কবি আজীজুল হক বাংলাদেশের কবিতায় পঞ্চাশের দশকের একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি হিসেবে গৃহীত | বলা প্রয়োজন, বিশ শতকের তিরিশ দশকে আধুনিকতায় তথা বিশ্বকাব্যচরিত্রে বাংলা কবিতাকে রূপদান নিয়ে যে আন্দোলন, সে ধারায় বাংলাদেশের পঞ্চাশের কবিগোষ্ঠী উজ্জীবিত হলেও তাঁদের কবিতা সমকালীন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতি তৎপরতার আবহে রচিত এবং স্বতন্ত্র মর্যাদায় চিহ্নিত | সময়ভিত্তিক রূপান্তরপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পঞ্চাশের দশকের কবিতা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য কারণ এর স্বতন্ত্র অবয়ব রয়েছে | ১৯৪৭ এর দেশবিভাগ-উত্তর ১৯৪৮ এ সৃষ্ট ভাষা-আন্দোলন এবং ১৯৫২ সালে এর রক্তাক্ত পরিণাম এ দেশের কবিতার স্বতন্ত্র ক্ষেত্র প্রস্তুত করে | বাংলা ভাষার রাজনৈতিক স্বীকৃতি বাঙালিকে আত্মচেতনাঋদ্ধ জাতীয় জাগরণে উদ্বুদ্ধ করে |
কবি আজীজুল হক অস্তিত্বসচেতন আধুনিক কবির মর্যাদায় ভূষিত | কবির কবিতার আলোচনায় আমাদেরকে অবশ্যই তাঁর সমকাল ও সময়ের কাব্যগুণের উল্লেখ করতে হয় | আধুনিক কবিতার অন্যতম লক্ষণ যে আত্মবিকাশের প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্যে নিহিত, পঞ্চাশের কবিতায় তা চলমান সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থায় ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে | সংগ্রামী মানব-অস্তিত্বের প্রধান লক্ষণ যে সামষ্টিক চেতনা তারই শৈল্পীক প্রকাশ দৃশ্যমান হয় পঞ্চাশের দশকের কবিতায় এবং এ দশকে কবিব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে সমাজরাষ্ট্রীয়চৈতন্যের বৃহৎ প্রেক্ষাপটে | কবি আজীজুল হক এর কবিতা অস্তিত্ববোধজাত এবং এ অস্তিত্ববোধ সমাজঅস্তিত্বের সক্রিয় অংশ হিসেবে ব্যক্তিজীবনের বিপন্নতাকে অতিক্রম করতে চেয়েছে | বৃটিশ উপনিবেশমুক্তির বিপ্লবী অভিজ্ঞতা , সাম্যবাদী উদার ভাবনা, নব্য ভূখণ্ড পূর্ব বাংলায় স্বপ্নভাঙনের হতাশা ও কষ্ট, পাকিস্তানি নয়া শাসনপদ্ধতিতে বাঙালিত্বের অবমাননা , সমাজ-সংস্কৃতির অন্তর্গত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সক্রিয়তা , বিশ্বমানবতাবোধ, প্রেম-নিসর্গ-নারী প্রভৃতি বিষয় পঞ্চাশের কবি হিসেবে আজীজুল হকের শিল্পচৈতন্যকে আলোড়িত করেছে |
‘ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে’ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ | গ্রন্থের নামকরণে কবির সমাজ ও জীবনবোধ স্পষ্ট হয়ে আছে | ‘ঝিনুক’ ‘মুহূর্ত’ ‘সূর্যকে’ –এ শব্দতিনের অন্বয়ের মধ্যে কবিদৃষ্টির পরিচয় নিহিত | সমাজের ভেতরকার ক্ষয় বা বিপন্ন সময় ‘ঝিনুক মুহূর্ত’ শব্দবন্ধে ধারণকৃত এবং এ বিপন্নতাকে সূর্যের শক্তিতে মুক্ত করার প্রতীকী ব্যঞ্জনা গ্রন্থের নামকরণে লক্ষ্যনীয় | ঝিনুক যেমন অন্তরালে মুক্তকে ধারণ করে, শক্ত আবরণে আত্মরক্ষা করে বাঁচে, কবি যেন তেমনি পার্শ্বিক বৈরীতা থেকে সুরক্ষিত জীবনের ক্রিয়া-প্রক্রিয়াকে অনুভব করছেন | আবার, বিষয়টি অন্যমাত্রা পায় সূর্যের প্রতীকে | সূর্য জীবনের যে দীপ্তি আর শক্তিরূপ ধারণ করে, কবি সেই দীপ্যমান শক্তিরূপকে কাব্যের অবয়বে গড়ে তুলতে চান| কেননা ব্যক্তিক উপলব্ধি থেকেই তিনি এই সত্যকে কবিতায় আনেন | গ্রন্থের নামকবিতায় আমরা পাই সমকালের পরিচয় –যেখানে মনোগত স্তরে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব স্পষ্ট এবং কবিচিত্তের বেদনা :
বন্ধুর শীতল হাতে হাত রেখে বন্ধুরা যখন
হলুদ বাতির নিচের কথা বলে,’ ফের দেখা হবে
আসি তবে’ এবং বিশিষ্ট হয় জুতোয় মাড়িয়ে
চিনেবাদামের খোসা,
বরফকুচির ধুলো ওড়ে ছায়াপথে,
নির্বিকার নক্ষত্র সমাজ,
প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ করি কোন এক দুর্ঘটনাকে ,
প্রত্যেক নক্ষত্র এক দূরত্বের নিঃসঙ্গ শিকার |
( ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে, ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে)
মানুষকে কবিতায় ‘নক্ষত্র’ শব্দটি যুক্তিসত্যের আকারে আলোড়ন সৃষ্টি করে | শব্দটি একদিকে যেমন আপন এ মানবীয় বিকাশের পীঠ সমাজের প্রতীকী রূপে চিহ্নিত ,অন্যদিকে তার নিঃসঙ্গ অবস্থান সামাজিক বৃত্তকেও নির্দেশ করে | এ অবরুদ্ধমুক্ত স্বপ্নময় জীবনের প্রসঙ্গ ও ইঙ্গিত পাওয়া যায় গ্রন্থের অন্য একটি কবিতায় :
একদিন মানব সমাজ
ওইখানে যাবে, এখন যন্ত্রণা শুধু আজ | এখন কেবল
শব থেকে শবের সিঁড়িতে একটি আকাঙ্ক্ষা হেঁটে যায়
জীবনের নামে ; এখন সে জীবনের নাম
স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম |
( যন্ত্রণা , ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে )
মনুষ্যজীবন অন্তিমে এসেও প্রায়অন্ধকারে যে স্বপ্ন দেখে , সে স্বপ্ন তার জীবনীশক্তি | এ স্বপ্নশক্তিই তাকে অস্তিত্বের সংগ্রামে সক্রিয় করে এবং জীবনের আদল দেয় | ‘যন্ত্রণা’ ,’আকাঙ্ক্ষা’ ,’স্বপ্ন’, ‘রক্ত’, ‘ঘাম’– শব্দগুলোর ব্যবহারকৌশল কবিতায় এনেছে গাঢ়তা | কবিতার অবয়বে শব্দকে রূপকের ব্যঞ্জনায় এমন ব্যবহার কবির কাব্যবৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক হিসেবে বিবেচিত | শব্দবাদী কবির দৃষ্টিকোণ নিয়ে তাঁর নিজেরই কথা : ‘কবিতাচর্চা মানে শব্দশরীরচর্চা’ (অস্তিত্বচেতনা ও আমাদের কবিতা, পৃষ্ঠা ১৭)
কবি আজীজুল হক এর কবিতায় দেখতে পাই প্রেম ও নারীর পারস্পরিক পরিপূরক রূপ ও সম্পর্ক | এ সম্পর্কটির সুচারু প্রকাশ ঘটেছে তাঁর একটি কবিতায় :
জাহানারা , একটি মুহূর্ত তুমি দিয়েছিলে খুলে
তোমার বয়স থেকে, অথবা তা এমনিই
খসে পড়েছিল ,
খসে পড়েছিল ,
তবুও তা স্পর্শমণি হলো না এখনো |
রূপালি মেঘের প্লেটে একটি সুন্দর চাঁদ
উপহার দেওয়া হয়ে গেলে
সময় হারিয়ে গেল ঝুমকোর বাঁকের আড়ালে ,
উজ্জ্বল কুমারী নদী সোনারং সরীসৃপ
স্পর্শ হয়ে গেল |
কেমন সুন্দর তুমি, প্রতিজ্ঞার মতন ঋজুতা
গ্রীবাদেশে, তারপর শিথিল চিবুক,
চোখের মলাট নেমে এলে
তারপর তুমি এক সুমিষ্ট শরীর |
(জাহানারা , ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে )
কবিতায় কবির প্রেমানুভব আনন্দের ধ্বনি পায় নি বরং তা প্রেমিকার সংস্পর্শে এসে সমাজসংকটমুহূর্তে প্রশ্নময় হয়েছে , কবিকে যন্ত্রণাকাতর করেছে | কবিতাংশে শব্দের স্বতন্ত্র চর্চা নেই , শব্দবিন্যাসভিত্তিক প্রতীকী ব্যঞ্জনা আমাদেরকে বিশেষ অর্থের উপকূলে বয়ে আনে | এবং এ ধারায় রচিত কবির অন্য সব কবিতায় দেখি , সেখানেও প্রেম, সমাজ ও জীবন সম্পর্কীয় অর্থ ও ভাবনার বিস্তৃত ভূমি সৃষ্টি হয়ে আছে | কবির আর একটি কবিতায় নারী, নিসর্গ ও আপন অস্তিত্বের গভীর প্রকাশ লক্ষ্যনীয় হয়ে ওঠে :
সুলতানা ,তুমি এক ফুল নও, তুমি
একগুচ্ছ ফুল
মুহূর্তের ঋতুমতী ,স্ফুটন প্রহরগুলি অতি উষ্ণ
এবং নির্ভুল ,
প্রত্যেক কুসুম তার বর্ণে গন্ধে ভিন্নতর,
স্বয়ং সম্পূর্ণ তারা মধুবিন্দুভাবে পরস্পর
পরস্পর থেকে ,
না হয় নাই-বা হলো অখণ্ড সঙ্গীত এক, তবু
প্রতি ফুলে বিচ্ছিন্ন গুঞ্জন যাবো রেখে,
তা-হলে বিষ্মিত হয়ো না |
(প্রাক উত্তর পর্বের সঙ্গীত , ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে )
কবিআত্মাকে খুঁজে পেতে হয় তাঁর সমাজ, মাটি আর প্রেমানুভের প্রসঙ্গে | এ কবিতায় ‘ফুল ‘ শব্দটি নারীসত্তার পূর্ণতাকে ইঙ্গিত করে এবং যা মধুরতায় উত্তীর্ণ অনুরূপভাবে ‘সঙ্গীত’ শব্দটির দ্যুতিময় ব্যবহার কবির আপন অস্তিত্বের বিকাশমান বিভাকে ব্যক্ত করছে |
কবি আজীজুল হক এর কাব্যপ্রসঙ্গ তাঁর সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ,প্রেম , নারী প্রভূতি বিষয় ঘিরে আবর্তিত এবং আপন অস্তিত্বের সঙ্গে প্রযুক্ত | তাঁর নিজের কবিতা নিয়ে বক্তব্য :
আমি কেবল এই বোধের উপর দাঁড়াতে পারি যে , কবিতা জীবনের নিগূঢ়তম অভীষ্ট সিদ্ধির শিল্প- সুন্দর এক উপায় বিশেষ | কবিতা আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ কোন এক পরিণাম নয় যেমন ফুল নয় বৃক্ষজীবনের পরিণামসীমা | ফুল এক শৈল্পীক সিদ্ধি বটে , কিন্তু সঙ্গে তা বৃক্ষের অস্তিত্ব বিষয় ,প্রয়োজন সিদ্ধিরও মনোহর উপায় | কি সেই অভীষ্ট তা জানি না , কেবল এক অভীপ্সাকে উপলব্ধি করি যা , বোধ হয়, স্থান-কাল-পাত্রে বিধৃত পার্থিবঘনিষ্ট মানবিক অস্তিত্বের বিদ্যমানতাকে বিস্তীর্ণতার মধ্যে বহুর মধ্যে এবং চিরসময়ের মধ্যে বিনাশহীন ক্রম সম্প্রসারতায় মুক্তি দেবার আকাঙ্ক্ষারই এক পরিশুদ্ধ নাম |
(আজীজুল হকের কবিতা , ভূমিকা)
