সিদ্ধার্থ হকের কবিতা

কথা ৪১—প্রেম

হয়ত কবিতা লেখা যায়, যায় ও যায়না, কিন্তু তোমাকে লেখা,

অসম্ভব, মানি; এমন অক্ষর কেউ লিখতে পারেনা, পারে নাই,

যে অক্ষর লেখা হলে, তার থেকে বের হয়ে সামনে এসে বসবে,

কথা থেকে বের হয়ে কথা বলবে, এরকম কোনো কথা লেখা হয় নাই;

কল্পনায় বহু কিছু হয়; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, কথা শুনে, দূরত্বকে পার হয়ে

তোমাকে সামনে এনে উপস্থিত করেনা জগত

তথাপি তোমার কথা লিখি, মনে মনে উপস্থিত করি

কথা বলি বিড়বিড়, উদভ্রান্তের মত;

কথা থেকে বের হয়ে, কথার অধিক, সামনে এসে বস,

চুপ করে তাকাও এদিকে

 

শূন্য একটা স্ক্রীন, শাদা পৃষ্ঠা, অন্ধকার স্ক্রীনশট, বহু আগেকার

কোনো স্ক্রিপ্টের মত, তাকিয়ে রয়েছে;

তাকিয়ে রয়েছে ভিতর, বাইরের দিকে;

বাইরে যে ভিতর আছে যেখানে সামান্য চড়ুই অসামান্য গান করছে

জগতের মত; আমার সামনে শূন্য স্থান, ধান কাটা হয়ে যাওয়া

পৃথিবীর মত, সহস্র বছর শুধু এইভাবে কাটে

মাটির ভিতর থেকে বের হয়ে জেগে উঠছে মহৎ উদ্ভিদ

তাকিয়ে রয়েছি আমি শত শত প্লাটফর্মের দিকে;

শত শত প্লাটফর্মের লক্ষ মানুষ, দুটি শুয়ে থাকা লোহার লাইন

দেখছে তাকিয়ে; লোহার রেললাইন আমার হৃদয়ে ঢুকছে

 

বহু আগে কোনো এক ট্রেনের গভীরে তুমি আমি হেঁটেছি অনেক;

সেইভাবে আরেকবার হাঁটা কি সম্ভব? হাঁটতে হাঁটতে পার হয়ে যাব

প্লাটফর্ম, পার হব সকল অনিদ্রা; অক্ষরের সীমাবদ্ধতা

আমরা পার হয়ে যাব; কবিতাকে পার হয়ে যাওয়া যায়না,

ফলে তার ভিতরে ঢুকব, দেখব অলীক অক্ষর জন্ম দিচ্ছে

অলীক জগত আর বাস্তব পৃথিবী একসাথে;

তুমিও অক্ষর থেকে বের হয়ে এসে

সামনে বসেছ সেই মানবীর মত;

অক্ষরের এই তুমি ঠিক সেই তুমি, যাকে আমি জানি ও জানিনা;

 

লিখছি অনেক দিন, লিখতে লিখতে অক্ষর পার হয়ে গেছি বহুবার;

কোনো অক্ষর থেকে বের হয়ে সামনে আসোনি তুমি কোনোদিন আজও;

কোনো পার হয়ে যাওয়া থেকে তোমার অস্তিত্ব জন্ম নেয়নি;

তবু এক ভূত এসে সামনে বসে আছে, অক্ষরের মতন নীরবে

 

০১/০৮/২০২৬

 

কথা ৪০—ঝরে যাওয়া

প্রতিদিন, একটু একটু করে, তোমার অবয়ব থেকে,

                                                         ঝরে যাও তুমি;

ঐ মুখে অন্য এক ক্লান্ততম মুখ, ফুটে ওঠে,

পুনরায় ঝরে যাবে বলে; বদলে যাও এইভাবে

বদলে যাওয়ার নিগূঢ় ভিতরে হাত পড়ে; বহু রাতে টের পাও,

পা থেকে জোছনা ঝরছে, হাত থেকে ঝরে পড়ছে

বেদনার সাতটি পুকুর, জীবনের নিঃশ্বাসের মত,

এক অদ্ভুত ইউকলেইলে বেজে যাচ্ছে স্পেসে, শুদ্ধতম বেনজু;

অশেষ মরুভূমির নিঃসীম বাতাস ঘুরছে বহু ঘর থেকে ঘরে;

সব চেয়ে বেশি ঝরে জীবন, এ শরীর থেকে, ক্রমান্বয়ে;

এ জীবন হতে ধীরে জীবনের বহু পথ উবে গিয়ে শূন্যে মিলায়;

যত হাঁটো, তত ঝরে স্মৃতি, তুমি কি তা টের পাও?

দু’একটি মুহূর্ত তুমি স্মৃতিহীন হয়ে এক নিঃস্তব্ধতাকে

জানতে পারো; তবু দেখো সব স্মৃতি ঝরেনা কখনো;

কিছু স্মৃতি ঝরে যায়, কেউ কেউ ঝরেনা, কেউ ফিরে আসে,

যত হাঁটো তত বাড়ে স্মৃতি, তত কমে, তত বাড়ে কমে

বিস্মৃতির দ্বার প্রান্তে বিস্ময় অপেক্ষা করে বহু পুরাতন এক

আয়নার মুখের মতন; বিস্ময় ও আয়না ঝরে পড়ে মুখ থেকে,

উঠে আসে পথ থেকে পথ, এই গায়ে; তোমার নতুন ত্বক

চাষের জমির মত বলিরেখাময়, কেননা সকল ঐক্যের

খুব কাছে, এক সীমান্তবিহীন অনৈক্য চুপ করে বসে আছে;

যত দিন যায় তত সে অনৈক্য ঘিরে আসে, গোল হয়ে, চারদিক থেকে

যত দিন যায় তত স্পৃহা ঝরে যায় নিবিড় সকল স্পৃহা হতে;

ক্রমান্বয়ে অবয়বে উদ্দেশ্যহীনতা জেগে ওঠে;

আমার সময় থেকে অন্য কার কাল যেন ঝরে যায়,

আমি যত ঝরি তত সেও ঝরে যায়

প্রতিদিন তোমার শরীর থেকে সকল শরীর ঝরে পড়ে

সকল শরীরে মেশে তোমার শরীর একটু একটু;

গাছের পাতার মধ্যে তোমার অবয়ব আমি দেখতে পাই

জেগে আছে, স্ফূর্ত ফুলের মতন; পৃথিবীকে দেখে,

এই এক সত্য টের পাও, যে কখনো দেখেনি মরুভূমি,

তার মন থেকেও মরুভূমি ঝরতে থাকে, রাত্রি গাঢ় হলে;

সবচেয়ে বেশি ঝরে জীবন এ জীবন থেকে

বেদনায় ভষ্ম হতে থাকে দুই হাত;

প্রতি পদক্ষেপ থেকে একটি পদক্ষেপ নিভে যায়;

কোথায় বা যাব আমি, সব স্থান যেন ক্রমান্বয়ে

হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙেচুরে স্থানহীনতা হয়ে গেছে

৩১/০৭/২০২৬

 

কথা ৩৬—প্রেম

বহু কিছু দিয়ে যেতে পারব তোমাকে, শুধু এই জীবনযাপন

হয়তোবা আমার সাথেই চলে যাবে, ছায়ার মত,

–শরীরকে ছেড়ে ছায়া থাকতে পারেনা, অন্ধকারের ভূত—

শিলাস্তরে একটি চিহ্ন এঁকে, ঘুরবে ভূগর্ভস্থ জল বহনকারী

নদীতে নৌকা, হাত উঁচু করে, এ্যঙ্করবিহীন বাস্তবতায়,

আমার ছায়া, কিংবা ছায়ার আমি, ক্রমে সরে যাব,

পাতাহীন বৃক্ষ, যার ডালে আর কোনো বৃষ্টি ঝরবেনা

বাতাসে দুলবেনা তার সবুজ শরীর, ফুটবেনা

ধর্মনিরপেক্ষ ফুল, পাতার ভিতরে, কোনো পাখি আসবেনা

একা বসে সারাদিন জগতের গান আর গাইবেনা,

                                      ছিঁড়ে ফেলা মর্মান্তিক হাত;

দূরের শহর কার নীরবতা ঘিরে হেঁটে যায়; হয়ত সে বহুরাতে

জীবনের বেদনায় পথে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল, প্রেমহীনতার,

কিংবা ভুল প্রেমের বাস্তবতা টের পেয়ে,

দেখেছিল সব বাস্তবতার মধ্যে নোঙ্গরের মত কল্পনা আছে,

ঘুরছে, ঘুরছে, স্পর্শ করতে চাইছে মুখ, বলতে চাইছে, কেঁদোনা,

ঐ দেখো একটু দূরেই একটি লোক, আরও গাঢ় বেদনার মধ্যে

এক নম্র স্পৃহার মত, চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে,

তার মন তোমাকে জড়িয়ে ধরেছে, যদিও সে হয়ে আছে দূর,

তার ছায়া তাকে ছেড়ে তোমার নিকটে এসেছে, বলছে,

পথ থেকে ওঠো সোনা, জীবনযাপন তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবে

স্ফূরণের মত যা কিছু মাঝে মাঝে কেঁপে উঠে বিকশিত হয়,

তা সত্য কিন্ত শাশ্বত নয়, অবিনশ্বর বলে কিছু নেই

শুধু এই অন্তহীন বেদনার অনুভব ছাড়া;

চিরন্তন, চিরন্তনভাবে বদলাতে থাকে

লক্ষ্য কর, আমার ছায়াও বদলে যায় আমার শরীরের মত

তবু যেন কিছু কিছু সরে যাওয়া গান, এই মন ভুলতে পারেনা

আমার জীবনযাপন যখন বাষ্পের মত ক্রমে উবে যাবে,

পরিপূর্ণভাবে আমি ইথারে মিলাবো, মনে হয়,

দু’একটি গান তবু থেকে যাবে অনন্ত নীরব, রূপান্তরিত

হতে হতে চিরন্তন থাকা এক ইথারের মধ্যে

বহু রাতে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সে শূন্যে বসে রবে

                          অনন্ত বদলে যাওয়া বুকে নিয়ে চিরস্থায়ী পাখি

১৮/০৭/২০২৬

কথা ৩৮—চোখ

বহুদিন আয়নার দিকে তাকিয়ে রয়েছি; আর কত দিন

আয়নায় তাকিয়ে এই অজানাকে দেখে যেতে হবে?

সে আমাকে তার কোনো পরিচয় দেয়না কখনো;

আমিও আমার পরিচয় তাকে দিতে পারিনা;

হয়ত সেও তাকিয়ে আছে এ আমার দিকে বহুকাল;

আয়নার স্বভাব এই, তাকানো ফেরত দিয়ে দেয়;

ফিরে আসা তাকানোর মধ্যেও কোনো জানা কিছু নেই;

তার সাথে পরিচিত হয়ে উঠবার সময় কি এবারও হবেনা?

অদ্ভুত বেদনা হয় অজানার চোখ দুটি দেখে;

বহু ব্যথা ঐখানে, ওই দুটি চোখে, চোখকে ধারণ করা মুখে;

প্রতিটি বলিরেখা একটি উপন্যাস

বহু রাত্রি পতনের শব্দ প্রতিটি উপন্যাসে, বলিরেখায়;

নদীর পাড়ের মত বলিরেখা ভাঙছে গড়ছে আর জন্ম দিচ্ছে

নতুন গঞ্জের ভাঙা চাড়া, ঘরবাড়ি, হাটে যাবার মগ্ন পথ;

সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে টের পাওয়া যায়, হয়ত দূরের হাটে

যাবার সময় হয়ে এলো তার, তবু তার স্ট্রাগল এখনো চলছে

অনলাইনে বহু কিছু কেনা যায়, হাটে যাবার পথ কেনা যায়না

হয়ত সে সহস্র সহস্র মাইল মরুভূমি পার হয়ে মরূদ্যানে পৌঁছে

দেখেছে তাকিয়ে আছে চোখ খুলে ফলের দুর্বিনীত দৃষ্টি;

গাছের নরম ছায়া শীতল পাটির মত বিছিয়ে রয়েছে;

তারপর কোনো অন্ধ পথ প্রদর্শক তাকে নিয়ে গেছে

ছায়া থেকে বহু দূরে, এতিম উটের মত হাঁটিয়েছে

অনিঃশেষভাবে, সেই দুর্বিনীত ফল আর সে দেখে নাই;

ছায়ার শীতল পাটিতে শুয়ে পাতাদের ফাঁক দিয়ে আকাশের

অনবধারিত রূপ আরেকবার দেখবার ইচ্ছা

পূর্ণ হয়নি; শান্ত হয়ে গেছে সব চাওয়া;

তারপর বলিরেখা জেগেছে তার মুখে আর চোখে;

চোখের বলিরেখা প্রতি ভোরে দেখে যাচ্ছে তার চোখ

আয়নায় তাকিয়ে; বিভ্রান্ত রঙের মেলা চারপাশে আছে;

তথাপি সে পৃথিবীর শাদা কালো বাস্তবতা, রঙ যে শুধু

আলোর কম্পাঙ্ক, দুচোখের বলিরেখা দিয়ে, বহু ভেবে,

বহু দেখে, পাঠ করে, ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছে;

বেদনার বারংবারতার তারতম্য হয়নি সে বোধগম্যতায়

২৫/০৭/২০২৬

কথা ৩৫—ইতিহাস ও ব্যর্থতা

সব কথা বুকে নিয়ে চুপ থাকে অনন্ত ইথার—

সব কথা, সব কথাহীনতার ফিসফিসে মাঠ,

সব শব্দ, ব্যর্থতার মত সমুদ্রের তলদেশে শুয়ে থাকা

শব্দহীনতার শত রঙহীন অতল জাহাজ

বুকে নিয়ে চুপ করে বসে আছে অনন্ত ইথার

মানুষের অশেষ ভ্রান্তি, বই আর বাস্তবের নিষ্ঠুর অমিল,

যা মানুষ ধরতে পারেনা কিম্বা পারে, তবু অন্ধ থাকে

স্ট্রেঞ্জ অহংকারে, সেইসব ধরতে পারা বা না পারা

বুকে নিয়ে বয়ে চলে বাতাস ও ইথার একসাথে

টের পাই চোখ আছে বাতাসের ইথারের, পরিপূর্ণ চোখ,

                          মানুষের দৃষ্টির মত আংশিক তা নয়

চাইনি তেমন কিছু, পৃথিবীর গোলাকার মাঠে বসে,

চেয়েছি তোমাকে বুঝে নিতে, ইতিহাস, বিজ্ঞান এইসব ধারণার

বাইরে তোমার যে ছায়া, নির্জন হয়ে পড়ে আছে, তার সন্ধান;

সব ধারণার ঐ পারে, যে বোধগম্যতা, যা সকল বিমূর্ত ধারণা,

ও বর্তমান একসাথে দেখতে পারে, তাকে চোখ বুজে,

বুঝে দেখবার চেষ্টা করে গেছি, খুব যে বুঝেছি, জেনেছি

তা নয়, শান্তি পাইনি, মুক্তিও নয়; হয়ত মুক্তি পাওয়ার স্থান

                                                                 এ পৃথিবী নয়

অতল গভীর অবোধ্যতা, কেননা তা বুদ্ধির অধিগত নয়

                                         কোনো তর্কে উঠে আসেনা;

প্লেটভর্তি দৃষ্টিহীন চোখের মত, মাঠ ভর্তি তর্ক বসে আছে,

ক্লান্তিকর ক্লান্তিকর এইসব গরিমা ও ভ্রান্তি

পৃথিবীর আভাস আসে থেকে থেকে গাঢ় স্পর্শের প্রেমের মতন

সব বেদনার বাইরে টেনে নিয়ে যায় তার স্পেস-হাত, বাতাস-বাহন,

বসায় এক বিস্ময়ের মুখামুখি; কে আমি, কি আমি, এইসব

প্রশ্নের উত্তর শব্দে আসেনা, নীরবতা হয়ে কাছে আসে, বসে থাকে;

মাঝে মাঝে তাকে আমি গভীর বেদনা থেকে চোখ তুলে

স্প্লিট সেকেণ্ডের জন্য যেন দেখতে পাই, কিংবা পাইনা;

আত্মার দরজা খুলে বসে আছে যারা, তাদের ছায়ার মত মুখ

চোখের পলকে কাছে আসে, চলে যায় দূরে, ফের আসে,

ফের চলে যায়, অনন্ত অসীম কাল ধরে এই খেলা চলে;

শুধু পাঠ আর পাঠ-বুদ্ধি নয়, ঐসব পার হওয়া মৌলিক চেতনা,

যখন মানুষের অনন্ত নিষ্ঠুরতার ইতিহাস লক্ষ্য করে

সত্য বাস্তবতা, কিংবা প্রায় সত্য বাস্তুবতা দেখে

                                               যে বেদনা অনুভব করে,

সে বেদনা সমুদ্রের তলদেশে শুয়ে থাকা গভীর টাওয়ার

১৭/০৭/২০২৬

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top