বেআদব
জলের নজর বড় বেআদব
জলের চোখের মণি ইতিউতি ঘোরে
জলের বিজ্ঞান কিছু নীতিহীন ঠেকে
রক্ত তার স্থির ও শীতল
তালু নিশপিশ করে
চোখ খোঁজে সমূহ যাপন।
#
জলকে বলেছি আমি
এবার তো বহে যেতে পারো।
শীতের রোদ এরিয়া মার্ক করে
নিঃসঙ্গ ফিরে যাচ্ছে রোজ,
কখনো তো তার সাথে চলে যেতে পারো।
যে সব কলঘর
সারাদিন উষ্ণতা খুঁজে
উলের নকশা বোনে টুপি বা জামায়
একবার গিয়ে তাদেরও তো দেখে আসতে পারো।
ইতিহাস
মাটি খুঁড়লে আরও কী কী পাওয়া যেতে পারে
তার হিসেব রাখছে মুদ্দাফরাশ
প্রতিটি প্রস্তরখণ্ডের গায়ে টিকিট লাগিয়ে
ক্যাটালগ নির্মাণ করছে ঝাড়ুদার
#
ইজ্জত সওয়াল
এই যে গাঁইতির ঘায়ে মাটি ফুঁড়ে উঠে এল জল
অন্তর্লীনা ভাগীরথী আলবাৎ বহে যেত এইখানে আদিকালে
এ দাবি ওঠার পর বরেণ্য ইতিহাসবিদ
আগাগোড়া কনফিউজড্ এবং ঈষৎ বেসামাল
#
থিবেস তাঁকে লিপি দিয়েছিল
আলেকজান্দ্রিয়া বই
জল কিছুই দেয় নি প্রবাহ ছাড়া
সেটা আর এক লিপি
কিন্তু তিনি তা পড়তে পারেন না
ব্যাধ
সে বুঝি ভেবেছিল আজ কিছু মিলে যাবে
ঈগলের ধারালো চঞ্চু আর নিমীলিত আকাশছায়ায়?
এই দ্বীপে শুধুমাত্র খরগোশেরাই বসবাস করে
এবং সূর্য ডুবে গেলে তারা খেয়ে যায় মুকুলিত চারা
শস্যের বন্ধ্যা ভূগোল তারা খায়।
#
সে দেখে, বাজপাখি মরে পড়ে আছে,
গর্তের মুখে নির্বিবাদ পড়ে আছে ব্যাধের পোষাক।
রাত নেমে এলে লাইটহাউসের আলোয় এমনকি
শৃগালেরও চোখে ধাঁধা লাগে।
সারাটা সকাল প্রাণহীন। সে ভাবে
সন্ধ্যা নেমে এলে প্রতি রোমকূপে সে ফসল ফলাবে
বাদামী খরগোশগুলির জন্য তাকে কিছু দানাশস্য নিয়ে যেতে হবে।
ফেরা
তোমার ফেরার পথে নেশাড়ু মাতাল এক বসে আছে।
গা ঢেকে বসে থাকা ব্যাধের দৃষ্টি স্থির হরিণীর জলে।
আঁকবাঁকা পথে চলা সাপের দৃষ্টি সরলরৈখিক
মায়াবী ইঁদুর দেখে ধান কাটা হলে। অনুরাগী মাতালের
দৃষ্টি কেমন হয় তা বলা অসম্ভব। তোমার ফেরার পথে
বসে থেকে থেকে সে হয়তো ফেরাটাই দেখে,
তোমাকে দেখে না।
রক্ষী
এমন কোজাগরী রাত
আমাকে চাঁদের পাশে একাকী বসিয়ে রেখে
ঘরে ফিরে গেছে সব তীর্থযাত্রীদল
মহুয়ার নেশা করে যেসব মেয়েরা আজ নাচতে চেয়েছিল
তারাও শেষ পর্যন্ত উঠোনে ক্যানভাস পেতে বসে গেছে।
#
আমি দেখছি সমস্ত আকাশ জুড়ে
একটু একটু করে জেগে উঠছে অগনন পদচিহ্ন।
আর কেউ নেই। চাঁদের বিষয় আশয়
একা আমিই আগলে পড়ে আছি।
নাবিক ও বন্দর
সমুদ্রবন্দরের কাছে নাবিকের
কিছু কিছু ঋণ তো থাকেই।
নাবিক ঘুমালে
বন্দর পাশে এসে বসে।
গা থেকে মুছে দেয় স্কুইডের ঘ্রাণ
জমে থাকা ঢেউয়ের লবন
নাবিকের ঠোঁট থেকে চেটে নেয় সমুদ্রবন্দর।
#
নাবিকও বন্দরকে নিয়ে
অ্যালবাট্রাস দ্বীপে ঘুরে আসে,
সে তাকে তরঙ্গ দেয়
ঝড় দেয় উথাল পাথাল।
#
নাবিক ও বন্দর
মাঝে মাঝে দেখা হয় তাদের
আসলে দু’জন তারা
কেউ কারো নয়।
শূককীট
সে একে একে সরিয়ে নিচ্ছে জাদুকাঠি
খুলে ফেলছে দস্তানা, বন্ধ করছে
প্রবেশদ্বার। নদীকে বলেছে ফিরে যেতে,
তুলে নিচ্ছে প্রোথিত নোঙর।
থেমে রয়েছে ঘড়ি, সেকেন্ডের কাঁটা স্থির
তাকিয়ে মুখের দিকে নির্নিমেষ।
একটি রেশম মথ কোকুন বুনছে বসে
সাদাকালো কংক্রিট দেওয়ালের গায়!
#
সে ভেবে আকূল হল কেন এই শূককীট
নিবিড় আশ্বাস হয়ে এখনও অচঞ্চল, স্থির?
স্বয়ম্বর
আকাশে ভেসেছে মীন
আমার সবুজ হাতে
কে যেন ধরিয়ে গেল সোনালী গান্ডীব
মোটামুটি টিপ করে একবার ঝেড়ে দাও চোখে
কেউ বলেছিল পাশ থেকে।
#
আমিও টিনের পাত জ্যা মুক্ত করে
বিঁধে দিব লক্ষে উদগ্রীব
হঠাৎ বিম্বে দেখি সমুদ্র ধরেছে আকাশ
আকাশে ভেসেছে জলপরী।
অন্ধ সে, চোখ নেই তার
চোখ তো থাকার কথা ! সেখানে কোটর,
ফাঁপা, শুকনো রক্তে ভরে আছে।
কি দেখিলে বল দেখি জানকীবল্লভ ?
আমার দর্পনে নেই তিলমাত্র চোখের আভাস।
ক্ষরণ
তোমার দরজা থেকে
খালি হাতে ফিরে যাবো
সে কী ভাবো আমার ক্ষরণ ?
#
তোমার প্রত্যাখ্যান
সে তো তোমারই ভয়
#
আমি সেই বিরল উদ্ভিদ, যার
খাদ্য বলতে দ্রবনীয় ভয়
ঈষৎ লবনযোগে সামান্য শোষণ।
বোরিং বোরিং
ছিপ নিয়ে পাড়ে পড়ে আছি। দেখছি
বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে নিচ্ছে
ছোট মাছ ঠুক ঠুক
ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দেখছে চার
ফাৎনা ফাৎনার মত
অর্ধনিমজ্জিত জলে। বাতাসের সাথে
কথা বলে বলে
বাকিখানা ভেসে থাকে স্রোতে।
#
মাঝে মাঝে
জল থেকে তুলে এনে দেখি
অপাপবিদ্ধ বঁড়শি
ফাৎনার তিরষ্কার শুনি
বোরিং, বোরিং।
স্বপন ভট্টাচার্য

কবি, প্রাবন্ধিক, বিজ্ঞানগদ্য লেখক, অনুবাদক এবং সাবেক অধ্যাপক। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার পাশাপাশি নিবিড় সাহিত্যচর্চায় যুক্ত এই লেখকের কবিতা ও নিবন্ধ ‘পরবাস’-সহ বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকী ও অনলাইন ওয়েবজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
তাঁর কবিতায় আবেগের চেয়ে জীবনের বৈচিত্র্য, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায়; যেখানে মায়াবী চিত্রকল্প ও রূপকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে আধুনিক জীবনের একঘেয়েমি, নিঃসঙ্গতা, ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক ও অন্তহীন প্রতীক্ষা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ ‘ওষধিবাগান’ (২০১৭) ও ‘গ্যালিয়ানোর আয়না ও অন্যান্য কবিতা’ (২০১৯), বিজ্ঞানচিন্তা ও নিবন্ধমূলক গ্রন্থ ‘অবিহিত কাল: জীবাণু ও জীবনের কথা’ (২০২২) এবং সংকলনগ্রন্থ ‘বিজনের পাঠশালা’। অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, যার অনন্য উদাহরণ স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কবিতার অনুবাদ ‘একশো বছরে লোরকার কবিতা’।
