শাহনাজ নাসরীন: এইসব মাথা ব্যথার দিনে

কে যেন বলেছে আবেগের মধ্যে থার্ডক্লাস আবেগ হলো অভিমান। অথচ অভিমান আমার শিরায় শিরায়। ছোটবেলায় যদিও জানতাম না যে অভিমান এত খারাপ আবেগ, তবু আমি অভিমান লুকাতাম। অভিমান করে নিজেকে বঞ্চিত করতাম খুব। সবাই হইচই করে মাঠে খেলতে যাচ্ছে, আমি মাথাব্যথার ভান করে পড়ে থাকতাম; কারণ খেলতে যাওয়ার জন্য আমার প্রাণ ফেটে যাচ্ছে আর নিজেকে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে আমি শোধ নিচ্ছি। একবার পাড়ার বড় আপার বিয়েতে সবাই খুব আনন্দ করল, আমার একটাও ভালো জামা নেই, মা-ও তার একটা শাড়ি দিল না পরতে—আমি নাকি নষ্ট করে ফেলব। তো ভান ধরলাম তীব্র মাথাব্যথার।

আজকাল আর ভান করতে হয় না। অভিমান হলে তীব্র মাথাব্যথা সত্যি সত্যিই হয়। মাথা এত ভারী হয় যে ছিঁড়ে পড়তে চায়। এখন বরং মাথাব্যথা অস্বীকার করে স্বাভাবিকতার ভান করি। ক’দিন ধরে তুমি আড়ে আড়ে লক্ষ করছ খেয়াল করেছি। আজ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছ কী হয়েছে, আমি অবাক হওয়ার ভান করে বলেছি—কী আবার হবে! তুমি বললে, “শিওর সব ঠিক আছে?” আমি লম্বা করে বলি, “হ্যাঁ-এ-এ, সব ঠিকঠাক।” কী করব, বিকারগ্রস্ত প্রেমিক যে আমাকে মৃতপ্রায় করে রেখেছে, তা তোমাকে বলা সম্ভব নয় যে!

এই করোনাকালে মৃত্যুর সাথে বসবাস করতে করতে দিনগুলো রাতগুলো মৃত্যুভাবনায় ঘিরে থাকে। দশ মাস বাড়ির বাইরে যাই না, তবু ঘুমাতে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই মনে হয় আজই শেষরাত। যেন খুব জ্বর এসেছে। থার্মোমিটারে টেম্পারেচার না পেলে মনে হয় থার্মোমিটার নষ্ট হয়ে গেছে। আবার ভাবি, করোনা তো আমার অন্তর্গত অশান্তির কাছে নস্যি! বরং অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক করে মরে শক্ত হয়ে থাকব, আর আগামীকাল ভোরে ঘুম ভাঙাতে গিয়ে আমাকে মৃত আবিষ্কার করে তুমি থ হয়ে যাবে। এরপর কি কাঁদবে হাউমাউ করে? মনে হয় না। তুমি যৌক্তিক আচরণই করবে। তুমি জানো মৃত্যু অবধারিত। কাজেই বাস্তববাদী তুমি শান্তভাবেই কর্তব্য স্থির করবে। নিশ্চিতভাবে আমার পরিবার এবং তোমার পরিবারে খবর দেবে। প্রথম ফোনটি কাকে করবে তাও জানি নিঃসন্দেহে। পরিবারের ডাক্তার সদস্যটিকেই প্রথমে ডাকবে সংগত কারণেই। আসলে সে আসার পরেই মৃত্যুটি নিশ্চিত হয়ে তারপর সবাইকে জানানোর ব্যবস্থা নেবে।

সেই সবার মধ্যে আমার বন্ধুরা অবশ্য থাকবে না। তোমার কাছে তাদের কারও ফোন নম্বর নেই, আর আমার মোবাইল তো তখন অটোলক হয়ে আছে। তুমি পাসওয়ার্ডও জানো না, তাই সেই মুহূর্তে ওটা খোলা তো সম্ভব হবে না। ফেসবুকেও তুমি অ্যাক্টিভ না, তাই দুঃখ-দুঃখ স্ট্যাটাস সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও শূন্য। কাজেই তারা যখন নিত্যকার ফেসবুকিং করছে, গ্রুপে কল দিচ্ছে আর আমার অনুপস্থিতি নিয়ে টুকটাক কিছু বলছে, ফোড়ন কাটছে আর হেসে কুটিপাটি হচ্ছে, কেউবা একটা মেসেজ রেখে দিচ্ছে—‘কী হলো? কোথায় তুমি?’—তারা কেউই জানবে না আমি তখন কবরে পচতে শুরু করেছি। অবশ্য জানলেও এই করোনাকালে ছুটে আসতে তো পারত না। আলোচনার মধ্যেই হয়তো স্মৃতিচারণের দুঃখগুলো গলে গলে পড়ত। তো দুঃখের আয়ুই বা কদিন; খুবই সামান্য।

তবে পাগলা টুসি হয়তো পরপর দু-তিনদিন মেসেজের কোনো উত্তর না পেয়ে মোবাইলেই কল দেবে আর ঘটনা জেনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আরও কাউকে কাউকে জানাবে। আমার ফেসবুক অ্যাডিক্টেড বোনের স্ট্যাটাস থেকেও দু-চারজন জানবে হয়তো। শুধু আমার রাগী প্রেমিক এক সপ্তাহের আগে কিছুই বুঝতে পারবে না। আমি কেন লিখছি না তা সে নিজে থেকে জানতে চাইবে না। বরং একটা গল্প নিজেই বানিয়ে নেবে। সর্বশেষ মেসেজের লেখাগুলো পড়ে পড়ে অন্তর্নিহিত অর্থ নতুনভাবে বুঝতে চাইবে, ভিন্ন অর্থ বের করতে চেষ্টা করবে, ঝগড়ার চিহ্ন খুঁজবে। অন্য কোনো ইঙ্গিত আছে কিনা এসব যাচাই-বাছাই শেষ করতে করতে খবরটি তার কাছে পৌঁছে যেতে পারে; তবে তার কুনো স্বভাবের কারণে কিছু জানতে না পারার সম্ভাবনাই বেশি।

যদি তখনও খবর না পৌঁছায়, ততদিনে তার রাগের পারদ সর্বোচ্চ মাত্রায় অবস্থান করছে। সেই রাগের কথা ভেবে আমি এখনই ঘামছি। এরকম অবস্থায় সাধারণত সে তোমাকে সবকিছু ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেয়। সুতরাং একটা হেস্তনেস্ত করার অভিপ্রায় জানিয়ে কঠিন হুমকি সংবলিত এসএমএস ইনবক্সে জমা হতে থাকবে।

তুমি করিৎকর্মা। হয়তো সেদিনই আমার ফোনের পাসওয়ার্ড ভেঙে এনেছ। আর সেই এসএমএস পড়ে তোমার ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠছে। বেঁচে থাকলে এরপর কী কী ঘটত আমি জানি; কিন্তু যে কিনা সব তাপ-উত্তাপের বাইরে, তাকে নিয়ে খুব মাথা ঘামাবে কি তোমার প্র্যাকটিক্যাল মন? তবে আগের মেসেজগুলো পড়তে পড়তে ইগো হার্ট হয়ে ফোনটা আছাড় মেরে চুরমার করার সম্ভাবনা প্রবল। আবার তার এই ধারাবাহিক মর্ষকামের বিবরণে কিছুটা আনন্দও হতে পারে আমি কেমন ধরা খেয়েছি বুঝে।

আমার যন্ত্রণাগুলো দেখে তোমার ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া হবে স্পষ্ট ধারণা করতে পারছি না আমাদের দীর্ঘ যৌথতায় আবেগ নিয়ে তেমন ডিল করা হয়নি বলে। বল এখন তোমার হাতে। স্মৃতিচারণ করতে করতে তোমার সামনে ততক্ষণে আমার মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হয়ে গেছে। ওকে এখন ইচ্ছেমতো খেলতে-খেলাতে পারো জানি। শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও নিতে পারো। কিন্তু তাই কি করবে তুমি? বোধহয় না। মানুষ হিসেবে তুমি উত্তম, এটা আমি নির্দ্বিধায় বলি। তবে সেটা ছাড়াও নোংরা ঘেঁটে যেহেতু লাভ নেই, আমাকে তো আর পাওয়া যাবে না শাস্তি দেওয়ার জন্য, তাই সেই যন্ত্রণা কাঁধে নেওয়ার মতো বোকামি তুমি করবে না; বরং ছোট করে আসল খবরটি দিয়ে দেবে এমনই মনে হচ্ছে। তাই করো প্লিজ। যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের মৃত্যু ঘটাতাম, তাহলে সব গুছিয়ে মরা যেত।

সম্ভাবনার হিসাব করে তোমাকে একটা সূত্র ধরিয়ে দিতে এই ভাবনার কথাগুলো যখন লিখে রাখছি, তখন আমার মরার প্রবল ইচ্ছা হেরে যাচ্ছে বাঁচার আকাঙ্ক্ষার কাছে। যদিও প্রতি মুহূর্তেই মরছি, তবুও যে আমার আত্মহত্যা করা হবে না তা বুঝে গেছি। যেন জীবন আর মৃত্যু এক বিন্দুতে স্থির হয়ে গেছে। বিষাদাক্রান্ত মন যখন প্রবল অবসাদে ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে, জীবন তখন ডাকছে—আরও কী কী সে করতে পারে, কতটা নামতে পারে তা জানার কৌতূহলে এবং আরও কত আমি সইতে পারি সেই চ্যালেঞ্জে। নিজেকে আরও ভাঙচুর করার তৃষ্ণা এখনও আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে।

 

শাহনাজ নাসরীন

শাহনাজ নাসরীনের জন্ম আষাঢ়ের এক বর্ষণমুখর বিকেলে কুমিল্লায় নানাবাড়িতে। বেড়ে ওঠা ময়নামতির কোল ঘেঁষে কুমিল্লার কোটবাড়িতে। দেয়ালপত্রিকায় ছড়া লেখা দিয়ে লেখালেখির শুরু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষে চাকুরি, সংসার ও লেখালেখি চলতে থাকে হাত-ধরাধরি করে।

কবিতার বই অসুখী পংক্তিমালা ২০০৩ এ প্রকাশিত হয়। এরপর ভালোবাসার এলিজি ২০০৬, নুন সত্য চিনি সত্য ২০১৫ ও প্রেমের কবিতা ২০১৬তে।

তিনটি গল্পগ্রন্থ -পরাজিত জীবনযাপন(২০০৩) , বামনের দীর্ঘ হাত(২০১২), অপ্রেমের গল্প(২০১৭)
উপন্যাস – দাঁড়ানো সময়ের মাঝামাঝি(২০১৫) ও ব্যক্তিগত রমণীয় সন্ধ্যা (২০২১)
জীবনীগ্রন্থ- নারী সাহসিকা (২০১২), কীর্তিময়ী নারী (২০১৯)
Email: [email protected]

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top