সাদিয়া নাজিবের একগুচ্ছ কবিতা

১. দুটুকরো ক্ষৌমবস্ত্র জড়িয়ে ঊষাকালে ঘড়ায় তুলছ জল

কামধেনু দোহন করে বিল্বপত্রে ভরছ অমৃতসুধা
পাতার ছাউনি ঘেরা ঠাঁই।
তুমি মৃত্তিকাজাত ধূপসঞ্চারী বায়ু
চিকুরে মায়াবতী ভাটফুল, আর শতনদী মেখলা
অচঞ্চল গ্রীবায় আকাশমুখী বলাকা
তোমার পাখনার ওমে জেগে ওঠে চরাচর
উনুনের আঁচে আরক্ত পয়োধর।
বিজরির উদ্ভাসন মৃত্তিকাময় করে তোলে তোমাকে
চিররজস্বলা ভূমির মতো চির-উর্বরা নারী।
কখনো দেবী, কখনো অশুভসংহারী
বুনে চলেছ চিরকালীন এক পাললিক নকশীকাঁথা
আদিম গন্ধ নিয়ে নিষ্ঠাবতী কিষাণি তুমি দশভুজা
পায়ের মল ছিঁড়ে, অসুর বিনাশ করে হয়েছ সর্বজয়া।

 

২. আদ্যাশক্তি

গভীর নিস্তব্ধতা।
ঋষিতুল্য তার ধ্যান!
অচঞ্চল এবং আড়ষ্টতা জেঁকে বসে আছে।

অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তেও,
অন্ধকারই আছে লেপ্টে।

নিষ্পন্দ বাতাস, বধির আকাশ আর ধর্ষিত মাটি
ফেরাতে পারে না জলের তরঙ্গ
এমন নিথর ক্ষণ বৃত্ত কেটেছে যাপিতযজ্ঞে।

দুর্বিনীত সময়ের এই মৌনব্রত
ভাঙি কোন সুরে!

আমাকে একটি বাঁশি দাও,
আমি দীপকরাগে তোলপাড় করব মৌনতর আঁধার।

তোমরা তাকে মুরলী বলো আর বংশীই বলো
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য
ফুঁৎকারে দেব উড়িয়ে।

আমাকে একটি বাঁশি এনে দাও,
অচেতন এই নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে যাক
চুরমার হয়ে যাক।

৩. দুর্বিনীত সময়

হরিতকী বনে চলো,
চলো ঝাউবনে।
তোমাকে চুমু খাব নিরালায়।

শহরে ভীষণ কোলাহল,
ঘরের দরজা আটকালেই সবাই ভাব
মেতে উঠছি বুঝি তুমুল শরীরী ঘ্রাণে।
আসলে এভাবে প্রেম হয় না—
জঙ্গলে চলো

কাদামাটি মাখা, তোমার আদিম কৃষক শরীরের
নুন চাখি, কবোষ্ণ ঠোঁটে!
কক্সবাজারের সৈকতের চেয়েও
দীর্ঘতর হবে সেই চুম্বন।

নোনা জলে ধুয়েমুছে যাক আর সব
পার্থিব যা কিছু।

একটি দীর্ঘ চুম্বন অপেক্ষা করছে
অনাদিকালের শিলাস্তরে প্রবল আঘাত হানবে বলে
জলে জঙ্গলে ঝাউ হরিতকী বনে।

 

৪. অপার্থিব

ততদিন তিনি কবিতা লিখতেন
যখন দামাল ছেলের দল
বৃষ্টির দিনে কাদামাটিতে ফুটবল খেলত হুলুস্থুল,
আর সন্ধ্যাবেলায় মায়াবতী মেয়েরা
হাতের মুঠো খুলে ওড়াত জোনাকি।

লাউয়ের মাচা থেকে গড়িয়ে পড়া শিশিরে
পিছলে পড়ত পিঁপড়েরা

কবি তখন লিখতেন কবিতা।

বাজারের থলেতে উঁকি দিত পুঁইডাটা আর
কচুরমুখির গায়ে লেপ্টে থাকা কুচোচিংড়ি।
উনুনে জ্বলত গৃহস্থের গল্পের প্রদীপ

মা আউশ চালের হাঁড়িতে দিতেন দু-একটা
কজলা বেগুন আর মিষ্টিকুমড়ার ফালি
কবিতার খাতায় নেমে আসত তখন
তারার চেয়েও উজ্জ্বলতর শব্দগুচ্ছ
সেই আলোতে দাদি অনাগতের জন্য সেলাই করতেন
কইতা ফোঁড় আর বিছাফোঁড়ের অপূর্ব নকশীকাঁথা।

কলিমগঞ্জের হাট থেকে রাবারের জুতায় মসমস শব্দে
হেঁটে আসতেন বিমলকাকা।
তার টর্চের আলোয় তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে থাকতেন লেনিন
খাতার সব কবিতা মুখস্থ করেছিলেন চে গেভারা।

তখন তিনি কবিতার পর কবিতা লিখতেন।

কিন্তু বাড়িতে নিমগাছ লাগানো হয়নি
কবি চিনতেন না Fipronil, Imidacloprid এইসব
তাই মাটির ডোয়ায় অগোচরে বাসা বাঁধে উই।

কবিতার খাতাটি বাঁচাতে তিনি যখন এইসব চিনলেন
তখন কবি লিখতে ভুলে গেলেন জীবনের কবিতা।

৫. উইপোকা

একা হয়ে যাও তুমি
নিজেতে মগ্ন হও।
খোঁজো, অন্বেষণ করো, হাতড়াও
ততক্ষণ
ডুবে না যেতে পারছ যতক্ষণ!
এত এত মানুষের ভিড়ে এত বর্ণিল সম্পর্কে
আসলে নেই কোনো বাঁধন। এ মূলত শৃঙ্খল
শিল্প ধ্বংসের হাতিয়ার।
একা হয়ে যাও
একা হয়ে যাও তুমি
নিজের ভেতরে নিজে একা হতে হতে
নিজেতে লীন হয়ে যাও
এবার দেখো
একাকিত্বের কী অপরূপ সৃষ্টি!
শিল্পের অপার জগতে অবগাহন করো
বাঁচো, শিল্পের সাথে
একাকী নিঝুম মানুষ।

আত্মমগ্নতায়।

 

সাদিয়া নাজিব

প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পেশা: শিক্ষকতা
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: সাতটি

 

 

 

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top