখে আছ, আমি তো অন্ধজন
আমার ভালোবাসা, সে তো ‘বীজ’— অসিদ্ধ-অপেক্ষা, তুচ্ছ, অসার
লিপিবদ্ধ অজ্ঞানতায় কতদিন তোমাকে আমি আকাশে রেখেছি!
আকাশে তাকালে তোমার জন্যে কান্নাগুলো মাটিতে পড়ে যায়;
—জানি না কেন জুঁই, আমি তা কুড়িয়ে নিই, আবার দু-চোখে রাখতে চাই!
অভী চৌধুরী

সংগীতশিল্পী ও গবেষক। ভাষাদর্শনও তাঁর আগ্রহের জায়গা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর, এম ফিল ও পিএইডি সম্পন্ন করেছেন তিনি। প্রকাশিত কবিতার বই: অবেলার গান (২০০৮), একগুচ্ছ জুঁই (২০১৩) এবং প্রেমের কবিতা (২০১৬)। প্রকাশিত প্রবন্ধের বই: নিহিতার্থের খোঁজে (২০১১) এবং রবীন্দ্রনাথের গান: গানের তথ্য গানের সত্য (২০১৬)
