মনজু রহমানের পাঁচটি কবিতা

১. কারিগর

কাল কালান্তরে উড়ে কবে দেখা হবে কাল
আলো সরে আঁধার আসে যেন আদিবাসী
কালো মেয়ে, ভাঁজে ভাঁজে ভাঙে মহাকাল
খেলা সে অশুভ খেলা, বাজে কল্কির বাঁশি।

নেই কোনো গন্তব্য, সামনে বর্ষাকান্ত আকাশ
বৃষ্টির দাপটে ঝরে পাহাড়ের ঢালে তার ঘর
বন্য পেরেক ঠুকে নৈঃশব্দ্য ভাঙন যার আভাস
চোখের বসতিতে ক্ষয়ে, উড়ে তারা পরস্পর।

এসব কাহিনি এখন নিত্যদিনের সরল জীবন
বাঁচামরা জীবনের, ভেসে যাওয়া জীবনসংগ্রাম
আদিবাসী উৎসব খুঁজে সুখীনদে পানসির মন
খোঁজে বেদেনীদের মতো, নদীকোলে আশ্রিত গ্রাম।

পাখিদের মতো পাহাড়ের ঢালে পুনর্নির্মাণ চাষ
বন্যপ্রাণীর মতো তারা কারিগর, গড়ায় নিবাস।

 

২. যখন অরক্ষিত

যখন ঘন কুয়াশা বরফকুচি ভাঙে
রাতের পাহাড় অস্পষ্ট বাঁকা চাঁদ তখন
তুমি কোথায় যে লুকোও!

আমি স্বচ্ছ হুইস্কি ও লেবুর
মাদকতায় যমজ পাহাড় বেয়ে উঠতে চাই মাতালের পথ!
একদিন ওই পাহাড়ে স্পর্শ রেখে বলেছিলাম—
লক্ষ্মী, তুমিই হরণ করেছ আমার বিলাসী স্বপ্ন
দশকের পেলব পঙক্তি আর ছড়ানো নিশাচর মৃদঙ্গধ্বনি।
তোমার ঘুড়ি হয়ে বাতাস কেটে যখন উড়ি
তখন ভুলে যাই ভূখণ্ডের অনাচার।

আমি কথা বলি না, বলতে চাই না
যদি কোনো অঘটন ঘটে, আমৃত্যু কেড়ে নেয় স্বাভাবিক গতি
কাকে বলব—যদি প্রতিবাদী হতে গিয়ে তোমাতেই
শূন্য হয়ে যাই!

মদ্যপান করি বলে ভেবো না—আমি মাতাল
পরিবেশ ভুলে শুধু তোমাকেই ছোঁব বলে
আমাকে উড়তে হয় মধ্যরাতে—যখন তুমি অরক্ষিত
যখন তুমি তন্দ্রায় স্বপ্ন-নিদ্রায়—
কে দেয় পাহারা তোমাকে ভূতের নেশা নিয়ে
আমি ছাড়া আর কে?

 

৩. কবিতার শিল্প

শিল্প আর শিল্প নেই
অজস্র ভেজালে নিমগ্ন শিল্প, শিল্পের বেশে
চেপে আছে গোটা দেশ
কৃত্রিম আলোয় তারুণ্য স্বউল্লাসে কাব্যের অতীত ভাঙে
দেশময় চলে তার সঘন উৎসব
আর শিল্প মৃতপ্রায় বৃক্ষের তলায় নিশাগ্রস্তে ঝিমোয়।

কাব্যকলা ভেঙে কোন কাব্যে চলেছে অনাকাঙ্ক্ষিত দুপুর
রোদে পোড়ে সরল হরিণের মহেন্দ্রক্ষণ!

দেখো—কবিদের আঁতুড়ঘরে কে করে বসবাস
নিয়ত ভাঙছে সরল পঙক্তি-উপমা, বেড়ে উঠছে ঘাস!

 

৪. প্রতিহিংসার আগুন

কে না জানে শুদ্ধাচার অমর-অক্ষয়
কে পারে মুছিয়ে দিতে তার পবিত্র অঙ্কুর

প্রতিহিংসার আগুন কখনো প্রভুর ইচ্ছা
ব্যতীত কাউকে স্পর্শ করতে পারে না—
না তোমাকে, না কোনো প্রাণকে
যেমন প্রেম ও প্রণয়, মাটি ও মানুষ
মানুষের অন্তরে
দাসত্বহীন মুক্ত পাহাড়
যেমন মাথা তোলে আবার নুয়ে পড়ে সমতলে,
তোমার জেদ তেমনি
তুমি চাও—মাথা তুলে দাঁড়াক দেশ, তোমার ভূখণ্ড।

জলতরঙ্গে ফেঁপে উঠুক সমুদ্রের গর্জন।
প্রতি ইঞ্চি ভূমির অধিকারে অবিচল থাকুক।
এ-ও এক ঈশ্বরের বিশ্বাস।
মাটিতে কাঙ্ক্ষিত ফসল ফলাতে প্রয়োজন পরিমিত আলো
তুমিসেই আলোর সন্ধানে লড়াই করেছ
পা-চাপা তুষের আগুনে।
জেদ একাগ্রতায় মূলধন জেনো—
সুখ-দুঃখ-মৃত্যু সবই তাঁর হাতে—যিনি এক ও অদ্বিতীয়

 

৫. ডটবিন্দু

ডটবিন্দু থেকে পথ ভেঙে
ছড়িয়ে পড়ে শহরের অভিমুখে—এমনকী গ্রামগঞ্জেও

কোনো পথ সমান্তরাল নয়,
পথের বাঁকের কোণায় কোণায় ছোট-বড় বহুতল বাড়ি—
যা ছিল অতীত পরিত্যক্ত উঠোন, জঙ্গলি মাঠ,
মজা পুকুর জলা
মানুষের ভিড়ে, পায়ে পায়ে সেগুলো কালের গর্ভে
ধূসর স্মৃতি।

বিচূর্ণ পথ আমাকেও ডাকে
আমি কোন পথে যাব, সব পথ বড্ড বিচিত্র
অচেনা অপরিকল্পিত আগুনের পিণ্ড।
বলা হলো—তুমি যেদিকে চোখ টানে যাও,
পথই দেখাবে তোমার গন্তব্য

জানি, আমার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই
যাযাবরের মতো হিজাব-আশ্রিত এই শহরে
চেনাপথ আমি হারিয়ে ফেলেছি অনেক আগে
অতীত গর্ভে
কোনো মানুষের তৈরি সৃষ্ট পথ মসৃণ নয়—
মানুষের মনে যে পথ আঁকা আছে তা
জটিল অপরিশুদ্ধ। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বঞ্চনার অন্ধকূপ
সবখানে হারিয়ে যাবার ভয়—

আমাদের কোনো পথ
খোলা নেই, যে পথে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া যায়…

 

মনজু রহমান

 

 

 

 

 

 

 

১৯৫৬ সালের ৩ অক্টোবর বাংলাদেশের বগুড়ার পূর্ব পালশায় জন্মগ্রহণকারী কবি মনজু রহমানের পেশা সাংবাদিকতা হলেও তাঁর মূল নেশা কবিতার ছোটকাগজ সম্পাদনা করা। তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে আজাবধি প্রকাশিত কবিতা বিষয়ক ছোটকাগজ ‘অ্যালবাম’ সম্পাদনা করে আসছেন; এ ছাড়া ‘টোঙ’ ও ‘পাণ্ডব’ নামের আরও দুটি কবিতার কাগজ তিনি সম্পাদনা করেছেন। সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত তাঁর ১০টি কাব্যগ্রন্থ ও ২টি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি দেশের বিভিন্ন দৈনিকে মাঝেমধ্যেই লিখে থাকেন। বগুড়ার পূর্ব পালশার ২০২৭/২ নম্বর ‘কঙ্ককুসমি’ বাড়ির এই অধিবাসীর সঙ্গে যোগাযোগের ফোন নম্বর ০১৭১৬-৭২৬১৬৯ এবং ইমেইল ঠিকানা [email protected][email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top